বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'অপরিচিতা' গল্পটি মূলত একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বাঙালি সমাজের যৌতুকপ্রথার নিষ্ঠুরতা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং তার বিরুদ্ধে এক সাহসী নারীর আত্মমর্যাদাবোধ ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে 'সবুজ পত্র' পত্রিকায়) প্রকাশিত এই গল্পটি তৎকালীন সমাজব্যবস্থাকে এক চরম আঘাত হেনেছিল।
নিচে গল্পটির মূল বিষয়বস্তু ও সারসংক্ষেপ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. অনুপমের আত্মকাহিনী ও ব্যক্তিত্বহীনতা
- অনুপমের পরিচয়: গল্পের কথক অনুপম একজন উচ্চশিক্ষিত (এম.এ. পাস) ধনী পরিবারের সন্তান। তবে সে অত্যন্ত নরমপন্থী এবং মা ও মামার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এক ব্যক্তিত্বহীন যুবক।
- সংসারের চালিকাশক্তি: অনুপমের বাবা মারা যাওয়ার পর তার মামাই সংসারের আসল অভিভাবক হয়ে ওঠেন, যাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল যেকোনো উপায়ে বংশের ধন ও মান বৃদ্ধি করা।
২. বিয়ের সম্বন্ধ ও যৌতুকের টানাপোড়েন
- কল্যাণীর সন্ধান: অনুপমের বন্ধু হরিশের মাধ্যমে কোলকাতার বাইরে সংলগ্ন অঞ্চলের (কনৌজ) এক চিকিৎসকের মেয়ে কল্যাণীর সন্ধান মেলে। কল্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ বাবু একজন আত্মমর্যাদাশীল ও স্পষ্টভাষী মানুষ ছিলেন।
- মামার লোভ: মামা কোলকাতার বাইরে বিয়ে দিতে রাজি হন কেবল কল্যাণীর পরিবার ধনাঢ্য এই আশায় এবং ছলে-বলে-কৌশলে যৌতুক আদায় করার উদ্দেশ্যে।
৩. বিয়ের আসরে অপমান ও বিয়ে ভাঙা
- স্বর্ণ পরীক্ষা: বিয়ের আসরে অনুপমের মামা শম্ভুনাথ বাবুকে সন্দেহ করেন এবং একজন সেকরা (স্বর্ণকার) এনে কনের গা থেকে সমস্ত গহনা খুলে তা আসল কি না তা পরীক্ষা করান।
- শম্ভুনাথ বাবুর সিদ্ধান্ত: এই চরম অপমানে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে শম্ভুনাথ বাবু বিয়ে ভেঙে দেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যে পরিবার তাঁর মেয়েকে চোর মনে করে, সেই পরিবারে তিনি মেয়ে দেবেন না। এমনকি তিনি বরযাত্রীদের খাইয়ে সসম্মানে বিদায় করে দেন, অথচ অনুপম সেখানে কোনো প্রতিবাদ না করে কাপুরুষের মতো চুপ করে থাকে।
৪. কল্যাণীর আত্মপ্রকাশ ও অনুপমের অনুশোচনা
- রেলস্টেশনের ঘটনা: বিয়ের বেশ কিছুদিন পর এক রেলযাত্রায় অনুপমের সঙ্গে এক অপরিচিতা তরুণীর দেখা হয়, যার কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্ব অনুপমকে মুগ্ধ করে। পরে সে জানতে পারে এই মেয়েটিই সেই 'কল্যাণী'।
- কল্যাণীর ব্রত: কল্যাণী আর বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশমাতৃকার সেবায় ও মেয়েদের শিক্ষাদানে নিজেকে উৎসর্গ করেছে।
- অনুপমের রূপান্তর: কল্যাণীর এই দীপ্ত রূপ দেখে অনুপমের ভেতরের পুরুষত্ব জেগে ওঠে। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মায়ের অমতেই কল্যাণীর কাছাকাছি থাকার জন্য কানপুরে চলে যায় এবং তার কাজে সাহায্য করতে শুরু করে।
মূল চেতনা:
'অপরিচিতা' গল্পে কল্যাণী কেবল একটি চরিত্র নয়, সে তৎকালীন শৃঙ্খলিত ও নির্যাতিত নারী সমাজের জাগরণের প্রতীক। যৌতুকের লোভী মানসিকতার মুখে থুতু দিয়ে নিজের আত্মমর্যাদাকে টিকিয়ে রাখার যে সাহস কল্যাণী দেখিয়েছে, তা-ই এই গল্পের মূল চালিকাশক্তি। আর অনুপমের ডায়েরির পাতায় ফুটে উঠেছে তার সারাজীবনের অনুশোচনা ও কল্যাণীর সান্নিধ্যে থেকে নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরে পাওয়ার এক নীরব সাধনা।