Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

০১ আগস্ট, ২০২৬ ১১:০১ পূর্বাহ্ণ

মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট; জিরো থেকে প্রো

মনিরুল হক

      বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি কার্যকর উপস্থাপনা বা প্রেজেন্টেশন তৈরির সামর্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সামনে পাঠদান থেকে শুরু করে অফিসের কনফারেন্স হল, সেমিনার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস ডিফেন্স, সর্বত্রই মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সহজ ইন্টারফেস, বৈচিত্র্যময় ডিজাইন বিকল্প এবং শক্তিশালী ফিচারের সমন্বয়ে এই সফটওয়্যারটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেজেন্টেশন তৈরির টুলে পরিণত হয়েছে।

এই আর্টিকেলে আমরা একেবারে শুরু থেকে, অর্থাৎ প্রোগ্রামটি খোলা থেকে শুরু করে একটি সম্পূর্ণ ও পেশাদার প্রেজেন্টেশন তৈরির প্রতিটি ধাপ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব। যাঁরা একেবারে নতুন, তাঁদের জন্য যেমন এটি কাজে আসবে, তেমনি যাঁরা মাঝে মাঝে ব্যবহার করেন তাঁরাও অনেক কার্যকর টিপস ও কৌশল এখানে খুঁজে পাবেন।

 

মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট কী?

মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট হলো মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের তৈরি একটি প্রেজেন্টেশন সফটওয়্যার, যা মাইক্রোসফট অফিস বা মাইক্রোসফট ৩৬৫ প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৮৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এটি প্রতিনিয়ত আরও উন্নত ও আধুনিক হয়েছে। এই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করে স্লাইড-ভিত্তিক উপস্থাপনা তৈরি করা যায়, যেখানে টেক্সট, ছবি, ভিডিও, অডিও, টেবিল, চার্ট, অ্যানিমেশন এবং ট্রানজিশন ইফেক্ট একত্রে সন্নিবেশিত করা সম্ভব।

পাওয়ারপয়েন্টের ফাইল সাধারণত .pptx ফরম্যাটে সংরক্ষিত হয় এবং এটি পিডিএফ, ভিডিও কিংবা ছবি হিসেবেও এক্সপোর্ট করা যায়।

 

পাওয়ারপয়েন্ট চালু করার পদ্ধতিঃ

পাওয়ারপয়েন্ট চালু করা খুবই সহজ। কম্পিউটারের স্টার্ট মেনু থেকে "PowerPoint" টাইপ করে সার্চ করলেই প্রোগ্রামটি পাওয়া যাবে। বিকল্পভাবে, ডেস্কটপে বা টাস্কবারে শর্টকাট থাকলে সরাসরি ডাবল ক্লিক করেও খোলা যায়।

প্রোগ্রামটি খুললে একটি স্বাগত পর্দা বা Start Screen দেখা যায়। এখানে তিনটি প্রধান অপশন থাকেঃ

Blank Presentationঃ একটি সম্পূর্ণ ফাঁকা প্রেজেন্টেশন শুরু করতে এই অপশন বেছে নেওয়া হয়। এখানে ডিজাইন থেকে কন্টেন্ট সব নিজেকে তৈরি করতে হয়।

Templatesঃ পাওয়ারপয়েন্টে অনেক রেডিমেড টেমপ্লেট থাকে। এই টেমপ্লেটগুলো ব্যবহার করলে ডিজাইনের ঝামেলা অনেক কমে যায়। সার্চ বারে যেকোনো বিষয় লিখে (যেমন Education, Business, Nature) সংশ্লিষ্ট টেমপ্লেট খোঁজা যায়।

Recent Filesঃ আগে কাজ করা ফাইলগুলো বাম দিকের তালিকায় দেখা যায়। পুরোনো কাজ চালিয়ে যেতে সেখান থেকে ক্লিক করলেই হয়।

নতুন ব্যবহারকারীদের জন্য পরামর্শ হলো প্রথমে Blank Presentation বেছে নিয়ে নিজেই তৈরি করা শুরু করুন, কারণ এতে প্রতিটি বিষয় হাতে-কলমে শেখার সুযোগ হয়।

 

ইন্টারফেস পরিচিতিঃ

পাওয়ারপয়েন্ট খোলার পর যে পর্দাটি দেখা যায় সেটিই হলো মূল কাজের পরিবেশ। এখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে, যেগুলো চিনে নেওয়া জরুরি।

টাইটেল বারঃ একদম উপরে থাকে। ফাইলের নাম এবং প্রোগ্রামের নাম এখানে দেখা যায়।

রিবন (Ribbon)ঃ টাইটেল বারের নিচে থাকা প্রশস্ত অংশটি হলো রিবন। এখানে Home, Insert, Design, Transitions, Animations, Slide Show, Review, View এই ট্যাবগুলো থাকে। প্রতিটি ট্যাবে সংশ্লিষ্ট কাজের টুলগুলো সাজানো থাকে।

স্লাইড প্যানেল (Slides Panel)ঃ বাম দিকে ছোট আকারে সব স্লাইডের থাম্বনেইল দেখা যায়। এখানে ক্লিক করে যেকোনো স্লাইডে সরাসরি যাওয়া যায়। স্লাইড যোগ করা, মুছে ফেলা বা ক্রম পরিবর্তন করাও এখান থেকেই করা যায়।

কাজের এলাকা (Slide View)ঃ মাঝের বড় অংশটি হলো মূল কাজের জায়গা। এখানেই স্লাইডের কন্টেন্ট তৈরি ও সম্পাদনা করা হয়।

নোটস প্যানেল (Notes Panel)ঃ স্লাইডের একদম নিচে একটি ছোট অংশ থাকে, যেখানে উপস্থাপকের নোট লেখা যায়। স্লাইড শো চলাকালীন দর্শকরা এই নোট দেখতে পান না, কিন্তু উপস্থাপক নিজের স্ক্রিনে দেখতে পারেন।

স্ট্যাটাস বারঃ একদম নিচে থাকে। এখানে মোট স্লাইডের সংখ্যা, বর্তমান স্লাইড নম্বর, ভাষা সেটিং এবং জুম নিয়ন্ত্রণ থাকে।

 

স্লাইড তৈরির ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াঃ

ধাপ ১ঃ প্রেজেন্টেশনের পরিকল্পনা করা

কাজ শুরু করার আগেই মাথায় একটি পরিষ্কার পরিকল্পনা থাকলে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। প্রেজেন্টেশনটি কোন উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে, দর্শক কারা, মোট কতটি স্লাইড থাকবে এবং প্রতিটি স্লাইডে কী থাকবে এই বিষয়গুলো একটি কাগজে লিখে নেওয়া ভালো।

একটি সাধারণ প্রেজেন্টেশনের কাঠামো হতে পারে এরকমঃ প্রথম স্লাইডে শিরোনাম ও উপস্থাপকের নাম, দ্বিতীয় স্লাইডে বিষয়বস্তুর তালিকা বা সূচিপত্র, এরপর একে একে মূল বিষয়গুলো আলাদা আলাদা স্লাইডে এবং শেষে উপসংহার বা ধন্যবাদ স্লাইড।

ধাপ ২ঃ নতুন স্লাইড যোগ করা

Blank Presentation খোলার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি খালি স্লাইড থাকে। নতুন স্লাইড যোগ করার কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে।

সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো বাম দিকের স্লাইড প্যানেলে মাউসের ডান বোতামে ক্লিক করে "New Slide" বেছে নেওয়া। কিবোর্ড শর্টকাট হিসেবে Ctrl + M চাপলেও নতুন স্লাইড যোগ হয়। এছাড়া Home ট্যাব থেকে "New Slide" বোতামে ক্লিক করেও করা যায়।

"New Slide" বোতামের নিচের তির চিহ্নে ক্লিক করলে বিভিন্ন লেআউটের স্লাইড দেখা যায়। যেমন Title Slide, Title and Content, Blank, Two Content ইত্যাদি। কাজের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত লেআউট বেছে নেওয়া উচিত।

ধাপ ৩ঃ স্লাইডের লেআউট নির্বাচন ও পরিবর্তন

লেআউট হলো স্লাইডের প্রাথমিক কাঠামো কোথায় শিরোনাম থাকবে, কোথায় কন্টেন্ট থাকবে তার পূর্বনির্ধারিত বিন্যাস। পাওয়ারপয়েন্টে নয়টি মূল লেআউট থাকে।

ইতোমধ্যে তৈরি কোনো স্লাইডের লেআউট পরিবর্তন করতে চাইলে Home ট্যাবে গিয়ে "Layout" বোতামে ক্লিক করুন। সেখান থেকে পছন্দের লেআউট বেছে নিলে স্লাইডের বিন্যাস বদলে যাবে কিন্তু কন্টেন্ট অক্ষুণ্ণ থাকবে।

 

টেক্সট যোগ ও ফরম্যাটিংঃ

স্লাইডের প্রতিটি নির্ধারিত বাক্সকে বলা হয় Placeholder। এই বাক্সে ক্লিক করলে কার্সর চলে আসে এবং সরাসরি টাইপ করা শুরু করা যায়।

টেক্সট বক্স আলাদাভাবে যোগ করাঃ Insert ট্যাবে গিয়ে "Text Box" নির্বাচন করুন। তারপর স্লাইডের যেকোনো জায়গায় মাউস দিয়ে টেনে একটি বাক্স আঁকুন। সেই বাক্সের ভেতরে ক্লিক করে টাইপ করুন।

ফন্ট ও সাইজঃ Home ট্যাবের Font গ্রুপে ফন্টের নাম এবং সাইজ পরিবর্তন করা যায়। উপস্থাপনায় সাধারণত শিরোনামের জন্য ৩৬-৪৪ পয়েন্ট এবং মূল কন্টেন্টের জন্য ২৪-২৮ পয়েন্ট ব্যবহার করা হয়।

বোল্ড, ইটালিক ও আন্ডারলাইনঃ টেক্সট সিলেক্ট করে Ctrl + B (বোল্ড), Ctrl + I (ইটালিক) এবং Ctrl + U (আন্ডারলাইন) চাপলে কাজ হয়।

রঙ পরিবর্তনঃ টেক্সট সিলেক্ট করে Home ট্যাবে Font Color বোতামের পাশের তির চিহ্নে ক্লিক করুন। সেখান থেকে পছন্দের রঙ বেছে নিন।

বুলেট ও নম্বরঃ তালিকা আকারে কন্টেন্ট দেওয়ার জন্য Home ট্যাবে Bullets এবং Numbering বোতাম রয়েছে। এগুলো দিয়ে বিন্দু বা সংখ্যায় তালিকা তৈরি করা যায়।

প্যারাগ্রাফ বিন্যাসঃ টেক্সটকে বাম, মাঝখান বা ডানে সারিবদ্ধ করতে Home ট্যাবের Alignment অপশন ব্যবহার করুন। লাইনের ফাঁকা জায়গা নিয়ন্ত্রণ করতে Line Spacing অপশন কাজে লাগে।

 

ছবি ও মিডিয়া যোগ করাঃ

প্রেজেন্টেশনকে আকর্ষণীয় করতে ছবি, ভিডিও এবং অন্যান্য মিডিয়া যোগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি যোগ করাঃ Insert ট্যাবে গিয়ে "Pictures" নির্বাচন করুন। "This Device" বেছে নিলে কম্পিউটার থেকে ছবি যোগ করা যাবে। "Online Pictures" বেছে নিলে সরাসরি ইন্টারনেট থেকে ছবি অনুসন্ধান করে যোগ করা যায়।

ছবি যোগ হওয়ার পর সেটিকে ক্লিক করে কোণায় থাকা হাতলগুলো (Handles) টেনে ছবির আকার বাড়ানো বা কমানো যায়। ছবির মাঝে ক্লিক করে মাউস টেনে যেকোনো জায়গায় সরিয়ে নেওয়া যায়।

ছবি সম্পাদনাঃ ছবিতে ক্লিক করলে উপরে Picture Format ট্যাব আসে। এখান থেকে Crop (ছাঁটাই) করা, Artistic Effects দেওয়া, উজ্জ্বলতা ও বৈসাদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ করা এবং Picture Style পরিবর্তন করা যায়।

আইকন যোগ করাঃ Insert ট্যাবে "Icons" অপশন থেকে হাজারো পেশাদার আইকন বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়। সার্চ বারে বিষয় লিখলে সংশ্লিষ্ট আইকন খুঁজে পাওয়া যায়।

স্মার্টআর্ট (SmartArt)ঃ Insert ট্যাব থেকে SmartArt বেছে নিলে বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়া, সংগঠন কাঠামো, সম্পর্ক চিত্র ইত্যাদি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করা যায়। এটি দিয়ে খুব সুন্দরভাবে তথ্যের প্রবাহ বা কোনো প্রক্রিয়ার ধাপগুলো উপস্থাপন করা সম্ভব।

ভিডিও যোগ করাঃ Insert ট্যাবের "Video" অপশন থেকে কম্পিউটারে সংরক্ষিত ভিডিও বা অনলাইন ভিডিওর লিংক যোগ করা যায়। তবে মনে রাখতে হবে, অনলাইন ভিডিও দেখাতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকা জরুরি।

 

আকৃতি (Shapes) ও রেখা (Lines) যোগ করাঃ

Insert ট্যাবে "Shapes" অপশনে ক্লিক করলে বিভিন্ন ধরনের জ্যামিতিক আকৃতি, তির চিহ্ন, কল-আউট বাক্স, সমীকরণ আকৃতি ইত্যাদির একটি বড় তালিকা আসে।

পছন্দের আকৃতিতে ক্লিক করে স্লাইডের উপর মাউস টেনে আঁকা যায়। আকৃতির উপর ডান-ক্লিক করে "Format Shape" বেছে নিলে রঙ, বর্ডার, ছায়া, ত্রিমাত্রিক প্রভাব ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আকৃতির ভেতরেও টেক্সট লেখার সুবিধা আছে, শুধু আকৃতিটিতে ডাবল ক্লিক করুন।

 

চার্ট ও টেবিল যোগ করাঃ

তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের জন্য চার্ট এবং টেবিল অত্যন্ত কার্যকর।

চার্ট যোগ করাঃ Insert ট্যাবে "Chart" নির্বাচন করুন। বার চার্ট, কলাম চার্ট, পাই চার্ট, লাইন চার্টসহ বিভিন্ন ধরনের চার্ট পাওয়া যাবে। চার্টের ধরন বেছে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি এক্সেল শিট খুলবে। সেই শিটে তথ্য বসানো মাত্রই স্লাইডে চার্ট তৈরি হয়ে যায়।

টেবিল যোগ করাঃ Insert ট্যাব থেকে "Table" বেছে নিয়ে কলাম ও সারির সংখ্যা নির্ধারণ করুন। টেবিলের যেকোনো ঘরে ক্লিক করে টাইপ করা যায়। Table Design ট্যাব থেকে টেবিলের রঙ, শৈলী ও বর্ডার পরিবর্তন করা যায়।

 

ডিজাইন ও থিম নির্বাচনঃ

একটি প্রেজেন্টেশনের বাহ্যিক রূপ বা চেহারা নির্ধারণ করে থিম। Design ট্যাবে ক্লিক করলে ডানে অনেক রঙিন থিম দেখা যায়। যেকোনো থিমের উপর মাউস নিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিভিউ দেখা যায়। ক্লিক করলে থিমটি পুরো প্রেজেন্টেশনে প্রয়োগ হয়ে যায়।

Variantsঃ প্রতিটি থিমের কয়েকটি রঙ বৈচিত্র্য বা Variant থাকে। Design ট্যাবের Variants গ্রুপ থেকে সেগুলো বেছে নেওয়া যায়।

Customize Backgroundঃ Design ট্যাবের "Format Background" অপশন থেকে স্লাইডের পটভূমিতে কঠিন রঙ, গ্রেডিয়েন্ট, টেক্সচার বা ছবি ব্যবহার করা যায়।

Slide Sizeঃ Design ট্যাবের "Slide Size" অপশন থেকে প্রেজেন্টেশনের আকার নির্ধারণ করা যায়। আধুনিক প্রজেক্টর ও স্ক্রিনের জন্য Widescreen (16:9) এবং পুরোনো প্রজেক্টরের জন্য Standard (4:3) বেছে নেওয়া উচিত।

 

ট্রানজিশনঃ স্লাইড থেকে স্লাইডে যাওয়ার প্রভাবঃ

ট্রানজিশন হলো এক স্লাইড থেকে অন্য স্লাইডে যাওয়ার সময় যে অ্যানিমেটেড প্রভাব দেখা যায়। এটি প্রেজেন্টেশনকে পেশাদার ও প্রাণবন্ত দেখায়।

Transitions ট্যাবে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ট্রানজিশন দেখা যাবে Fade, Push, Wipe, Split, Reveal, Random Bars ইত্যাদি। যেকোনো একটিতে ক্লিক করলে সেটি নির্বাচিত স্লাইডে প্রয়োগ হয়। "Apply to All" বোতামে ক্লিক করলে একই ট্রানজিশন পুরো প্রেজেন্টেশনে যোগ হয়।

Timing (সময় নিয়ন্ত্রণ)ঃ ট্রানজিশনের গতি Transition > Duration বক্স থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেকেন্ডে মান দিয়ে গতি বাড়ানো বা কমানো যায়।

Sound (শব্দ)ঃ প্রতিটি ট্রানজিশনের সাথে শব্দ যোগ করার সুবিধা থাকলেও অফিস বা শিক্ষার পরিবেশে শব্দ ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ অনেক সময় এটি মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে।

পরামর্শঃ সব স্লাইডে একই ট্রানজিশন রাখুন। বিভিন্ন স্লাইডে বিভিন্ন ট্রানজিশন দিলে প্রেজেন্টেশন অপেশাদার দেখায়। "Morph" ট্রানজিশনটি বিশেষভাবে সুন্দর, এটি একটি স্লাইড থেকে অন্য স্লাইডে উপাদানগুলোকে মসৃণভাবে রূপান্তর করে।

 

অ্যানিমেশনঃ স্লাইডের ভেতরের প্রভাবঃ

ট্রানজিশন যেখানে স্লাইডের মাঝে কাজ করে, অ্যানিমেশন কাজ করে স্লাইডের ভেতরের উপাদানগুলোর উপর। একটি টেক্সট বা ছবি কীভাবে স্লাইডে আসবে, থাকবে বা চলে যাবে তা অ্যানিমেশনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায়।

অ্যানিমেশন যোগ করাঃ প্রথমে যে উপাদানে (টেক্সট বক্স, ছবি, আকৃতি) অ্যানিমেশন দিতে চান সেটি ক্লিক করে নির্বাচন করুন। তারপর Animations ট্যাবে যান। সেখানে বিভিন্ন অ্যানিমেশন প্রভাব দেখা যাবে।

অ্যানিমেশন মূলত তিন ধরনের হয়ঃ

Entrance (প্রবেশঃ) উপাদানটি কীভাবে স্লাইডে আসবে। যেমন Appear, Fade, Fly In, Zoom।

Emphasis (জোরদারঃ) উপাদানটি স্লাইডে থাকা অবস্থায় কোনো প্রভাব দেখাবে। যেমন Pulse, Spin, Grow/Shrink।

Exit (বিদায়ঃ) উপাদানটি কীভাবে স্লাইড থেকে চলে যাবে।

Animation Paneঃ Animations ট্যাবে "Animation Pane" বোতামে ক্লিক করলে ডানে একটি প্যানেল খুলবে। এখানে সব অ্যানিমেশনের তালিকা দেখা যায় এবং তাদের ক্রম পরিবর্তন করা যায়।

Timing (সময়)ঃ প্রতিটি অ্যানিমেশনের শুরুর ধরন নির্ধারণ করা যায় On Click (ক্লিকে শুরু), With Previous (আগেরটির সাথে একসাথে) অথবা After Previous (আগেরটি শেষ হলে)।

 

স্লাইড মাস্টারঃ একসাথে সব স্লাইড সম্পাদনা

স্লাইড মাস্টার হলো পাওয়ারপয়েন্টের একটি শক্তিশালী ফিচার। এটি ব্যবহার করে পুরো প্রেজেন্টেশনের একটি অভিন্ন চেহারা তৈরি করা যায়।

View ট্যাব থেকে "Slide Master" বেছে নিলে একটি বিশেষ সম্পাদনা মোডে প্রবেশ করা যায়। এখানে করা পরিবর্তন পুরো প্রেজেন্টেশনের সব স্লাইডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োগ হয়। যেমন সব স্লাইডে একই লোগো রাখতে চাইলে স্লাইড মাস্টারে যোগ করলেই হবে, বারবার আলাদাভাবে যোগ করার দরকার নেই।

 

হেডার, ফুটার ও স্লাইড নম্বর

Insert ট্যাব থেকে "Header & Footer" বেছে নিলে একটি ডায়ালগ বক্স খুলবে। এখানে স্লাইডের নিচে তারিখ, স্লাইড নম্বর এবং নির্দিষ্ট কোনো লেখা (যেমন বিদ্যালয়ের নাম বা উপস্থাপকের নাম) যোগ করা যায়। "Apply to All" ক্লিক করলে সব স্লাইডে যুক্ত হয়।

 

স্লাইড শোঃ উপস্থাপনা পরিচালনা

প্রেজেন্টেশন তৈরি হয়ে গেলে এটি প্রদর্শনের সময়। Slide Show ট্যাবে গিয়ে নিম্নলিখিত অপশনগুলো ব্যবহার করা যায়।

From Beginning (শুরু থেকে)ঃ F5 চাপলে বা এই বোতামে ক্লিক করলে প্রথম স্লাইড থেকে উপস্থাপনা শুরু হয়।

From Current Slide (বর্তমান থেকে)ঃ Shift + F5 চাপলে বা এই বোতামে ক্লিক করলে যে স্লাইডে আছেন সেখান থেকেই শুরু হয়।

Presenter View (উপস্থাপক দৃশ্য)ঃ দুটি স্ক্রিন সংযুক্ত থাকলে (কম্পিউটার ও প্রজেক্টর) এই মোড ব্যবহার করা উচিত। এতে দর্শকরা স্লাইড দেখেন, আর উপস্থাপক নিজের স্ক্রিনে পরবর্তী স্লাইডের প্রিভিউ এবং নোট দেখতে পান।

স্লাইড পরিবর্তনঃ স্লাইড শোতে মাউসের বাম বোতামে ক্লিক করলে বা কিবোর্ডের ডান তির বা Page Down চাপলে পরের স্লাইডে যাওয়া যায়। বাম তির বা Page Up চাপলে আগের স্লাইডে ফেরা যায়।

লেজার পয়েন্টারঃ স্লাইড শো চলাকালীন Ctrl চেপে মাউস নাড়ালে একটি লাল বিন্দু দেখা যায়, যেটি লেজার পয়েন্টারের মতো কাজ করে।

পর্দায় আঁকাঃ স্লাইড শোতে মাউসের ডান বোতামে ক্লিক করে "Pointer Options" থেকে Pen বা Highlighter নির্বাচন করে স্লাইডের উপর সরাসরি আঁকা বা হাইলাইট করা যায়।

শেষ করাঃ Escape বা Backspace চাপলে উপস্থাপনা শেষ হয়।

 

সংরক্ষণ ও শেয়ার করাঃ

প্রেজেন্টেশন তৈরির পর সেটি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

সাধারণ সংরক্ষণঃ Ctrl + S চাপলে ফাইল সংরক্ষিত হয়। প্রথমবার সংরক্ষণের সময় ফাইলের নাম ও অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়।

Save As (অন্য নামে সংরক্ষণ)ঃ F12 চাপলে বা File > Save As বেছে নিলে আলাদা নামে বা অন্য ফরম্যাটে সংরক্ষণ করা যায়।

পিডিএফ হিসেবে রপ্তানিঃ File > Export > Create PDF/XPS বেছে নিলে ফাইলটি পিডিএফ হিসেবে সংরক্ষণ করা যায়। পিডিএফ ফরম্যাটে পাঠালে অন্যের কম্পিউটারে পাওয়ারপয়েন্ট না থাকলেও দেখা যায়।

ভিডিও হিসেবে রপ্তানিঃ File > Export > Create a Video বেছে নিলে পুরো প্রেজেন্টেশনটি একটি ভিডিও ফাইলে রূপান্তর করা যায়। ইউটিউবে প্রকাশ করতে বা ভিডিও শেয়ার করতে এটি কাজে আসে।

OneDrive-এ সংরক্ষণঃ মাইক্রোসফট ৩৬৫ ব্যবহার করলে ফাইলটি সরাসরি OneDrive-এ সংরক্ষণ করা যায়। এতে যেকোনো ডিভাইস থেকে ফাইলটি অ্যাক্সেস করা সম্ভব হয়।

অটো সেভঃ OneDrive বা SharePoint-এ ফাইল সংরক্ষণ করলে AutoSave চালু হয়, যা প্রতি কয়েক সেকেন্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফাইল সংরক্ষণ করে।

 

স্পেলচেক ও সম্পাদনা টুলঃ

Review ট্যাবে গিয়ে বানান ও ব্যাকরণ পরীক্ষা করা যায়। বাংলা টেক্সটের জন্য এই সুবিধা সীমিত হলেও ইংরেজি টেক্সটের ভুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত হয়। ফাইনাল প্রেজেন্টেশন দেওয়ার আগে অবশ্যই একবার পুরো স্লাইড পড়ে দেখুন।

 

একটি পরিপূর্ণ প্রেজেন্টেশনের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শঃ

প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি একটি কার্যকর প্রেজেন্টেশনের জন্য কিছু সাধারণ নীতি মেনে চলা উচিত।

স্লাইডে বেশি লেখা নয়ঃ প্রতিটি স্লাইডে সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে ছয়টি বুলেট পয়েন্ট রাখুন এবং প্রতিটি পয়েন্টে সর্বোচ্চ দশটি শব্দ রাখার চেষ্টা করুন। স্লাইড হলো উপস্থাপকের কথার সহায়ক, পুরো বক্তৃতার বিকল্প নয়।

রঙের সামঞ্জস্যঃ পুরো প্রেজেন্টেশনে দুই থেকে তিনটি মূল রঙ ব্যবহার করুন। খুব বেশি রঙ প্রেজেন্টেশনকে এলোমেলো দেখায়।

পাঠযোগ্য ফন্টঃ সরল ও পরিষ্কার ফন্ট ব্যবহার করুন। Calibri, Arial, Gill Sans এগুলো প্রেজেন্টেশনের জন্য খুব ভালো। হাতের লেখার মতো ফন্ট দূর থেকে পড়া কঠিন হয়।

উচ্চ বৈসাদৃশ্যঃ পটভূমি ও টেক্সটের রঙের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রাখুন। সাদা পটভূমিতে কালো বা গাঢ় নীল রঙের লেখা, অথবা গাঢ় পটভূমিতে সাদা লেখা সবচেয়ে স্পষ্ট দেখায়।

ছবির মান ও প্রাসঙ্গিকতাঃ শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য ছবি ব্যবহার না করে বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক ছবি ব্যবহার করুন। কম রেজোলিউশনের ছবি বড় পর্দায় ঝাপসা দেখায়।

অনুশীলনঃ প্রেজেন্টেশনের আগে বেশ কয়েকবার অনুশীলন করুন। নিজের কণ্ঠস্বর রেকর্ড করে শুনুন। সময়ের মধ্যে শেষ করা যাচ্ছে কিনা যাচাই করুন।

 

মাইক্রোসফট পাওয়ারপয়েন্ট একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বহুমুখী সফটওয়্যার। প্রথমবার দেখলে হয়তো কিছুটা জটিল মনে হতে পারে, কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারের সাথে সাথে এটি খুবই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এই আর্টিকেলে বর্ণিত ধাপগুলো অনুসরণ করে যেকোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা পেশাদার ব্যক্তি একটি পরিপূর্ণ ও আকর্ষণীয় প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে পারবেন।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার এই যাত্রায় ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন সকলের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। পাওয়ারপয়েন্টের মতো সফটওয়্যার দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে পারলে তথ্য উপস্থাপনের সক্ষমতা বাড়ে, কাজের মান উন্নত হয় এবং নিজেকে আরও কার্যকরভাবে প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি হয়।

 

লেখকঃ মনিরুল হক

সহকারী শিক্ষক

আমলাবাড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয়

খোকসা, কুষ্টিয়া।

০১৭২২ ২৭৩২৭২

[email protected]

 

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট