Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

০৮ মে, ২০২৩ ০৪:৫৯ অপরাহ্ণ

গ্রীষ্মের রঙিন ফুল ৪

গ্রীষ্মের রঙিন ফুল


গনগনে রোদ্দুর প্রখর তাপ হয়ে ঝরে গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে। তপ্ত বাতাস জ্বালা ধরিয়ে দেয় শরীর ও চোখে। আবার এই আগুনঝরা গ্রীষ্মই আমাদের দৃষ্টিতে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে যায় তার বর্ণিল ফুলের সমারোহে। চারপাশের সব রুক্ষতা যেন হারিয়ে যায় এ রঙের ঝাঁপির মাঝে। চলতি পথে কৃষ্ণচূড়ার গাঢ় লাল দেখে থমকে দাঁড়ায় তৃষ্ণার্ত পথিক। আবার কখনও লালের ফাঁকে উঁকি দেয় বেগুনি জারুল ফুল। সোনাঝরা সোনালু ফুলের গাছ ঝলমল করতে থাকে আপন মহিমায়। এছাড়াও  রাধাচূড়া, শিমুল,ভাটফুল, কুরচি,করবীসহ নানা ফুলের চমৎকার রঙ গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে খানিকটা হলেও স্বস্তি দিয়ে যায় আমাদের। ইট কাঠের ফাঁকে ফাঁকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল গাছের ফুলগুলো তীব্র রোদের ঝলকানিতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।


কৃষ্ণচূড়া


গ্রীষ্মের সবচেয়ে রঙিন ফুলটি বোধহয় কৃষ্ণচূড়া। এর জাদুকরী রঙের ছটায় মুহূর্তেই রঙিন হয়ে ওঠে প্রকৃতি। গাঢ় লালের এ সমারোহ দেখে মনে হতে পারে, এত কৃষ্ণচূড়া গাছ লুকিয়ে ছিল আমাদের চারপাশে!লালের পাশাপাশি হলুদ ও কমলা রঙের হয় এ ফুল। কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম ডেলোনিখ রেজিয়্যা। চমৎকার পত্রপল্লব ও আগুনরঙা ফুলের জন্য প্রসিদ্ধ এ গাছ। কৃষ্ণচূড়া যে শুধু লাল রঙেরই হয় তা নয়, পাশাপাশি কমলা লাল ও হলুদ রঙেরও হয়। দৃষ্টিনন্দন ফুলগুলোর শোভা বাড়ায় উজ্জ্বল সবুজ রঙের সূক্ষ্ম চিরলপাতা। কৃষ্ণচূড়া গাছের আরেক নাম গুলমোহর। আমাদের দেশে সহজপ্রাপ্য এ গাছটির আদিনিবাস মাদাগাস্কারে। উৎপত্তিস্থল শুকনো পাতা ঝরা বৃক্ষের বন হলেও বর্তমানে বনে এ গাছ বিলুপ্তপ্রায়। ক্যারাবিয়ান অঞ্চল, আফ্রিকা, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণচীন, বাংলাদেশ, ভারত সহ বিশ্বের অনেক দেশে এটি জন্মে। কৃষ্ণচূড়ার সবুজ কচি ফলগুলো সবুজ পাতার ভিড়ে লুকিয়ে থাকে। শীতে গাছের পাতা খসে পড়লে দেখা যায় গাঢ় ধূসর রঙের পাকা ফল। বসন্তকাল থেকে নিঃশব্দে ঝরে যাওয়া বিবর্ণ ফলগুলোর জায়গা একটু করে দখল করে নিতে থাকে রক্তিম ফুল। গ্রীষ্মে মনে হয় হঠাৎই যেন আগুন লেগে গেছে গাছজুড়ে! আগুন লাল ফুলে ছেয়ে যায় পুরো কৃষ্ণচূড়াগাছ। উজ্জ্বল লাল রঙের এ ফুলগুলো বড় চারটি পাপড়িযুক্ত। পাপড়িগুলো প্রায় ৮ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হতে পারে। শোভাবর্ধন করার পাশাপাশি উষ্ণ আবহাওয়ায় সুশীতল ছায়া দিতেও জুড়ি নেই কৃষ্ণচূড়াগাছের। গ্রীষ্মের তাপ সঙ্গে নিয়ে আসা কৃষ্ণচূড়া ফুল বর্ষার রিমঝিম ছন্দের সঙ্গেও তাল মেলায়। তবে কখনও বিবর্ণ হয় না এ ফুল। ঝরে পরার আগ পর্যন্ত তার গাঢ় লালচে রঙে মুগ্ধ করে সবাইকে। নগরীর মানিক মিয়া এভিনিউ এর সড়ক দ্বীপ, বোর্টানিক্যাল গার্ডেন,রমনা পার্ক,সোহরাওয়্যার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে কৃষ্ণচূড়া গাছের মেলা। নীল আকাশের ক্যানভাসে ফুটে থাকা লাল কৃষ্ণচূড়ার মাঝে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুঁজে নিতে চাইলে যেতে পারেন এর যেকোনো জায়গায়।



জারুল


দৃষ্টিনন্দন বেগুনি রঙে প্রকৃতির শোভা বাড়ায় জারুল ফুল। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিতে থাকে এ ফুলটি। বিশাল গাছের শাখা উপশাখা জুড়ে বিচরণ জারুলের। এর বৈজ্ঞানিক নাম লেজারস্ট্রমিয়া স্পেসিওজা। এটি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রজাতি। জারুল ভারতীয় উপমহাদেশের গাছ। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, মালয়েশিয়া, ভারতের জলাভূমি অঞ্চলে এর জন্ম। জারুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ইংরেজরা উনিশ শতকে এখান থেকে বীজ নিয়ে কুয়ালালামপুর ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের অনেক শহরে জারুল লাগায়। নিম্নাঞ্চলের জলাভূমিতে ভালোভাবে  বেড়ে ওঠে জারুল গাছ। তবে শুকনো এলাকায়ও মানিয়ে নিতে পারে। অনেক শাখা-প্রশাখায় মেলে ধরা সবুজ ছাতার মতো দেখায় গাছটি। এর কাণ্ড ধূসর ও পাতা লম্বাটে। পত্রদণ্ডে বিপরীত দিকে সাজানো থাকে। শীতে পাতা ঝরে যায় এর। আবার বসন্তে রিক্ত শাখাগুলো ভরে ওঠে সবুজ পাতায়। আর গ্রীষ্মে হালকা বেগুনির বর্ণচ্ছটায়। প্রথমে ডিম্বাকৃতির ফল আসে গাছে।এতো প্রচুর পরিমাণে হয় ফল হয় যে ভারে শাখা নুয়ে পড়ে। শীতে পাতার সঙ্গে ফলও ঝরে পড়ে। বীজ থেকে সহজেই চারা গজায়। বাড়েও দ্রুত। জারুল ফুলগুলো থাকে শাখার ডগায়, পাতার ওপরের স্তরে। লম্বা মঞ্জরিতে গাঢ় সবুজের পটভূমিতে বেগুনি ফুলের গুচ্ছ দোলে বাতাসে। ফুলে ছয়টি পাপড়ি থাকে।মাঝখানে পুংকেশরের সঙ্গে মাখামাখি হলুদ পরাগকোষ ফুলের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেক দিন ধরেই ফুলের শোভা পায় গাছজুড়ে। গ্রীষ্মের শুরুতে ফুল ফোটে। কিছুটা কমে এলেও শরৎ অবধি সবুজে-বেগুনিতে জারুল হয়ে থাকে মনোরম। পথের শোভা বাড়াতে জারুলের জুড়ি নেই। চাইলে বাগানেও রোপণ করতে পারেন এ গাছ। 


জারুল কাঠ অত্যন্ত মূল্যবান। লালচে রঙের কাঠ শক্ত ধরণের হয়। ভিজলেও সহজে নষ্ট হয় না। ভেষজ গুণও চমৎকার।



সোনালু


সোনালুর ঝলমলে রূপ দেখে মনে হয় কেউ যেন যত্ন করে সাজিয়েছে তাকে! দীর্ঘ থোকায় সাজানো উজ্জ্বল হলুদ ফুলের মায়াবি রূপ গ্রীষ্মেরই অবদান। সোনালুর বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাশিয়া ফিস্টুলা।


বৈশাখের শুরুতে দীর্ঘ মঞ্জরির ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে। নতুন পাতাও জেগে ওঠে একই সঙ্গে। দেখতে দেখতে ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গাছ। দেখে মনে হয় যেন কাঁচা সোনা রঙে ভরে গেছে গাছটি। ডালপালা সেজে ওঠে কচি সবুজ পাতায়। লম্বা ঝুলন্ত পুষ্পমঞ্জরি সোনালুর প্রধান আকর্ষণ। বৈশাখী হাওয়ায় ফুলের থোকাগুলো দুলতে থাকে কানের দুলের মতো। সোনালু গাছ আকারে ছোট,ছড়ানো-ছিটানো ডালপালা। পাপড়ির সংখ্যা পাঁচ। ফল গোল, লাঠির মতো লম্বা। এ কারণে সোনালু কোথাও কোথাও বানরলাঠি নামেও পরিচিত। বানরলাঠি ঘিরে লোকসমাজে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে।  পূর্ব এশিয়া থেকে আগত সোনালুর ফল, ফুল ও পাতা বানরের প্রিয় খাদ্য। এ গাছের কাঠ জ্বালানি ছাড়াও অন্যান্য কাজে লাগে। 

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট