সহকারী শিক্ষক
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৩৮ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মোস্তাফিজুর রহমান কবি, গবেষক ও শিক্ষক
একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ কেবল ভূগর্ভস্থ খনিজ বা ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং সেই দেশের জনমিতিক শক্তি বা মানব সম্পদ (Human Resource)। আর এই মানব সম্পদকে যখন জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতার মাপকাঠিতে উন্নত করা হয়, তখন তা পরিণত হয় 'গুণগত মানব সম্পদে'। একটি জাতির ভবিষ্যৎ ক্যানভাস কেমন হবে, তা বহুলাংশেই নির্ভর করে তার শিশুরা শৈশবে কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে তার ওপর।
প্যারেন্টিং বা শিশু লালন-পালন কেবল জীববিদ্যাগত প্রজনন বা দৈহিক ভরণপোষণ নয়; এটি একটি সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ, প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় সনাতন বা গতানুগতিক প্যারেন্টিংয়ের ধারণা অনেকটাই অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। আধুনিক প্যারেন্টিং তাই কেবল শাসন বা শৃঙ্খলার বেড়াজাল নয়, বরং এটি একটি বৈজ্ঞানিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি—যা শিশুর অন্তর্নিহিত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে ভবিষ্যৎ বিশ্বের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
অর্থনীতিবিদ জেমস হেকম্যানের (James Heckman) নোবেলজয়ী গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মানব পুঁজি উন্নয়নে শৈশবের প্রাথমিক বছরগুলোতে (Early Childhood Development) বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি রিটার্ন বা সুফল দেয়। শিশুর মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ বিকাশ ঘটে তার জীবনের প্রথম পাঁচ বছরে। এই সংবেদনশীল সময়ে শিশুর লালন-পালন কেমন হচ্ছে, তা তার নিউরোলজিক্যাল বা স্নায়বিক গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আধুনিক মনোবিজ্ঞান এবং শিক্ষা দর্শনের আলোকে, শিশু লালন-পালনকে কেবল খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-আশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এটি মূলত শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক (Cognitive), আবেগীয় (Emotional) এবং সামাজিক (Social) বিকাশের একটি সুসংহত রূপরেখা। যখন একজন শিশু শৈশবে নিরাপদ ও উদ্দীপনামূলক পরিবেশ পায়, তখন তার মস্তিষ্কে ইতিবাচক স্নায়বিক সংযোগ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তার সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং শেখার গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ঐতিহ্যবাহী সমাজব্যবস্থায় প্যারেন্টিং মূলত ছিল কর্তৃত্বপরায়ণ (Authoritarian)। যেখানে বাবা-মায়ের নির্দেশই শেষ কথা ছিল এবং শিশুর নিজস্ব মতামত বা আবেগের প্রকাশের সুযোগ ছিল সীমিত। কিন্তু আধুনিক প্যারেন্টিং বিশ্বাস করে গণতান্ত্রিক এবং সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে। এর প্রধান স্তম্ভগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
আধুনিক যুগে কেবল বুদ্ধিমত্তা বা আইকিউ (IQ)-এর চেয়ে ইকিউ অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। শিশু তার নিজের আবেগ বুঝতে পারছে কি না, অন্যের আবেগকে সম্মান করতে শিখছে কি না এবং হতাশা বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না—তা আধুনিক প্যারেন্টিংয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। অভিভাবকরা যখন শিশুর আবেগকে দমন না করে তা বুঝতে সাহায্য করেন, তখন শিশুরা মানসিকভাবে অনেক বেশি দৃঢ় হয়ে ওঠে।
শাস্তি দিয়ে নয়, বরং বোঝাপড়ার মাধ্যমে শিশুকে সঠিক পথ দেখানোই আধুনিক প্যারেন্টিংয়ের মূলমন্ত্র। মারধর বা কড়া ধমক শিশুর আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয় এবং তার মধ্যে ভীতি বা মিথ্যা বলার প্রবণতা তৈরি করে। পক্ষান্তরে, ইতিবাচক শৃঙ্খলায় শিশুকে তার কাজের পরিণতির মুখোমুখি করা হয় এবং সঠিক আচরণের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়।
একটি শিশু তখনই তার সেরাটা দিতে পারে যখন সে জানে যে ভুল করলে তাকে অপমান করা হবে না, বরং ভুল থেকে শেখার সুযোগ দেওয়া হবে। পরিবারে মানসিক নিরাপত্তা না থাকলে শিশুরা অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা (Anxiety) এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে।
একবিংশ শতাব্দীর অভিভাবকত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। স্ক্রিন টাইম, সোশ্যাল মিডিয়ার কুপ্রভাব, সাইবার বুলিং এবং ভার্চুয়াল আসক্তি আজকের শিশুদের মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
স্ক্রিন আসক্তি ও মনোযোগের ঘাটতি: অতিরিক্ত স্মার্টফোন বা ট্যাব ব্যবহারের ফলে শিশুদের মনোযোগের স্থায়িত্ব (Attention Span) কমে যাচ্ছে।
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: ভার্চুয়াল জগতের ভিড়ে শিশুরা বাস্তব জীবনের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, সহমর্মিতা এবং দলগত কাজের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আধুনিক প্যারেন্টিং এখানে সুনির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। শিশুকে প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে মেশার সুযোগ করে দেওয়া, বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং খেলাধুলায় উৎসাহিত করা আজ অত্যন্ত জরুরি।
গুণগত মানব সম্পদ তৈরির পূর্বশর্ত হলো মুখস্থবিদ্যার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তন (Critical Thinking) তৈরি করা।
কৌতূহলকে প্রশ্রয় দেওয়া: শিশুরা জন্মগতভাবেই কৌতূহলী। তারা হাজারো প্রশ্ন করে। গতানুগতিক প্যারেন্টিংয়ে অনেক সময় বিরক্ত হয়ে এই প্রশ্নগুলোকে থামিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আধুনিক প্যারেন্টিং এই কৌতূহলকে লালন করে, যাতে শিশু নিজে থেকে চিন্তা করতে শেখে।
নৈতিক মূল্যবোধ ও সততা: পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ শিশুর চরিত্র গঠনে বেশি প্রভাব রাখে। সততা, পরোপকার, শ্রমের মর্যাদা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ পরিবার থেকেই শিশুর রক্তে মিশে যায়।
জেন্ডার সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি: আধুনিক প্যারেন্টিং ছেলে ও মেয়ের মধ্যে প্রচলিত ভেদরেখা মুছে ফেলতে শেখায়। উভয়কেই সমান সুযোগ, আত্মনির্ভরশীলতা এবং দায়িত্ববোধের পাঠ দেওয়া হয়।
একটি পরিবার একা একটি শিশুর সম্পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন একটি অনুকূল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো।
১. অভিভাবক প্রশিক্ষণ: অনেক সময় সঠিক জ্ঞানের অভাবে অভিভাবকরা ভুল পদ্ধতি বেছে নেন। তাই সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মশালা এবং প্যারেন্টিং গাইডলাইন তৈরি করা প্রয়োজন। ২. কর্মক্ষেত্রে পরিবার-বান্ধব নীতি: কর্মজীবী বাবা-মায়েরা যাতে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন, সে জন্য ফ্লেক্সিবল ওয়ার্ক আওয়ার বা প্যারেন্টাল লিভ-এর মতো নীতি বাস্তবায়ন করা দরকার। ৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: স্কুল কেবল পাঠদান করবে না, বরং শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেবে।
কবি জন মিল্টন বলেছিলেন, "The child shows the man, as morning shows the day." আজকের শিশু আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, উদ্যোক্তা কিংবা দক্ষ কর্মী। একটি জাতিকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করার আগে মানসিকভাবে সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। আর সেই সমৃদ্ধির প্রথম পাঠশালা হলো ঘর, এবং প্রথম শিক্ষক হলেন বাবা-মা।
আধুনিক প্যারেন্টিং এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরিপক্ব শিশু লালন-পালন কেবল ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় বিনিয়োগ। আমরা যদি আমাদের আগামী প্রজন্মকে ভয়মুক্ত, সৃজনশীল, আবেগীয়ভাবে শক্তিশালী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তবেই গুণগত মানব সম্পদ উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে। একটি সুন্দর শৈশব মানেই একটি নিশ্চিত এবং উন্নত ভবিষ্যৎ।
১৮
২৯ মন্তব্য