Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:১১ পূর্বাহ্ণ

জালিম ও মজলুম: জুলুমের অন্ধকার, ন্যায়বিচারের আলো এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহি -মোঃ মুজিবুর রহমান

জালিম ও মজলুম: জুলুমের অন্ধকার, ন্যায়বিচারের আলো এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহি

মোঃ মুজিবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক

 মোজাদ্দেদীয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা, কালিয়াকৈর, গাজীপুর।

মানবজীবনের অন্যতম প্রধান আদর্শ হলো ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সততা ও পারস্পরিক অধিকার সংরক্ষণ। একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে মানুষের প্রতি মানুষের সম্মান, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়সংগত আচরণের ভিত্তিতে। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা, অর্থসম্পদ, প্রভাব, পদমর্যাদা কিংবা সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে অন্যের অধিকার হরণ করেন, সত্যকে অস্বীকার করেন অথবা দুর্বল মানুষের ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেন, তখন সমাজে জুলুমের বিস্তার ঘটে। এর বিপরীতে, যিনি অন্যায়-অবিচারের শিকার হন, তাঁর পরিচয় হলো মজলুম।

জালিম ও মজলুম—শব্দ দুটি কেবল দুটি বিপরীত অবস্থার পরিচয় নয়; বরং এগুলো মানুষের নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, বিবেক এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ইসলামের শিক্ষা হলো, কারও প্রতি অন্যায় করা যাবে না, অন্যায়ের সহযোগী হওয়া যাবে না এবং কোনো নিরপরাধ মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করা ন্যায়নিষ্ঠ জীবন গঠনের অপরিহার্য শর্ত।

জালিম কাকে বলে?

‘জালিম’ আরবি ‘ظالم’ শব্দের বাংলা রূপ। এর অর্থ অত্যাচারী, অন্যায়কারী বা অধিকার হরণকারী। যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি অন্যায় করেন, ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন, মিথ্যা অভিযোগে অপদস্থ করেন, প্রতারণার মাধ্যমে সম্পদ আত্মসাৎ করেন কিংবা নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেন, তিনি জুলুমের সঙ্গে জড়িত।

জুলুম কেবল শারীরিক নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারও অর্থ আত্মসাৎ করা, প্রাপ্য পাওনা আটকে রাখা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, নিরপরাধ ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করা, দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে অন্যের ক্ষতি করা কিংবা অন্যায়ভাবে কাউকে বঞ্চিত করাও জুলুমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

কখনো জুলুম প্রকাশ্যে ঘটে, আবার কখনো তা হাসিমুখের আড়ালে, মিষ্টি কথার অন্তরালে কিংবা বিশ্বস্ততার মুখোশ পরে সংঘটিত হয়। কেউ ক্ষমতার জোরে অন্যায় করেন, কেউ অর্থের প্রভাবে, কেউ সম্পর্কের সুযোগে, আবার কেউ মিথ্যা প্রচারণা ও কৌশলের মাধ্যমে অন্যের অধিকার নষ্ট করেন। বাহ্যিক আচরণ ভিন্ন হলেও অন্যায়ভাবে মানুষের অধিকার হরণ করার নৈতিক দায় থেকে কেউ মুক্ত নন।

তবে কোনো বিরোধে কে জালিম আর কে মজলুম, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আবেগ, একতরফা বক্তব্য কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, ন্যায়সংগত বিচার ও সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের বক্তব্য বিবেচনা করা জরুরি। কারণ ন্যায়বিচারের নামে কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

মজলুম কাকে বলে?

‘মজলুম’ আরবি ‘مظلوم’ শব্দের বাংলা রূপ। এর অর্থ অত্যাচারিত, নিপীড়িত বা অন্যায়ের শিকার ব্যক্তি। যিনি অন্যের অন্যায় আচরণ, প্রতারণা, অধিকার হরণ, অপবাদ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তিনি মজলুম।

মজলুম হওয়া মানে দুর্বল চরিত্রের মানুষ হওয়া নয়। একজন সৎ, সরল, পরিশ্রমী ও বিশ্বস্ত মানুষও অন্যের প্রতারণার শিকার হতে পারেন। কেউ নিজের কথা ও কাজে বিশ্বস্ত থেকেও বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হন; কেউ ন্যায্য পাওনা দাবি করেও অপমানিত হন; কেউ সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগের মুখোমুখি হন। এসব পরিস্থিতিতে তাঁর কষ্ট শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; মানসিক শান্তি, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক সম্মান এবং মানুষের প্রতি বিশ্বাসও আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।

বিশেষ করে যখন কোনো ব্যক্তি নিজের বিশ্বস্ত মানুষ, ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আত্মীয় কিংবা দীর্ঘদিনের পরিচিত কারও কাছ থেকে অন্যায়ের শিকার হন, তখন তাঁর বেদনা আরও গভীর হয়। কারণ সেখানে শুধু অধিকার হারানোর কষ্ট থাকে না; থাকে বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণাও।

তবে মজলুমের মর্যাদা রক্ষার অর্থ এই নয় যে তাঁর প্রতিটি বক্তব্য যাচাই ছাড়াই সত্য বলে ধরে নিতে হবে। ইসলামের ন্যায়বিচার উভয় পক্ষের অধিকার রক্ষা করে। যে সত্যিকার অর্থে অন্যায়ের শিকার, তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে; আর বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে সত্য, প্রমাণ ও ন্যায়ের ভিত্তিতে।

পবিত্র কুরআনে জুলুমের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ঘোষণা

ইসলামে জুলুমের কোনো বৈধতা নেই। আল্লাহ তাআলা মানুষকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)

এই আয়াত মানবজীবনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নৈতিক নির্দেশনা তুলে ধরে। ন্যায়বিচার শুধু আদালতের দায়িত্ব নয়; এটি ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থারও অপরিহার্য ভিত্তি।

আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন—

“নিশ্চয়ই আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৪০-এর অংশবিশেষ)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর বিচার সম্পূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক। মানুষের চোখে কোনো অন্যায় আড়াল হয়ে যেতে পারে, কোনো অপরাধী সাময়িকভাবে পার পেয়ে যেতে পারে, আবার কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি মানুষের কাছে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতেও ব্যর্থ হতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান ও বিচার থেকে কোনো কিছুই গোপন নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

“তোমরা ন্যায়বিচারে অবিচল থাকবে; আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৩৫-এর ভাবার্থ)

এই নির্দেশ আমাদের শেখায়, ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, শত্রুতা কিংবা সামাজিক প্রভাবকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। সত্য যার পক্ষেই থাকুক, তা স্বীকার করার নৈতিক সাহস থাকতে হবে।

জুলুম ইসলামে গুরুতর অপরাধ

ইসলামে জুলুমকে অত্যন্ত গুরুতর অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর বাণী বর্ণনা করেছেন—

“হে আমার বান্দারা! আমি জুলুমকে আমার নিজের ওপর হারাম করেছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও তা হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা পরস্পর জুলুম করো না।”

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৭।

এই হাদিসে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কেউ অন্যের ওপর জুলুম করতে পারেন না—তিনি ধনী হোন বা দরিদ্র, ক্ষমতাবান হোন বা দুর্বল, শিক্ষিত হোন বা অশিক্ষিত। মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় ন্যায়বিচার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

অনেক সময় মানুষ মনে করেন, সামান্য পাওনা আটকে রাখা, ছোটখাটো প্রতারণা, মিথ্যা কথা কিংবা কারও সম্মানহানি তেমন গুরুতর বিষয় নয়। কিন্তু অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে বিষয়টি আর নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার থাকে না। বিশেষত কেউ জেনেশুনে অন্যের সম্পদ, সম্মান কিংবা ন্যায্য অধিকার নষ্ট করলে তাকে নিজের কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

মজলুমের দোয়া ও আল্লাহর সাহায্য

মজলুমের প্রতি ইসলামের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ হজরত মু‘আয ইবন জাবাল (রা.)-কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন—

“মজলুমের দোয়া থেকে সাবধান থাকবে; কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই।”

—সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪৮।

এই হাদিস অন্যায়কারীর জন্য কঠোর সতর্কবার্তা। কোনো মানুষকে অসহায় মনে করে তার অধিকার হরণ করা, তার কান্নাকে তুচ্ছ করা কিংবা তার ন্যায়সংগত দাবি উপেক্ষা করা কখনোই নিরাপদ নয়। মানুষের সামনে কোনো মজলুমের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া গেলেও আল্লাহর কাছে তার ফরিয়াদ অজানা থাকে না।

তবে মজলুমের দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি এমন নয় যে, তিনি যা চাইবেন, তা অবশ্যই ঠিক সেইভাবে ও সঙ্গে সঙ্গে ঘটবে। দোয়া কবুলের ধরন ও সময় আল্লাহর হিকমতের অধীন। তাই মজলুমের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, ন্যায়সংগত উপায়ে নিজের অধিকার আদায়ের চেষ্টা করা এবং অন্যায়ের প্রতিকারে ধৈর্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া।

মজলুমের জন্য ধৈর্য মানে অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়। ধৈর্য হলো বিপদের মধ্যেও ন্যায়নীতি বজায় রাখা, হতাশায় ভেঙে না পড়া এবং প্রতিশোধের নেশায় নিজেই অন্যায়কারী হয়ে না যাওয়া।

জালিমের দুনিয়াবি সাফল্য প্রকৃত সাফল্য নয়

কখনো দেখা যায়, একজন অন্যায়কারী অর্থসম্পদ, সামাজিক প্রভাব, বাহ্যিক প্রতিপত্তি কিংবা মানুষের সমর্থন লাভ করছেন। অন্যদিকে, যিনি অন্যায়ের শিকার, তিনি আর্থিক ক্ষতি, অপমান, মানসিক কষ্ট কিংবা সামাজিক অসুবিধার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ দৃশ্য দেখে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—ন্যায়পরায়ণ মানুষের কষ্ট কেন, আর অন্যায়কারীর উন্নতি কেন?

এখানে মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার সাময়িক অবস্থা মানুষের চূড়ান্ত সফলতা কিংবা ব্যর্থতার নির্ভুল মাপকাঠি নয়। সম্পদ থাকা মানেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা নয়; আবার বিপদে পড়া মানেই আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। দুনিয়ার জীবন পরীক্ষা, আর প্রত্যেক মানুষকে তার কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“আর তোমার রব যা করেন, সে সম্পর্কে তিনি উদাসীন নন।” (সূরা হুদ, ১১:১২৩-এর অংশবিশেষের ভাবার্থ)

অতএব, কোনো জালিম দুনিয়ায় সাময়িক সুবিধা পেলেই তার অন্যায় বৈধ হয়ে যায় না। একইভাবে, মজলুম সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেই তাঁর ন্যায়সংগত দাবি মূল্যহীন হয়ে যায় না। আল্লাহর বিচার সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস মানুষকে হতাশা থেকে রক্ষা করে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।

তবে প্রত্যেক বিপদগ্রস্ত মানুষকে মজলুম এবং প্রত্যেক সফল মানুষকে জালিম মনে করাও সঠিক নয়। বাস্তব অবস্থা, প্রমাণ ও কাজের প্রকৃতি বিবেচনা করেই ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।

মানুষের অধিকার নষ্ট করার ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামে আল্লাহর হক ও বান্দার হক—উভয়ের গুরুত্ব রয়েছে। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তওবা করলে আল্লাহ তাঁর গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু মানুষের অধিকার নষ্ট করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং যথাযথভাবে দায়মুক্ত হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তির পরিচয় ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে উপস্থিত হবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভোগ করেছে, কারও রক্তপাত ঘটিয়েছে কিংবা কাউকে প্রহার করেছে। ফলে তার নেকি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করা হবে; নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের পাপ তার ওপর চাপানো হবে।

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮১।

এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা করাও অপরিহার্য। শুধু বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় বা ইবাদতের দাবি দিয়ে অন্যের প্রতি অন্যায়কে আড়াল করা যায় না।

যে ব্যক্তি কারও অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, তাঁর উচিত যথাসম্ভব সেই অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া। কারও সম্মান নষ্ট করে থাকলে অন্যায়ের প্রতিকার করা, অপবাদ প্রত্যাহার করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অধিকার যথাযথভাবে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা প্রয়োজন। আন্তরিক তওবা শুধু মুখে অনুতাপ প্রকাশের নাম নয়; এর সঙ্গে অন্যায় পরিত্যাগ, অনুশোচনা এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও জড়িত।

সরলতা ও বিশ্বস্ততার সুযোগ নিয়ে জুলুম

মানুষের সরলতা, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততা মহৎ গুণ। কিন্তু কখনো কিছু মানুষ এই গুণগুলোকেই দুর্বলতা মনে করে অন্যের সুযোগ নেন। কেউ বন্ধুত্বের আড়ালে প্রতারণা করেন, কেউ আত্মীয়তার সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সম্পদ হাতিয়ে নেন, আবার কেউ বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।

এ ধরনের আচরণ শুধু আর্থিক ক্ষতি করে না; মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসকেও দুর্বল করে দেয়। একজন সৎ মানুষ যখন বারবার প্রতারণার শিকার হন, তখন তাঁর মনে সন্দেহ, হতাশা ও নিরাপত্তাহীনতা জন্ম নিতে পারে। তিনি হয়তো পরবর্তী সময়ে কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পান। এর ফলে একটি অন্যায় ব্যক্তির জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তবে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর সরলতা ও সততা পরিত্যাগ করা সমাধান নয়। বরং নৈতিকতা বজায় রেখে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, গুরুত্বপূর্ণ লেনদেনে লিখিত প্রমাণ রাখা, প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য সংরক্ষণ করা এবং যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

ইসলাম মানুষকে সৎ হতে শেখায়, কিন্তু অসতর্ক হতে বলে না। কাউকে বিশ্বাস করা মহৎ গুণ; আর সেই বিশ্বাসের সঙ্গে বিবেচনা, সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা প্রজ্ঞার পরিচয়।

জুলুমের শিকার হলে করণীয়

কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তাঁর সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিজের অধিকার রক্ষার চেষ্টা করা এবং সেই প্রচেষ্টায় ন্যায়নীতি বজায় রাখা। অন্যায় সহ্য করাই যে সব সময় উত্তম, এমন ধারণা সঠিক নয়। ইসলাম ন্যায়সংগতভাবে অধিকার আদায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং নিপীড়িতকে সাহায্য করার শিক্ষা দেয়।

প্রথমত, আবেগের বশবর্তী হয়ে তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। ঘটনার বিবরণ, লেনদেনের কাগজপত্র, বার্তা, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, সম্ভব হলে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ, বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির মধ্যস্থতা নেওয়া যেতে পারে। তবে মধ্যস্থতার নামে মজলুমকে তাঁর ন্যায্য অধিকার ত্যাগ করতে বাধ্য করা গ্রহণযোগ্য নয়।

তৃতীয়ত, অন্যায় গুরুতর হলে কিংবা আলোচনায় সমাধান না এলে আইনসম্মত কর্তৃপক্ষ বা আদালতের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বৈধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অন্যায় নয়।

চতুর্থত, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজে মিথ্যা বলা, অপবাদ দেওয়া, হুমকি দেওয়া কিংবা নিরপরাধ কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ অন্যায়ের প্রতিকার করতে গিয়ে নতুন অন্যায় সৃষ্টি করলে ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

পঞ্চমত, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং মানসিক শক্তি ধরে রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে পরিবার, বিশ্বস্ত বন্ধু কিংবা উপযুক্ত পরামর্শদাতার সহায়তা নিতে হবে। নিজের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি মানসিক শান্তি, নিরাপত্তা ও সুস্থ জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

জালিমের জন্য তওবা ও সংশোধনের পথ

ইসলাম অন্যায়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে; একই সঙ্গে আন্তরিক তওবা ও সংশোধনের পথও উন্মুক্ত রেখেছে। কোনো ব্যক্তি অতীতে জুলুম করে থাকলে তাঁর উচিত নিজের ভুল স্বীকার করা, অন্যায় বন্ধ করা এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।

তবে মানুষের অধিকার নষ্ট করার পর শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। কারও অর্থ আত্মসাৎ করলে তা ফিরিয়ে দিতে হবে; কারও পাওনা আটকে রাখলে তা পরিশোধ করতে হবে; কারও প্রতি অন্যায় অভিযোগ করলে যথাসাধ্য তা প্রত্যাহার করে ক্ষতি সংশোধন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

কেউ ভুল স্বীকার করলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া মানবিকতার পরিচয়। তবে ক্ষমা করা বা সমঝোতায় আসার জন্য মজলুমকে চাপ দেওয়া যাবে না। ক্ষমা মহৎ গুণ, কিন্তু অন্যায়কারীর দায় অস্বীকার করার উপায় নয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্পই প্রকৃত সংশোধনের ভিত্তি।

মজলুমকে সাহায্য করা সমাজের দায়িত্ব

একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য শুধু জুলুম থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়; জুলুমের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোও প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে জালিম হোক অথবা মজলুম।”

সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, মজলুমকে সাহায্য করা তো বুঝলাম; কিন্তু জালিমকে কীভাবে সাহায্য করব? তিনি বললেন, “তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে।”

—সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৪৪।

এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। জালিমকে সাহায্য করার অর্থ তার অন্যায়কে সমর্থন করা নয়; বরং তাকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনা। আর মজলুমকে সাহায্য করার অর্থ হলো তাঁর অধিকার রক্ষা, ন্যায়সংগত সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা।

সমাজে যখন মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও সাহসী অবস্থান নেয়, তখন জুলুমের বিস্তার কমে আসে। আর যখন মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভয়, পক্ষপাত কিংবা সম্পর্কের কারণে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়, তখন অপরাধী আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠন—সব জায়গায় ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা বা ক্ষমতার কারণে তাঁর অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে, কারও প্রতি ব্যক্তিগত বিরাগের কারণে তাঁর ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করাও অন্যায়।

ক্ষমা, ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের সীমারেখা

জুলুমের শিকার মানুষের মনে কষ্ট, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই কষ্ট যেন তাকে অন্যায়ের পথে পরিচালিত না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

“মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ; তবে যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে।” (সূরা আশ-শূরা, ৪২:৪০-এর ভাবার্থ)

এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, অন্যায়ের ন্যায়সংগত প্রতিকার গ্রহণের সুযোগ রয়েছে; একই সঙ্গে ক্ষমা ও সংশোধনের মর্যাদাও রয়েছে। তবে ক্ষমা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আন্তরিকভাবে এবং স্বেচ্ছায় করা হয়। ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা অসহায়ত্বের কারণে কাউকে ক্ষমা করতে বাধ্য করা ন্যায়সংগত নয়।

প্রতিশোধের নামে সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। কেউ আমার ক্ষতি করেছে বলে আমিও তার ক্ষতি করব, কেউ মিথ্যা বলেছে বলে আমিও মিথ্যা বলব, কেউ অপমান করেছে বলে আমিও অপমান করব—এমন মনোভাব মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

মজলুমের শক্তি কেবল তার প্রতিবাদে নয়; বরং সত্যের ওপর অবিচল থাকা, বৈধ উপায়ে অধিকার আদায় করা এবং অন্যায়ের জবাবে অন্যায় না করার মধ্যেও নিহিত। ক্ষমা মহান গুণ, কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি পরিত্যাগ করা প্রত্যেক পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক নয়।

পরিবার ও সমাজে জুলুম প্রতিরোধ

জুলুম শুধু অপরিচিত মানুষের মধ্যে ঘটে না; কখনো পরিবার, দাম্পত্য সম্পর্ক, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের মধ্যেও তা দেখা যায়। পারিবারিক জীবনে অন্যের কথা না শোনা, অপমান করা, অযৌক্তিক সন্দেহ পোষণ করা, আর্থিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কিংবা দুর্বল সদস্যের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করা সম্পর্কের শান্তি নষ্ট করতে পারে।

একইভাবে, ব্যবসায়িক সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, হিসাব গোপন, পাওনা আটকে রাখা কিংবা অংশীদারের ন্যায্য অধিকার অস্বীকার করা গুরুতর বিরোধের জন্ম দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মান, লিখিত চুক্তি এবং ন্যায়সংগত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সন্তানদেরও ছোটবেলা থেকে শেখাতে হবে—ক্ষমতাবান হওয়া মানে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পাওয়া নয়; বরং ক্ষমতা ও দায়িত্বের সঙ্গে ন্যায়বিচারের দায়ও বৃদ্ধি পায়। সম্পদ, জ্ঞান, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক প্রভাব মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশ পায় সততা, দায়িত্বশীলতা, ন্যায়পরায়ণতা ও উত্তম চরিত্রে।

যে পরিবারে ন্যায়বিচার থাকে, সেখানে বিশ্বাস জন্মায়। যে সমাজে দুর্বল মানুষের অধিকার রক্ষা করা হয়, সেখানে মানবিকতা বিকশিত হয়। আর যে রাষ্ট্রে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

উপসংহার

জালিম ও মজলুমের বিষয়টি আমাদের সামনে এক গভীর নৈতিক সত্য তুলে ধরে—মানুষের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও ন্যায্য অধিকার কোনো ব্যক্তির খেয়ালখুশির বিষয় নয়। অন্যের প্রতি অন্যায় করে সাময়িক সুবিধা অর্জন করা গেলেও তা নৈতিক সাফল্য নয়; আর অন্যায়ের শিকার হয়ে কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন কাটানোও কোনো মানুষের চূড়ান্ত পরাজয়ের প্রমাণ নয়।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, অন্যায় থেকে বিরত থাকতে, মজলুমের পাশে দাঁড়াতে, জালিমকে অন্যায় থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, কাউকে জালিম বা মজলুম আখ্যা দেওয়ার আগে সত্য ও প্রমাণ যাচাই করা জরুরি। কারণ ন্যায়বিচারের নামে অন্যায় করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী।

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের এমন আচরণ গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমাদের কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত ও সম্পর্কের মাধ্যমে কেউ অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। আর কখনো অন্যায়ের শিকার হলে হতাশ না হয়ে ধৈর্য, প্রজ্ঞা, বৈধ প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ন্যায়সংগতভাবে অধিকার আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের জুলুম করা ও জুলুমের সহযোগী হওয়া থেকে রক্ষা করুন, অন্যায়ের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তৌফিক দিন, অন্যায়কারীদের আন্তরিক তওবা ও সংশোধনের পথ দেখান এবং আমাদের পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা ও পারস্পরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন। আমিন।

 

মন্তব্য করুন