অধ্যক্ষ
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৪৭ অপরাহ্ণ
অধ্যক্ষ
বর্তমান যুগের কিশোর-কিশোরী এবং শিক্ষার্থীদের দিকে তাকালে অনেক সময় এক ধরণের উদাসীনতা চোখে পড়ে। অভিভাবক ও সমাজ ভাবছে, যেখানে আগের প্রজন্মের প্রতিটি প্রাপ্তির পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, সেখানে বর্তমান প্রজন্ম সবকিছু হাতের মুঠোয় পেয়েও কেন লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে না? প্রশ্ন জাগছে— "সব পেয়ে যাওয়া" কি তবে আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
💠 চাহিদার সহজলভ্যতা ও সংগ্রামের অনুপস্থিতি-
আজকের প্রজন্মের বড় অংশটি এমন এক সময়ে বড় হচ্ছে, যেখানে তাদের মৌলিক চাহিদার বাইরেও শৌখিন চাহিদাগুলো অবলীলায় পূরণ হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মায়েরা তাদের নিজেদের জীবনের অপূর্ণতাগুলো সন্তানদের মাধ্যমে পূরণ করতে চান। ফলে সন্তান কোনো কিছুর অভাব বোধ করার আগেই তা তার সামনে হাজির করা হয়।
এই "সহজলভ্যতা" তাদের মনস্তত্ত্বে এক ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন কোনো অর্জনের জন্য ঘাম ঝরাতে হয় না, তখন সেই অর্জনের প্রতি কোনো মমত্ববোধ বা মূল্যায়ন তৈরি হয় না। তারা "অপ্রাপ্তি" বা "প্রতীক্ষা" শব্দ দুটির সাথে পরিচিত নয়। ফলে জীবনের ছোটখাটো ব্যর্থতা বা বাধায় তারা খুব দ্রুত ভেঙে পড়ছে অথবা সবকিছুর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
💠 প্রযুক্তির হাতছানি ও লক্ষ্যচ্যুতি-
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মন না বসার একটি বড় কারণ হলো তথ্যের অতি-প্রবাহ এবং বিনোদনের সহজলভ্যতা। একটি স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা মুহূর্তেই জগতের যাবতীয় আনন্দ পেয়ে যাচ্ছে। এই তাৎক্ষণিক আনন্দ (Instant Gratification) তাদের মস্তিস্ককে এমনভাবে অভ্যস্ত করে ফেলছে যে, দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বা পড়াশোনার মতো শ্রমসাধ্য কাজে তারা আর আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে না। তাদের কাছে দায়িত্ব পালনের চেয়ে ভার্চুয়াল জগতের রঙিন হাতছানি অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
💠 দায়বদ্ধতার অভাব-
সবকিছু অনায়াসে পেয়ে যাওয়ায় কিশোরদের মধ্যে এই ধারণা জন্মাচ্ছে যে, তাদের কোনো পরিশ্রম ছাড়াই জীবন এভাবেই চলে যাবে। এই মানসিকতা তাদেরকে নিজেদের সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন করে তুলছে। তারা নিজেদের "উপভোক্তা" হিসেবে ভাবছে, "নির্মাতা" হিসেবে নয়। যখন জীবনের কঠিন সত্য— অর্থাৎ পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধের মুখোমুখি হতে হয়, তখন তারা সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়।
💠 অভিশাপ নাকি ভুল লালন-পালন-
আসলে প্রাপ্তি কখনো অভিশাপ হওয়ার কথা ছিল না। সমস্যাটি প্রাপ্তির প্রাচুর্যে নয়, বরং "মূল্যবোধের অভাব এবং শাসনের শিথিলতায়।" অভাববোধ মানুষের ভেতরে জেদ আর আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। যখন সেই অভাববোধটুকু কৃত্রিমভাবে মুছে ফেলা হয়, তখন মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি ও লড়াই করার মানসিকতা মরে যায়। শিক্ষার্থীরা আজ পড়াশোনাকে জীবনের উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে না দেখে একটি 'বিরক্তিকর বোঝা' হিসেবে দেখছে, কারণ তাদের বর্তমান জীবন এতটাই আরামদায়ক যে ভবিষ্যতের সুন্দর জীবনের স্বপ্ন তাদের প্রলুব্ধ করতে পারছে না।
💠 উত্তরণের পথ-
এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সন্তানদের শুধু "দেওয়া" নয়, বরং "অর্জনের শিক্ষা" দিতে হবে। তাদের শেখাতে হবে যে-
✅ প্রত্যেকটি প্রাপ্তির পেছনে পরিশ্রমের প্রয়োজন আছে।
✅ অপ্রাপ্তিও জীবনের একটি বড় শিক্ষা।
✅ দায়িত্ব পালন করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং ব্যক্তিত্বের অংশ।
আমার জীবনের দু'টি বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে এই লেখার ইতি টানবো-
১। আমি এমন এক প্রতিষ্ঠানে পড়তাম যেখানে বসার ভালো জায়গা ছিল না, প্রতি বছর ঝড়ের সময় কোনো না কোনো ক্ষতি হতো আমার মাদ্রাসার। এমনকি টিনের চাল উড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল দুই একবার। তো, সেখানকার প্রতিটা ছাউনি, বেড়া আমরা আগলে রাখতাম। এমনকি ঝড় হলে মাদ্রাসায় যেতে চাইতাম বেশি করে, কারণ- ঝড়ের সময় ভেঙে যাওয়া থেকে মাদ্রাসাকে ধরে রেখে বাঁচাবো। দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তাম তখন।
আর এই প্রজন্ম নিজের স্কুলের এমন কোনো ক্ষতি নাই যে করে না, এমনকি বিদায় অনুষ্ঠানের দিন স্কুলের লাইট, ফ্যানসহ চেয়ার-টেবিল ভেঙে রেখে যায়।
২। আমার ছোট বেলায় রেশনের চাল আনতে যেতাম বাড়ি থেকে ৩/৪ মাইল দূরে, আর দুই বেলা রুটি খেতাম আমরা। মাঝে মাঝে একবেলা রুটি খেয়ে দুই বেলা ভাত খাওয়ার বায়না ধরতাম আম্মার কাছে। আর এই প্রজন্ম তার পেছনে ছোটা বার্গারের প্যাকেটকে অনায়াসে তাচ্ছিল্য করে, খাবার খায় তো না-ই, উল্টো তাদের কাছে খাবার খাওয়াটা বিরক্তির কারণ।
বর্তমান প্রজন্ম পড়াশোনাটা কেন করবে তার লক্ষ্যই নাই যেন, সব দিক থেকে চাপের কারণে তারা স্কুলে/কলেজে আসে যায় শুধু, নৈতিক দিক থেকে ভেঙে পড়ছে তারা। যত যাই বোঝানো হোক তারা তাদের দায়িত্ব শিখবে না, শিখছে না। কোনো কিছুর জন্যই তারা পরিশ্রম করবে না, সব কিছুর সহজলভ্যতা তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করে তুলছে দিন দিন।
পরিশেষে বলা যায়, প্রজন্মের এই বিমুখতা কোনো জন্মগত ত্রুটি নয়। এটি আমাদের অতি-আদর এবং প্রস্তুতির অভাবের ফল। তাদের হাতে প্রাচুর্য দেওয়ার পাশাপাশি যদি নৈতিকতা এবং পরিশ্রমের গুরুত্ব তুলে দেওয়া যায়, তবেই এই অভিশপ্ত চক্র থেকে তাদের বের করে আনা সম্ভব। অন্যথায়, এই অফুরন্ত প্রাপ্তিই তাদের মেরুদণ্ডহীন এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।
”-অভাব শেখান, অভাব তাদেরকে পরিশ্রমী করে গড়ে তুলবে, আর পরিশ্রম সফলতা বয়ে আনতে সাহায্য করবে।"
১৮
২৮ মন্তব্য