সিনিয়র শিক্ষক
৩০ মে, ২০২৩ ০২:৩৯ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
ধরনঃ সাধারণ শিক্ষা
শ্রেণিঃ ষষ্ঠ
বিষয়ঃ ডিজিটাল প্রযুক্তি
অধ্যায়ঃ প্রথম অধ্যায়
ল্যাটেরাল থিংকিং’ কী, এবং কর্মজীবনে এই দক্ষতা বাড়াবেন কীভাবে
ল্যাটেরাল থিংকিং বলতে বোঝানো হয় কোনো সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীল উপায়ে চিন্তা করা। আমরা যেটাকে অনেক সময় বলে থাকি, “বাক্সের বাইরে চিন্তা করা”।
সাধারণত আমরা একটা সমস্যা সমাধানের জন্য চিন্তা করার সময় যুক্তি ব্যবহার করি। আমাদের এই যুক্তি ব্যবহার হয় সরাসরি বা সরলরৈখিক। এজন্য এ ধরনের চিন্তা করার কৌশলকে অনেক সময় বলা হয় ‘ভার্টিকাল থিংকিং’ বা লম্বালম্বি পদ্ধতিতে চিন্তা করা।
অন্যদিকে ল্যাটেরাল বা ‘পার্শ্বিক’ চিন্তার মাধ্যমে একটা বিষয়কে বিভিন্ন পাশ থেকে দেখা হয়। একে তাই আনুভূমিক চিন্তাও (হরাইজন্টাল থিংকিং) বলা হয়। এমন সব সমস্যার সমাধান বের করার জন্য ল্যাটেরাল থিংকিং ব্যবহার করা হয়, যেসব সমাধানের কথা প্রথমে কখনো মনেই হবে না।
ল্যাটেরাল থিংকিং এর বিষয়টি প্রথমে তুলে ধরেন মনোবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড ডি বোনো। মার্কেটিং অথবা বিজ্ঞাপন জগতে যারা সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত, তাদেরকে প্রায়ই ল্যাটেরাল থিংকিং এর মাধ্যমে চিন্তা করার দক্ষতা কাজে লাগাতে হয়।
আপনি যদি গ্রাফিক্স, শিল্পকলা অথবা ডিজাইন শিখে থাকেন, তবে সম্ভাবনা আছে যে আপনার মধ্যে কিছুটা হলেও এমন চিন্তা করার দক্ষতা আছে। আপনার যদি এই দক্ষতা থাকে, তবে সেটা নিজের ক্যারিয়ারের ভবিষ্যতে অনেক কাজে লাগবে।
.
# ল্যাটেরাল থিংকিং এর পদ্ধতিতে চিন্তা করা বলতে কী বোঝায়?
ল্যাটেরাল চিন্তা করা বলতে বোঝায় একটা সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ সামলানোর জন্য সৃজনশীল উপায় চিন্তা করা। কাজ করার জন্য এটা দারুণ একটা দক্ষতা।
সহজ কথায়, একটা সমস্যার সমাধান সরাসরিভাবে না চিন্তা করে ভিন্ন উপায় খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ল্যাটেরাল থিংকিং।
এ ধরনের চিন্তা সম্পর্কে যত ভাল ভাবে বোঝা যাবে, সমস্যা সমাধান করার দক্ষতা ততই বাড়বে এবং চ্যালেঞ্জিং সব সমস্যার জন্য বিশেষ সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
.
# ইন্টারভিউ এর সময় ল্যাটেরাল থিংকিং নির্ভর প্রশ্নের উদাহরণ
চাকরির ইন্টারভিউ নেয়ার সময় নিয়োগকর্তাদের পছন্দের কিছু প্রশ্ন আছে। এসব প্রশ্নের মাধ্যমে তারা কেবল প্রার্থীদের সৃজনশীল চিন্তা করার সক্ষমতাই দেখেন না, একই সাথে তাদের সমস্যা সমাধান করার দক্ষতাও পরীক্ষা করেন।
আপনি যদি ধাঁধা বা বুদ্ধির প্রশ্ন সমাধান করতে পছন্দ করেন, তবে আপনিও সম্ভবত ইন্টারভিউতে এমন প্রশ্নের উত্তর ভাল ভাবে দিতে পারবেন।
তবে এসব প্রশ্ন বুঝতে পারা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। ইন্টারভিউতে কখনো হয়ত এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, যেটা আপনার কাছে অন্য রকম বলে মনে হচ্ছে অথবা প্রথম বার শুনে আপনি প্রশ্নটা ঠিকমত বুঝতেই পারেননি।
এমনটা হলে সম্ভাবনা আছে প্রশ্নটার উত্তর বের করতে ল্যাটেরাল থিংকিং এর প্রয়োজন।
ইংল্যান্ডে অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি অফ কেন্ট’ এর সংগ্রহে এমন দারুণ সব প্রশ্নের একটা তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা থেকে কিছু প্রশ্ন এখানে দেয়া হল:
ক. এমন একটি আবিষ্কার রয়েছে, যার সাহায্যে বিশ্বের অনেক দেশের মানুষ প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত দেয়ালের মধ্য দিয়ে দেখতে পারে। কী সেই আবিষ্কার?
উত্তরটা হল জানালা।
খ. একজন অস্ট্রেলিয়ান ভদ্রমহিলার জন্ম হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। তবে তিনি কিছুদিন আগে তার ১৬তম জন্মদিন পালন করলেন। কীভাবে সম্ভব?
উত্তরটা হল, তার জন্ম হয়েছিল ২৯ ফেব্রুয়ারিতে।
অথবা আপনাকে জিজ্ঞেস করা হতে পারে আপনি কি এমন জটিল কোনো পরিস্থিতির উদাহরণ দিতে পারবেন, যেখান থেকে বের হওয়ার জন্য আপনাকে ল্যাটেরাল থিংকিং করতে হবে?
প্রশ্নটি শুনে যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা সহজ না। উত্তর বের করার জন্যে আপনি এভাবে চিন্তা শুরু করতে পারেন যে, অতীতে কোন পরিস্থিতিতে আপনাকে সমস্যা সমাধানের জন্য সৃজনশীল চিন্তা করতে হয়েছিল। আপনি তাহলে সেই সমস্যা সমাধানের বিষয়টা নিয়ে বলতে পারেন, যেখানে আপনি ল্যাটেরাল থিংকিং ব্যবহার করেছিলেন।
.
# যেভাবে আপনার ল্যাটেরাল থিংকিং এর দক্ষতা বাড়াবেন
কিছু মানুষ আছে যারা স্বাভাবিকভাবে অন্যদের চেয়ে ভাল ল্যাটেরাল থিংকিং করতে পারে। অন্যদিকে বাকিদের জন্য এমন চিন্তাশক্তির দক্ষতা বাড়ানো অনেক কঠিন মনে হতে পারে।
তবে সবকিছুর মতই মানুষ যত অনুশীলন করে, ততই নিখুঁত হতে পারে। তাই আপনি অনুশীলন করে নিজের ল্যাটেরাল থিংকিং এর দক্ষতা বাড়াতে পারেন।
এ ধরনের চিন্তা করা আইটি বিষয়ক দক্ষতার মত কোনো ধরনের ‘হার্ড স্কিল’, অর্থাৎ নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে দক্ষতার ওপর নির্ভর করে না। বরং অনেকটাই পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। তাই কীভাবে এই দক্ষতা বাড়ানো যায়, তার উপায় খুঁজে বের করা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়।
তবে আপনি এ ধরনের কিছু মাথা খাটানোর অনুশীলন করার চেষ্টা করে দেখতে পারেন:
১. মাইন্ড ম্যাপিং
যুক্তি দিয়ে যখন সমাধানে পৌঁছানো যায় না, তখন মাইন্ড ম্যাপিং ভাল কাজ দিতে পারে। কারণ মাইন্ড ম্যাপ আমাদের দৃষ্টি বা দর্শনের অনুভূতি নিয়ে কাজ করে। তাই তখন আমাদের মস্তিষ্ক অন্যভাবে চিন্তা করে। এতে করে অনেক সময় অপ্রত্যাশিতভাবে আপনি প্রশ্নের সমাধান পেয়ে যান।
মাইন্ড ম্যাপিং এর সময় আপনি মাথায় আসা সকল আইডিয়া কাগজে লিখতে পারেন এবং চিন্তা করার সময় পুরোটা একসাথে ভেবে দেখতে পারেন।
.
২. নিজের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করুন
আমাদের ৫টি ইন্দ্রিয় আছে: দর্শন, স্পর্শ, শ্রবণ, ঘ্রাণ এবং স্বাদ। কিন্ত আমরা সমস্যা সমাধানের জন্য খুব কমই আমাদের সবগুলি ইন্দ্রিয় ব্যবহার করি। সাধারণত আমরা দর্শন ইন্দ্রিয়ের ওপর বেশি নির্ভর করি।
তবে আমাদের অন্য ইন্দ্রিয়গুলি ব্যবহার করা হলে সমাধান বের করার ক্ষেত্রে আরো ভাল ফলাফল পাওয়া সম্ভব।
যেমন আপনি যখন একটা সমস্যায় পড়েন, আপনি চাইলে সমস্যাটির কথা জোরে জোরে বলতে পারেন এবং মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে রাখতে পারেন। আপনি যখন পরে এই রেকর্ড শুনবেন, তখন দেখা যাবে আপনি এমন কিছু খুঁজে পেয়েছেন, যা আগে মিস করে গেছেন।
.
৩. বিপরীত চিন্তা বা রিভার্স থিংকিং
কোনো একটা পরিস্থিতিতে মানুষ সাধারণ অবস্থায় কোন কাজটা করবে তা বিশ্লেষণ করা এবং তারপর ঠিক তার উল্টো কাজটা করাই হল বিপরীত চিন্তা বা রিভার্স থিংকিং। আপনি যদি নিজে এমন সমস্যার মধ্যে পড়ে যান, যার কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না, তখন আপনি সমাধান থেকে শুরু করে আগাতে পারেন।
যেমন প্রথমে সমস্যার বিষয়টি বুঝলেন। এরপর চিন্তা করলেন এর থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে ভাল উপায় কী হতে পারে। তারপর আপনি সেই জায়গা থেকে কাজ শুরু করবেন।
.
৪. নিজেকে বিভিন্ন উপায়ে উদ্দীপ্ত করুন
যখন একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবেন, অনেক সময়ই আপনি চেষ্টা করেন সকল ধরনের বাধাবিঘ্ন এড়িয়ে একাগ্র মনে চিন্তা করতে। এই পদ্ধতি যদিও অনেককে বেশি মনোযোগী হতে সাহায্য করে, তবে এর ফলে আপনার চিন্তার সীমানা ছোট হয়ে আসতে পারে।
তাই নিজেকে আলাদা করে না রেখে, বরং বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে দেখতে পারেন।
মনে করুন আপনি নতুন একটা পডকাস্ট শোনা শুরু করলেন। কিংবা এমন কারো সাথে কথা বললেন যার সাথে আপনি আগে কখনো কথা বলেননি। অথবা এমন রাস্তা দিয়ে হাঁটলেন, যে রাস্তা আপনার অচেনা।
এভাবে এলোমেলো কাজ থেকে আমাদের মন নানাভাবে উদ্দীপনা খুঁজে পেতে পারে, যা আমাদের যৌক্তিক চিন্তা কাঠামোকে বদলে দেয় এবং আমরা নতুন সৃজনশীল চিন্তা করতে পারি।
.
৫. বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন
এই পদ্ধতিতে সমস্যা সমাধানের জন্য পরস্পর সম্পর্কহীন একাধিক বিষয় ব্যবহার করা হয়। এমনও হতে পারে, ভুল সমাধান নিয়েই আগে পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
যেমন আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন যে, “এই মুহূর্তে আমাদের কোন কাজটি করা অনুচিৎ?” সাধারণ ভাবে ভাবতে গেলে এমন চিন্তা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে।
তবে এভাবে ল্যাটেরাল থিংকিং করতে পারলে নতুন আইডিয়া পেয়ে যেতে পারেন। আপনি যখন এমন প্রশ্ন করবেন, তখন আপনার কল্পনা শক্তি এমন সব বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পাবে, যেগুলি অন্য সময় আপনার কাছে সম্পর্কহীন বলে মনে হয়েছিল।
সৌঃ সি বি