Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ

যে হাত ভবিষ্যৎ গড়ে, সে কেন অরক্ষিত?

১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ অক্টোবর প্যারিসে আইএলও এবং ইউনেস্কোর বিশেষ আন্তঃসরকার সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার ও পেশাগত সুরক্ষায় একটি ঐতিহাসিক বৈশ্বিক সনদ গৃহীত হয়েছিল। দেখতে দেখতে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৫ অক্টোবর সেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের গৌরবময় ৬০ বছর (হীরকজয়ন্তী) পূর্ণ হলো। ইউনেস্কোর ঘোষণায় এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য- ‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়ানো: পেশা রক্ষা, মর্যাদার উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গঠন’। বিশ্বজুড়ে যখন এই ষাট বছরের পথচলা উদযাপন করা হচ্ছে, ঠিক তখনই প্রশ্ন জাগে- যে হাত পরম মমতায় একটি দেশের ভবিষ্যৎ রূপান্তর গড়ে তোলে, সেই হাত আজ নিজ দেশে কতটা সুরক্ষিত? উৎসবের আলো ঝলমলে বৈশ্বিক মঞ্চের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা এখনো এক গভীর সংকটের বার্তা দেয়।

রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষকদের অবদান নিয়ে আমাদের বাগাড়ম্বরের শেষ নেই। কলামের পর কলাম কিংবা বক্তৃতার মঞ্চে তাদের ‘জাতির মেরুদণ্ড’ বলে আকাশচুম্বী প্রশংসা করা হয়। অথচ রূঢ় সত্য হলো, আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দর্শনে শিক্ষক আজও সবচেয়ে অবহেলিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত- শিক্ষকতার মর্যাদা আজ এক গভীর কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার। মানুষ গড়ার যে কারিগররা শ্রেণিকক্ষে নিপুণ কারিগরি দেখাবেন, তাদের নিজেদের জীবন আজ নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি আর তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বেড়াজালে বন্দি।

ideal College

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই উদাসীনতার এক প্রামাণ্য ও উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। ইউনেস্কোর ২০২৬-এর এসডিজি-৪ স্কোর কার্ডের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের টেকসই রূপান্তরের জন্য জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অথবা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা বাধ্যতামূলক। অথচ সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত মেগা বাজেটে শিক্ষা খাতে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হলেও, তা সামগ্রিক জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। তথ্যানুযায়ী দেখা যায়- গত অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল আরও তলানিতে যা মোট জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় জিডিপির অনুপাতে শিক্ষায় বরাদ্দের এই হার এখনও সর্বনিম্ন স্তরে। জিডিপির এই ২ শতাংশের সীমিত বৃত্তে আটকে থাকায় শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান এবং বেতন কাঠামোর কোনো মৌলিক পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না।

অর্থনৈতিক এই অনগ্রসরতার সরাসরি শিকার দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি এবং কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক। নামমাত্র মূল বেতন আর উৎসব ভাতার নামে যে যৎসামান্য অর্থ তাদের দেওয়া হয়, তা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে এক চরম উপহাস। অভাবের তাড়নায় শিক্ষকরা যখন বাধ্য হয়ে প্রাইভেট টিউটরিং বা অন্য কোনো খণ্ডকালীন উপার্জনের পেছনে ছোটেন, তখন শিক্ষকতা পেশার সেই চিরায়ত নৈতিক আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে ফিনল্যান্ড বা জাপানের মতো বিশ্বমানের পাঠদান আশা করি, কিন্তু তাদের ন্যূনতম সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরম কার্পণ্য দেখাই।

আর্থিক সংকটের চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে শিক্ষকদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তাহীনতায়। সামপ্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির দাপটে শিক্ষকদের ওপর শারীরিক লাঞ্ছনা, জনসমক্ষে কান ধরে ওঠবস করানো কিংবা জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। যে সমাজে ক্ষমতার লোভে শিক্ষকের কলার চেপে ধরা যায়, সেই সমাজের নৈতিক দেউলিয়াত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু থাকে না।

এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত বৈষম্য। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সরকারিকৃত হাজার হাজার কলেজ শিক্ষক আজ এক অদ্ভুত প্রশাসনিক গোলকধাঁধায় ভুগছেন। সরকারি ঘোষণার পরও তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো পদসোপান বা পদোন্নতি নেই, নেই কোনো বদলির সুযোগ। সরকারি হওয়ার পূর্বের ২০-২৫ বছরের দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা মূল্যায়নেও রয়ে গেছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ফলে একই দেশের সরকারি কলেজ ব্যবস্থা দুটি সমান্তরাল ও বৈষম্যমূলক নীতিতে চলছে। পদোন্নতিহীন এই অবমূল্যায়ন মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশার প্রতি তীব্রভাবে বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে।

সনদের ৬০ বছরের এই ঐতিহাসিক মাইলফলকে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও সমাজকে বিনাবাক্যে মেনে নিতে হবে - শিক্ষককে দুর্বল, বুভুক্ষু ও অরক্ষিত রেখে কোনো শক্তিশালী জাতি গঠন সম্ভব নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কিংবা প্রযুক্তির এই যুগে তথ্যের হয়তো অভাব নেই, কিন্তু মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ার জন্য শিক্ষকের ছোঁয়া অপরিহার্য। শিক্ষকদের পেশাগত সুরক্ষা কোনো রাষ্ট্রীয় দয়া নয়, এটি টেকসই সমাজ গঠনের প্রথম শর্ত।

Presidency University admission (300x250) 20-08-26

আসুন, বিশ্ব শিক্ষক দিবসের হীরক জয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে সত্যিকার অর্থেই শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াই। একটি স্বাধীন ও দলীয় প্রভাবমুক্ত ‘জাতীয় শিক্ষক কমিশন’ গঠন, বৈষম্যহীন একক বেতন কাঠামো নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ সম্মান ফিরিয়ে আনাই হোক এই দিবসের মূল অঙ্গীকার। যে হাত ভবিষ্যৎ গড়ে, সেই হাতকে সুরক্ষিত ও সম্মানিত রাখা রাষ্ট্রের করুণা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার দায়।

লেখক: বিভাগীয়প্রধান, সমাজবিজ্ঞান, সরকারি ফুলতলা মহিলা কলেজ, খুলনা।

শিক্ষাসহ সব খবর সবার আগে জানতে দৈনিক শিক্ষাডটকমের ইউটিউব চ্যানেলের সঙ্গেই থাকুন। ভিডিয়োগুলো মিস করতে না চাইলে এখনই দৈনিক শিক্ষাডটকমের ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন এবং বেল বাটন ক্লিক করুন। বেল বাটন ক্লিক করার ফলে আপনার স্মার্ট ফোন বা কম্পিউটারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিয়োগুলোর নোটিফিকেশ

মন্তব্য করুন

ব্লগ