Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

কাব্যগ্রন্থ : খাতা বদলের গল্প প্রারম্ভিকা-কবিতা কলমে: মোস্তাফিজুর রহমান কবি, গবেষক ও শিক্ষক

খাতা বদলের গল্প

প্রারম্ভিকা-কবিতা

কলমে: মোস্তাফিজুর রহমান
কবি, গবেষক ও শিক্ষক

আজকে আমি ছাত্র হলাম, তোমরা হলে গুরু,
উল্টো রথে শুরু হলো শেখার নতুন সুর।
যে হাতে ছিল চক-ডাস্টার, সে হাত হলো খাতা,
শিক্ষার পথে বদলে গেল পরিচিত সব কথা।

আমি এলাম শেখাতে তোমাদের—নিয়ে পুরোনো পাঠ,
তোমরা দিলে নতুন করে প্রশ্ন করার হাত।
বললে—“স্যার, শুধু শুনব না, আমরাও বলব কথা,
শেখার মাঝে আমরাও হব জ্ঞানেরই ব্যাখ্যাতা।”

বোর্ডের কালো বুকের পরে ফুটল নতুন ভোর,
প্রশ্নগুলো খুলে দিল যে চিন্তার কত দ্বার।
কেউ বলিলে—“কেন এমন?”, কেউ বা বলল—“কী?”,
প্রশ্নের মাঝে জেগে ওঠে জ্ঞানের দীপশিখা কী!

শিক্ষা শুধু মুখস্থ করা বইয়ের পাতার বাণী নয়,
শিক্ষা হলো ভাবতে শেখা—সত্য-মিথ্যা চেনার জয়।
শিক্ষা মানে প্রশ্ন করা, যুক্তির আলো জ্বালা,
ভুলের ভেতর পথ খুঁজে নেওয়া, থেমে না-যাওয়া।

একুশ শতক ডাকছে আজ—“শিখো নবীন পথে,
জ্ঞানকে শুধু জমিয়ে রেখো না নিজেরই খাতাতে।
সহযোগিতায় জাগুক মেধা, সংলাপে খুলুক দ্বার,
অভিজ্ঞতায় গড়ে উঠুক শেখার নতুন সংসার।”

ডিজিটালের জানালা খুলে বিশ্ব এলো ঘরে,
তথ্যের স্রোত ছুটছে আজকে মুহূর্তেরই তরে।
তবু তথ্য জ্ঞান নয় শুধু—বাছতে হবে সত্য,
বিবেক দিয়ে যাচাই করাই শিক্ষার বড় শক্তি।

প্রযুক্তি হবে সহযাত্রী, মানুষ থাকবে কেন্দ্র,
যন্ত্র যতই শক্তিশালী হোক, মানবতাই মন্ত্র।
কৃত্রিম বুদ্ধি পাশে থাকুক, বাড়ুক সৃজনশক্তি,
মানুষ যেন না হারিয়ে ফেলে নিজের বিবেক-বুদ্ধি।

শিক্ষক শুধু বক্তা নন, তিনিও একজন শিক্ষার্থী,
প্রতিটি শিশুর চোখের ভেতর খোঁজেন নতুন সৃষ্টি।
শিক্ষার্থীও কেবল শ্রোতা নয়, সে সম্ভাবনার বীজ,
তার প্রশ্নেই শিক্ষক খুঁজে পান নতুন দিনের দিশ।

শেখা হবে অংশগ্রহণে, কাজে হবে পাঠ,
সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে খুলবে জ্ঞানের ঘাট।
কেউ আঁকবে, কেউ বলবে, কেউ করবে অনুসন্ধান,
কেউ ভুল করে শিখবে আবার—এটাই শিক্ষার প্রাণ।

যে শিশুটি চুপ করে থাকে, তারও আছে ভাষা,
যে শিশুটির চোখে স্বপ্ন, তারও আছে আশা।
শিক্ষা হবে সবার তরে—ভিন্নতাকে মেনে,
প্রতিটি প্রাণের সম্ভাবনাকে আলোয় এনে।

কেউ দ্রুত শেখে, কেউ বা ধীরে—তবু সবাই পথের যাত্রী,
তুলনা নয়, সহায়তাই হোক শিক্ষার মূল মন্ত্রটি।
ভয় নয়, প্রশ্নের সাহস; শাস্তি নয়, সংশোধন,
ভুলকে করে শেখার সোপান—এই হোক শিক্ষার বন্ধন।

মূল্যায়ন শুধু নম্বর নয়, দেখুক শেখার গতি,
কোথায় থেমে, কোথায় এগোয় শিক্ষার্থীরই মতি।
ফল নয় শুধু, পথটিও হোক মূল্যায়নের মান,
অগ্রগতির প্রতিটি ধাপে জাগুক আত্মবিশ্বাস-প্রাণ।

শিক্ষা হবে জীবনমুখী, বই ছাড়িয়ে মাঠে,
সমস্যা এসে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে শিক্ষার পাঠে।
সমাধানের পথ খুঁজতে গিয়ে গড়বে সৃজনশীল মন,
জ্ঞান তখনই সত্যি হবে—যখন বদলায় জীবন।

শুধু নিজের জন্য শেখা নয়, শেখা হোক মানুষের তরে,
ন্যায়ের পাশে দাঁড়াক কলম, সত্য থাকুক অন্তরে।
জ্ঞান যদি দেয় অহংকার, সে জ্ঞান তবে অর্ধেক,
জ্ঞান যদি দেয় মানবতা—তবেই তার পূর্ণ লেখ।

আজ তোমরা যে কাঠি ধরেছ, কাল ধরবে দায়িত্ব,
তোমাদের হাতেই গড়বে দেশের আগামী ভবিষ্যৎ।
প্রশ্ন রেখো, স্বপ্ন দেখো, সত্যের পথে চলো,
অন্যায়ের আঁধার পেরিয়ে ন্যায়ের প্রদীপ জ্বালো।

স্নেহের ছাত্র, শোনো তবে আজ ছাত্রের উপদেশ—
জ্ঞানের সাগর সীমাহীন, ফুরোয় না তার রেশ।
আমিও শিখি তোমাদের কাছে, এই হোক অহংহীন,
শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলেই গড়ি আলোকিত দিন।

গুরু সে তো শুধু আদেশ দিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে রয় না,
হাত বাড়িয়ে পথ দেখায়, ভুল হলে ফিরে নেয় না?
শিক্ষক সে তো সহযাত্রী—পথেরই এক সাথি,
শিক্ষার্থীর জয়ের মাঝে খুঁজে নেয় সে প্রভাতী।

খাতা বদলের এই গল্প তাই খাতাতেই নয় শেষ,
এ গল্প হলো মানুষ হওয়ার—শিক্ষার অনন্ত রেশ।
আজ যে ছাত্র, কাল সে শিক্ষক—চক্রটি চলুক চির,
একজনের জ্ঞানের আলোয় অন্যজন হোক ধীর।

চলো তবে এমন শিক্ষা গড়ি—
যেখানে প্রশ্ন অপরাধ নয়,
যেখানে ভুল মানে শেষ নয়,
যেখানে প্রযুক্তি মানুষকে ছাড়িয়ে যায় না,
যেখানে নম্বর মানুষকে মাপে না,
যেখানে শিক্ষকও শেখেন,
শিক্ষার্থীও শেখান,
আর জ্ঞানের শেষ সীমানায়
মানবতা দাঁড়িয়ে থাকে প্রথম সারিতে।

চলো,
চকের ধুলো পেরিয়ে
ডিজিটাল আলোর জানালা খুলে
শিক্ষাকে নিয়ে যাই জীবনের কাছে—
শেখা হোক আনন্দ,
চিন্তা হোক স্বাধীন,
জ্ঞান হোক দায়িত্ব,
আর মানুষ হওয়াই হোক
সমস্ত শিক্ষার শেষ পাঠ।

আজকে আমি ছাত্র হলাম, তোমরা হলে গুরু—
এই উল্টো রথের পথেই
জেগে উঠুক শিক্ষার নতুন ভোর।


মন্তব্য করুন