Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫৭ অপরাহ্ণ

গল্পে গল্পে ও বাস্তব উপকরণের মাধ্যমে শিক্ষাদানের আধুনিক ও আনন্দময় পদ্ধতি

সকাল ঠিক এগারোটা। নবম শ্রেণীর ক্লাসরুমের বাইরে তখন তুমুল হট্টগোল। কিশোর বয়সের শিক্ষার্থীরা কেউ বেঞ্চ বাজিয়ে গান গাইছে, কেউবা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে। ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন রাবেয়া ম্যাডাম। কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ, হাতে কিছু চার্ট পেপার আর মার্কার পেন-ডাস্টার। তিনি ক্লাসে ঢুকতেই পুরো ঘরটা এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। 


রাবেয়া ম্যাডাম এই স্কুলে নতুন এসেছেন। তিনি ভালো করেই জানেন, নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জোর করে বা ধমক দিয়ে ধরে রাখা যায় না, তাদের মন জয় করতে হয় বন্ধুত্ব দিয়ে। তিনি মুখে একটি মিষ্টি হাসি নিয়ে বললেন, "শুভ সকাল, সবাই কেমন আছো?" 


পুরো ক্লাস একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, "ভালো আছি, ম্যাডাম!" 


রাবেয়া ম্যাডাম বোর্ডে গিয়ে আজকের তারিখ লিখলেন। তারপর বড় বড় অক্ষরে লিখলেন আজকের পড়ার বিষয়—"আমাদের পৃথিবী ও পরিবেশ"। তিনি প্রথাগত নিয়মে বই খুলে গৎবাঁধা রিডিং পড়া শুরু করলেন না। বরং ব্যাগ থেকে একটা পৃথিবীর মানচিত্র বিশিষ্ট ছোট গ্লোব বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বাস্তব উপকরণের মাধ্যমে পড়া শুরু করতেই ক্লাসের সবার চোখ চকচক করে উঠল। 


"বলতো এটা কী?" ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন।

পেছনের বেঞ্চ থেকে চঞ্চল ছেলেটি হাত তুলে বলল, "ম্যাডাম, এটা তো গ্লোব! গোল পৃথিবীর ম্যাপ।" 


"একেবারে ঠিক বলেছ!" রাবেয়া ম্যাডাম তাকে বাহবা দিলেন। ছেলেটির মুখটা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এরপর ম্যাডাম গল্পে গল্পে বোঝাতে লাগলেন কীভাবে আমাদের চারপাশের গাছপালা, নদীনালা আর পশুপাখি নিয়ে এই সুন্দর পৃথিবী গড়ে উঠেছে। 


কিছুক্ষণ পর ম্যাডাম একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, "কিন্তু আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীটা দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে। একে আমরা বলছি পরিবেশ দূষণ। আচ্ছা, তোমরা কি জানো পরিবেশ কেন এবং কীভাবে দূষিত হয়?" 


পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেল। ম্যাডাম তখন চিলড্রেনদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমরা প্রতিদিন চারপাশে যা দেখছো, সেটাই বলো। আচ্ছা, ওই জানালার বাইরে তাকাও। রাস্তায় যে কালো ধোঁয়া দেখছো, ওটা কোথা থেকে আসছে?" 


এবার মাঝের বেঞ্চ থেকে একজন বলল, "ম্যাডাম, গাড়ির ইঞ্চিন আর ইটের ভাটা থেকে!" 


"একদম ঠিক!" ম্যাডাম চকে বোর্ডে লিখতে লাগলেন। "কলকারখানা ও গাড়ির কালো ধোঁয়া বাতাসকে বিষাক্ত করছে। প্লাস্টিক ও পলিথিন মাটিতে মিশে মাটিকে নষ্ট করছে। আর এই সবকিছুর জন্য দায়ী কে জানো? আমরা, অর্থাৎ মানুষ। নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য আমরা নির্বিচারে গাছ কাটছি, নদী-নালা ভরাট করছি আর বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলছি।" 


পড়ানোর মাঝখানেই ক্লাসের সবচেয়ে শান্ত আর লাজুক মেয়েটি আস্তে করে হাত তুলল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, "ম্যাডাম, কলকারখানার ধোঁয়া আর বর্জ্য কি আমাদেরও ক্ষতি করে?"

রাবেয়া ম্যাডাম তার কাছে এগিয়ে গেলেন। পরম স্নেহে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "খুব সুন্দর একটা প্রশ্ন করেছ। হ্যাঁ, একদম তাই। এই দূষিত পরিবেশের কারণে আমাদের ফুসফুসের রোগ, ক্যান্সার এবং নানা রকম চর্মরোগ হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।" 


ম্যাডাম এবার একটু হেঁটে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, "তাহলে এই পরিবেশকে বাঁচানোর উপায় কী? আমরা কীভাবে এটা রোধ করতে পারি? কেউ বলতে পারবে?" 


পেছনের বেঞ্চ থেকে একজন বলল, "বেশি করে গাছ লাগাতে হবে ম্যাডাম!"

আরেকজন বলল, "প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো দরকার।" 


রাবেয়া ম্যাডাম হাততালি দিয়ে বললেন, "চমৎকার! হ্যাঁ, আমাদের বেশি করে গাছ লাগাতে হবে, প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং 'থ্রি-আর' (Reduce, Reuse, Recycle) নীতি মানতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সচেতন হতে হবে।" 


ঘড়ির কাঁটা কখন যে পৌনে বারোটা ছুঁয়ে ফেলল, কেউ টেরই পায়নি। আনন্দময় এই পাঠদানের কারণে ক্লাসের প্রতিটি মুহূর্ত শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। পরের ক্লাসের ঘণ্টা বাজতেই শিক্ষার্থীরা যেন একটু হতাশ হলো। 


রাবেয়া ম্যাডাম যখন ব্যাগ গুছিয়ে ক্লাস থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন পেছনের বেঞ্চের সেই চঞ্চল ছেলেটি দৌড়ে এসে বলল, "ম্যাডাম, আজ থেকে আমি আর যেখানে-সেখানে চকলেটের খোসা ফেলব না। গাছও লাগাবো।" 


রাবেয়া ম্যাডাম মুচকি হাসলেন। একজন শিক্ষকের আসল স্বার্থকতা তো এখানেই—যখন তার পাঠদান শুধু বইয়ের পাতায় আটকে না থেকে শিক্ষার্থীর আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। তিনি এক বুক তৃপ্তি নিয়ে পরের ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেলেন।


গল্পে গল্পে শিক্ষাদানের আধুনিক ও আনন্দময় পদ্ধতির সাথে যদি শিক্ষাদানের বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে তুলনা করি, তাহলে আমরা যে বিষয়গুলো অনুধাবন করি-  


১. শিক্ষাদানে আধুনিক উপকরণের বাস্তব প্রয়োগ: বইয়ের পাতায় মুখস্থ বিদ্যায় সীমাবদ্ধ না থেকে যদি আমরা শ্রেণিকক্ষে বাস্তব উপকরণ (যেমন: গ্লোব) ও গল্পের মাধ্যমে পড়ালে শিক্ষার্থীরা সহজে বিষয়টি বুঝতে পারে।


২. স্নেহ ও সহানুভূতির শক্তি: ধমক বা ভয়ের চেয়ে শিক্ষকের সদয় আচরণ এবং মিষ্টি হাসি শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে বেশি কার্যকর।


৩. ভীতি দূরীকরণ: ভুল উত্তরের জন্য বকা না দিয়ে স্নেহের সাথে বুঝিয়ে বলায় ক্লাসের লাজুক ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরাও প্রশ্ন করার সাহস পায়।


৪. আচরণগত পরিবর্তনই প্রকৃত শিক্ষা: শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটানো—যেমনটা চঞ্চল ছেলেটি চকলেটের খোসা আর যেখানে-সেখানে না ফেলার প্রতিজ্ঞা করার মাধ্যমে দেখিয়েছে।


৫. শিক্ষকের সার্থকতা: একজন শিক্ষকের আসল সার্থকতা তখনই আসে যখন তার শিক্ষা শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও অভ্যাসের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়।

মন্তব্য করুন

ব্লগ