Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

১৪ নভেম্বর, ২০২১ ১০:০০ অপরাহ্ণ

নবান্ন

বাংলার কবি-সাহিত্যিকরাও নতুন ফসল ঘরে ওঠার ঋতু হেমন্ত আর নবান্ন উৎসবকে নিয়ে লিখেছেন কবিতা-গান। ষড়ঋতুর লীলাবৈচিত্রে কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে অগ্রহায়ণ মাস তথা হেমন্ত ঋতু আসে নতুন ফসলের সওগাত নিয়ে। কৃষককে উপহার দেয় সোনালী দিন। তাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো সোনালী ধানের সম্ভার স্বগৌরবে বুকে ধারণ করে হেসে ওঠে বাংলাদেশ। তাই বিপুল বিস্ময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গেয়ে ওঠেন-

‘ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি ॥’ হাসি ফোটে কৃষকের মুখেও; মাঠ ভরা সোনালী ফসল নতুন স্বপ্ন জাগায় চোখে।

কবি সুকান্ত’র ভাষায় যেন-‘নতুন ফসলের সুবর্ণ যুগ আসে।’ ‘এই হেমন্তে কাটা হবে ধান, আবার শূন্য গোলায় ডাকবে ফসলের বান’। নবান্নের বর্ণনা তিনি তাঁর ‘এই নবান্নে’ কবিতায় এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন। হেমন্ত ঋতুর দিন-রাতের অবিশ্রান্ত শ্রমে কৃষকের ঘরে ওঠে সোনার ধান। বাংলার গ্রাম-গঞ্জ মেতে ওঠে নবান্নের উৎসবে।

‘ঋতুর খাঞ্জা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত? নবীন ধানের আঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হল মাৎ।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় এভাবে নতুন আমন ধানের আঘ্রাণে অগ্রহায়ণকে মাৎ করে দেওয়ার কথা উচ্চারিত হয়েছে।

পল্লীকবি জসীম উদ্দীন হেমন্তে মাঠ ভরা ফসলের সম্ভারে মুগ্ধ হয়ে বলেন-
‘আশ্বিন গেল কার্তিক মাসে পাকিল ক্ষেতের ধান,
সারা মাঠ ভরি গাহিছে কে যেন হলদি-কোটার গান।
ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়িছে বায়,
কলমীলতায় দোলন লেগেছে, হেসে কূল নাহি পায়।'

কবি আল মাহমুদ লেখেন-
‘আজ এই হেমন্তের জলজ বাতাসে/আমার হৃদয় মন মানুষীর গন্ধে ভরে গেছে/রমণীর প্রেম আর লবণ সৌরভে/আমার অহংবোধ ব্যর্থ আত্মতুষ্টির ওপর/বসায় মার্চের দাগ, লাল কালো কট ও কষায়।' 

হেমন্ত তো এমনই। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাই হেমন্তের অরণ্যে পোস্টম্যান হয়ে প্রকৃতির হাতচিঠি পৌঁছে দেন মানুষের রুদ্ধ দুয়ারে। সে দুয়ারের দ্বার শীতের আগে খুললেও স্পর্শসুখ মরমে পৌঁছায় তো?

দিনবদলের পালায় গ্রামের মানুষের কাছে অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে নবান্নের আনন্দ। আগে নতুন ধান গোলায় ওঠার সময়ে যেভাবে উৎসবের আমেজ বিরাজ করত, তা যেন হারিয়ে যাচ্ছে। পিঠা-পুলি, পায়েশের সেই আয়োজন আর তেমন চোখে পড়ে না। সময় পরিবর্তনের হাওয়ায় সংস্কৃতি পাল্টে যাচ্ছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন। এখন নাগরিক সংস্কৃতির আগ্রাসনে গ্রামীণ সংস্কৃতি যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। 

নবান্ন উৎসবের মতো গ্রামবাংলার অন‌্যান‌্য ঐতিহ‌্যও হারিয়ে যাচ্ছে। আসলে এখন পারিবারিক বন্ধনটা আর আগের মতো নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের প্রতি আত্মিক টান কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সংস্কৃতিতে। পিঠা-পুলি খাওয়ার ঐতিহ‌্য হারিয়ে যাচ্ছে। সংস্কৃতি পাল্টে যাওয়ার কারণে এখন আর নবান্ন উৎসব আগের মতো দেখা যায় না। নবান্নের উৎসব এখন মেকি আনুষ্ঠানিতকতার মধ‌্যে সীমাবদ্ধ।

গ্রামীণ জনপদে দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ আছে কিন্তু কৃষকের ঘরে নেই নবান্নের আমেজ। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসব কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে। সিকি শতাব্দী পূর্বেও নবান্নের ধান কাটার উৎসবে মুখরিত হতো গ্রামের প্রতিটি আঙ্গিনা। গ্রামীণ জনজীবনে নবান্ন উৎসব এখন শুধুই স্মৃতি।

বাঙালির নবান্ন তথা উৎসবের ঋতু হেমন্ত, নবান্নের আশা জাগানিয়া, দুঃখ ভোলানিয়া হেমন্ত। স্বপ্নের জাগরণে হতাশা আর নিরাশা ভুলে চলতো নবান্নের উৎসব। পাক পালাগান, জারি গান, কবি গান আর গাজীর গীতের আসর জমানো হতো প্রকৃত গ্রামবাংলায়।

অগ্রহায়ণের প্রথম দিনের আশা হোক, ষড়ঋতুর বাংলাদেশে হেমন্ত আসুক অপার সম্ভাবনা আর সমৃদ্ধির শুভ সংবাদ নিয়ে।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট