সিনিয়র শিক্ষক
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:৫২ অপরাহ্ণ
এক দিনের ফুল নয়, সারা বছর শিক্ষকের মর্যাদা চাই
শিক্ষক দিবস এলেই শিক্ষকদের নিয়ে আমাদের আবেগ একটু বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে ওঠে শিক্ষকের ছবি, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার অসংখ্য পোস্ট। কেউ লেখেন ‘শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড’, কেউ বলেন ‘শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর’, আবার কেউ স্মরণ করেন জীবনের প্রিয় কোনো শিক্ষকের কথা। শিক্ষার্থীরা হাতে ফুল নিয়ে শিক্ষকের কাছে যায়, শুভেচ্ছা জানায়, কোথাও আয়োজন হয় সম্মাননা অনুষ্ঠানের।
সেদিন মনে হয়, শিক্ষকই বুঝি সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ; কিন্তু পরদিন? ফুল শুকিয়ে যায়, ছবি পুরোনো হয়ে যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট হারিয়ে যায়। জীবন আবার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে আসে। তখন প্রশ্ন জাগে শিক্ষকের প্রতি আমাদের সম্মান কি শুধু একটি দিনের আবেগ, নাকি সব সময়ের কর্তব্য?
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান, হেনস্তা, জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে বাধা দেওয়া কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো ঘটনা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগের বিচার প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনগত প্রক্রিয়ায় না গিয়ে উত্তেজিত জনতার হাতে চলে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। এসব ঘটনা শুধু একজন শিক্ষককে অপমান করে না; ক্ষতিগ্রস্ত করে শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ, শিক্ষকের নিরাপত্তাবোধ এবং সমাজে জ্ঞানচর্চার মর্যাদাকেও।
একজন শিক্ষক হয়তো ৩০ বছর ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন। তার ছাত্রদের কেউ চিকিৎসক হয়েছেন, কেউ প্রকৌশলী, কেউ প্রশাসনে গেছেন, কেউ ব্যবসায়ী হয়েছেন, কেউ আবার শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। সেই শিক্ষকই যদি একদিন কয়েকজন উত্তেজিত মানুষের সামনে অপমানিত হন, তাকে ঘিরে কটূক্তি করা হয় বা ভয় দেখিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়, তাহলে সেই অপমান শুধু একজন ব্যক্তির নয়, এটি তার দীর্ঘ পেশাজীবনের প্রতি অবমাননা। একজন শিক্ষকের সন্তান যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বাবার বা মায়ের অপমানের ভিডিও দেখে, তখন সেই আঘাতের গভীরতা আমরা কি কখনো ভেবে দেখি?তবে শিক্ষককে মর্যাদা দেওয়ার কথা বলতে গিয়ে একটি বিষয়ও স্পষ্ট থাকা দরকার, শিক্ষক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন। একজন শিক্ষক যেহেতু একটি প্রজন্মের শিক্ষা, জ্ঞান ও মূল্যবোধ গঠনের দায়িত্ব পালন করেন, তাই তার কাছ থেকে পেশাগত সততা, দায়িত্বশীলতা, নৈতিকতা ও মানবিক আচরণ প্রত্যাশিত। কোনো শিক্ষক যদি দায়িত্বে অবহেলা করেন, শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেন, আর্থিক অনিয়মে জড়ান কিংবা গুরুতর কোনো অপরাধ করেন, তাহলে অবশ্যই তদন্ত হতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত বিধি ও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু জবাবদিহি আর অপমান এক বিষয় নয়। অভিযোগ উঠলেই কেউ অপরাধী হয়ে যান না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে, প্রমাণ পরীক্ষা করতে হবে, অভিযুক্ত শিক্ষককে তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কারণ একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন ন্যায়বিচারের অংশ, তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় ও হয়রানি থেকে রক্ষা করাও ন্যায়বিচারের অংশ। জবাবদিহি হবে প্রতিষ্ঠানের নিয়মে, বিচার হবে আইনের পথে, মবের হাতে নয়।
মব কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। উত্তেজিত জনতা হয়তো মুহূর্তের মধ্যে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে; কিন্তু একটি অভিযোগের পেছনের সত্য, প্রেক্ষাপট ও প্রমাণ যাচাই করার দায়িত্ব জনতার নয়। সে দায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
মূললেখক: শাহেদ আহমদ, দৈনিক শিক্ষাডটকম
১
০ মন্তব্য