সিনিয়র শিক্ষক
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১০ অপরাহ্ণ
শিক্ষকের চাওয়া কী, রাষ্ট্রের পাওয়া কী?
৫ অক্টোবর। বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সারা পৃথিবীতে এই দিনে শিক্ষকদের সম্মান জানানো হয়। তাদের অবদানকে কুর্নিশ জানানো হয়। বাংলাদেশে এই দিনটি যেন এক করুণ বাস্তবতার আয়না! শিক্ষক দিবসে একটা বিষয় সামনে চলে আসে- শিক্ষকরা কী চায়? রাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়া কী ? এই দুই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে বেরিয়ে আসে এক বেদনাদায়ক গল্প!
শিক্ষকের চাওয়া: রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তো বটেই অধিকাংশ সময় বলা হয়-শিক্ষকতা মহান পেশা। এই একই বাণী শুনতে শুনতে যুগের যুগের পর যুগ কেটে যাচ্ছে অথচ শিক্ষকরা ন্যায্য সম্মান ও সম্মানী পাচ্ছে না। পেশা নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহান হয় না। সব পেশার মর্যাদা রয়েছে। মানুষ ও তার কাজের দায়িত্ববোধই পেশাকে মহান করে তোলে। মহৎ পেশার জন্য তো মহৎ বেতন কাঠামো হওয়ার কথা! মহৎ পেশায় তো দেশসেরা শিক্ষার্থীদের আসার কথা! কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল না থাকলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে!
শিক্ষকদের চাওয়া খুব বেশি কিছু না। শিক্ষকরা মর্যাদাসম্পন্ন বেতন চান। সকল স্তরের শিক্ষকদের জন্য বৈষম্যহীন সম্মানজনক বেতন কাঠামো প্রধান দাবি। কিন্তু বাস্তবতা কী? প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—সব স্তরের শিক্ষকরাই বলছেন, দায়িত্ব বাড়ছে দিন দিন; কিন্তু সম্মান ও সুবিধা বাড়ছে না। বরং কমছে। সরকার ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবসে’ গুণী শিক্ষক সম্মাননার করেছে-যেটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে মনে করি। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয়। শিক্ষকরা আর্থিক নিরাপত্তা চান। বিশেষ করে বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুল ও সমমানের শিক্ষকরা। তারাই তো মাধ্যমিক শিক্ষার মূল কারিগর। দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ৯৫ ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জীবনটা কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে! সাম্প্রতিক সময়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশনের টাকা লুটপাটের খবরও এসেছে! এতে শিক্ষকরা আরও শঙ্কিত। শিক্ষকরা চাকরির নিরাপত্তা চান। বদলির সুযোগ চান। সব পর্যায়ের শিক্ষকরা বেতনের সুরক্ষা চান। স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো কথা বলা হচ্ছে গত দুই দশক ধরেই; কিন্তু বাস্তবায়নের কথা রাষ্ট্র ভাবছে না। শিক্ষকরা পেশাগত স্বীকৃতি চান। সম্মান চান।
রাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়া ও বাস্তবতা: রাষ্ট্রের পাওয়াও খুব বেশি না! চাওয়া গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা। যেটার মূল কারিগর শিক্ষকরা। মূলত শিক্ষার কাঠামো সরকার নিজেই ঠিক করে দেয় আর শিক্ষকরা মাঠ পর্যায়ে সেটি বাস্তবায়ন করে। শিক্ষক যখন তার ন্যায্য অধিকার পায়, তখন সে পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে দায়িত্ব পালন করে। আর তখন রাষ্ট্র পায় ভালো শিক্ষা, গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু শিক্ষক যখন অর্থনৈতিক অনটনে ভোগে, বৈষম্যে ক্লান্ত থাকে, তখন রাষ্ট্র কী পায়?
রাষ্ট্র চাই দায়িত্বশীল শিক্ষক। শিক্ষক যখন মর্যাদাসম্পন্ন বেতন পায়, পেনশন নিশ্চয়তা পায়, চাকরির নিরাপত্তা পায় তখন সে দায়িত্বশীল হয়। সে শুধু পাঠদান করে না, শিক্ষার্থীদের জীবন গড়ার কারিগর হয়ে ওঠে; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা কী? শিক্ষকরা তাদের ন্যূনতম অধিকারের কথা বলতে বলতে ক্লান্ত! রাষ্ট্র চায় গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষক যখন আর্থিক চিন্তামুক্ত থাকে তখন সে গবেষণা করে। উদ্ভাবন করে, শিক্ষাদান পদ্ধতি উন্নত করে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকার বদলালেই শিক্ষাক্রম বদলায়! কিন্তু শিক্ষকদের ভাগ্য বদলায় না। আবার প্রশাসনিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। রাষ্ট্র চায় মেধাবী প্রজন্ম। দক্ষ শিক্ষকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দক্ষতা আসে মেধা থেকে। শিক্ষক যখন অনুপ্রাণিত থাকে, তখন সে মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু বর্তমানে নিম্ন বেতন, পেশাগত অবমূল্যায়ন, সামাজিক বাস্তবতা- এসব কারণে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে চায় না। ফলে রাষ্ট্র হারায় মেধাবী প্রজন্ম গড়ার সুযোগ। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্যের কথা বলা হলেও সমাধান নিয়ে কেউ ভাবে না! বাংলাদেশের শিক্ষকরা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন বেতনে জীবনযাপন করছেন।
সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বৈষম্যের শিকার। অথচ তারা একই যোগ্যতাসম্পন্ন। প্রাথমিক ও কলেজ পর্যায়ে যত বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ হয়েছে সে তুলনায় বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণে নজর দেওয়া হয়নি। মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ সময়ের দাবি। শুধু শিক্ষকদের জন্য নয়, শিক্ষার্থীদের জন্য জাতীয়করণ দরকার। বেতন ও অন্যান্য ফি দিয়ে পড়তে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খরচ দিন দিন বাড়ছে। ফলে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে। তবে ভালো শিক্ষাক্রম দিলেই রাতারাতি শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন হয়ে যাবে- এমনটি ভাবার কারণ নেই! শিক্ষকরা সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনব্যবস্থার বাইরে নন। তাদের জীবনে তো বটেই শিক্ষার উপরও রাজনৈতিক ইতিবাচক-নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। রয়েছে ঘুষ-দুর্নীতি-অপকর্ম-অনিয়মের প্রভাবও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটি গঠনেও রাজনৈতিক প্রভাব লক্ষ করা যায়! কিন্তু দরকার ছিল শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে বিদ্যালয় তদারকি কমিটি।
পৃথিবীর উন্নত দেশে শিক্ষকরাই সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখেন; কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়ারত দেশগুলোতে রাজনীতিই হয়ে উঠে মুখ্য পরিচয়! বিরোধী দলে থাকতে শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে যতটা সোচ্চার হতে দেখা যায়, সরকারে এসে দেখা যায় সেই নীতিনির্ধারকরাই অনেক কিছুই ভুলে যায়। অনেক সময় এলাকার পাতি নেতার ভয়ে শিক্ষককে তটস্থ থাকতে হয়! শিক্ষকদেরকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া হয় না!
মেধাবীরা কেন শিক্ষক হতে চান না?: মেধাবীরা কেন শিক্ষক হতে চান না- প্রশ্নটি এখন জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। একটি জটিল সমীকরণ বটে! তবে উত্তর সহজ। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে শুনেও না শোনার ভান করা হয়! কেননা শিক্ষকতায় রয়েছে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। নিম্ন বেতন। রয়েছে আর্থিক অনটন। সুযোগ-সুবিধার অভাব। সময়মতো বেতন পাওয়ার অনিশ্চয়তা! নেই চাকরির স্ট্যাটাস দেখানোর মতো প্রভাব। নেই পদ ও ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাহাদুরির সুযোগ! হয়তো এসব কারণে মেধাবীরা এই পেশায় আসতে চান না! সমাজে শিক্ষক পেশার মর্যাদা কমে গেছে। তাই মেধাবীরা আর এই পেশাকে আকর্ষণীয় মনে করেন না। শিক্ষকতায় উন্নতির সুযোগ সীমিত। গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার পরিবেশও অনুকূল নয়। রয়েছে চাকরির নিরাপত্তার অভাব। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের। যে কোনো সময় চাকরিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা। তাই মেধাবীরা দূরে সরে থাকে।
পরিবর্তনের সময় এখনই: কেন একজন সেরা শিক্ষার্থী চাকরির শুরুতে প্রাথমিক কিংবা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান না? কেন একজন সেরা শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যান- এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সময় এখনই। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যত দেরি হবে, গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন তত পিছিয়ে যাবে। বর্তমান বিশ্ব আগের থেকে দ্রুত গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে। ‘এআই’ শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা ভাবতে বাধ্য করছে। চীনের মতো কারিগরি শিক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে। যেখানে হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েও এখন শিক্ষার্থী বসে না থেকে নিজের উপার্জনের পথ খুঁজে নিতে পারে। সবার উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। মেধাবী ও গবেষণায় আগ্রহীদের কেবল উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে হবে।
শিক্ষক দিবস শুধু উৎসবের দিন নয়। এটি হওয়া উচিত শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের দিন। মাধ্যমিক শিক্ষকের চাওয়া সহজ। শিক্ষকরা মর্যাদা ও নিরাপত্তা চান। ন্যায্য অধিকার চান। রাষ্ট্রের দেওয়া উচিত প্রতিশ্রুতি নয়, চাই বাস্তবায়ন। বৈষম্যহীন বেতন কাঠামো সময়ের দাবি। মেধাবীদের জন্য আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার তৈরি করতে হবে। যেসব দেশে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসে সেসব দেশের শিক্ষকতা যেমন সম্মানের তেমনি গুণগত, মানসম্মত ও বাস্ততসম্মত। শিক্ষক দিবসে এই বার্তাটি যেন রাষ্ট্র ও সমাজ মনে রাখে। দক্ষ শিক্ষক ছাড়া দক্ষ জাতি গঠন অসম্ভব। শিক্ষক সমাজকে অবহেলিত রেখে গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা গড়াও অসম্ভব।
মূল লেখক: সাধন সরকার, দৈনিক শিক্ষাডটকম ও শিক্ষক
৮
৮ মন্তব্য