সহকারী শিক্ষক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৮:৫৭ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
দুঃখু মিয়ার জীবন আলেখ্য
— মোস্তাফিজুর রহমান
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া।
৩০/১১/২০০৮
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক বিস্ময়কর ধূমকেতুর নাম। পরাধীন ভারতবর্ষের অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন শোষিতের কণ্ঠস্বর ও বিদ্রোহের মশাল নিয়ে। কিন্তু এই যে মহাবিদ্রোহী, যিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন এবং বাংলা কাব্য ও সংগীতের প্রচলিত ধারাকে সম্পূর্ণ নতুন খাতে প্রবাহিত করেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিজীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল অসীম বেদনা, দারিদ্র্য ও ট্র্যাজেডি। রাঢ় অঞ্চলের রুক্ষ মাটিতে জন্ম নেওয়া যে শিশুটির নাম রাখা হয়েছিল 'দুঃখু মিয়া', তিনি যেন আজীবন সেই নামের সার্থকতা বহন করে গেছেন। ১৯৯০-এর দশক এবং ২০০৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকাশিত বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থ, সমসাময়িক স্মৃতিকথা ও গবেষণালব্ধ তথ্যের আলোকে এই নিবন্ধে সেই 'দুঃখু মিয়া' থেকে 'বিদ্রোহী কবি' এবং পরিশেষে এক নির্বাক মহামানবে রূপান্তরিত হওয়ার করুণ ও সংগ্রামী জীবন আলেখ্য তুলে ধরা হলো।
জন্ম ও শৈশবের রুক্ষ বাস্তবতা: ‘দুঃখু মিয়া’ নামের নেপথ্যে
১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম হয়। চুরুলিয়া ছিল প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ এক জনপদ, কিন্তু নজরুলের জন্মের সময় তা ছিল দারিদ্র্যপীড়িত এক গ্রাম। তাঁর পিতা কাজী ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাজারের খাদেম। মাতা জাহেদা খাতুন ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ গৃহিণী। ফকির আহমদ ও জাহেদা খাতুন দম্পতির প্রথম চার সন্তানের অকালমৃত্যুর পর নজরুলের জন্ম হয়। পরপর সন্তান হারানোর শোক এবং এই নবজাতক যেন বেঁচে থাকে—সেই সংস্কার ও কাতর প্রার্থনা থেকেই পরিবারের মানুষ তাঁর ডাকনাম রাখেন ‘দুঃখু মিয়া’।
শৈশবেই এই নামের যথার্থতা তাঁর জীবনে নির্মমভাবে প্রতিফলিত হতে শুরু করে। কাজী পরিবারের একসময়ের সচ্ছলতা তখন বিলীন হয়ে গেছে। মাত্র নয় বছর বয়সে, ১৯০৮ সালে পিতা কাজী ফকির আহমদের আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারের ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। পিতৃহীন বালক দুঃখু মিয়ার কাঁধে এসে পড়ে মা, ভাই ও বোনদের ভরণপোষণের অকাল দায়িত্ব। যে বয়সে একটি শিশুর দুরন্তপনায় মেতে থাকার কথা, সেই বয়সে দুঃখু মিয়াকে নামতে হয় জীবিকার কঠোর সংগ্রামে।
গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক (তৎকালীন প্রাচীন পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষা) পাস করার পর অর্থাভাবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ছেদ পড়ে। জীবিকার তাগিদে তিনি সেই মক্তবেই মাত্র দুই টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ এবং মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এই অল্প বয়সেই ইসলাম ধর্মের মৌলিক শিক্ষা, পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ফারসি সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠ তাঁর আয়ত্তে আসে, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক ও ছন্দোময় প্রয়োগে গভীর ভূমিকা রেখেছিল।
লেটো গানের দল ও লোকজ সংস্কৃতির পাঠশালা
মক্তবের শিক্ষকতা ও মসজিদের ইমামতি বালক দুঃখু মিয়ার চঞ্চল ও সৃষ্টিশীল মনকে দীর্ঘদিন বেঁধে রাখতে পারেনি। রাঢ় অঞ্চলের লোকজ সংস্কৃতি, বিশেষ করে ‘লেটো’ গানের দল তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। চাচা কাজী বজলে করিম ছিলেন আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় পণ্ডিত এবং লেটো দলের একজন বিশিষ্ট ওস্তাদ। তাঁরই অনুপ্রেরণায় নজরুল লেটো গানের দলে যোগ দেন।
লেটো দল ছিল মূলত গ্রামীণ পালাগান ও তাৎক্ষণিক কবিয়াল লড়াইয়ের এক মাধ্যম। এখানে যোগ দিয়েই দুঃখু মিয়ার সুপ্ত প্রতিভার প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দলের প্রধান কবিয়াল বা ‘গদ্দার’ হয়ে ওঠেন। এই সময়েই তিনি ‘চাষার সং’, ‘শকুনিবধ’, ‘রাজা যুধিষ্ঠিরের সং’, ‘দাতা কর্ণ’, ‘আকবর বাদশাহ’, ‘কবি কালিদাস’ ও ‘বিদ্যাভূতুম’-এর মতো অসংখ্য পালাগান ও হাস্যরসাত্মক নাটিকা রচনা করেন। লেটো দলের প্রয়োজনে তাঁকে হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ও লোককাহিনি গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হয়। ফলে শৈশবেই ইসলামী ঐতিহ্যের পাশাপাশি ভারতীয় পুরাণের এক অপূর্ব সমন্বয় তাঁর চেতনায় প্রোথিত হয়। তৎকালীন গবেষক মুজফ্ফর আহমদ ও আবদুল কাদিরের বিভিন্ন রচনায় নজরুলের এই লেটো জীবনের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও লোকায়ত জীবনের পাঠশালা থেকেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসামান্য শব্দশিল্পী।
ভবঘুরে জীবন ও রুটির দোকানের শ্রম
লেটো দলের মৌসুমি আয়ে সংসার চলত না। তাই ১৯১০ সালের দিকে নজরুল পুনরায় পড়াশোনা করার উদ্দেশ্যে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে (নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন) ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তৎকালীন বিশিষ্ট কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। কুমুদরঞ্জন মল্লিক বালক নজরুলের মেধা ও চঞ্চলতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কশাঘাতে মাত্র এক বছর পরই তাঁকে আবার স্কুল ছাড়তে হয়।
এরপর শুরু হয় দুঃখু মিয়ার অনিশ্চিত ভবঘুরে জীবন। কখনো বাসুদেবপুরের কবিগানের দলে, কখনো বা রেলওয়ে গার্ডের বাড়িতে বাবুর্চির সহকারীর কাজ নেন তিনি। সেখান থেকে পালিয়ে চলে যান আসানসোলে। সেখানে পেটের দায়ে এম. বখশ নামের এক ব্যক্তির চায়ের ও রুটির দোকানে মাসিক মাত্র এক টাকা বেতনে কাজ নেন। সারাদিন কয়লার আগুনের তাপে ময়দা মাখা ও রুটি বেলার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাতে দোকানের নিচে সিঁড়ির কোণে ঘুমাতেন তিনি। কিন্তু এই চরম দুর্দশার মাঝেও তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণা ও কাব্যচর্চা থেমে থাকেনি। দোকানের অবসরে তিনি পুঁথি পড়তেন, গান বাঁধতেন।
আসানসোলের এই রুটির দোকানেই ঘটে তাঁর জীবনের এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা। আসানসোলের তৎকালীন দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ কিশোর নজরুলের মেধা, সৌন্দর্য ও কাব্যপ্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। ১৯১৪ সালে রফিজউল্লাহ নজরুলকে নিজের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার কাজির শিমলা গ্রামে নিয়ে আসেন এবং দরিরামপুর হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করে দেন। ত্রিশালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সুতিয়া নদীর তীর এবং বটতলায় বসে বাঁশি বাজানোর স্মৃতি নজরুলের কিশোর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। কিন্তু বাঁধনহারা দুঃখু মিয়া সেখানেও এক বছরের বেশি টেকেননি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ না করেই তিনি ১৯১৫ সালে আবার চুরুলিয়ায় ফিরে যান এবং রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন।
সিয়ারসোল রাজ স্কুলে পড়াকালীন তিনি বিনা বেতনে অধ্যয়ন ও বোর্ডিংয়ে থাকার সুযোগ পান। এখানেই তাঁর সাথে পরিচয় হয় আজীবনের বন্ধু ও সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সাথে। এই স্কুলে তখন বিপ্লবী যুগান্তর দলের গোপন তৎপরতা ছিল। স্কুলের শিক্ষক নিবারণচন্দ্র ঘটকের সংস্পর্শে এসে কিশোর নজরুলের মনে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী চেতনার বীজ রোপিত হয়।
সৈনিক জীবন ও বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে প্রবেশ
১৯১৭ সালের শেষভাগে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নজরুল যখন দশম শ্রেণির প্রি-টেস্ট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই তিনি পড়াশোনা ছেড়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে করাচির সেনানিবাসে তাঁর নতুন জীবন শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, ব্রিটিশবিরোধী চেতনা থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন? সমসাময়িক গবেষকদের মতে, এর পেছনে দুটি কারণ ছিল: প্রথমত, তীব্র অর্থকষ্ট ও রোমাঞ্চের নেশা; দ্বিতীয়ত, অস্ত্র চালনা ও সামরিক কৌশল শিখে তা ভবিষ্যতে মাতৃভূমির স্বাধীনতার কাজে লাগানোর গোপন আকাঙ্ক্ষা।
১৯১৭ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছরের সৈনিক জীবন ছিল নজরুলের সাহিত্যিক প্রস্তুতির স্বর্ণযুগ। কঠোর সামরিক শৃঙ্খলার মাঝেও তিনি অবসর সময়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন। রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলভির কাছে তিনি ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের গভীর পাঠ নেন এবং মহাকবি হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের কাব্য আত্মস্থ করেন। করাচি সেনানিবাসে বসেই তিনি রচনা করেন তাঁর প্রথম গদ্য রচনা ‘বাউণ্ডেলের আত্মকাহিনী’ (প্রকাশকাল: মে ১৯১৯, সওগাত পত্রিকা), প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা) এবং ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’-এর মতো রোমান্টিক ও যুদ্ধের পটভূমির গল্প। সেনানিবাসে থাকাকালীনই তিনি কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। এই সময়ে তিনি রুশ বিপ্লবের (১৯১৭) সংবাদ পান এবং লাল ফৌজের বিজয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে ওঠেন।
কলকাতা পর্ব, সাহিত্যিক উত্থান ও ‘বিদ্রোহী’র জন্ম
১৯২০ সালের মার্চ মাসে বেঙ্গলি রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে নজরুল কলকাতায় চলে আসেন। ওঠেন ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র অফিসে, যেখানে তাঁর রুমমেট ও আজীবন সুহৃদ হন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্ফর আহমদ। মুজফ্ফর আহমদের সাহচর্যে নজরুল সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসেন।
১৯২০ সালের জুলাই মাসে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের অর্থানুকূল্যে কাজী নজরুল ইসলাম ও মুজফ্ফর আহমদের যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’। নবযুগের পাতায় নজরুলের অগ্নিঝরা সম্পাদকীয় প্রবন্ধগুলো (যেমন—‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?’, ‘ডায়ারের স্মৃতিস্তম্ভ’) ব্রিটিশ শাসকদের টনক নড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি ‘মোসলেম ভারত’, ‘প্রবাসী’ ও ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর কবিতা ও গান প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর ‘শাতিল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’ ও ‘মোহররম’ কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যে এক সম্পূর্ণ নতুন ও বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের আগমনী ঘোষণা করে।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের রাতে ৩/৪ সি, তালতলা লেনের বাড়িতে বসে পেন্সিল দিয়ে নজরুল রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী কবিতা—‘বিদ্রোহী’। পরদিন সকালে কবিতাটি তিনি প্রথম শোনান বন্ধু মুজফ্ফর আহমদকে। ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হলে সারা বাংলায় অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
গবেষকদের মতে, পরাধীন ভারতের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে এক তরুণ কবির কণ্ঠে ব্যক্তিসত্তার এমন সীমাহীন আত্মপ্রত্যয়, সব অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে এমন বজ্রনির্ঘোষ উচ্চারণ এর আগে কেউ শোনেনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নিগ্ধ ও প্রশান্ত কাব্যবলয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে নজরুল সম্পূর্ণ নিজস্ব এক ওজস্বী কাব্যভাষা নির্মাণ করলেন। রাতারাতি চুরুলিয়ার সেই ‘দুঃখু মিয়া’ পরিণত হলেন বাংলার ‘বিদ্রোহী কবি’তে।
প্রেম, বিবাহ ও পারিবারিক জীবনের টানাপোড়েন
নজরুলের ব্যক্তিজীবন ছিল যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি বেদনাঘন। ১৯২১ সালে প্রকাশক আলী আকবর খানের সাথে তিনি কুমিল্লায় যান। সেখানে দৌলতপুর গ্রামে আকবর খানের ভাগ্নি সৈয়দা খাতুনের সাথে তাঁর প্রণয় হয়। নজরুল ভালোবেসে তাঁর নাম দেন ‘নার্গিস আসার খানম’। ১৯২১ সালের জুন মাসে তাঁদের বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেও কাবিননামায় ‘ঘরজামাই’ থাকার একটি অপমানজনক শর্তকে কেন্দ্র করে জটিলতার সৃষ্টি হয়। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কবি বিয়ের রাতেই দৌলতপুর ত্যাগ করে কর্দমাক্ত পথে হেঁটে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে আসেন। নার্গিসের সাথে তাঁর আর কখনোই মিলন হয়নি, যদিও দীর্ঘ ষোলো বছর পর নার্গিসের এক চিঠির জবাবে তিনি লিখেছিলেন তাঁর সেই অমর গান ও চিঠি।
কুমিল্লায় বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে অবস্থানকালেই তাঁর পরিচয় হয় প্রমীলা সেনগুপ্তার (দোলন) সাথে। প্রমীলার মা গিরিবালা দেবী ছিলেন অত্যন্ত উদারমনা নারী। সকল সামাজিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে উপেক্ষা করে ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতার ৬ নম্বর হাজী লেনে নজরুল ও প্রমীলা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। নজরুল প্রমীলার নাম দেন ‘আশালতা’। এই বিবাহকে কেন্দ্র করে তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজই প্রবল সমালোচনা করে, কিন্তু কবি তাঁর মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক আদর্শে অটল থাকেন। গিরিবালা দেবী আজীবন নজরুলের ছায়াসঙ্গী হয়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন।
সাংবাদিকতা, কারাবরণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুলের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার জন্য আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন। ‘ধূমকেতু’তে নজরুল ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেন, যা তৎকালীন জাতীয় কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের কোনো নেতাও তখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে দাবি করেননি।
১৯২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’র পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় নজরুলের প্রতীকী কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। এই কবিতার জন্য ব্রিটিশ সরকার পত্রিকাটির ওই সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে এবং কুমিল্লা থেকে কবিকে গ্রেপ্তার করে। রাজদ্রোহের মামলায় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে নজরুল যে জবানবন্দি প্রদান করেন, তা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ—‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে যা পরিচিত। বিচারে তাঁর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।
আলিপুর ও হুগলি জেলে থাকাকালীন জেল সুপারের দুর্ব্যবহার ও কয়েদিদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে নজরুল টানা ৩৯ দিন আমরণ অনশন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে তাঁকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান (যদিও জেল কর্তৃপক্ষ তা গোপন করে)। অবশেষে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং কুমিল্লা থেকে ছুটে আসা মাতৃসম বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। কারাগার থেকেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করেন।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে নজরুল পুনরায় সাহিত্য ও রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯২৫ সালে হেমন্তকুমার সরকার, কুতুবউদ্দিন আহমদ ও শামসুদ্দীন হোসেনকে সাথে নিয়ে গঠন করেন ‘লেবার স্বরাজ পার্টি’ এবং প্রকাশ করেন সাম্যবাদী সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘লাঙ্গল’। এই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত ‘সাম্যবাদী’ গুচ্ছের কবিতাগুলো, যেখানে তিনি নারী-পুরুষের সমতা, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার এবং ধর্মীয় ভণ্ডামির বিরুদ্ধে ক্ষুরধার লেখনী চালনা করেন। হুগলি, কৃষ্ণনগর ও কলকাতার বস্তির মতো দারিদ্র্যপীড়িত পরিবেশে বসবাস করে তিনি রচনা করেন ‘দারিদ্র্য’-এর মতো কালজয়ী কবিতা, যেখানে নিজের জীবনের বঞ্চনাকে তিনি বিশ্বমানবের কণ্ঠে রূপ দিয়েছেন।
পুত্রশোক ও আধ্যাত্মিক রূপান্তর
নজরুলের জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে আসে তাঁর সন্তানদের অকালমৃত্যু। প্রথম পুত্র কৃষ্ণ মুহম্মদ (আজাদ কামাল) জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরই মারা যায়। দ্বিতীয় পুত্র অরিন্দম খালেদ ওরফে ‘বুলবুল’ ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও সংগীতপ্রিয়। মাত্র চার বছর বয়সেই বুলবুল রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতে পারত এবং পিতার সুরের সাথে তাল মেলাত। কিন্তু ১৯৩০ সালের মে মাসে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে বুলবুলের মৃত্যু হয়।
বুলবুলের মৃত্যুতে কবি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। শোকাতুর কবি শিয়রে বসে ফরিদউদ্দিন আত্তারের ফারসি কাব্য ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ অনুবাদ করেন। পুত্রশোকের এই তীব্র দহন থেকেই নজরুল ক্রমশ আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এ সময় তিনি প্রখ্যাত যোগী বরদাচরণ মজুমদারের সংস্পর্শে আসেন এবং তন্ত্র ও যোগসাধনায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে তাঁর আরও দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধের জন্ম হয়, কিন্তু বুলবুলের শূন্যতা কবির হৃদয় থেকে কখনোই মুছে যায়নি।
সংগীতের জাদুকর ও চলচ্চিত্রের ভুবন
১৯৩০-এর দশকে নজরুল রাজনৈতিক উন্মাদনা থেকে কিছুটা সরে এসে সংগীতের ভুবনে পুরোপুরি ডুব দেন। গ্রামোফোন কোম্পানি (এইচএমভি ও মেগাফোন) এবং নবপ্রতিষ্ঠিত কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি সংগীত রচনা ও সুরারোপে এক নতুন বিপ্লব ঘটান।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী (২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে), নজরুল প্রায় চার হাজারের মতো গান রচনা করেছেন, যা ‘নজরুলগীতি’ বা ‘নজরুল সংগীত’ নামে পরিচিত। বাংলা গানে তিনিই প্রথম সার্থকভাবে গজল প্রবর্তন করেন। ওস্তাদ জমিরউদ্দিন খাঁর সাহচর্যে এসে তিনি উত্তর ভারতীয় মার্গসংগীত বা রাগপ্রধান গানের সাথে বাংলা কাব্যের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটান। শুধু তাই নয়, লুপ্তপ্রায় অনেক রাগের পুনরুদ্ধার ছাড়াও তিনি নিজে ‘বেনুবীণা’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘নির্ঝরিণী’, ‘মিনাক্ষী’, ‘সন্ধ্যামালতী’ ও ‘বনকুন্তলা’র মতো বেশ কিছু নতুন রাগ সৃষ্টি করেন।
তাঁর সংগীতের অন্যতম বিস্ময়কর দিক হলো একই সাথে ইসলামী গান (হামদ, নাত, মর্সিয়া) এবং হিন্দু ভক্তিমূলক গান (শ্যামাসংগীত, কীর্তন, ভজন) রচনায় সমান দক্ষতা। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’ বা ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, অন্যদিকে তেমনি রচনা করেছেন কালজয়ী শ্যামাসংগীত ও কীর্তন। আব্বাসউদ্দীন আহমদের অনুরোধে তিনি যে ইসলামী গানগুলো রচনা করেছিলেন, তা বাঙালি মুসলমান সমাজে সংগীতচর্চার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জড়তা ভেঙে দেয়।
সংগীতের পাশাপাশি তিনি মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্রের সাথেও নিবিড়ভাবে যুক্ত হন। ‘আলেয়া’, ‘ঝিলিমিলি’, ‘মধুমালা’ নাটক রচনার পাশাপাশি তিনি ম্যাডান থিয়েটার ও পাইওনিয়ার ফিল্মসের সাথে কাজ করেন। ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে তিনি নারদের ভূমিকায় অভিনয় করেন এবং সংগীত পরিচালনা করেন। এছাড়া ‘পাতালপুরী’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘গোরা’ ও ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের সংগীত ও কাহিনি নির্মাণে তাঁর অসামান্য অবদান ছিল।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়, প্রমীলার পক্ষাঘাত ও কবির নির্বাক হয়ে যাওয়া
গ্রামোফোন কোম্পানি ও চলচ্চিত্র থেকে একসময় প্রচুর অর্থ উপার্জন করলেও নজরুলের বেহিসেবি ও দানশীল স্বভাবের কারণে তিনি কখনোই অর্থ সঞ্চয় করতে পারেননি। যেকোনো বিপদগ্রস্ত মানুষ বা বিপ্লবীর প্রয়োজনে তিনি অকাতরে অর্থ বিলিয়ে দিতেন। ১৯৩৯ সালে তাঁর জীবনে নেমে আসে আরেক চরম বিপর্যয়। প্রিয়তমা স্ত্রী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইসিস) হয়ে কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ হয়ে যান।
স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে কবি চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। নিজের প্রিয় মোটরগাড়ি বিক্রি করে দেন, এমনকি মাত্র চার হাজার টাকায় গ্রামোফোন কোম্পানির কাছে নিজের গানের রয়্যালটি এবং বইয়ের স্বত্ব বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। দেনার দায়ে জর্জরিত কবি একদিকে অসুস্থ স্ত্রীর সেবা, অন্যদিকে অর্থসংগ্রহের জন্য দিনরাত অমানুষিক পরিশ্রম করতে থাকেন। ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক পুনরায় ‘নবযুগ’ পত্রিকা বের করলে নজরুল তার প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন, কিন্তু ততদিনে তাঁর শরীর ও স্নায়ু ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
১৯৪১ সালের ৬ এপ্রিল মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির রজতজয়ন্তী উৎসবে নজরুল তাঁর জীবনের শেষ অভিভাষণ পাঠ করেন—‘যদি আর বাঁশী না বাজে’। এই ভাষণে তিনি যেন নিজের আসন্ন ট্র্যাজেডিরই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে তিনি যে সুন্দরের আরাধনা করেছেন, তা যেন মানুষ ভুলে না যায় এবং তাঁর অসমাপ্ত কাজ যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এগিয়ে নিয়ে যায়। একই বছর আগস্ট মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়াণে শোকাহত নজরুল রচনা করেন ‘রবিহারা’ ও ‘সালাম অস্তরবি’ কবিতা এবং বেতারে তা আবৃত্তি করেন।
১৯৪২ সালের জুলাই মাসে ঘটল সেই হৃদয়বিদারক ঘটনা। কলকাতা বেতার কেন্দ্রে একটি অনুষ্ঠানে কথিকা পাঠ করার সময় হঠাৎ করেই কবির জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে যায়। ক্রমে তিনি বাকশক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকেন। প্রথমে হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা এবং পরে রাঁচির মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করানো হয়, কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। চিরদিনের মতো থেমে যায় সেই বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠ একসময় বজ্রনিনাদে প্রকম্পিত করেছিল সমগ্র উপমহাদেশ।
সুদীর্ঘ অসুস্থতা, চিকিৎসা ও শেষের বছরগুলো
১৯৪২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল—দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর কাজী নজরুল ইসলাম জীবন্মৃত ও নির্বাক অবস্থায় অতিবাহিত করেন। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন দীর্ঘস্থায়ী ট্র্যাজেডির নজির বিরল। দেশভাগের পর চরম দারিদ্র্য ও অবহেলার মধ্যে কলকাতার ছোট ছোট ভাড়াবাড়িতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রমীলা দেবী এবং নির্বাক কবির দিন কাটতে থাকে।
১৯৫২ সালে ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’ গঠিত হয়। ১৯৫৩ সালে কবি ও প্রমীলা দেবীকে চিকিৎসার জন্য লন্ডন এবং পরে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় পাঠানো হয়। ভিয়েনার বিশ্বখ্যাত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. হ্যানস হফ কবির মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে জানান যে, কবি ‘পিকস ডিজিজ’ (Pick's Disease) নামক এক দুরারোগ্য মস্তিষ্ক-ক্ষয় রোগে ভুগছেন, যার ফলে মস্তিষ্কের সামনের ও পাশের অংশ সংকুচিত হয়ে গেছে এবং তাঁর আর কখনোই সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
১৯৬২ সালের ৩০ জুন কবির দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গী প্রমীলা দেবী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে চুরুলিয়ায় সমাহিত করা হয়। এরপর কবি আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে নজরুলের গান ও কবিতা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান প্রেরণা। তাঁর ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি স্বাধীন বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ২৪ মে স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে এবং ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে কবিকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ‘কবিভবন’-এ রাখা হয়।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কবিকে সম্মানসূচক ‘ডি.লিট’ ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং ফেব্রুয়ারিতে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদা প্রদান করে।
জীবনের শেষ দিনগুলো কবি কাটিয়েছেন তৎকালীন পিজি হাসপাতালের (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) ১১৭ নম্বর কেবিনে। অবশেষে ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই মহান কবির জীবনাবসান ঘটে। তিনি তাঁর একটি গানে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন যেন তাঁকে মসজিদের পাশে কবর দেওয়া হয়, যাতে তিনি মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পান। কবির সেই অন্তিম ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।
দুঃখু মিয়ার চিরন্তন উত্তরাধিকার
চুরুলিয়ার মাটির ঘর থেকে যে ‘দুঃখু মিয়া’র যাত্রা শুরু হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর জাগতিক জীবনের সমাপ্তি ঘটে। মাত্র তেইশ বছরের সক্রিয় সাহিত্যিক জীবনে (১৯১৯–১৯৪২) তিনি বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়ে গেছেন, তা অতুলনীয়। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাণী, নারীমুক্তির আহ্বান এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা তাঁর মতো এত বলিষ্ঠভাবে আর কেউ উচ্চারণ করেননি।
নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অসীম দারিদ্র্য, পুত্রশোক, সমাজের আঘাত এবং পরিশেষে দীর্ঘ চৌত্রিশ বছরের নির্বাক অন্ধকার—কোনো কিছুই তাঁর সৃষ্টিকে ম্লান করতে পারেনি। বরং ব্যক্তিগত দুঃখকে তিনি রূপান্তরিত করেছিলেন বিশ্বমানবের মুক্তির মন্ত্রে। তাই ‘দুঃখু মিয়া’ আজ কেবল একটি করুণ জীবনগাথার নাম নয়; তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর এক অবিনশ্বর প্রতীক।
তথ্যসূত্র (৩০/১১/২০০৮ ইং পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থাবলি): ১. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, কলকাতা (প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৫)। ২. রফিকুল ইসলাম, নজরুল জীবনী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা (প্রকাশকাল: ১৯৭২)। ৩. আবদুল কাদির (সম্পাদিত), নজরুল রচনাবলী (১ম-৪র্থ খণ্ড), বাংলা একাডেমি, ঢাকা (১৯৯৩ সংস্করণ)। ৪. আজহারউদ্দীন খান, বাংলা সাহিত্যে নজরুল, সুপ্রীম পাবলিশার্স, কলকাতা (প্রথম প্রকাশ: ১৯৫৪)। ৫. প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল, কলকাতা (১৯৫৫)। ৬. সুশীলকুমার গুপ্ত, নজরুল-চরিতমানস, কলকাতা (১৯৬০)। ৭. শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, কেউ ভোলে না কেউ ভোলে, কলকাতা। ৮. আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আমার শিল্পীজীবনের কথা, ঢাকা (১৯৬০)। ৯. করুণাময় গোস্বামী, কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সাহিত্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা (১৯৯০-এর দশক)। ১০. গোলাম মুরশিদ, বিদ্রোহী রণক্লান্ত: নজরুল-জীবনী সংক্রান্ত প্রাক-গবেষণা ও প্রবন্ধসমূহ (২০০৮ পর্যন্ত প্রকাশিত সাময়িকী)।
#mostafez_rahman_
৭২
১০৯ মন্তব্য