Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৫২ অপরাহ্ণ

নিমগাছ (বনফুল)
নিমগাছ' বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক বনফুল (বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়)-এর একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীকী ছোটগল্প। গল্পটি ১৯৪৭ সালে তাঁর 'অদৃশ্যলোক' নামক গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত হয়। অতি ক্ষুদ্র অবয়বের এই গল্পটিতে লেখক অসাধারণ শিল্পের সাহায্যে এক চিরন্তন সামাজিক সত্যকে তুলে ধরেছেন। 
নিমগাছ গল্পের মূল উপাদানগুলো নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. নিমগাছের উপকারিতা ও অবহেলা
গল্পের প্রথমাংশে নিমগাছের নানাবিধ ভেষজ ও ব্যবহারিক গুণের কথা বলা হয়েছে:
  • ছাল ও পাতা: নিমের ছাল সেদ্ধ করে বা পাতা পিষে মানুষ খোস-পাচড়া, দাদ বা চুলকানির মতো চর্মরোগের মহৌষধ হিসেবে ব্যবহার করে।
  • কচি পাতা ও ডাল: অনেকে যকৃতের (লিভার) উপকারের জন্য নিমের কচি পাতা কাঁচা বা বেগুন দিয়ে ভেজে খায়। কচি ডাল দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত ভালো থাকে।
  • হাওয়া ও কবিরাজ: কবিরাজরা নিমের হাওয়ার প্রশংসা করেন এবং সাধারণ মানুষও বাড়ির পাশে নিমগাছ থাকলে ভালো মনে করে। কিন্তু গাছটির গুণাগুণ সবাই ভোগ করলেও কেউ এর যত্ন নেয় না; গাছটি চারপাশের আবর্জনা স্তূপের মধ্যেই অবহেলায় বেড়ে ওঠে।
২. কবির আগমন
একদিন এক নতুন ধরনের মানুষ অর্থাৎ একজন কবি আসেন। তিনি অন্য সবার মতো নিমের ছাল, পাতা বা ডাল ছিঁড়লেন না। তার বদলে তিনি নিমগাছটির থোকা থোকা ফুলের রূপ এবং তার সৌন্দর্যের মুগ্ধ প্রশংসা করলেন। কবির এই মমত্ববোধ ও সৌন্দর্যচেতনা দেখে নিমগাছটির খুব ইচ্ছে হলো কবির সাথে চলে যেতে। কিন্তু মাটির গভীরে তার শিকড় এতদূর চলে গেছে যে, সে শত চেষ্টা করলেও কবির সাথে যেতে পারল না। 
৩. মূলভাব ও শেষ চরণের ম্যাজিক
গল্পটির আসল মোড় এবং চমৎকারিত্ব লুকিয়ে আছে এর একদম শেষ লাইনে, যাকে বলা হয় "ম্যাজিক বাক্য"। লেখক লিখেছেন:
"ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।" 
এই একটি লাইনের মাধ্যমে পুরো গল্পটি একটি সাধারণ গাছের গল্প থেকে সমাজের নারীদের জীবনের একটি প্রতীকী রূপকে রূপান্তর লাভ করে: 
  • তুলনা: নিমগাছটি যেভাবে মুখ বুজে সংসারের সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে উপকার করে যায় কিন্তু নিজে পায় চরম অবহেলা ও আবর্জনা, ঠিক তেমনি বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের লক্ষ্মী বউটিও দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে সবাইকে আগলে রাখে। 
  • শিকড়ের বন্ধন: বউটিরও কখনো কখনো ইচ্ছে করে এই অবহেলা আর খাঁচাসদৃশ সংসার ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে, কিন্তু সংসারের মায়া, দায়িত্ব ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা রূপী পারিবারিক শিকড় তাকে মাটির সাথে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যে সে শত কষ্টের পরেও সংসার ছেড়ে যেতে পারে না।

বনফুল অতি অল্প কথায় সংসারের ঘেরাটোপে বন্দি ও অবহেলিত নারী জীবনের এই ট্র্যাজেডি নিমগাছের প্রতীকের মাধ্যমে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। 
মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট