সহকারী শিক্ষক
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৬:৩২ পূর্বাহ্ণ
বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকতা ও আমাদের বাস্তবতা
আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস।
শিক্ষকতা ও আমাদের বাস্তবতা:
ভূমিকা
"শিক্ষক হলেন জাতির আলোকবর্তিকা" কিংবা "শিক্ষকতা একটি মহান
পেশা"—এই
চিরন্তন বাণীগুলো আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। একটি আদর্শ, প্রগতিশীল এবং উন্নত
জাতি গঠনের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক। প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত
মর্যাদার সাথে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়, যার উদ্দেশ্য শিক্ষকদের অবদানকে
স্মরণ করা এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান জানানো। তবে বাংলাদেশে এই দিবসের
জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা। আদর্শ ও বাস্তবতার
টানাপোড়েনে এ দেশে শিক্ষকতা পেশাটি আজ এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
আদর্শ
বনাম বাস্তবতা: অর্থনৈতিক টানাপোড়েন
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যা হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক
নিরাপত্তা। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত,
শিক্ষকদের একটি বড় অংশই তাদের প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে
বেসরকারি এমপিওভুক্ত (Monthly Pay Order) স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকেরা চরম
বৈষম্যের শিকার।
· বেতন বৈষম্য: সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষকদের বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এবং উৎসব ভাতা অত্যন্ত নামমাত্র।
·
নন-এমপিও শিক্ষকদের
দুর্দশা: দেশে হাজার হাজার নন-এমপিও শিক্ষক
রয়েছেন, যারা মাসের পর মাস বিনা বেতনে শুধু আশার ওপর ভর করে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।
এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে অনেক শিক্ষককেই বাধ্য হয়ে টিউশনি, কোচিং বা অন্য
কোনো খণ্ডকালীন পেশার ওপর নির্ভর করতে হয়, যা তাদের মূল শিক্ষকতা পেশার মনোযোগ ও
মানকে ক্ষুণ্ণ করে।
সামাজিক
মর্যাদার অবক্ষয় ও নিরাপত্তা সংকট
এক সময় সমাজে শিক্ষকদের স্থান ছিল সবার ওপরে। একজন শিক্ষকের কথা বা আদেশকে সমাজের
মানুষ পরম শ্রদ্ধার সাথে গ্রহণ করত। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষকদের সেই
সামাজিক মর্যাদা অনেকটাই ম্লান।
· লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনা, কান ধরে ওঠ-বস করানো, কিংবা নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক অজুহাতে অপদস্থ করার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
· নিরাপত্তাহীনতা: শ্রেণীকক্ষে বা বিদ্যালয়ের বাইরে শিক্ষকেরা অনেক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী বা উগ্র মানসিকতার শিকার হন, যা তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
রাজনৈতিক
প্রভাব ও নিয়োগ বাণিজ্য
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় বাস্তব ক্ষত হলো রাজনীতি ও নিয়োগ বাণিজ্য।
· মেধার অবমূল্যায়ন: প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য এবং আর্থিক লেনদেন (ঘুষ) প্রাধান্য পায়। এর ফলে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরা শিক্ষকতায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
· দলীয়করণ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ (গভর্নিং বডি) বা প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আধিপত্যের কারণে শিক্ষকেরা স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না।
নতুন
শিক্ষাক্রম ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ সরকার মেধাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে নতুন শিক্ষাক্রম চালু
করেছে। এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের মূল চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষকেরা। কিন্তু
বাস্তবতা হলো:
· প্রশিক্ষণের অভাব: নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের যে ধরনের আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
· শ্রেণীকক্ষের পরিবেশ: অনেক বিদ্যালয়ে এখনো আধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রজেক্টর বা পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ নেই। এই পরিকাঠামোগত অভাবের কারণে শিক্ষকেরা তাদের সর্বোচ্চটা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
উত্তরণের
উপায় ও করণীয়
শিক্ষকতা পেশাকে যদি মর্যাদাপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় করা না যায়, তবে দেশের সামগ্রিক
উন্নয়ন অসম্ভব। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
১. স্বাধীন শিক্ষা কমিশন ও জাতীয়করণ: দেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে
ক্রমান্বয়ে জাতীয়করণ করা এবং একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষকদের বেতন ও
সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা।
২. নিয়োগে স্বচ্ছতা: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে
শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
৩. সুরক্ষা আইন: শিক্ষকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা
রক্ষায় বিশেষ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
৪. যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন শিক্ষাক্রমের
সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার
শিক্ষকেরা হলেন একটি দেশের ভবিষ্যতের স্থপতি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)
অর্জন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার কোনো
উপায় নেই। বিশ্ব শিক্ষক দিবসের রাষ্ট্রীয় সার্থকতা তখনই আসবে, যখন বাংলাদেশের
শিক্ষকেরা অর্থনৈতিক দৈন্যতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি পেয়ে বুক
ফুলিয়ে বলতে পারবেন—"আমি একজন গর্বিত শিক্ষক।" শিক্ষকদের মুখে হাসি না
ফুটলে, জাতির কপালে কখনোই আলোর চিলতে দেখা যাবে না।
২
২ মন্তব্য