বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) এক ধূমকেতু। তিনি সমকালীন ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং শ্রেণি-বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলমকে করেছিলেন প্রধান হাতিয়ার। তাঁর সাম্যবাদী (১৯২৫) কাব্যগ্রন্থটি কেবল বাংলা সাহিত্যে নয়, সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনে একটি মাইলফলক। শতবর্ষের আলোয় এই কাব্যগ্রন্থের দিকে তাকালে কেবল এর বিষয়বস্তু বা থিম নয়, বরং এর কাব্যভাষা বা স্টাইল আজও বিশেষভাবে চমৎকৃত করে। নজরুল যেভাবে তাঁর সাম্যবাদী ধারণাকে প্রকাশ করার জন্য শব্দের বুনন, ছন্দের দোলা এবং রূপকের ব্যবহার করেছেনÑতা এক নতুন নন্দনতত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। শতবর্ষের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার নান্দনিক ও প্রায়োগিক রূপটি বুঝতে হলে তাঁর কাব্যভাষা বা ভাষাশৈলী চুলচেরা বিশ্লেষণ অত্যন্ত জরুরি। ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির কাবা নাই’ কিংবা ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান্’Ñচরণ দুটি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের। এই কাব্যগ্রন্থে সমকালীন প্রথাগত-প্রচলিত অন্তঃসারশূন্য বিশ্বাসের মূলেও তিনি কুঠারাঘাত করেছেন। ‘সাম্যবাদী’ প্রকাশের শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রচলিত বিশ্বাসের নিরিখে ধর্মকে মানুষ মূল্যায়ন করে চলছে। স্বর্গের মোহ এবং নরকের ভীতির পরিবর্তে যে স্রষ্টা-সৃষ্টির প্রেম হতে পারে, এটি এখনো গণমানুষের মধ্যে ভীষণভাবে অনুপস্থিত। কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা শুরু হয়েছে এভাবেÑ ‘গাহি সামের গানÑ যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান, যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসিলম-ক্রীশ্চান’। এই মিলে যাওয়া কিংবা এক হয়ে যাওয়ার যে আহ্বান, সেখানে নিজ নিজ ধর্মকে স্বীকার করার মাধ্যমেই সম্ভব সহাবস্থানÑনিজ ধর্ম বজায় রেখে মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার কথা নজরুল বলেছেন। শিল্পী ফেরদৌস আরা যথার্থই বলেন, ‘সাম্যের পথপ্রদর্শক কাজী নজরুল ইসলাম। বাঙালি বৈষম্যের শিকার হয়েছে বলে নজরুলের দৃঢ় ভূমিকা অর্থাৎ তাঁর কবিতা-গানের কারণে তাঁকে আরও বেশি আপন করে নিয়েছে, ভালোবেসেছে, তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে। নজরুলের সাম্যবাদ নিয়ে লিখে-বলে শেষ করায় উপায় নেই’। মাত্র এগারোটি কবিতার একটি কাব্যগ্রন্থ। প্রায় প্রতিটি কবিতায়: ‘মন্দির-কাবা-বুদ্ধগয়া’, ‘পূজারী-মোল্লা’, ‘টুপি-টিকি’, ‘মাস্তুত ভাই-স্যাঙাৎ’, ‘অহল্যা-মেরী’, ‘ভগবান-শয়তান’, ‘মসজিদ-মন্দির-গির্জা’ ইত্যাদি ভারতীয় বিচিত্র ধর্মের শব্দগুচ্ছকে এক কাতারে বসিয়ে কবি তাঁর কাব্যশৈলী নির্মাণ করেছেন। সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর শব্দচয়নের অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী চরিত্র। নজরুল তাঁর কাব্যভাষায় একদিকে যেমন সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের গম্ভীর আবহ তৈরি করেছেন, অন্যদিকে অবলীলায় ব্যবহার করেছেন আরবি, ফারসি এবং খাঁটি বাংলা লোকজ শব্দ। যেমন: ‘সাম্যবাদী’ কবিতার শুরুতেই ‘সাম্য’ ও ‘ব্যবধান’-এর মতো তৎসম শব্দের পাশাপাশি অবস্থান। ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি যখন লেখেনÑ খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা? সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা! তখন ‘খোদা’ (ফারসি) এবং ‘হাতুড়ি-শাবল’ (দেশি ও তদ্ভব শব্দ) একই সমান্তরালে এসে দাঁড়ায়। এই দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক শব্দের মেলবন্ধন অভিজাত শ্রেণির ড্রয়িংরুমের ভাষাকে ভেঙে চুরমার করে শ্রমজীবী মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি নিয়ে যায়। পাশাপাশি একটি অনুজ্ঞা-আদেশাত্মক ভাষাশৈলীর আবহ তৈরি হয়। গবেষক সাজেদ কামাল বলেন, ‘এই কাব্যগ্রন্থের ১১টি কবিতায় কবি নজরুল ধর্মের সাম্য, নারী-পুরুষের সাম্য, ধনী-গরীবের সাম্য, পরিবেশ... সব সাম্যের কথা বলেছেন। এমন কাব্যগ্রন্থের নজির পৃথিবীতে অন্য সাহিত্যে বিরল’। ‘আল্লাহ্-ভগবান’কে এক করে দিতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। নজরুল তাঁর কাব্যভাষাকে ধারালো করতে বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস ও পুরাণকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তবে তা প্রথাগত ধর্মীয় অর্থে নয়। তিনি প্রচলিত ধর্মীয় মিথ বা রূপককে ভেঙে প্রগতিশীল অর্থ প্রদান করেছেন। যেমন: ‘মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’Ñএখানে কাবা বা মসজিদকে মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় স্থান দেওয়া হয়নি। কাবা ও কাবার ভাষা এখানে সর্বজনীন মানবতাবাদের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। আবার, ‘চ-াল’ বা ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি হিন্দু পুরাণের রামায়ণ-মহাভারত থেকে উপাদান নিয়েছেন। কিন্তু রাম বা কৃষ্ণকে ঈশ্বর রূপে দেখার চেয়ে তিনি মানবমুক্তির দূত হিসেবে দেখিয়েছেন। এই রূপক বা প্রতীকের সাহসী ব্যবহার নজরুলের কাব্যভাষাকে একাধারে ধারালো এবং তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী করে তুলেছে। তাঁর ব্যবহৃত লোকভাষাও ভাষাশৈলীর গুণে নিভাষা বা আইডোলেক্ট-এর স্তরে উন্নীত হয়েছে। কবিতাগুলোর ভেতরের চালটি অত্যন্ত গতিশীল ও বক্তৃতামূলক। নজরুলের কাব্যভাষা এখানে নিছক শিল্পসৃষ্টির জন্য নয়, বরং জনতাকে জাগিয়ে তোলার জন্য উচ্চকণ্ঠ। তাঁর কবিতার ভাষা অনেক সময় নাট্যধর্মী ও সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার মতো। যেমন ‘কুলি-মজুর’ কবিতায়: ‘বেতন দিয়াছ?Ñচুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!’Ñএই যে ‘চুপ রও’ বা ‘মিথ্যাবাদীর দল’Ñএই সম্বোধনগুলো কাব্যিক কোমলতাকে বর্জন করে একধরনের বিপ্লবী গদ্য-ছন্দের আমেজ তৈরি করে, যা পাঠকের মগজে ও রক্তে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। কাব্যগ্রন্থের নামকরণগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায় এর ভাষা কাদের প্রতিনিধিত্ব করেÑ ‘ঈশ্বর’, ‘মানুষ’, ‘পাপ’, ‘চ-াল’, ‘চোর-ডাকাত’, ‘কুলি-মজুর’, ‘বারাঙ্গনা’। বাংলা কবিতার মূলধারায় যারা চিরকাল ‘ব্রাত্য’ বা অস্পৃশ্য ছিল, নজরুল তাঁদের ভাষা ও জীবনের শব্দগুলোকে কবিতার মূল বেদিতে স্থান দিয়েছেন। ইকরাম আহমেদ লেনিন বলেন, ‘সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের মতো কোনো কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে আর নাই। সব ধরনের মানবিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এর ১১টি কবিতা যেন ১১টি পারমাণবিক বোমা! সামাজিক-মানবিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে এসব কবিতা যেন কঠোর আঘাত’। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় তিনি সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যে, তথাকথিত পতিতাও মায়ের মতোই পবিত্র। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় বাষ্প-শকট (রেলগাড়ি) এবং ঔপনিবেশিক অত্যাচারের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি শ্রমিকের ঘাম ও রক্তের ভাষাকে কাব্যের অলংকার বানিয়েছেন। ভাষাবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থে সর্বনামের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কবি এখানে প্রায়শই ‘আমরা’, ‘তুমি’ এবং ‘ভাই’ সম্বোধন ব্যবহার করেছেন। এই ‘ভাই’ বা ‘মোরা’ শব্দের মধ্য দিয়ে কবি ও পাঠকের মধ্যবর্তী দূরত্ব মুছে যায়। কবি কোনো দূরবর্তী প্রচারক নন, বরং তিনি শোষিত মানুষেরই একজন কমরেড বা সহযোদ্ধা। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লোসিভ) ভাষাশৈলী সাম্যবাদী ধারণাকে তাত্ত্বিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে অতি সাধারণ মানুষের হৃদয়ের খুব কাছে নিয়ে গেছে। নজরুল যখন ‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি রচনা করেন, তখন ব্রিটিশ ভারতের রাজনৈতিক পটভূমি ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসে কলুষিত। শত বছর পর আজও যখন বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় মেরুকরণ এবং জাত্যাভিমানের আস্ফালন দেখি, তখন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দর্শন এক চরম সত্য হিসেবে সামনে আসে। কবিতায় নজরুল বাহ্যিক আচার-সর্বস্ব ধর্মকে অস্বীকার করে মানুষের ভেতরের ‘সত্য’কে বড় করে দেখেছেন। তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, কোনো ধর্মই মানুষকে বিভেদ শেখায় না; বরং মানুষের তৈরি কৃত্রিম দেয়ালই সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। শতবর্ষের আলোয় এই কবিতার মূল নির্যাস এটাই যেÑ হিন্দু বা মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় আমরা মানুষ। বর্তমান শতকের যুদ্ধবিক্ষুব্ধ ও অসহিষ্ণু পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে হিন্দু-মুসলিমের এই মিলন কেবল রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, বরং মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার এক আবশ্যিক শর্ত। নজরুল এই কবিতায় পরম মমতায় দুই ধর্মের মানুষকে একই ছাতার নিচে এনে এক নতুন পৃথিবীর ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। নজরুল তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে কেবল তাত্ত্বিকভাবে প্রকাশ করেননি, বরং তা পাঠকের মগজে সুকৌশলে গেঁথে দেওয়ার জন্য এক অনন্য ভাষাশৈলী ব্যবহার করেছেন। এই কবিতার শব্দচয়ন ও বাক্যগঠন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কবি সমান্তরালভাবে দুই ধর্মের পবিত্রতম প্রতীক ও স্থানগুলোকে পাশাপাশি স্থাপন করেছেন। যেমনÑ ‘কা’বা’র সাথে ‘কাশি’, ‘কোরান’-এর সাথে ‘বেদ-পুরাণ’, বা ‘বাবা-ভবন’র সাথে ‘মথুরা-বৃন্দাবন’। এই যে শব্দ ও প্রতীকের যুগলবন্দী, তা বাংলা কবিতায় এক অভূতপূর্ব সেক্যুলার বা অসাম্প্রদায়িক ভাষা-কাঠামোর জন্ম দেয়। নজরুল এখানে যে বাগভঙ্গি বা স্টাইল ব্যবহার করেছেন তা অত্যন্ত সরাসরি ও আক্রমণাত্মক; যা ধর্মের নামে ব্যবসা করা ভ- সমাজকে সজোরে আঘাত করে। তিনি কোনো মারপ্যাঁচ বা রূপকের আড়ালে না গিয়ে সরাসরি ঘোষণা করেনÑ ‘এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’। এই সরল, সাবলীল অথচ বজ্রকণ্ঠের ভাষাশৈলীই কবিতাটিকে গত এক শতাব্দী ধরে শোষিত ও মুক্তিকামী মানুষের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত করেছে। পরিশেষে বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশকাল থেকে আজ শতবর্ষ পূর্তির মুহূর্তে এর গুরুত্ব বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি, বরং আরও প্রখর হয়েছে। নজরুল তাঁর অনন্য ও বৈপ্লবিক কাব্যভাষার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যের চেনা পরিধিকে আমূল বদলে দিয়েছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, কবিতা কেবল নান্দনিক আনন্দের উৎস নয়, বরং তা সমাজ পরিবর্তনের এক অমোঘ হাতিয়ার। নজরুল গবেষক এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বলেন, ‘নজরুলের সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে যে ভাবধারা তা না সোশালিজম, না কমিউনিজম, আসলে হিউম্যানিজম (মানবতাবাদ)’। শত বছর আগে কবি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং হিন্দু-মুসলিম মিলনের ডাক দিয়েছিলেন, আজকের যুদ্ধবিক্ষুব্ধ, ধর্মীয় মেরুকরণ ও বর্ণবাদে জর্জরিত বিশ্বেও তা মানবমুক্তির একমাত্র পথ। কুলি, মজুর, চ-াল কিংবা বারাঙ্গনার মতো প্রান্তিক মানুষের ব্রাত্য-ভাষাকে কাব্যের মূল বেদিতে প্রতিষ্ঠা করে নজরুল যে ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ করেছিলেন, তা আজ একুশ শতকেও সমভাবে প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেখানে আধ্যাত্মিক সুষমা ও গীতিময়তায় বিশ্বজনীনতা খুঁজেছিলেন, নজরুল সেখানে মানুষের রক্ত-ঘাম, সম্প্রীতি ও অধিকারের ভাষায় সাম্যবাদের নতুন নন্দনতত্ত্ব নির্মাণ করেছেন। তাই সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থের ভাষাশৈলী কেবল গত এক শতাব্দীর সাহিত্যের ইতিহাস নয়; বরং এটি আগামী শতকের বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার এক অবিনশ্বর অঙ্গীকার।