সহকারী অধ্যাপক
১৮ জানুয়ারি, ২০২৪ ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
ধরনঃ মাদ্রাসা শিক্ষা
শ্রেণিঃ দ্বাদশ
বিষয়ঃ জীববিজ্ঞান ২য় পত্র
অধ্যায়ঃ দ্বিতীয় অধ্যায়
বিজ্ঞানী আব্রাহাম ট্রেম্বলে (Abraham Trembley, 1700-1784) হাইড্রা আবিষ্কার করেন। তবে এর নামকরণ করেন স্যার কার্ল লিনিয়াস (Carl Linnaeus, 1707-1778)। নামটি নেয়া হয়েছে বহুমস্তকবিশিষ্ট কাল্পনিক গ্রীক দৈত্যের নাম অনুসারে যার একটি মাথা কাটলে তার বদলে দুই বা ততোধিক মাথা গজাত। ঐ দৈত্যের মতো হাইড্রারও দেহের হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরায় সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে বলে এর নাম দেয়া হয় হাইড্রা। বাংলাদেশে বহুল প্রাপ্ত হাইড্রার বৈজ্ঞানিক নাম: Hydra vulgaris । এরা স্বাদুপানিতে মুক্তজীবি হিসেবে বাস করে। এদের পুনরুৎপত্তির ক্ষমতা রয়েছে। এরা মাংসাশী ও কর্ষিকার সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ করে থাকে। কর্ষিকা ও দেহের সংকোচন-প্রসারণ এর মাধ্যমে চলাফেরা করে। এদের প্রধানত দুই ধরনের জনন প্রক্রিয়া দেখা যায়। যথা- অযৌন জনন (মুকুলোদগম ও দ্বিবিভাজন) এবং যৌন জনন (জনন কোষ সৃষ্টি)।
শ্রেণীতাত্ত্বিক অবস্থান
রাজ্য (Kingdom): Animalia
পর্ব (Phylum): Cnidaria
শ্রেণী (Class): Hydrozoa
বর্গ (Order): Hydroida
গোত্র (Family): Hydridae
গণ (Genus): Hydra
প্রজাতি (Species): Hydra vulgaris
বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য (External Morphology)
দেহ নরম ও নলাকার। এদের মৌখিক প্রান্তে মুখ-ছিদ্র অবস্থিত যা খোলা ও বন্ধ
হতে সক্ষম। অন্যদিকে বি-মৌখিক প্রান্ত বদ্ধ প্রকৃতির এবং এটি যে কোন
অবলম্বনের সাথে একে আটকে বা লেগে থাকতে সাহায্য করে। Hydra vulgaris
বর্ণহীন তবে গৃহীত খাদ্য অনুযায়ী দেহের বর্ণের পরিবর্তন হতে দেখা যায়। তবে
অন্যান্য প্রজাতিতে বিভিন্ন রঙ দেখা যায়। এরা ১০ থেকে ৩০ মিলিমিটার লম্বা
এবং ১ মিলিমিটার চওড়া হয়ে থাকে। দেহ অরিয় প্রতিসম (radial symmetry) অর্থাৎ
মৌখিক ও বি-মৌখিক প্রান্ত বরাবর কেন্দ্রীয় অক্ষ অতিক্রমকারী তলে একাধিক
বার ভাগ করলে একই ধরণের সমান দুটি অংশ পাওয়া যায়।
হাইড্রার
বহিঃগঠন (চিত্রে ডিম্বাশয়, শুক্রাশয় ও মুকুল একসাথে দেখানো হয়েছে বাস্তবে
গ্রীষ্মকালে মুকুল এবং হেমন্ত ও শীতকালে ডিম্বাশয় ও শুক্রাশয় দেখতে পাওয়া
যায়)
হাইড্রার দেহকে প্রধানত তিনটি অংশে ভাগ করা যায়। যথা- হাইপোস্টোম, দেহ-কাণ্ড ও পদতল।
১। হাইপোস্টোম (Hypostome)
মৌখিক প্রান্তে অবস্থিত, ছোট ও সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা সম্পন্ন অংশের নাম
হাইপোস্টোম। এর উপরের দিকে খোলা ও বন্দ হতে সক্ষম গোলাকার মুখ-ছিদ্র রয়েছে
যার সাহায্যে খাদ্য গ্রহণ ও অপাচ্য অংশের নিষ্কাশন সম্পন্ন হয়।
হাইপোস্টোমের গোড়ার চারিদিকে ৬ থেকে ১০টি কর্ষিকা (tentacle) থাকে। কর্ষিকা
লম্বা, ফাঁপা, সূত্রাকার এবং লম্বায় দেহ অপেক্ষা দ্বিগুণ বা তিনগুণ দীর্ঘ
হতে পারে। কর্ষিকার বহিঃপ্রাচীরে অসংখ্য ছোট আকারের টিউমারের মত গঠন দেখতে
পাওয়া যায় যাকে নেমাটোসিস্ট ব্যাটারি (nematocyst battery) বলে। প্রত্যেক
ব্যাটারি বিভিন্ন ধরনের নেমাটোসিস্ট নিয়ে গঠিত। কর্ষিকা ও নেমাটোসিস্ট
সম্মিলিতভাবে খাবার গ্রহণ, চলন ও আত্মরক্ষায় অংশ নেয়।
২। দেহ-কাণ্ড ( trunk)
হাইপোস্টোমের নিচ থেকে পদতলের উপর পর্যন্ত সংকোচন-প্রসারণশীল অংশটিই
দেহ-কাণ্ড। অনুকূল পরিবেশে (যেমন গ্রীষ্মকালে) অর্থাৎ যখন পর্যাপ্ত
পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যায় তখন হাইড্রার দেহ-কাণ্ড থেকে এক বা একাধিক
পূর্ণাঙ্গ বা বৃদ্ধিরত মুকুল (bud) দেখতে পাওয়া যায়। প্রত্যেকটি মুকুল একটি
নতুন হাইড্রার জন্ম দেয় যা হাইড্রার অন্যতম অযৌন জনন পদ্ধতি। হেমন্ত ও
শীতকালে হাইড্রার দেহ-কাণ্ডের উপরের অংশ থেকে এক বা একাধিক কোনাকার
শুক্রাশয় এবং নিচের অংশে গোলাকার ডিম্বাশয় দেখে যায়। এই অস্থায়ী অঙ্গদ্বয়
যৌন জননে অংশ গ্রহণ করে থাকে।
৩। পদতল বা পাদ-চাকতি ( pedal disc)
পদতল বা পাদ-চাকতির অবস্থান দেহ-কাণ্ডের নিম্ন বা শেষ প্রান্তে। এটি গোল ও
চ্যাপ্টা। এখান থেকে এক প্রকার আঠালো রস নিঃসৃত হয় যা কোন শক্ত বস্তুর সাথে
হাইড্রাকে লেগে থাকতে সাহায্য করে এবং এই চাকতির দ্বারা সৃষ্ট বুদবুদ
হাইড্রাকে ভাসিয়ে রাখতেও সাহায্য করে। এদের ক্ষণপদ গঠনকারী কোষ গ্লাইডিং (এ
প্রক্রিয়ায় পদতল এর বহিঃত্বকীয় কোষ গুলো থেকে পিচ্ছিল পদার্থ নিঃসৃত হয়
এবং সৃষ্ট ক্ষণপদের সাহায্যে মসৃণ তলে খুব ধীরে ধীরে অল্প দূরত্ব অতিক্রম
করে থাকে) চলন সম্পন্ন করে থাকে।
অন্তর্গঠন (Internal Morphology)
হাইড্রাকে দ্বিভ্রূণস্তরী প্রাণী বলা হয় কারণ ভ্রুণাবস্থায় দেহ প্রাচীরের
কোষগুলোকে এক্টোডার্ম ও এন্ডোডার্ম নামক দু’টি স্তরে বিন্যস্ত হতে দেখা
যায়। পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় স্তরদু’টি যথাক্রমে এপিডার্মিস ও
গ্যাস্ট্রোডার্মিসে পরিণত হয়। এই স্তরদ্বয়ের মাঝে কিছু কোষ ও তন্তু বিশিষ্ট
মেসোগ্লিয়া নামক জেলির মত একটি স্তর থাকে। মেসোগ্লিয়াকে উভয় স্তরের
সংযোগকারী স্তরও বলা হয়। এ স্তরের ব্যাস ০.১ মাইক্রন।
ক। এপিডার্মিস (বহিঃত্বক)
এটি হাইড্রার বহিরাবরণ নামে পরিচিত। একটি পাতলা ও নমনীয় কিউটিকল (cuticle)
দ্বারা এটি আবৃত। মোট সাত প্রকারের কোষ নিয়ে এপিডার্মিস গঠিত। যথা-
হাইড্রার বহিঃত্বকের কোষসমূহ
1. পেশি-আবরণী কোষ
2. ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ
3. স্নায়ু কোষ
4. সংবেদী কোষ
5. গ্রন্থি কোষ
6. জনন কোষ
7. নিডোসাইট
হাইড্রার বহিঃত্বকের কোষসমূহ
১। পেশি-আবরণী কোষ (Musculo-epithelial cell)
বহিঃত্বকের সমস্ত অংশ জুড়ে এ কোষ অবস্থান করে। দেখতে কোনাকার (বহির্মুখী
চওড়া ও অন্তর্মুখী সরু প্রান্তবিশিষ্ট)। চওড়া প্রান্তে থাকে সাইটোপ্লাজম।
সাইটোপ্লাজমে রয়েছে গহ্বর এবং মিউকাস বস্তু। চওড়া প্রান্ত মিলিত হয়ে
অবিচ্ছেদ্য আবরণ গঠন করে।
মায়োনিম নামের এক ধরনের নমনীয় ও সংকোচন-প্রসারণশীল তন্তু দ্বারা গঠিত
পেশী-প্রবর্ধন তথা পেশীর বর্ধিতাংশ পেশী আবরণী কোষের সরু প্রান্তে পাওয়া
যায় এবং তা দেহ অক্ষের সমান্তরালে অবস্থান করে। কর্ষিকায় এ কোষ বড় ও
চ্যাপ্টা হয়ে থাকে। এতে পরিস্ফুটনরত নিডোসাইট (নিডোব্লাস্ট) দেখতে পাওয়া
যায়।
কাজ
২। ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ (Interstitial cell):
পরপর দুটি পেশী-আবরণী কোষের সরু প্রান্তের ফাঁকে ফাঁকে এদের অবস্থান। এরা
মেসোগ্লিয়া ঘেঁষে গুচ্ছাকারে অবস্থান করে। কোষগুলো গোলাকার বা
ত্রিকোণাকার,ব্যাস ৫ মাইক্রন। এতে সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াস ও মসৃণ
এন্ডোপ্লাজমিক জালিকা, রাইবোজোম ও মাইটোকন্ড্রিয়া থাকে।
কাজ
৩। স্নায়ু কোষ (Nerve cell)
অনিয়ত আকার বিশিষ্ট এ কোষটি মেসোগ্লিয়া ঘেঁষে অবস্থান করে। দেহকোষ ক্ষুদ্র
এবং দুই এর অধিক সূক্ষ্ম শাখান্বিত স্নায়ুতন্তু দিয়ে গঠিত যা পরস্পর মিলে
স্নায়ু জালিকা গঠন করে।
কাজ
৪। সংবেদী কোষ (Sensory cell)
কর্ষিকা, হাইপোস্টোম ও পদতলের চারিদিকে এদের বেশী দেখা যায়। পেশী –আবরণী
কোষের ফাঁকে লম্ব ভাবে বা বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করে। এর মুক্ত প্রান্ত
থেকে সংবেদী রোম বের হয়। অপর প্রান্ত আবদ্ধ থাকে স্নায়ু তন্তুর সাথে। কিছু
গুটিকাময় সূক্ষ্ম তন্তু সংবেদী কোষ ও স্নায়ু কোষকে আবদ্ধ করে।
কাজ
৫। গ্রন্থি কোষ (Gland cell)
মুখছিদ্রের চারিদিকে ও পদতলে অবস্থিত। কোষগুলো লম্বাটে আকৃতির। বাইরের
প্রান্তে অসংখ্য নিঃসারী দানা ও ভিতরের প্রান্ত পেশী প্রবর্ধনযুক্ত।
কাজ
৬। জনন কোষ (Germ cell)
এদের অবস্থান জননাঙ্গে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু এ দু’ধরনের কোষ দেখতে পাওয়া
যায়। পরিণত শুক্রাণু অতি ক্ষুদ্র। স্ফীত মস্তকে নিউক্লিয়াস থাকে। মধ্য খণ্ড
সংকীর্ণ ও সেন্টিওল যুক্ত।এতে একটি লেজ থাকে যা চলাচলে সাহায্য করে। পরিণত
ডিম্বাণু বড় ও গোলাকার। এতে তিনটি পোলার বডি থাকে।
কাজ
৭। নিডোসাইট (Cnidocyte)
হাইড্রার পদতল ছাড়া বহিঃত্বকের সব জায়গায় এ কোষ দেখতে পাওয়া যায়। কর্ষিকার
পেশী-আবরণী কোষের ফাঁকে ফাঁকে এদের বেশী দেখতে পাওয়া যায়। কোষগুলো বড়,
নিচের দিকে নিউক্লিয়াস থাকে, দ্বি-আবরণবেষ্টিত। কোষের আকার গোল, পেয়ালাকৃতি
বা ডিম্বাকৃতি। ক্ষুদ্র, দৃঢ় ও সংবেদী নিডোসিল কোষের মুক্ত প্রান্তে
অবস্থান করে। অভ্যন্তরের অপারকুলাম দিয়ে আবৃত ও বিষাক্ত হিপনোটক্সিন পূর্ণ
গহ্বর প্যাঁচানো সুতাযুক্ত নেমাটোসিস্ট ধারণ করে। এর সূতার গোড়ায় বড় বড়
তিনটি কাটার মত বার্ব থাকে। পরিস্ফুটনরত নিডোসাইটকে নিডোব্লাস্ট
(Cnidoblast) বলে।
কাজ