সহকারী প্রধান শিক্ষক
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৩২ অপরাহ্ণ
মহালয়া ২০২৬: তারিখ, তাৎপর্য ও পিতৃপক্ষ | Mahalaya 2026
👉মহালয়া ২০২৬-এর পূর্ণাঙ্গ গাইড PDF আকারে পেতে ক্লিক করুন
👉পিতৃপক্ষে তর্পণের সঠিক নিয়ম ও মন্ত্র একসাথে জানুন
👉মহিষাসুরমর্দিনীর ইতিহাস ও তাৎপর্য বিস্তারিত পড়ুন
মহালয়া ২০২৬: তারিখ, তাৎপর্য ও পিতৃপক্ষ | Mahalaya 2026
শরতের সকাল। ভোর চারটের ঠাণ্ডা হাওয়া জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকছে। পাড়ার কোনো বাড়িতেই তখন আর ঘুমের ঘোর নেই — প্রতিটা বাঙালি বাড়িতে তখন রেডিওর সুইচে চাপ পড়ে গেছে, অথবা মোবাইলে ইউটিউব খুলে গেছে। অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসছে একটা গভীর, ভারী কণ্ঠস্বর — "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর..."। ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে ঠাকুমা বলছেন, "মহালয়া এসে গেছে রে!" হ্যাঁ, এটাই মহালয়া — বাঙালির শারদোৎসবের প্রথম ঘণ্টাধ্বনি।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ — কিন্তু দুর্গাপূজার আগে যেই দিনটা না এলে পূজো-পূজো গন্ধই ছড়ায় না, সেটা হলো মহালয়া। অনেকের কাছেই মহালয়া মানে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে চণ্ডীপাঠ শোনা, অনেকের কাছে মানে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে পিতৃপুরুষদের তর্পণ করা, আর অনেকের কাছে মানে — পূজোর শপিংয়ের শেষ ধাক্কা দেওয়ার সংকেত। ছোটবেলায় মহালয়ার ভোরে রেডিওর সামনে বসে থাকা, বাবার হাত ধরে ঘাটে যাওয়া, আর মায়ের হাতের খিচুড়ি — এই স্মৃতিগুলোই বাঙালিকে বাঙালি করে রেখেছে।
মহালয়া ২০২৬ কবে পড়ছে, মহালয়ার তাৎপর্য আসলে কী, পিতৃপক্ষ আর দেবীপক্ষের মানে কী, মহালয়ার দিনে কী কী করা হয় — এই সব প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আজকের বিস্তারিত লেখা। যারা গুগলে "মহালয়া কবে" বা "mahalaya 2026 date" লিখে খুঁজছেন, তাদের সব প্রশ্নের উত্তর এক জায়গায় পাবেন এখানে।
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেও মহালয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালীমন্দির, চট্টগ্রামের জে এম সেন হল প্রাঙ্গণ — মহালয়ার ভোরে সর্বত্রই ভিড় জমান ভক্তরা। অনেকে ভোরে শাঁখারীবাজারের গঙ্গার ঘাটে (বুড়িগঙ্গা) তর্পণ করতে যান। আর যারা বিদেশে থাকেন — সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, কাতার বা ওমানে কর্মরত প্রবাসী বাঙালিরা — তারা মোবাইলে মহিষাসুরমর্দিনী শুনেই মহালয়ার সকালটা পার করেন। দূরত্ব যতই হোক, মহালয়ার আবেগ সব বাঙালিকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
মহালয়া ২০২৬ কবে
মহালয়া ২০২৬ পড়ছে শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতেই প্রতি বছর মহালয়া পালিত হয়, আর ২০২৬ সালে সেই অমাবস্যা পড়েছে অক্টোবরের ১০ তারিখে।
যারা খুঁজছেন "mahalaya 2026 date" — তাদের জন্য পরিষ্কার করে বলি: মহালয়া ২০২৬ = ১০ অক্টোবর, শনিবার। আর এই তারিখের ঠিক ৬ দিন পর, অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর শুক্রবার, দেবীর বোধন ও দুর্গাপূজার ষষ্ঠী। মানে মহালয়ার সকাল থেকে শুরু করে ষষ্ঠীর সন্ধ্যা পর্যন্ত — এই ছয়টা দিন বাঙালির মনে শুধু একটাই সুর বাজে: মা আসছেন।
একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার — মহালয়া কোনো একটা নির্দিষ্ট ইংরেজি তারিখে আটকে থাকে না। চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী আশ্বিনের অমাবস্যাতেই মহালয়া হয় বলে প্রতি বছর তারিখটা এগিয়ে-পিছিয়ে যায়। কোনো বছর সেপ্টেম্বরের শেষে, কোনো বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি। ২০২৬ সালে সেটা ১০ অক্টোবর। পঞ্জিকা মতে, অমাবস্যা তিথি শুরু হয় ৯ অক্টোবর রাত থেকে, আর ১০ অক্টোবর ভোর ও সকাল জুড়ে থাকে — তাই তর্পণ ও মহিষাসুরমর্দিনী শোনার মূল দিন ১০ অক্টোবরই।
তাই যারা "মহালয়া কবে" গুগলে খুঁজছেন, এই লেখাটা পড়েই নিশ্চিন্ত হোন — ২০২৬ সালের মহালয়া ১০ অক্টোবর, শনিবার। ভোর চারটেয় রেডিওটা অন করে রাখতে ভুলবেন না, আর যারা তর্পণ করবেন, তারা আগের রাতেই ঘাটে যাওয়ার প্রস্তুতি সেরে রাখুন।
মহালয়ার তাৎপর্য
মহালয়া শব্দটা শুনলেই বাঙালির মনে একটা অদ্ভুত শিহরণ জাগে — কিন্তু মহালয়ার তাৎপর্য আসলে কতটা গভীর, সেটা অনেকেই জানেন না। মহালয়া মূলত দুটো বড় ঘটনার সন্ধিক্ষণ: একদিকে শেষ হচ্ছে পিতৃপক্ষ, অন্যদিকে শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষ। এই দুই পক্ষের মিলনস্থলেই দাঁড়িয়ে আছে মহালয়া।
পিতৃপক্ষের সমাপ্তি
আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের পনেরোটা দিনকে বলা হয় পিতৃপক্ষ। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পনেরো দিনে পিতৃপুরুষদের আত্মা মর্ত্যলোকে নেমে আসেন — তাদের উত্তরপুরুষদের কাছ থেকে তর্পণ ও শ্রাদ্ধ গ্রহণ করতে। এই পক্ষের শেষ দিন, অর্থাৎ অমাবস্যা তিথি, সেটাই মহালয়া। মহালয়ার দিন পিতৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, পিতৃপক্ষে যারা নিয়মিত তর্পণ করতে পারেননি, মহালয়ার দিন — অর্থাৎ সর্বপিতৃ অমাবস্যায় — একবার তর্পণ করলেই পুরো পক্ষের তর্পণের ফল পাওয়া যায়। তাই এই দিনটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এই রীতি বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
দেবীপক্ষের সূচনা
আর মহালয়ার পরদিন থেকেই শুরু হয় দেবীপক্ষ — শুক্লপক্ষের সেই পনেরোটা দিন, যার শেষে বিজয়া দশমীতে দুর্গাপূজা শেষ হয়। শাস্ত্রমতে, মহালয়ার দিনেই দেবী দুর্গা কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যে যাত্রা শুরু করেন। অর্থাৎ মহালয়া হলো মায়ের মর্ত্যে আগমনের শুভসূচনা।
বাঙালি ঘরের মেয়েরা যেমন পূজোর ছুটিতে বাপের বাড়ি আসে, দেবী দুর্গাও তেমনই মহালয়ার দিন থেকে তাঁর বাপের বাড়ি — মর্ত্যলোকের — পথে রওনা দেন। সন্তানদের নিয়ে মায়ের এই আগমনই শারদোৎসবের মূল ভাবনা।
দেবীপক্ষের এই পনেরো দিনে ধাপে ধাপে পূজোর আবহ তৈরি হয়। প্রতিপদ থেকে পঞ্চমী পর্যন্ত চলে কল্পারম্ভের প্রস্তুতি — মণ্ডপ সাজানো, প্রতিমা আনা, ঢাক-ঢোলের মহড়া। ষষ্ঠীর বোধন দিয়ে শুরু হয় মূল পূজা। মজার ব্যাপার হলো, মহালয়ার দিন দেবীর চক্ষুদান হলেও বোধনের আগে দেবীকে "জাগানো" হয় না — মহালয়া থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত এই সময়টাকে ভাবা হয় মায়ের যাত্রাপথ হিসেবে। এই ভাবনাটাই মহালয়াকে শুধু একটা তিথি থেকে একটা আবেগে বদলে দিয়েছে। মহালয়ার ভোরে যখন চণ্ডীপাঠে শোনা যায় দেবীর জাগরণের আহ্বান, তখন প্রতিটা বাঙালি হৃদয়ে যেন মায়ের পায়ের শব্দ শোনা যায়।
দেবীর মর্ত্যে আগমন ও অসুর বধের কাহিনি
পুরাণ মতে, মহিষাসুর নামের এক অসুর যখন ত্রিলোক জয় করে দেবতাদের স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেয়, তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর-সহ সব দেবতার তেজ একত্রিত হয়ে সৃষ্টি হয় দেবী দুর্গার। দেবতারা তাঁকে দেন নিজ নিজ অস্ত্র — শিবের ত্রিশূল, বিষ্ণুর চক্র, ইন্দ্রের বজ্র। মহালয়ার দিনে দেবী মর্ত্যে আসেন — আর ষষ্ঠীতে হয় তাঁর বোধন, অর্থাৎ জাগরণ। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীতে পূজা, আর দশমীতে বিজয়া — অসুর বধ করে মায়ের বিজয়।
এই কাহিনি শুধু পুরাণের গল্প নয় — এটা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। মহালয়ার তাৎপর্য তাই শুধু ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়। এটা বাঙালির সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে বড় কাউন্টডাউনের শুরু। মহালয়ার ভোরে রেডিওতে চণ্ডীপাঠ শোনা, গঙ্গায় তর্পণ করা, আর সন্ধ্যায় পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে পূজোর প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধা দেখা — এই সব মিলিয়েই মহালয়া।
দার্শনিক দৃষ্টিতেও মহালয়ার তাৎপর্য গভীর। পিতৃপক্ষ মানে অতীতের প্রতি কৃতজ্ঞতা — যাদের হাত ধরে আমরা এসেছি, তাদের স্মরণ। আর দেবীপক্ষ মানে ভবিষ্যতের দিকে তাকানো — নতুন শক্তি, নতুন আশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। মহালয়া এই দুইয়ের সেতুবন্ধন: সকালে পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা, আর সন্ধ্যায় মায়ের আগমনের আনন্দ। অতীতকে সম্মান না জানিয়ে ভবিষ্যতের উৎসবে মেতে ওঠা যায় না — এই শিক্ষাটাই মহালয়া প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয়।
মহিষাসুরমর্দিনী — বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের প্রভাতী অনুষ্ঠান
মহালয়া আর মহিষাসুরমর্দিনী — বাঙালির কাছে এই দুটো শব্দ প্রায় সমার্থক। অল ইন্ডিয়া রেডিওর সেই কিংবন্তি প্রভাতী অনুষ্ঠান, যা ১৯৩১ সাল থেকে প্রতি মহালয়ার ভোর চারটেয় সম্প্রচারিত হয়ে আসছে, সেটাই মহিষাসুরমর্দিনী। প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলে আসা এই অনুষ্ঠান ভারতের সবচেয়ে পুরনো ও দীর্ঘস্থায়ী রেডিও অনুষ্ঠানগুলোর একটা।
কীভাবে শুরু হলো এই ঐতিহ্য
১৯৩১ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও কলকাতা কেন্দ্র প্রথমবার সম্প্রচার করে "মহিষাসুরমর্দিনী" — দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনি নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার এক বিশেষ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন বাণীকুমার (আসল নাম বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য), সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। আর সংস্কৃত শ্লোক পাঠ করেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র — যাঁর গভীর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর পরবর্তী প্রায় এক শতাব্দী ধরে বাঙালির মহালয়ার সকালের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে।
অনুষ্ঠানটিতে রয়েছে চণ্ডীপাঠ, "যা চণ্ডী", "জাগো তুমি জাগো", "জয় জয় জপ্য জয়ে"-এর মতো বিশটা ভক্তিগীতি, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর ভদ্রের সেই অবিস্মরণীয় বর্ণনা। প্রথম দিকে এটা সরাসরি সম্প্রচার হতো — শিল্পীরা ভোরের আগেই স্নান সেরে সাদা-লাল পোশাকে স্টুডিওতে হাজির হতেন, ঠিক ভোর চারটেয় শঙ্খ বাজিয়ে শুরু হতো অনুষ্ঠান। ষাটের দশক থেকে এটা পূর্ব-রেকর্ড করা সংস্করণে সম্প্রচারিত হচ্ছে, কিন্তু আবেগটা একটুও কমেনি। প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, আরতি মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের কণ্ঠও এই অনুষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছে।
কে ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র জন্মেছিলেন ১৯০৫ সালের ৪ আগস্ট, উত্তর কলকাতার আহিরীটোলায়। পেশায় তিনি ছিলেন রেডিও সম্প্রচারক, নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক। তিরিশের দশকের গোড়ায় তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যোগ দেন। কাজী নজরুল ইসলাম ও পঙ্কজ মল্লিকের সমসাময়িক এই মানুষটা সারাজীবন নাটক আর বেতার নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু অমর হয়ে আছেন মহালয়ার ভোরের সেই কণ্ঠস্বরে। ১৯৯১ সালের ৩ নভেম্বর তিনি প্রয়াত হন — কিন্তু প্রতি মহালয়ায় তাঁর কণ্ঠ নতুন করে জেগে ওঠে।
উত্তমকুমার বনাম বীরেন্দ্রকৃষ্ণ — সেই বিখ্যাত ঘটনা
মজার একটা ইতিহাস আছে এখানে। ১৯৭৬ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও একবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জায়গায় মহানায়ক উত্তমকুমারকে দিয়ে মহিষাসুরমর্দিনী পাঠ করিয়েছিল। ফল? বাঙালি শ্রোতারা তীব্র প্রতিবাদ জানান — চিঠি, ফোন আর বিক্ষোভে রেডিও কেন্দ্র ভরে যায়। শেষমেশ কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে পরের বছর থেকেই আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মূল সংস্করণ ফিরিয়ে আনে। উত্তমকুমার যত বড় তারকাই হোন, মহালয়ার ভোরে বাঙালি শুধু একটা কণ্ঠই শুনতে চায় — বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের। এই ঘটনাটাই প্রমাণ করে, মহিষাসুরমর্দিনী বাঙালির কাছে শুধু একটা অনুষ্ঠান নয়, এটা একটা ধর্মীয় আবেগ।
আজকের মহালয়ার সকাল
আজকাল রেডিওর পাশাপাশি ইউটিউব আর টিভি চ্যানেলেও মহালয়ার ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারিত হয়। প্রবাসী বাঙালিরা — যারা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া বা আমেরিকা-ইউরোপে থাকেন — তারাও মোবাইলে এই অনুষ্ঠান শুনে মহালয়া পালন করেন। অনেকে আধো ঘুমে শোনেন — পুরোপুরি জেগে শোনাটা যেন ঠিক মহালয়ার আমেজ নয়! বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র প্রয়াত হলেও তাঁর কণ্ঠস্বর প্রতি বছর অক্টোবরের ওই ভোরে নতুন করে জেগে ওঠে। বাঙালির কাছে মহালয়ার সকাল মানেই — "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর..."
অনুষ্ঠানের শুরুর এই পঙ্ক্তিগুলোর অর্থ জানলে আবেগটা আরও গভীর হয়। "আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর, ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা" — অর্থাৎ শরতের সকালে আলোর নূপুর বেজে উঠেছে, আকাশ থেকে মেঘ সরে গেছে। এরপর "জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী" — দশ হাতে অস্ত্রধারিণী দুর্গাকে জাগানোর আহ্বান। এই আহ্বানই মহালয়ার মূল বার্তা: অন্ধকার কাটিয়ে আলোর দিকে যাত্রা, আর সেই যাত্রার নেত্রী স্বয়ং দেবী দুর্গা।
পিতৃপক্ষ ও তর্পণ — মহালয়ার দিনে কী করা হয়
মহালয়ার দিনে কী করা হয় — এই প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর হলো তর্পণ। হিন্দু শাস্ত্রমতে, মহালয়া হলো পিতৃপক্ষের শেষ দিন, আর এই দিনে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করা সবচেয়ে পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়।
পিতৃপক্ষ কী
পিতৃপক্ষ হলো আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের পনেরো দিন — পূর্ণিমার পরদিন থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে পিতৃপুরুষদের আত্মা পিতৃলোক থেকে মর্ত্যে নেমে আসেন। তাদের সন্তান-সন্ততিরা যদি এই সময়ে তর্পণ ও পিণ্ডদান করেন, তাহলে পিতৃপুরুষরা তৃপ্ত হন এবং বংশধরদের আশীর্বাদ করেন।
পিতৃপক্ষে অনেক পরিবারে নতুন কাজ শুরু করা, বিয়ে বা শুভ অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলা হয় — কারণ এই পক্ষটা পূর্বপুরুষদের স্মরণের জন্য উৎসর্গীকৃত। তবে মহালয়ার পরদিন থেকে দেবীপক্ষ শুরু হলে সেই বিধিনিষেধ কেটে যায়, আর শারদোৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে সবাই।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে, পিতৃপক্ষে যারা নিয়মিত তর্পণ করতে পারেননি, মহালয়ার দিন — অর্থাৎ সর্বপিতৃ অমাবস্যায় — একবার তর্পণ করলেই পুরো পক্ষের তর্পণের ফল পাওয়া যায়। তাই এই দিনটার ধর্মীয় গুরুত্ব অপরিসীম। পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এই রীতি বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
তর্পণ কীভাবে করা হয়
তর্পণ সাধারণত ভোরে, সূর্যোদয়ের আগে বা সূর্যোদয়ের সময় কোনো নদী, পুকুর বা জলাশয়ের ঘাটে করা হয়। কলকাতায় গঙ্গার বাবুঘাট, আহিরীটোলা ঘাটে; বাংলাদেশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, মেঘনা বা পদ্মার ঘাটে মহালয়ার ভোরে হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে। তর্পণকারী ধুতি বা গামছা পরে জলে নেমে পূর্বমুখী হয়ে দাঁড়ান, হাতে কুশ, তিল, যব ও ফুল নিয়ে মন্ত্র পড়ে পূর্বপুরুষদের নামে জল অর্পণ করেন।
তর্পণের মন্ত্রে পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ — তিন পুরুষের নামে জল দেওয়া হয়, সঙ্গে মাতৃকুলের পূর্বপুরুষদেরও স্মরণ করা হয়। পুরোহিতের সাহায্যে বা নিজে নিজেও এই আচার পালন করা যায়। তর্পণ শেষে সূর্যকে অর্ঘ্য দেওয়া হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রই তর্পণ করেন, তবে আজকাল অনেক পরিবারে মেয়েরাও পিতৃপুরুষের তর্পণ করছেন — এ নিয়ে সমাজে ইতিবাচক বদল আসছে। যারা শারীরিকভাবে ঘাটে যেতে পারেন না, তারা বাড়িতেই গঙ্গাজল বা পবিত্র জল দিয়ে তর্পণের নিয়ম পালন করতে পারেন। মূল কথা হলো শ্রদ্ধা আর স্মরণ — আচারের বাহ্যিক রূপের চেয়ে আন্তরিকতাটাই বড়।
চক্ষুদান ও দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি
মহালয়ার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো দেবী প্রতিমার চক্ষুদান। কুমারটুলি বা পাড়ার মৃৎশিল্পীদের হাতে গড়া দুর্গা প্রতিমার চোখ আঁকা হয় মহালয়ার দিনে — শিল্পীরা বিশ্বাস করেন, এই দিনেই প্রতিমায় দেবীর প্রাণের সঞ্চার শুরু হয়। চক্ষুদানের পরেই প্রতিমা পূর্ণতা পায়, আর মণ্ডপে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। অনেক জায়গায় মহালয়ার দিন থেকেই প্যান্ডেলে প্রতিমা আনার কাজ শুরু হয়।
মহালয়ার দিনে অনেকে নিরামিষ খান, উপোস করেন, আর সন্ধ্যায় বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আগমনের প্রার্থনা করেন। পিতৃপক্ষের শোকাবহ ভাব কাটিয়ে দেবীপক্ষের আনন্দে প্রবেশ — এই রূপান্তরটাই মহালয়ার দিনের মূল সুর। সকালে পিতৃপুরুষদের স্মরণ, আর সন্ধ্যায় মায়ের আগমনের আনন্দ — দুটোই এক দিনে, এটাই মহালয়ার বিশেষত্ব।
মহালয়া থেকে দুর্গাপূজা — ছয় দিনের কাউন্টডাউন
মহালয়া ২০২৬ পড়ছে ১০ অক্টোবর, আর ষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর। মাঝের এই ছয়টা দিন বাঙালির জীবনে একটা উৎসবের প্রস্তুতিপর্ব — প্রতিটা দিনেরই নিজস্ব রং আছে, নিজস্ব ব্যস্ততা আছে।
মহালয়ার পরের দিনগুলোতে পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল বাঁধার কাজ জোরেশোরে চলে। প্রতিমা আনা হয় মণ্ডপে, আলোকসজ্জার কাজ শেষ হয়, ঢাকিরা মহড়া দেয়। সন্ধ্যাবেলায় পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে বাঁশ-খুঁটির কাঠামো দেখে বোঝা যায় — আর মাত্র কয়েকটা দিন। বাঙালি বাড়িতে এই কয়দিনে চলে শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা — নতুন জামা, জুতো, আর অষ্টমীর অঞ্জলির ফুলের তালিকা। দর্জির দোকানে ভিড়, মিষ্টির দোকানে ভিড় — শহরজুড়ে একটা উৎসব-উৎসব ভাব।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় হয় দেবীর বোধন — বেল গাছের তলায় দেবীকে জাগিয়ে তোলার আচার, যা দিয়ে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বোধনের আগে ষষ্ঠীর সকাল থেকেই মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় জমতে থাকে — কেউ প্রতিমার শেষ রঙের কাজ দেখছেন, কেউ ফুলের মালা গাঁথছেন। তারপর সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান ও মহাস্নান — কলা গাছকে স্নান করিয়ে দেবীর প্রতীক হিসেবে মণ্ডপে আনা হয়। অষ্টমীতে কুমারী পূজা ও সন্ধিপূজা — অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবীর চামুণ্ডা রূপের পূজা, যা দুর্গাপূজার সবচেয়ে পবিত্র মুহূর্তগুলোর একটা। নবমীতে মহাপূজা আর হোম-যজ্ঞ, আর দশমীতে বিজয়া — সিঁদুরখেলা শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মাকে বিদায় জানানো, "আসছে বছর আবার হবে" ধ্বনিতে।
দুর্গাপূজার পূর্ণ নির্ঘণ্ট — ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিটা দিনের তারিখ, তিথি ও আচার — নিয়ে আলাদা বিস্তারিত লেখা রয়েছে, সেখানে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। এই লেখায় মহালয়া পর্যন্তই থাক — কারণ মহালয়াই হলো সেই দরজা, যেটা পেরোলেই শুরু হয় বাঙালির বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব।
মহালয়া ২০২৬ তাই শুধু একটা তারিখ নয় — এটা বাঙালির শারদোৎসবের সূচনা। ১০ অক্টোবরের ভোরে যখন রেডিওতে বেজে উঠবে "বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর", তখন বুঝবেন — মা আসছেন, আর মাত্র ছয়টা দিন বাকি। শুভ মহালয়া!
মহালয়া ২০২৬ — সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
মহালয়া ২০২৬ কোন তারিখে?
মহালয়া ২০২৬ পড়ছে শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতেই মহালয়া পালিত হয়, আর ২০২৬ সালে সেই অমাবস্যা পড়েছে ১০ অক্টোবর।
mahalaya 2026 date — what is the exact date?
Mahalaya 2026 falls on Saturday, 10 October 2026. It marks the end of Pitripaksha and the beginning of Debipaksha. Durga Puja Sasthi follows six days later, on Friday, 16 October 2026.
মহালয়া কবে পালিত হয়?
প্রতি বছর আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে মহালয়া পালিত হয়। চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী তারিখ বদলায় — কোনো বছর সেপ্টেম্বরের শেষে, কোনো বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি। ২০২৬ সালে মহালয়া ১০ অক্টোবর।
মহালয়ার তাৎপর্য কী?
মহালয়া হলো পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও দেবীপক্ষের সূচনার সন্ধিক্ষণ। এই দিনেই দেবী দুর্গা কৈলাস ছেড়ে মর্ত্যে যাত্রা শুরু করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। একই সঙ্গে এই দিন থেকে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক কাউন্টডাউন শুরু হয় — ষষ্ঠী আসতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকে।
মহালয়ার দিনে কী করা হয়?
ভোরে নদী বা জলাশয়ের ঘাটে গিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করা হয় — এটাই মহালয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আচার। ভোর চারটেয় মহিষাসুরমর্দিনী শোনা হয়, দুর্গা প্রতিমার চক্ষুদান হয়, আর অনেকে উপোস বা নিরামিষ আহার পালন করেন। সন্ধ্যায় বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আগমনের প্রার্থনা করা হয়। অনেক পরিবারে এই দিন থেকেই পূজোর কেনাকাটার শেষ পর্ব শুরু হয়।
পিতৃপক্ষ কী?
আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের পনেরো দিনকে পিতৃপক্ষ বলা হয় — পূর্ণিমার পরদিন থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত। এই সময়ে পিতৃপুরুষদের আত্মা মর্ত্যে নেমে আসেন বলে বিশ্বাস করা হয়, আর উত্তরপুরুষরা তর্পণ ও শ্রাদ্ধের মাধ্যমে তাদের তৃপ্ত করেন। মহালয়া হলো এই পক্ষের শেষ দিন, অর্থাৎ সর্বপিতৃ অমাবস্যা — যারা পুরো পক্ষে তর্পণ করতে পারেননি, তাদের জন্য এই একদিনের তর্পণেই পুরো ফল পাওয়ার বিধান রয়েছে।
দেবীপক্ষ কবে থেকে শুরু হয়?
মহালয়ার পরদিন, অর্থাৎ আশ্বিন শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে দেবীপক্ষ শুরু হয়। ২০২৬ সালে দেবীপক্ষ শুরু হচ্ছে ১১ অক্টোবর থেকে, আর এই পক্ষের মধ্যেই পড়ে দুর্গাপূজার ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী।
মহালয়া থেকে দুর্গাপূজার ষষ্ঠী কত দিন বাকি থাকে?
মহালয়া ২০২৬ (১০ অক্টোবর, শনিবার) থেকে ষষ্ঠী (১৬ অক্টোবর, শুক্রবার) পর্যন্ত ৬ দিনের ব্যবধান রয়েছে। এই ছয় দিনে চলে প্যান্ডেল, প্রতিমা আনা, আলোকসজ্জা ও শেষ মুহূর্তের পূজোর কেনাকাটা। মহালয়া মানেই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা — মা আসছেন, প্রস্তুতি শুরু।
১৮
২৮ মন্তব্য