সহকারী অধ্যাপক
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৩৭ পূর্বাহ্ণ
সূরা আল-ক্বিয়ামাহর আলোকে কিয়ামত, আত্মজিজ্ঞাসা ও চূড়ান্ত জবাবদিহিতা - মোঃ মুজিবুর রহমান
সূরা আল-ক্বিয়ামাহর আলোকে কিয়ামত, আত্মজিজ্ঞাসা ও চূড়ান্ত জবাবদিহিতা
মোঃ মুজিবুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক
মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।
যাঁর কৃপায় প্রাণে জাগে আশার নবোদয়,
যাঁর দানে জীবন ভরে শান্তি ও নির্ভয়—
সেই মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন উদ্দেশ্যহীনভাবে নয়; বরং তাঁকে দিয়েছেন জীবন, বিবেক, জ্ঞান, বুদ্ধি ও সঠিক পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ। এই জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এর কর্মের পরিণতি চিরস্থায়ী। একদিন পৃথিবীর পরিচিত সব দৃশ্যপট বদলে যাবে, মানুষ তার প্রিয়জন, সম্পদ, ক্ষমতা ও পার্থিব আশ্রয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা দাঁড়াবে মহান আল্লাহর সামনে। সেই মহাদিবসই কিয়ামত।
পবিত্র কুরআনের ৭৫তম সূরা আল-ক্বিয়ামাহ মূলত মানুষের পুনরুত্থান, কিয়ামতের ভয়াবহতা, মানুষের আত্মসচেতনতা, দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, মৃত্যুর অনিবার্যতা এবং আখিরাতের চূড়ান্ত জবাবদিহিতার কথা অত্যন্ত শক্তিশালী ও হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরে। মাত্র চল্লিশ আয়াতের এই সূরাটি মানুষের অন্তরকে নাড়া দিয়ে প্রশ্ন করে—মানুষ কি সত্যিই মনে করে, মৃত্যুর পর তার কোনো হিসাব নেই? সে কি মনে করে, তাকে এমনিই ছেড়ে দেওয়া হবে?
কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী
সূরার শুরুতেই আল্লাহ কিয়ামত দিবসের শপথ করেছেন এবং সেই নফসের কথাও উল্লেখ করেছেন, যে নিজেকে ভর্ৎসনা করে। এর মাধ্যমে মানুষের বিবেক ও আত্মসমালোচনার গুরুত্ব প্রকাশ পায়। মানুষের ভেতরে এমন একটি নৈতিক বোধ রয়েছে, যা ভুলের পর তাকে সতর্ক করে, অনুতপ্ত করে এবং সংশোধনের দিকে আহ্বান জানায়।
কিন্তু মানুষ অনেক সময় নিজের বিবেকের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে। সে পাপ করতে থাকে, তবু মনে করে—আরও সময় আছে, পরে তওবা করব, পরে ভালো হয়ে যাব। অথচ মানুষ জানে না তার জীবনের শেষ মুহূর্ত কখন এসে উপস্থিত হবে।
কিয়ামত কোনো কল্পকাহিনি নয়; এটি ইসলামী আকিদার মৌলিক সত্য। আল্লাহ মানুষকে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করবেন এবং প্রত্যেককে তার কর্মের হিসাবের মুখোমুখি করবেন।
মৃত্যুর পর পুনরুত্থান কেন অসম্ভব হবে?
কিয়ামত অস্বীকারকারীদের একটি প্রশ্ন ছিল—মৃত মানুষের হাড় যখন মাটিতে মিশে যাবে, তখন কি আল্লাহ তাকে আবার জীবিত করতে পারবেন?
কুরআন এর জবাব দিয়েছে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে। আল্লাহ শুধু মানুষের হাড় একত্র করতে সক্ষম নন; তিনি মানুষের আঙুলের ডগার সূক্ষ্ম বিন্যাস পর্যন্ত পুনর্গঠন করতে সক্ষম।
এখানে মানুষের জন্য গভীর শিক্ষা রয়েছে। যে আল্লাহ মানুষকে প্রথমবার অস্তিত্ব দিয়েছেন, তাঁর জন্য মৃত্যুর পর পুনরায় সৃষ্টি করা অসম্ভব নয়। মানুষের সীমিত জ্ঞান কোনো বিষয় কল্পনা করতে না পারলেই তা অসম্ভব হয়ে যায় না। আল্লাহ সর্বশক্তিমান; তাঁর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই।
তাই মুমিনের বিশ্বাস হলো—মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্বের পরিসমাপ্তি ঘটে না; বরং দুনিয়ার জীবন শেষ হয়ে আখিরাতের অনন্ত জীবনের সূচনা হয়।
পাপের প্রতি মানুষের প্রবণতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা
মানুষ অনেক সময় জানে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন, তবু পাপের পথে এগিয়ে যায়। সে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাকে অজুহাত বানিয়ে বর্তমানের প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে।
কিয়ামতের সময় কখন—এ প্রশ্নের আড়ালেও কখনো কখনো সত্য অস্বীকারের প্রবণতা লুকিয়ে থাকে। অথচ আসল প্রশ্ন কিয়ামত ঠিক কবে হবে, তা নয়; বরং কিয়ামতের জন্য আমি কতটা প্রস্তুত?
একজন বুদ্ধিমান মানুষ শুধু শেষ দিনের তারিখ জানতে চায় না; সে নিজের আমল সংশোধন করে। সে সালাত ঠিক করে, হারাম থেকে বেঁচে থাকে, মানুষের অধিকার রক্ষা করে, তওবা করে, সৎকর্মে অগ্রসর হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের লক্ষ্য বানায়।
কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য
সূরা আল-ক্বিয়ামাহ কিয়ামতের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। চোখ বিস্মিত ও স্থির হয়ে যাবে, চাঁদের আলো ম্লান হয়ে যাবে এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্র করা হবে। মানুষ তখন আতঙ্কিত হয়ে পালানোর জায়গা খুঁজবে।
কিন্তু সেদিন কোনো আশ্রয় থাকবে না।
দুনিয়ায় মানুষ বিপদে পড়লে ঘর, পরিবার, সম্পদ, ক্ষমতা, রাষ্ট্র, বন্ধু কিংবা পরিচিত মানুষের আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এসব পার্থিব আশ্রয়ের কোনো মূল্য থাকবে না। সেদিন মানুষের প্রকৃত আশ্রয় হবে একমাত্র আল্লাহর কাছে।
এই শিক্ষা আমাদের বর্তমান জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুনিয়ার সব সম্পর্ক ও সম্পদ আল্লাহর দেওয়া আমানত। তাই এগুলোর ওপর নির্ভরতা সীমিত রেখে মানুষের উচিত সর্বদা আল্লাহর ওপর ঈমান, তাওয়াক্কুল ও আনুগত্যের সম্পর্ক দৃঢ় করা।
মানুষ নিজের কর্ম সম্পর্কে অবগত
কিয়ামতের দিন মানুষকে তার পূর্বের ও পরের কর্ম সম্পর্কে অবহিত করা হবে। মানুষের জীবনের কোনো কাজই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।
মানুষ অন্যের সামনে নিজের ভালো দিক তুলে ধরতে পারে, নিজের ভুল লুকাতে পারে, নানা অজুহাত দিতে পারে; কিন্তু আল্লাহর সামনে কোনো সত্য গোপন থাকবে না।
মানুষ নিজের সম্পর্কেও যথেষ্ট অবগত। সে জানে কোথায় সে অন্যায় করেছে, কোথায় অন্যের অধিকার নষ্ট করেছে, কোথায় সত্য জেনেও তা এড়িয়ে গেছে, কোথায় গোপনে পাপ করেছে এবং কোথায় আল্লাহর অবাধ্য হয়েছে।
তাই প্রকৃত সফলতা হলো মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে নিজের অন্তরকে সংশোধন করা।
কুরআন সংরক্ষণ ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দায়িত্ব
সূরার মধ্যভাগে কুরআন গ্রহণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে নবী মুহাম্মদ ﷺ-কে আল্লাহ আশ্বস্ত করেছেন। ওহি নাজিলের সময় তিনি তা দ্রুত মনে রাখার চেষ্টা করতেন। আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন—কুরআন সংরক্ষণ ও পাঠ করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁরই।
এখান থেকে কুরআনের প্রতি মুসলমানের গভীর আস্থা ও শ্রদ্ধার শিক্ষা পাওয়া যায়। কুরআন শুধু তিলাওয়াতের গ্রন্থ নয়; এটি মানুষের জীবন পরিচালনার হিদায়াত।
তাই কুরআন পড়ার পাশাপাশি এর অর্থ বোঝা, শিক্ষা গ্রহণ করা এবং জীবনে বাস্তবায়ন করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
দুনিয়ার তাৎক্ষণিক জীবন বনাম আখিরাত
সূরা আল-ক্বিয়ামাহ মানুষের একটি বড় দুর্বলতা তুলে ধরে—মানুষ অনেক সময় তাৎক্ষণিক দুনিয়ার জীবনকে ভালোবাসে এবং আখিরাতকে অবহেলা করে।
দুনিয়ার জীবন মানুষের প্রয়োজন; ইসলাম দুনিয়া ত্যাগ করতে বলে না। বরং হালাল উপায়ে উপার্জন, পরিবার পরিচালনা, জ্ঞান অর্জন, মানুষের কল্যাণ এবং সমাজের উন্নয়ন—সবই বৈধ ও প্রশংসনীয় কাজ হতে পারে।
সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন দুনিয়া মানুষের লক্ষ্য হয়ে যায় এবং আখিরাত তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়।
সম্পদ থাকবে, কিন্তু সম্পদের মোহ থাকবে না; পদ থাকবে, কিন্তু অহংকার থাকবে না; পরিবার থাকবে, কিন্তু আল্লাহর আনুগত্য বিসর্জন দেওয়া যাবে না। দুনিয়াকে ব্যবহার করতে হবে আখিরাতের পাথেয় হিসেবে।
মুমিনের মুখ উজ্জ্বল হবে
কিয়ামতের দিন কিছু মুখমণ্ডল উজ্জ্বল ও দীপ্তিমান হবে এবং তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। এটি মুমিনদের জন্য এক মহান সুসংবাদ।
যারা দুনিয়ায় ঈমান এনেছে, আল্লাহর আনুগত্য করেছে, সালাত কায়েম করেছে, পাপ থেকে তওবা করেছে, মানুষের অধিকার রক্ষা করেছে এবং সৎকর্মে জীবন সাজিয়েছে—তাদের জন্য আখিরাতে সম্মান ও পুরস্কার রয়েছে।
এর বিপরীতে অবাধ্য ও পাপাচারী মানুষের মুখ হবে বিষণ্ন ও মলিন। তারা বুঝতে পারবে যে কঠিন পরিণতি তাদের সামনে উপস্থিত।
অতএব, প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু দুনিয়ার চেহারায় নয়; প্রকৃত সৌন্দর্য হলো ঈমান, তাকওয়া, সৎচরিত্র ও নেক আমলে।
মৃত্যুর মুহূর্ত—ফিরে যাওয়ার আর সুযোগ নেই
সূরাটি মানুষের মৃত্যুর মুহূর্তের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। যখন প্রাণ কণ্ঠাগত হবে, তখন মানুষ বুঝতে পারবে—এবার বিদায়ের সময় এসে গেছে।
যে মানুষ সারা জীবন সম্পদ সংগ্রহ করেছে, সে তখন সম্পদের মালিকানা হারাবে। যে ক্ষমতার অহংকার করেছে, তার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে। যে ভবিষ্যতের জন্য অসংখ্য পরিকল্পনা করেছে, তার পরিকল্পনার সময় শেষ হয়ে যাবে।
মৃত্যু মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—জীবন আমাদের হাতে চিরস্থায়ীভাবে দেওয়া হয়নি।
তাই মৃত্যুর আগে তওবা করা, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সংশোধন করা অত্যন্ত জরুরি।
ঈমান ও সালাতের গুরুত্ব
সূরার এক কঠোর সতর্কবার্তায় অবিশ্বাস ও সালাত পরিত্যাগের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। সে ব্যক্তি সত্যকে অস্বীকার করেছিল, সালাত আদায় করেনি, বরং সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং অহংকারের সঙ্গে নিজের পরিবারের কাছে ফিরে গিয়েছিল।
এখানে সালাতের গুরুত্ব বিশেষভাবে স্মরণীয়। সালাত শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি মুমিনের জীবনের অন্যতম প্রধান ইবাদত এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
সালাত মানুষকে আল্লাহর স্মরণে রাখে, আত্মাকে সংযত করে এবং পাপ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।
অহংকারের পরিণতি
মানুষ যখন নিজের শক্তি, জ্ঞান, সম্পদ, পদ বা সামাজিক মর্যাদাকে নিজের কৃতিত্ব মনে করে অহংকারে ডুবে যায়, তখন সে নিজের দুর্বলতা ভুলে যায়।
অথচ তার সূচনা হয়েছিল এক ক্ষুদ্র বীর্যবিন্দু থেকে। আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন, আকৃতি দিয়েছেন, সুস্থতা দিয়েছেন, জ্ঞান দিয়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন।
যে মানুষ নিজের শুরু ভুলে যায়, সে নিজের পরিণতিও ভুলে যায়।
তাই ইসলামের শিক্ষা হলো—মানুষ যত বড়ই হোক, তাকে বিনয়ী হতে হবে। কারণ তার শক্তি আল্লাহর দান এবং তার জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত।
মানুষ কি উদ্দেশ্যহীনভাবে সৃষ্টি?
সূরার শেষাংশে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসেছে—মানুষ কি মনে করে তাকে এমনিই ছেড়ে দেওয়া হবে?
এই প্রশ্নের মধ্যেই জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর শিক্ষা রয়েছে।
মানুষ পৃথিবীতে শুধু খাওয়া, ঘুমানো, সম্পদ অর্জন, বিনোদন ও পার্থিব সাফল্যের জন্য আসেনি। তাকে আল্লাহর বান্দা হিসেবে জীবনযাপন করতে হবে এবং তাঁর নির্দেশ অনুসারে চলতে হবে।
মানুষের জীবন একটি পরীক্ষা। এখানে সে কীভাবে ঈমান আনল, কীভাবে ইবাদত করল, কীভাবে মানুষের সঙ্গে আচরণ করল, কীভাবে সম্পদ অর্জন ও ব্যয় করল, কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করল এবং কীভাবে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করল—এসবেরই হিসাব হবে।
সৃষ্টি থেকে পুনরুত্থানের প্রমাণ
আল্লাহ মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেন—সে কি একসময় বীর্যবিন্দু ছিল না? এরপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তার আকৃতি গঠন করা হয়েছে এবং তাকে নর ও নারী হিসেবে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে।
মানুষের নিজের অস্তিত্বই তার জন্য আল্লাহর অসীম ক্ষমতার একটি নিদর্শন।
যিনি ক্ষুদ্র উপাদান থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি মৃত্যুর পর পুনরুত্থান করতে অবশ্যই সক্ষম।
তাই কিয়ামত অস্বীকার করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। সূরার শেষ আয়াতের প্রশ্নটি যেন মানুষের বিবেককে জাগিয়ে দেয়—
যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি মৃতদের পুনরায় জীবিত করতে সক্ষম নন?
অবশ্যই তিনি সক্ষম।
আত্মজিজ্ঞাসা: আজই হিসাবের প্রস্তুতি
সূরা আল-ক্বিয়ামাহ আমাদের শুধু কিয়ামতের ভয় দেখায় না; বরং কিয়ামতের আগে নিজেকে সংশোধনের সুযোগও দেয়।
প্রতিদিন আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—
আমি কি আল্লাহর প্রতি সত্যিকার ঈমান রাখি?
আমার সালাতের অবস্থা কেমন?
আমি কি হালাল-হারামের প্রতি সতর্ক?
আমি কি কারও অধিকার নষ্ট করেছি?
আমি কি কারও প্রতি জুলুম করেছি?
আমার উপার্জন কি বৈধ?
আমার কথা কি অন্যকে কষ্ট দেয়?
আমি কি গোপনে এমন কাজ করি, যা প্রকাশ্যে করতে লজ্জা পাই?
মৃত্যু যদি আজই আসে, আমি কি প্রস্তুত?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই নফসে লাওয়ামাহ—নিজেকে সংশোধনের পথে নিয়ে যেতে পারে।
পরিবার ও সমাজের জন্য শিক্ষা
সূরা আল-ক্বিয়ামাহর শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের জন্য নয়; পরিবার ও সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যে ব্যক্তি কিয়ামতে বিশ্বাস করে, সে অন্যের অধিকার হরণ করতে ভয় পায়। সে প্রতারণা থেকে বাঁচে, আমানত রক্ষা করে, মিথ্যা বলে না, জুলুম করে না, দুর্বলকে অবহেলা করে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে না।
একজন শিক্ষক যখন কিয়ামতকে স্মরণ করেন, তিনি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষা দেন।
একজন ব্যবসায়ী যখন কিয়ামতকে স্মরণ করেন, তিনি প্রতারণা থেকে বাঁচেন।
একজন কর্মকর্তা যখন কিয়ামতকে স্মরণ করেন, তিনি আমানত রক্ষা করেন।
একজন অভিভাবক যখন কিয়ামতকে স্মরণ করেন, তিনি সন্তানকে নৈতিক ও দ্বীনি শিক্ষায় গড়ে তোলেন।
একজন নাগরিক যখন কিয়ামতকে স্মরণ করেন, তিনি অন্যের অধিকার ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করেন।
এভাবেই আখিরাতের বিশ্বাস দুনিয়ার জীবনকেও সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক করে তোলে।
কিয়ামতের বিশ্বাস মানুষকে হতাশ করে না
কিয়ামতের কথা শুনে কেউ যেন মনে না করে ইসলাম কেবল ভয় ও শাস্তির ধর্ম। বরং কুরআনের শিক্ষা ভয় ও আশার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করে।
ভয় মানুষকে পাপ থেকে বিরত রাখে, আর আল্লাহর রহমতের আশা তাকে তওবা ও সৎকর্মে উৎসাহিত করে।
যে ব্যক্তি ভুল করেছে, তার জন্য তওবার দরজা খোলা। যে অন্যায় করেছে, সে ফিরে আসতে পারে। যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার জন্য কল্যাণের পথ উন্মুক্ত।
তাই কিয়ামতের স্মরণ মানে জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে ফেলা নয়; বরং জীবনকে অর্থপূর্ণ করা।
আমাদের করণীয়
সূরা আল-ক্বিয়ামাহর শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হলে আমাদের—
১. আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখতে হবে।
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।
৩. কুরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি তার শিক্ষা বুঝতে হবে।
৪. গুনাহ হলে দ্রুত তওবা করতে হবে।
৫. মানুষের অধিকার ও আমানত রক্ষা করতে হবে।
৬. হালাল উপার্জন ও বৈধ জীবনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
৭. অহংকার, মিথ্যা, প্রতারণা ও জুলুম থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
৮. দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণ করতে হবে, কিন্তু আখিরাতকে ভুলে যাওয়া যাবে না।
৯. প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব নিতে হবে।
১০. মৃত্যুর আগে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সুন্দর করার চেষ্টা করতে হবে।
উপসংহার
সূরা আল-ক্বিয়ামাহ মানুষের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এটি মনে করিয়ে দেয়—এই জীবনই শেষ নয়, মৃত্যুর পর রয়েছে পুনরুত্থান, হিসাব ও চূড়ান্ত পরিণতি।
মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, একদিন তাকে মৃত্যুর সামনে দাঁড়াতে হবে। যত সম্পদই থাকুক, একদিন তা রেখে যেতে হবে। যত ক্ষমতাই থাকুক, একদিন তা শেষ হবে। কিন্তু ঈমান, সৎকর্ম ও আল্লাহর আনুগত্য মানুষের সঙ্গে আখিরাত পর্যন্ত থাকবে।
তাই কিয়ামতের ভয়াবহ দিনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া মানে বর্তমান জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। সালাত, তওবা, তাকওয়া, সততা, আমানতদারি, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং সৎকর্মের মাধ্যমে জীবন সাজানোই হলো সেই প্রস্তুতির পথ।
আসুন, কিয়ামতের দিন আসার আগে নিজেদের হিসাব নিজেরাই গ্রহণ করি। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহের পরিবর্তে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতাকে অগ্রাধিকার দিই। অহংকারের পরিবর্তে বিনয়, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়, বিদ্বেষের পরিবর্তে কল্যাণ, গাফিলতির পরিবর্তে আল্লাহর স্মরণ এবং পাপের পরিবর্তে তওবাকে জীবনের সঙ্গী করি।
হে মহান আল্লাহ! আমাদের ঈমানকে দৃঢ় করুন, কুরআনের শিক্ষা বুঝে জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার শক্তি দিন, মানুষের হক আদায় করার তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে আপনার রহমত ও সন্তুষ্টি লাভকারী বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাদের দুনিয়ার জীবনকে কল্যাণময় এবং আখিরাতকে সফল করুন। আমিন।
৮
৮ মন্তব্য