সিনিয়র শিক্ষক
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১৬ অপরাহ্ণ
শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা মানেই ভবিষ্যৎ সুরক্ষা
প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনেসকো শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সুপারিশ গ্রহণ করে। এর স্মরণে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বিশ্বব্যাপী ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকার ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে দিবসটির জাতীয় স্বীকৃতি দেয়। বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষকদের অবদান, অধিকার, দায়িত্ব ও সামাজিক মর্যাদা স্মরণ করার দিন। তবে এটি কেবল ফুল দেওয়া, শুভেচ্ছা জানানো বা আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বরং এই দিনটি শিক্ষকদের বাস্তব সমস্যা, তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য হলো—‘শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াই: পেশার সুরক্ষায় ৬০ বছর, মর্যাদা উন্নয়ন ও আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ। ’ ইংরেজিতে প্রতিপাদ্যটি হলো, “স্ট্যান্ডিং উইথ টিচার্স: সিক্সটি ইয়ার্স অব প্রোটেক্টিং দ্য প্রফেশন, অ্যাডভান্সিং ইটস স্ট্যাটাস অ্যান্ড শেপিং আওয়ার ফিউচার্স” ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের শিক্ষকতার মর্যাদা-সংক্রান্ত আইএলও-ইউনেসকো সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতিহাসের শিক্ষা: ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের ঐতিহাসিক সুপারিশে শিক্ষকতার অধিকার, দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, বেতন ও কর্মপরিবেশের বিষয়ে আন্তর্জাতিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, সমাজে শিক্ষকদের মর্যাদা তাদের দায়িত্ব ও অবদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকের মর্যাদা কেবল সামাজিক সম্মানের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে পেশাগত স্বাধীনতা, ন্যায্য পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ। একজন শিক্ষক যেন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, নিজের দক্ষতা উন্নত করতে পারেন এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন—এই ছিল ওই আন্তর্জাতিক সুপারিশের মূল লক্ষ্য। ছয় দশক পরও বিশ্বের বহু দেশে এই লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, সংঘাত, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রয়োজন শিক্ষকতার দায়িত্বকে আরও জটিল করে তুলেছে।
শিক্ষকদের বাড়তি দায়িত্ব বর্তমান সময়ে একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ান না। তাকে একই সঙ্গে পাঠদাতা, পরামর্শক, প্রযুক্তি-সহায়ক, মানসিক সহায়তাকারী এবং কখনো কখনো সমাজকর্মীর ভূমিকাও পালন করতে হয়। একই শ্রেণিকক্ষে বিভিন্ন আর্থিক অবস্থা, ভাষা, সক্ষমতা ও শেখার গতির শিক্ষার্থী থাকতে পারে। তাদের প্রত্যেকের প্রয়োজন বুঝে পাঠদান করা সহজ নয়। শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ চিহ্নিত করা, বুলিং প্রতিরোধ করা, অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতন করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান পদ্ধতি আয়ত্ত করাও এখন শিক্ষকের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু অনেক শিক্ষক এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট প্রশিক্ষণ, সময়, উপকরণ বা সহায়ক জনবল পান না। বড় শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকস্বল্পতা, অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শিক্ষকদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ায়। এর প্রভাব শুধু শিক্ষকদের ওপর পড়ে না; শিক্ষার্থীদের শেখা, মনোযোগ ও সামগ্রিক কল্যাণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মূল লেখক: ফয়সাল হাবিব, দৈনিক শিক্ষাডটকম
৮
৮ মন্তব্য