Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

মহাকালের নীরব দ্রষ্টা: উনিশ শতকের ‘অ্যালজেব্রা মেড ইজি’ এবং রক্তস্নাত ঐতিহাসিক বাঁক

মহাকালের নীরব দ্রষ্টা: উনিশ শতকের ‘অ্যালজেব্রা মেড ইজি’ এবং রক্তস্নাত ঐতিহাসিক বাঁক

​লেখক: মোস্তাফিজুর রহমান

পদবি: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

রচনাকাল: ৩৬ জুলাই ২০২৪ (প্রতীকী ঐতিহাসিক বর্ষপঞ্জি) / ৫ আগস্ট ২০২৪

​প্রারম্ভিক কথন: ধূলিমলিন পাতার মহাজাগতিক রূপ

​ইতিহাস কেবল মহাফেজখানা কিংবা পুরাকীর্তির খোদাই করা পাথরে বন্দী থাকে না; বহু শতাব্দী পেরিয়ে তা কখনো কখনো এসে থিতু হয় জীর্ণ-শীর্ণ এক টুকরো কাগজের পাতায়। শতবর্ষের ধূলি মেখে জীর্ণ হয়ে যাওয়া একটি গ্রন্থ যখন কোনো এক শিক্ষকের টেবিলে স্থান পায়, তখন তা স্রেফ একটি গণিতের পাঠ্যবই থাকে না; রূপ নেয় একটি জাতির বহু প্রজন্মের সংগ্রাম, চেতনা ও সময়ের মহাজাগতিক এক মৌন সাক্ষীতে।

​প্রখ্যাত বাঙালি শিক্ষাবিদ ও গণিতজ্ঞ কালীপদ বসু (কে. পি. বসু)-র কালজয়ী গ্রন্থ "Algebra Made Easy" তেমনই এক জীবন্ত স্মারক। সম্প্রতি প্রাপ্ত ১৮৯১ সালের একটি দুর্লভ মুদ্রণ আমাদের সামনে উন্মোচন করেছে কীভাবে একটি গ্রন্থ উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা, পাকিস্তান পর্বের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের অগ্নিগর্ভ দিন এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।

​১. গণিত-সংস্কারক কালীপদ বসু ও তাঁর বৈপ্লবিক পাঠ্যবই

​ঝিনাইদহের হরিশংকরপুর গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে অধ্যাপক কালীপদ বসু (১৮৬০–১৯১৪) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষাঙ্গনে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। ১৮৯২ সালে ঢাকা কলেজের গণিত বিভাগে যোগ দেওয়ার আগেই তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল নীরস সূত্রের মুখস্থবিদ্যার কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে বীজগণিত এক চরম ভীতির বিষয় ছিল।

​এই ভীতি দূর করার প্রত্যয়ে তিনি রচনা করেন "Algebra Made Easy" (সহজ বীজগণিত)। তাঁর লক্ষ্য ছিল নিয়ম মুখস্থ করানোর পরিবর্তে শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি ও মানসিক বিকাশ (Mental discipline) ত্বরান্বিত করা। বইটির ভূমিকাংশেই তিনি উল্লেখ করেন—বীজগণিত কেবল নিয়মের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং অন্তর্নিহিত নীতিগুলোর বৌদ্ধিক আত্মস্থকরণ। তাঁর এই অনন্য পাঠদানরীতি তৎকালীন অবিভক্ত বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ছাড়িয়ে বোম্বে ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির শিক্ষাঙ্গনেও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

​২. মুদ্রণশৈলী ও ভৌত সাক্ষ্য (Physical & Textual Evidence)

​সংগৃহীত গ্রন্থটির বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ গঠন বিশ্লেষণ করলে উনিশ শতকের এক অপূর্ব মুদ্রণ সংস্কৃতির পরিচয় মেলে:

  • ​বাইন্ডিং ও কভার: বইটির বাঁধাই ছিল তৎকালীন ভিক্টোরিয়ান আমলের ঐতিহ্যবাহী হাফ-লেদার বা কোয়ার্টার-লেদার (স্পাইনে চামড়া এবং বাকি অংশে মার্বেল/ক্লথযুক্ত শক্ত বোর্ড)। কালক্রমে কভারের কাপড় ও চামড়া জীর্ণ হলেও ভিতরের সেলাই ও কাগজের স্থায়িত্ব আজও অটুট রয়েছে।

  • ​লেটারপ্রেস ও ফন্ট: ধাতব অক্ষর সাজিয়ে ‘লেটারপ্রেস’ পদ্ধতিতে মুদ্রিত বইটিতে তৎকালীন উচ্চমানের ‘Scotch Roman’ ফন্ট, গাণিতিক চলকে ইটালিক্স এবং জটিল ভগ্নাংশ ও মূলচিহ্নের নিখুঁত টাইপোগ্রাফি লক্ষ্য করা যায়।

  • ​বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র সংকলন: বইটির শেষাংশে ১৮৭১ থেকে ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (Calcutta University Entrance Examination) এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের (Allahabad University Entrance Examination) প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংকলিত রয়েছে, যা এর উচ্চ শিক্ষাগত উপযোগিতা ও তৎকালীন অ্যাকাডেমিক গুরুত্বের প্রমাণ বহন করে।

​৩. ব্রিটিশ উপনিবেশ, দ্বিজাতিতত্ত্ব ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন

​১৮৯০-৯১ সালে যখন ঢাকার মুদ্রণশালা থেকে বইটির পরিমার্জিত রূপ আত্মপ্রকাশ করছে, তখন সমগ্র উপমহাদেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এরপর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, কার্জন হলের গর্জন, স্বদেশী আন্দোলন এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের উত্তাল দিনগুলোতে এই গ্রন্থটি ছিল কোনো না কোনো শিক্ষার্থীর নিত্যদিনের সঙ্গী।

​১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ট্র্যাজেডি পেরিয়ে বইটি নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমারেখায় প্রবেশ করে। এরপর যখন মায়ের ভাষাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ঔপনিবেশিক চক্রান্ত শুরু হলো, তখন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে সালাম, বরকত, রফিকদের রক্তস্নাত পিচঢালা পথ এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার ঐতিহাসিক বিজয়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে রইল এই বইটি।

​৪. ১৯৭১-এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও স্বৈরাচারবিরোধী দশক

​বইটির ভেতরের পৃষ্ঠায় নীল কালিতে হাতে লেখা ঐতিহাসিক নোট এবং প্রশাসনিক দাপ্তরিক স্বাক্ষর বিদ্যমান:

​"Chairman, J. P. C. — 4.7.71"


​১৯৭১ সালের ৪ জুলাই, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে যখন চারদিকে বারুদের গন্ধ ও হানাদার বাহিনীর নারকীয় তাণ্ডব চলছিল, তখন স্থানীয় প্রশাসনিক পর্ষদের (Jurisdiction / Peace Committee বা তৎসংশ্লিষ্ট কমিটি) চেয়ারম্যানের এই স্বাক্ষরটি প্রমাণ করে যে বইটি সেই অগ্নিগর্ভ সময়েও কোনো বিদ্যানুরাগী পরিবারে বা সংকলনে চিহ্নিত ও সংরক্ষিত ছিল।

​পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে নূর হোসেন ও ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে গণতান্ত্রিক নবজাগরণ ঘটেছিল, সেই রূপান্তরও বইটির হলদেটে পাতার ভাঁজে যেন অলিখিতভাবে ধরা আছে।

​৫. ২০২৪-এর রক্তিম জুলাই ও এক মহাজাগতিক রূপক

​মহাকালের আবর্তনে বইটি এসে পৌঁছায় ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানে। আবু সাঈদ ও মুগ্ধদের আত্মত্যাগে রচিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন কেবল এক স্বৈরাচারের পতন নয়, বরং শত বছরের শোষিত মেধার এক মহাবিস্ফোরণ।

​১৮৯১ সালের যে তরুণ শিক্ষার্থী এই বই খুলে সমীকরণ মেলাতে বসেছিল, ২০২৪ সালের তরুণরা সেই একই মেধা ও আত্মমর্যাদাবোধ নিয়ে রাজপথের অসম লড়াইয়ে ন্যায়ের সমীকরণ মিলিয়ে দিয়েছে। এভাবে শতাব্দীপ্রাচীন জীর্ণ বইটি রূপ নিয়েছে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক দ্রোহ ও প্রতিবাদের অমোঘ এক মহাজাগতিক প্রতীকে (Metaphor)।

​৬. হলুদঘর থেকে শিক্ষকের ডেস্ক: পরম্পরার বৃত্ত পূরণ

​বইটির অন্তিম যাত্রাপথটিও অত্যন্ত মানবিক ও ভাবগম্ভীর। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কম্পো নদীর তীরের শান্ত গ্রাম ‘হলুদঘর’-এর এক প্রবীণ ব্যক্তির পারিবারিক সংগ্রহে সযত্নে রক্ষিত ছিল এই অমূল্য সম্পদ।

​২১ শে ফেব্রুয়ারি ২০২১—যে দিনটি আমাদের ভাষার চেতনার প্রতীক—সেই শুভদিনে তাঁরই এক নাতি গণিত পাঠ নেওয়ার সময় পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পারিবারিক উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এই ঐতিহাসিক গ্রন্থটি উপহার হিসেবে তুলে দেয় তাঁর শিক্ষকের হাতে। এটি লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার সৌকর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁর গণিতচর্চার পথকে আরও গভীর ও সুগম করে তোলে।

​এক শতক পূর্বে কে. পি. বসু নামে একজন শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যে জ্ঞানের বীজ বুনেছিলেন, ঠিক এক শতক পর আরেক শিক্ষকের টেবিলেই সেই স্মারকটি এসে আশ্রয় নিল—জ্ঞানের এ যেন এক অনিন্দ্যসুন্দর ও চিরন্তন পরম্পরার বৃত্তপূরণ।

​উপসংহার

​আজকের নশ্বর কৃত্রিমতা ও প্রযুক্তির মোহে যখন মানুষ ক্ষণস্থায়ী উপকরণের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছে, তখন একজন শিক্ষকের টেবিলে সযত্নে সংরক্ষিত ১৮৯১ সালের ‘অ্যালজেব্রা মেড ইজি’ বইটি আমাদের এক গভীর সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়: নশ্বর বস্তুর ক্ষয় ঘটে, কিন্তু চেতনা, জ্ঞান ও বিপ্লবের রূপকগুলো অনন্তকাল অমর থাকে। এটি কোনো প্রাচীন জড়বস্তু নয়, বরং একটি মুক্তিকামী জাতির আত্মিক পরিচয়ের চিরন্তন মহাজাগতিক দর্পণ।

​প্রামাণ্য গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র (Bibliography & References)

  1. ​Bose, K. P. (1891). Algebra Made Easy: For all classes of students in schools. Second Edition. Dacca: Published and Printed under Colonial Administration.

  2. ​Calcutta University & Allahabad University Entrance Examination Papers (1871–1893). Appendix and question sets included in Algebra Made Easy, pp. 456–490.

  3. ​Archival Inscription (Primary Source): Physical handwritten inscription and endorsement marked "Chairman, J. P. C. - 4.7.71" along with price index (Rs. 30.00) on the front endpaper.

  4. ​মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৭১). বাংলাদেশের ইতিহাস (আধুনিক যুগ), জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স, কলকাতা।

  5. ​রহিম, এম. এ. (১৯৭৮). বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

  6. ​জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) আর্কাইভ: উনিশ শতকের বাংলায় গণিত শিক্ষা ও কে. পি. বসুর অবদান বিষয়ক সংকলন।



মন্তব্য করুন

ব্লগ