Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

৩১ মার্চ, ২০২৬ ০৮:০১ পূর্বাহ্ণ

হিসাব চক্র

হিসাব চক্র (Accounting Cycle) হলো হিসাববিজ্ঞানের এমন একটি ধারাবাহিক বা চক্রাকার প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনগুলো লিপিবদ্ধ করা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা পর্যন্ত কাজগুলো ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয়। একটি নির্দিষ্ট হিসাবকাল (যেমন- এক মাস বা এক বছর) শেষে এই চক্রটি শেষ হয় এবং পরবর্তী হিসাবকালের শুরুতে আবার নতুন করে শুরু হয়।

হিসাব চক্রের প্রধান ধাপগুলো নিচে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো:


১. লেনদেন শনাক্তকরণ ও বিশ্লেষণ (Identifying and Analyzing Transactions)

হিসাব চক্রের প্রথম ধাপ হলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ঘটনার মধ্য থেকে আর্থিক লেনদেনগুলোকে আলাদা করা। এরপর প্রতিটি লেনদেনের সাথে জড়িত দুটি পক্ষ বা হিসাব খাত (ডেবিট ও ক্রেডিট) বিশ্লেষণ করা হয়। এর জন্য চালান, ক্যাশমেমো, ভাউচার ইত্যাদি উৎস দলিল ব্যবহার করা হয়।

২. জাবেদাভুক্তকরণ (Journalizing)

লেনদেনগুলো শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করার পর সেগুলোকে তারিখের ক্রমানুসারে ডেবিট ও ক্রেডিট বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক হিসাবের বইতে লিপিবদ্ধ করা হয়। এই বইকে জাবেদা (Journal) বলা হয়।

৩. খতিয়ানে স্থানান্তর (Posting to Ledger)

জাবেদায় লিপিবদ্ধ লেনদেনগুলোকে এরপর তাদের নিজ নিজ শিরোনাম অনুযায়ী আলাদা আলাদা হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ করে পাকাপাকিভাবে লেখা হয়। এই বইকে খতিয়ান (Ledger) বলা হয়। খতিয়ানের মাধ্যমে প্রতিটি হিসাবের (যেমন- নগদান, মূলধন, ক্রয়, বিক্রয়) নির্দিষ্ট উদ্বৃত্ত বা ব্যালেন্স জানা যায়।

৪. রেওয়ামিল প্রস্তুতকরণ (Unadjusted Trial Balance)

খতিয়ানের হিসাবগুলোর ডেবিট ও ক্রেডিট উদ্বৃত্তগুলো নিয়ে একটি নির্দিষ্ট দিনে হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করার জন্য যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়, তাকে রেওয়ামিল বলা হয়। রেওয়ামিলের ডেবিট ও ক্রেডিট দিক মিলে গেলে ধরে নেওয়া হয় যে হিসাবরক্ষণে বড় কোনো গাণিতিক ভুল নেই।

৫. সমন্বয় দাখিলা (Adjusting Entries)

হিসাবকালের শেষে এমন কিছু লেনদেন থাকতে পারে যেগুলো জাবেদায় লেখা হয়নি বা বকেয়া/অগ্রিম হিসেবে রয়ে গেছে (যেমন- বকেয়া বেতন, অগ্রিম ভাড়া, অবচয় ইত্যাদি)। সঠিক আর্থিক অবস্থা জানার জন্য এই বিষয়গুলোকে হিসাবের বইতে অন্তর্ভুক্ত করতে যে জাবেদা দেওয়া হয়, তাকে সমন্বয় দাখিলা বলে।

৬. সমন্বিত রেওয়ামিল (Adjusted Trial Balance)

সমন্বয় দাখিলাগুলো খতিয়ানে স্থানান্তর করার পর নতুন যে উদ্বৃত্তগুলো পাওয়া যায়, তা দিয়ে আবারও একটি রেওয়ামিল তৈরি করা হয়। একে সমন্বিত রেওয়ামিল বলে। এটি আর্থিক বিবরণী তৈরির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

৭. আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতকরণ (Financial Statements)

হিসাব চক্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এটি। সমন্বিত রেওয়ামিলের সাহায্যে প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি এবং আর্থিক অবস্থা জানার জন্য আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়। এর প্রধান অংশগুলো হলো:

  • বিশদ আয় বিবরণী (Income Statement): নিট লাভ বা ক্ষতি নির্ণয়ের জন্য।

  • মালিকানাস্বত্ব বিবরণী (Statement of Owner's Equity): মালিকের মূলধনের পরিবর্তন জানার জন্য।

  • উদ্বৃত্তপত্র বা আর্থিক অবস্থার বিবরণী (Balance Sheet): প্রতিষ্ঠানের মোট সম্পদ, দায় এবং মালিকানাস্বত্ব প্রদর্শনের জন্য।

৮. সমাপনী দাখিলা (Closing Entries)

আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পর, সাময়িক হিসাবগুলো (সকল আয়, ব্যয় এবং উত্তোলন) বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যে জাবেদা দেওয়া হয়, তাকে সমাপনী দাখিলা বলে। এর ফলে এই হিসাবগুলোর উদ্বৃত্ত শূন্য হয়ে যায় এবং এগুলো পরবর্তী বছরে স্থানান্তরিত হয় না।

৯. সমাপনী-পরবর্তী রেওয়ামিল (Post-Closing Trial Balance)

সমাপনী দাখিলা দেওয়ার পর সাময়িক হিসাবগুলো বন্ধ হয়ে গেলে, শুধুমাত্র স্থায়ী বা বাস্তব হিসাবগুলো (সম্পদ, দায় ও মালিকানাস্বত্ব) নিয়ে যে রেওয়ামিল তৈরি করা হয়, তাকে সমাপনী-পরবর্তী রেওয়ামিল বলে। এটি পরবর্তী হিসাবকালের প্রারম্ভিক উদ্বৃত্ত হিসেবে কাজ করে।

১০. বিপরীত দাখিলা (Reversing Entries) - ঐচ্ছিক ধাপ

পরবর্তী হিসাবকালের শুরুতে গত বছরের কিছু নির্দিষ্ট সমন্বয় দাখিলার (যেমন- বকেয়া আয় বা ব্যয়) প্রভাব বাতিল করার জন্য যে উল্টো জাবেদা দেওয়া হয়, তাকে বিপরীত দাখিলা বলে। এটি হিসাব চক্রের একটি ঐচ্ছিক ধাপ।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট