সিনিয়র শিক্ষক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:২৫ অপরাহ্ণ
শিক্ষার্থীর হাতে বই থাকার কথা, প্রশাসনিক অভিযোগের ব্যানার নয়
শিক্ষার্থীর হাতে বই থাকার কথা, প্রশাসনিক অভিযোগের ব্যানার নয়
নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনা আমাদের কী প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়?
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়—এটি একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠান। সেখানে শিক্ষার্থী শিখবে জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা। শিক্ষক হবেন পথপ্রদর্শক, প্রধান শিক্ষক হবেন প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকসুলভ প্রশাসনিক নেতা এবং অভিভাবক হবেন বিদ্যালয়ের অন্যতম সহযোগী।
কিন্তু সম্প্রতি নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা আমাদের শুধু একজন প্রধান শিক্ষক বা একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সমস্যা নিয়ে ভাবায় না; বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে তৈরি হওয়া একটি গভীরতর সংকটের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। অভিযোগগুলোর মধ্যে আর্থিক অনিয়ম এবং অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো বিষয়ও উঠে এসেছে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপের পর প্রধান শিক্ষককে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো এবং অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যদি প্রধানত প্রশাসনিক, আর্থিক ব্যবস্থাপনা কিংবা অভিভাবকদের সঙ্গে আচরণ-সংক্রান্ত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এসব অভিযোগের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের কাছে কীভাবে পৌঁছাল?
অবশ্যই শিক্ষার্থীদের মতামত অমূল্য। বিদ্যালয়ের পরিবেশে কোনো অন্যায় হলে তারা তা জানাবে—এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
কিন্তু একটি বিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব, প্রশাসনিক অনিয়ম, অভিভাবকের সঙ্গে আচরণ কিংবা প্রধান শিক্ষকের ব্যবস্থাপনার বৈধতা যাচাই করার দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের কাঁধে তুলে দেওয়া যায় না।
এসব বিষয়ে রয়েছে নির্ধারিত প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষা বিভাগ, তদন্তব্যবস্থা, অভিভাবক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তাহলে প্রশ্ন আসে—
শিক্ষার্থীরা কেন সেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আন্দোলনের মুখপাত্র হয়ে উঠল?
অভিযোগের সত্যতা এক বিষয়, অভিযোগের বাহক আরেক বিষয়
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য না মিথ্যা—তা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। অভিযোগ উঠেছে বলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না। একইভাবে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে বলেই তাদের অভিযোগকে মিথ্যা বলারও সুযোগ নেই।
কিন্তু অভিযোগের উৎস, বিস্তার এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা বৈধ।
বিশেষ করে যদি অভিযোগগুলো এমন হয়, যা মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়—তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জানতে ইচ্ছা করে:
কে শিক্ষার্থীদের এসব বিষয় জানাল?
কারা তাদের অভিযোগগুলো সংগঠিত করল?
কেউ কি তাদের উৎসাহিত বা প্রভাবিত করেছে?
নাকি বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এতটাই অকার্যকর যে শিক্ষার্থীরাই শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক বিরোধের প্রকাশ্য পক্ষ হয়ে উঠেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের হওয়া উচিত।
শিক্ষার্থীর হাতে ব্যানার নয়, বই বেশি মানায়
একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় শক্তি তার জ্ঞান, যুক্তিবোধ ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন।
তার হাতে থাকার কথা বই, খাতা, কলম ও বিজ্ঞান-গণিতের উপকরণ। তার সময় ব্যয় হওয়ার কথা পাঠ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সৃজনশীলতা ও চরিত্র গঠনে।
অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের তদন্ত, প্রশাসনিক বিরোধের নিষ্পত্তি কিংবা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিচার—এসব প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্ব।
শিক্ষার্থীরা যদি প্রতিদিন বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন করতে শুরু করে, তবে বিদ্যালয় আর বিদ্যালয় থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের ময়দানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আর এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার্থীদেরই।
তবে শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না
এখানে শিক্ষার্থীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোও সমাধান নয়।
কারণ একজন কিশোরী শিক্ষার্থী কীভাবে একটি প্রশাসনিক অভিযোগের ভাষা, তথ্য ও কৌশল আয়ত্ত করে আন্দোলনে নামল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে প্রাপ্তবয়স্কদের কাছেই।
যদি কেউ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে থাকে, তাহলে সেটি আরও গুরুতর বিষয়।
কারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ, সরলতা ও সম্মিলিত শক্তিকে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা প্রশাসনিক বিরোধের হাতিয়ার বানানো হলে তা শুধু একটি বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা নষ্ট করে না; শিক্ষার্থীদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তবে আবারও বলা প্রয়োজন—কেউ শিক্ষার্থীদের উস্কানি দিয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত এখনই দেওয়া যাবে না। সেটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু উস্কানি ছিল কি না—এই প্রশ্নটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
তাহলে বিদ্যালয়ের অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা কোথায়?
এই ঘটনাটি আমাদের আরও একটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।
একজন শিক্ষার্থী যদি মনে করে কোনো শিক্ষক অন্যায় করেছেন, তার অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কোথায়?
কোনো অভিভাবক যদি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তার প্রতিকার পাওয়ার পথ কী?
বিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা যাচাই করবে কে?
প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামার আগেই কি কোনো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই?
যদি ব্যবস্থা থাকে, তবে তা কার্যকর হলো না কেন?
আর যদি ব্যবস্থা কার্যকর না থাকে, তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি সেখানেই।
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের জায়গায় যদি প্রশাসনিক সংঘাত আসে
বিদ্যালয়ের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলোর একটি হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক।
শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখেন। প্রধান শিক্ষক শুধু অফিস পরিচালনা করেন না; তিনি পুরো প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলার নেতৃত্ব দেন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থী শিক্ষককে প্রশ্ন করতে পারবে, ভুল হলে জানাবে, অন্যায় হলে প্রতিবাদ করবে—এটিও একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার অংশ।
কিন্তু প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক আন্দোলন এক জিনিস নয়।
শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে যেন শিক্ষার্থীকে প্রশাসনিক বিরোধের যোদ্ধায় পরিণত না করা হয়—এ ভারসাম্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ঘটনার ভেতর দিয়ে বড় সংকেত
নাটোরের ঘটনাটি তাই শুধু একজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কিংবা একটি বিদ্যালয়ের আন্দোলনের ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো আমরা বড় ছবিটি দেখতে পাব না।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, শিক্ষকের মর্যাদা ও আর্থিক অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা, নেতৃত্বের সংকট, শৃঙ্খলার অবনতি, অভিভাবক-বিদ্যালয় সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের আন্দোলন—এসবকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে প্রতিটি ঘটনাই আলাদা সমস্যা মনে হবে।
কিন্তু একসঙ্গে দেখলে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে ওঠে—
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি তার মূল উদ্দেশ্য থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে?
আমরা কি শিক্ষার্থীকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছি, নাকি তাকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দ্বন্দ্বের অংশ করে ফেলছি?
আমরা কি শিক্ষককে যথাযথ মর্যাদা ও জবাবদিহির কাঠামো দিচ্ছি?
আমরা কি প্রধান শিক্ষককে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিচ্ছি, একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় রাখছি?
আমরা কি অভিভাবকের অভিযোগ শোনার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করেছি?
সবচেয়ে বড় কথা—
আমরা কি বিদ্যালয়ের ভেতরে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে কোনো সমস্যা হলে শিক্ষার্থীকে রাস্তায় নামতে হবে না; বরং প্রতিষ্ঠানই তার সমস্যার সমাধান করতে পারবে?
এখন প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
এই ধরনের ঘটনায় কাউকে আগেভাগে অপরাধী ঘোষণা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শিক্ষার্থীদের অভিযোগকে অবজ্ঞা করাও ঠিক নয়।
প্রয়োজন—
নিরপেক্ষ তদন্ত,
স্বচ্ছ প্রশাসন,
কার্যকর অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা,
আর্থিক জবাবদিহি,
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক মর্যাদা,
অভিভাবকের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং
প্রধান শিক্ষকের জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব।
আর যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রশাসনিক বিরোধে তাদের নামিয়েছে, তবে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
কারণ শিক্ষার্থীদের দিয়ে কোনো পক্ষের হিসাব মেটানো যায় না।
শিক্ষার্থী কোনো পক্ষের হাতিয়ার নয়।
শিক্ষার্থী কোনো প্রশাসনিক বিরোধের সৈনিক নয়।
শিক্ষার্থী হলো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।
তাই তার হাতে সবচেয়ে বেশি মানায়—
বই, কলম ও স্বপ্ন।
আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাতে থাকতে হবে—
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার।
নাটোরের ঘটনা আমাদের সেই মৌলিক কথাটিই আবার মনে করিয়ে দেয়—
বিদ্যালয়ের সমস্যা বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যেই সমাধান হওয়া উচিত। শিক্ষার্থী যেন কখনো সেই ব্যবস্থার ব্যর্থতার বোঝা বহন করতে বাধ্য না হয়।
কারণ কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যখন শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক অভিযোগের বিচার চাইতে রাস্তায় নামে, তখন শুধু সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষককে নয়—আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি ও অভিভাবকত্বের কাঠামোকেই আয়নায় দেখা প্রয়োজন।
মুফিদুল আলম
সিনিয়র শিক্ষক
রামু,কক্সবাজার
১৮
২৯ মন্তব্য