সহকারী শিক্ষক
২৫ জানুয়ারি, ২০২৫ ০৯:৩৮ অপরাহ্ণ
“ঔষধি গাছ রোপণ করি রোগ থেকে বেঁচে থাকি”
আসসালামু আলাইকুম। ছোট্ট ছোট্ট সোনামণিদের সুস্বাস্থ্যের জন্য গাছের উপকারিতা জানানোর জন্য এবং বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগের জন্য আমার এই উদ্ভাবনী গল্প “ঔষধি গাছ রোপণ করি রোগ থেকে বেঁচে থাকি”এই গল্পে আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি রত্না খাতুন, সহকারী শিক্ষক, ধাদাশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, পুঠিয়া, রাজশাহী।
১। এই উদ্ভাবনী উদ্যোগটি আমি কেন হাতে নিলামঃ আমাদের হাতের ধারে কাছেই পাওয়া যায় এমন অসংখ্য ঔষধি গাছ যেগুলো সম্পর্কে আমি ও আমার শিক্ষার্থীদের কাছে অজানা। আমি মনে করি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঔষধি গাছ রোপণ করার উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কার্যকর। কারণ গাছের মধ্যে রয়েছে অনেক প্রাকৃতিক ঔষধি গুণাগুণ যা প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যবহার করলে আমার শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হবে। এ জন্যই বিলুপ্ত প্রায় ঔষধি গাছগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আশা, শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিতি করানো আমার উদ্ভাবনীর উদ্দেশ্য। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক অবস্থাতেই প্রাকৃতিক চিকিৎসার সুবিধা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং সেই গাছগুলির ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করতে পারবে। ঔষধি গাছ রোপণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে।
২। আমার শিক্ষার্থীরা কিভাবে উপকৃত হচ্ছেঃ বিদ্যালয়ে ঔষধি গাছ রোপণ করার ফলে আমার শিক্ষার্থীরা নানাভাবে উপকৃত হচ্ছে।
প্রথমত, তারা প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করছে, যা তাদের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। ঔষধি গাছের পরিচর্যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা গাছের গুরুত্ব এবং উপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারছে।
দ্বিতীয়ত, এই প্রক্রিয়াটি শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। তারা কীভাবে গাছের যত্ন নিতে হয়, কীভাবে গাছ বড় হয় এবং কীভাবে গাছের পাতা, ফুল, ফল ও মূল ব্যবহার করে ঔষধি সমস্যার সমাধান করা যায়, তা শিখছে। এটি তাদের বিজ্ঞান এবং জীববিদ্যার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করছে।
তৃতীয়ত, ঔষধি গাছ রোপণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা, এবং কাজের প্রতি একনিষ্ঠা হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে যা তাদের সামাজিক গুণাবলী বিকাশে সহায়ক হচ্ছে। এছাড়াও, এই উদ্যোগটি তাদের মধ্যে দলগত কাজের চর্চা গড়ে তুলছে।
৩। শিক্ষক এবং কর্মচারীদের সহায়তা: আমার এই উদ্ভাবনী উদ্যোগে আমার প্রধান শিক্ষক, সহকর্মী এবং অভিভাবকবৃন্দ আমাকে সবদিক থেকে সহযোগিতা করেছেন। আমার এই উদ্দ্যেগের জন্য বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি নির্দিষ্ট স্থান, গাছ রোপণের সময়, ঔষধি গাছের চারা, সার, এবং পানি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য আমাকে সহযোগিতা করেছেন।
৪। কাজটি কীভাবে করেছিঃ প্রধান শিক্ষক জনাব, দিলরুবা খাতুন ম্যাডামের সহযোগিতা নিয়ে, বিদ্যালয়ের শিশুদের একত্র করে বললাম, "তোমরা কি জানো, আমাদের চারপাশের অনেক গাছ আছে যেগুলো আমাদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে? আমরা যদি এগুলো আমাদের বিদ্যালয়ে লাগাই, তাহলে আমরা যেমন স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাব তেমনি এর উপকারিতাও শিখতে পারব।" এতে বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থী আগ্রাহ প্রকাশ করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে সবাই মিলিত হয়ে পরিচ্ছন্ন টবে সার মিশিয়ে মাটি প্রস্তুত করি। প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী একটি করে ঔষধি গাছ রোপণ করে। কেউ তুলসী, নিম,মহাবিঙ্গরাজ ,রাম বাসক, নিল বাসক, রক্ত বাসক, আদা, আকুন্দ গাছ, থানকুনি পাতা, মিঠা পান, কলাবতী, হলুদ, ড্রাগন, এলোভেরা, নয়নতারা পাথরকুচি, গন্ধ ভাজালি, লেবু, নাকদোনা, আয়াপান, দাদমর্দন, শ্বেত পূর্ণ নভা, জাভাচা, চুকাই প্রজাতি, সর্পগন্ধা, শতমূল, বড় শাল পানি, বিষোহরী ওয়াটার লিফ, ফায়র স্পাইক ইত্যাদি গাছ লাগানো হল। প্রতিটি গাছের পাশে ছোট্ট একটি কাডে লিখে দিয়েছি গাছের নাম। শিক্ষার্থীরা পালাক্রমে প্রতিদিন এই বাগানের পরিচর্যা করে। তারা গাছের বৃদ্ধি দেখে, নিয়মিত পানি দেয়। কিছুদিন পর, গাছগুলো বড় হতে শুরু করল, আর বিদ্যালয় চত্বরে সুন্দর সবুজ আভা ছড়িয়ে পড়ল। এই ঔষধি বাগান শুধু বিদ্যালয়কে নয়, পুরো এলাকাকেই প্রভাবিত করেছে। অভিভাবকরাও সন্তানদের কাছ থেকে ঔষধি গাছের গুণাগুণ শিখে নিজেদের বাড়িতে এসব গাছ লাগানো শুরু করেছে।
৫। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাঃ শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলার জন্য, এক মত হয়ে কাজ করার জন্য আমি আমার বিদ্যালয়ে শতাধিক ঔষুধি গাছ লাগিয়েছি। দিনে দিনে আরো সমৃদ্ধি করতে চাই। প্রত্যেক বিদ্যালয়ে যদি ঔষুধি গাছ থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরা এখান থেকে জ্ঞানলাভ করে আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে। এতক্ষন আমার উদ্ভাবনী গল্পের সাথে থেকে আমাকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সকলের প্রতি রইল আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা, ধন্যবাদ।