অধ্যক্ষ
০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৭:২৫ অপরাহ্ণ
দেরিতে পাওয়া জিনিসের মধ্যেও কি আল্লাহর হিকমাহ থাকে?
দেরিতে পাওয়া জিনিসের মধ্যেও কি আল্লাহর হিকমাহ থাকে?
জীবনে এমন কিছু চাওয়া থাকে, যেগুলো আমরা খুব মন থেকে চাই। দোয়া করি, অপেক্ষা করি, চেষ্টা করি। কখনো দিনের পর দিন, কখনো বছরের পর বছর। কিন্তু যখন দেখি অন্যরা তাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে যাচ্ছে, অথচ আমাদের জীবনে সেটি আসছে না, তখন বুকের ভেতর একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে, “আমারটা এত দেরি হচ্ছে কেন?”
কখনো মনে হয়, আল্লাহ হয়তো আমার দোয়া শুনছেন না। কখনো মনে হয়, আমি বুঝি বঞ্চিত। কিন্তু একজন মুমিনের বিশ্বাস এখানেই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সে জানে, আল্লাহ দেরি করতে পারেন, কিন্তু অবহেলা করেন না। আমাদের সময়ের হিসাব আর আল্লাহর হিকমাহর হিসাব এক নয়।
১. দেরি মানেই প্রত্যাখ্যান নয়
আমরা অনেক সময় মনে করি, কোনো কিছু দ্রুত না পেলে বুঝি আল্লাহ আমাদের তা দিতে চান না। অথচ দেরি সবসময় না পাওয়ার অর্থ নয়।
কখনো কোনো জিনিস আমাদের জীবনে আসতে দেরি হয়, কারণ তার জন্য সময়টা এখনো উপযুক্ত হয়নি। আমরা হয়তো শুধু ফলাফলটা দেখতে চাই, কিন্তু আল্লাহ দেখেন পুরো পথটা।
একটি বীজ মাটিতে বপন করার পর পরদিন গাছ পাওয়া যায় না। তাকে অন্ধকার মাটির নিচে সময় কাটাতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে শিকড় গড়ে ওঠে, চারা বের হয়, একদিন গাছ হয়।
আমাদের জীবনের কিছু দোয়াও হয়তো এমনই। আমরা শুধু ফল চাই, কিন্তু আল্লাহ হয়তো আমাদের প্রস্তুত করছেন।
২. আমরা যা চাই, আল্লাহ তার পরিণতিও জানেন
মানুষ বর্তমান দেখে সিদ্ধান্ত নেয়, আর আল্লাহ জানেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ।
কখনো আমরা এমন কিছু চাই, যেটাকে আমরা নিজেদের জন্য খুব ভালো মনে করি। কিন্তু আল্লাহ জানেন, সেটি পেলে হয়তো আমাদের ক্ষতি হতে পারে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:
“হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে ভালোবাস অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমাদের জ্ঞান সীমিত। তাই কোনো কিছু দেরিতে পাওয়া মানেই আল্লাহ আমাদের বঞ্চিত করছেন, এমন ভাবার কারণ নেই।
৩. কখনো দেরি আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে
কিছু জিনিস যদি খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাই, হয়তো তার মূল্য বুঝব না।
যে মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে একটি ভালো সুযোগ পায়, সে সেই সুযোগকে অন্যভাবে মূল্যায়ন করে। যে দীর্ঘদিন দোয়া করে কোনো নিয়ামত পায়, সে হয়তো তার জন্য আরও বেশি শুকরিয়া আদায় করে।
অপেক্ষা মানুষকে ধৈর্য শেখায়। দেরি মানুষকে পরিণত করে। আর কষ্ট মানুষকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যেতে পারে।
হয়তো আপনি যে জিনিসটি আজ পাচ্ছেন না, সেটার জন্য অপেক্ষা করতে গিয়েই এমন কিছু শিখছেন, যা ভবিষ্যতে আপনার প্রয়োজন হবে।
৪. দেরির সময়ে দোয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে
কখনো আমরা কোনো প্রয়োজনের কারণে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করি। প্রথমে হয়তো শুধু সেই প্রয়োজনের জন্য দোয়া করি। কিন্তু দীর্ঘদিন দোয়া করতে করতে একসময় বুঝতে পারি, আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কোনো নির্দিষ্ট জিনিস নয়, আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আল্লাহর নৈকট্য।
তখন দোয়ার ভাষাও বদলে যায়।
আগে বলতাম,
“হে আল্লাহ, আমাকে এটা দিন।”
পরে বলতে শিখি,
“হে আল্লাহ, আমার জন্য যা কল্যাণকর,
সেটাই নির্ধারণ করুন এবং তাতে আমাকে
সন্তুষ্ট রাখুন।”
এই পরিবর্তনটাও আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের নিয়ামত হতে পারে।
৫. দেরি কখনো কখনো সুরক্ষাও হতে পারে
আমরা হয়তো ভাবছি, “আমি যদি এটা আরও আগে পেতাম!”
কিন্তু কে জানে, আগে পেলে কী হতো?
হয়তো সেই সময় আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। হয়তো ভুল মানুষকে বিশ্বাস করতাম। হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নিতাম। হয়তো কোনো নিয়ামত আমাদের অহংকারী করে তুলত।
তাই জীবনের প্রতিটি বিলম্বকে শাস্তি হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিছু বিলম্বের ভেতরেও আল্লাহর রহমত লুকিয়ে থাকতে পারে।
৬. তবে অপেক্ষা মানে বসে থাকা নয়
আল্লাহর ওপর ভরসা করার অর্থ হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়।
দোয়া করতে হবে, চেষ্টা করতে হবে, সঠিক পথে এগোতে হবে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে।
আপনি চাকরি চান, চেষ্টা করুন। বিয়ের জন্য দোয়া করছেন, নিজেকে প্রস্তুত করুন। ব্যবসা করতে চান, জ্ঞান অর্জন করুন। কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে চান, পরিশ্রম করুন।
তারপর বলুন, “হে আল্লাহ, আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছি। এখন আমার জন্য যা উত্তম, সেটাই সহজ করে দিন।”
৭. আপনার সময় আর আল্লাহর সময় এক নয়
জীবনে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হলো অপেক্ষা করা। বিশেষ করে যখন মনে হয়, “সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, শুধু আমি পিছিয়ে আছি।”
কিন্তু মনে রাখবেন, জীবনের সবার সময়সূচি এক নয়।
কারও বিয়ে আগে হয়, কারও পরে। কারও চাকরি আগে হয়, কারও পরে। কেউ দ্রুত সফল হয়, কেউ অনেক সংগ্রামের পর সফল হয়।
অন্যের সময় দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করার প্রয়োজন নেই।
আপনার গল্পের সময়সূচি আলাদা হতে পারে।
৮. দেরিতে পাওয়া জিনিস কখনো আরও মূল্যবান হয়
অনেক সময় আমরা যে জিনিসের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করি, সেটি যখন আসে, তখন তার মূল্য আমাদের কাছে অনেক বেশি হয়।
কারণ আমরা জানি, এর পেছনে কত রাতের দোয়া ছিল, কত চোখের পানি ছিল, কতটা ধৈর্য ছিল।
তখন মানুষ শুধু নিয়ামত দেখে না, নিয়ামতের পেছনে আল্লাহর রহমতও অনুভব করে।
তাই কোনো দোয়া দেরিতে কবুল হচ্ছে মনে হলে হতাশ হবেন না। নিজের হৃদয়কে বলুন:
“আল্লাহ আমার দোয়া জানেন। তিনি আমার প্রয়োজন জানেন। তিনি আমার সময়ও জানেন। আমি শুধু তাঁর ওপর ভরসা রাখব।”
শেষ পর্যন্ত আমরা হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর এখনই পাব না। কিন্তু একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো, সব উত্তর না জেনেও সে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারে।
হয়তো আপনার জীবনে যে জিনিসটি দেরিতে আসছে, তার পেছনে এমন কোনো হিকমাহ আছে, যা আজ আপনি বুঝতে পারছেন না।
তাই অপেক্ষার দিনগুলোকে শুধু কষ্টের দিন ভাববেন না। এগুলো হতে পারে প্রস্তুতির দিন, দোয়ার দিন, আত্মশুদ্ধির দিন এবং আল্লাহর আরও কাছে যাওয়ার দিন।
দেরি হয়েছে মানেই শেষ হয়ে যায়নি। হয়তো আল্লাহ বলছেন, “আরও একটু অপেক্ষা করো, সময়টা আমি তোমার চেয়ে ভালো জানি।”
আর কখনো যদি মনে হয়, “আমার দোয়া এত দেরিতে কেন?”
তখন শুধু মনে রাখুন:
আল্লাহ দেরি
করেন, কিন্তু ভুল করেন না।
তিনি আমাদের
চাওয়ার চেয়েও ভালো জানেন, আমাদের জন্য কখন কী প্রয়োজন।
তাই অপেক্ষা
করুন, চেষ্টা করুন, দোয়া করুন এবং ভরসা রাখুন।
কারণ আল্লাহর সিদ্ধান্তে দেরি থাকতে পারে, কিন্তু অযথা কিছু থাকে না।
১৮
২৯ মন্তব্য