Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৫:৩৬ অপরাহ্ণ

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'বিলাসী'
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত 'বিলাসী' গল্পটি সমাজ-সংসারের জাত-পাত, কুসংস্কার এবং তথাকথিত রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে (১৩২৫ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায়) 'ভারতী' পত্রিকায় এটি প্রথম প্রকাশিত হয়। গল্পটি মূল কথক 'ন্যাড়া' নামের এক যুবকের জবানবন্দিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
নিচে গল্পটির মূল বিষয়বস্তু ও সারসংক্ষেপ সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসীর পরিচয়
  • মৃত্যুঞ্জয়ের একাকীত্ব: মৃত্যুঞ্জয় ছিল গ্রামের এক অনাথ যুবক। তার কিছু জমিজমা ও বাগান থাকলেও আত্মীয়দের চরম অবহেলা ও শঠতার কারণে সে একা ও প্রায় সমাজবিচ্ছিন্ন জীবন কাটাত।
  • বিলাসীর সেবা ও ভালোবাসা: মৃত্যুঞ্জয় যখন এক মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী, তখন সাপুড়ে কন্যে বিলাসী নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত এক করে সেবা দিয়ে তাকে সুস্থ করে তোলে। এই সেবার সূত্র ধরেই তাদের মধ্যে গভীর ভালোবাসার জন্ম হয়।
২. জাত-পাত ও সমাজের নিষ্ঠুরতা
  • জাত হারানো ও গৃহত্যাগ: একজন নিচু জাতের (সাপুড়ে) মেয়েকে বিয়ে করায় এবং তার হাতের অন্ন গ্রহণ করায় রক্ষণশীল সমাজ মৃত্যুঞ্জয়কে তীব্র ধিক্কার জানায়। মৃত্যুঞ্জয়ের পিশেমশাই ও সমাজের মাতব্বরেরা মিলে বিলাসীর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় এবং তাকে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়।
  • সাপুড়ে জীবন: সমাজচ্যুত হয়ে মৃত্যুঞ্জয় বিলাসীর ঘরে আশ্রয় নেয় এবং নিজের জাত ও সমাজ ত্যাগ করে বিলাসীর বাবার পেশা অর্থাৎ সাপুড়ের পেশা বেছে নেয়। সে বিলাসীর ভালোবাসার মাঝেই প্রকৃত সুখ খুঁজে পায়।
৩. ট্র্যাজেডি ও বিলাসীর আত্মাহুতি
  • মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু: একদিন এক গোখরো সাপ ধরতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সাপের কামড়ে মৃত্যুঞ্জয় মারা যায়। ওঝা ও বিলাসীর সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে বিষের তীব্রতায় তার মৃত্যু ঘটে।
  • বিলাসীর আত্মহত্যা: মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুর পর বিলাসীর পৃথিবী সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে যায়। যে সমাজের জন্য সে এত লাঞ্ছনা সহ্য করেছিল, সেই সমাজে একাকী বেঁচে থাকার কোনো অর্থ সে খুঁজে পায়নি। ফলে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুর সাত দিনের মাথায় সে বিষপানে আত্মহত্যা করে।
৪. সমাজের ভন্ডামি ও ন্যাড়ার উপলব্ধি
  • গল্পের কথক ন্যাড়া তৎকালীন সমাজের ভন্ড ও নিষ্ঠুর রূপটি খুব কাছ থেকে দেখেছে। যে সমাজ বিলাসীর জীবদ্দশায় তাকে দু-মুঠো অন্নের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, তার মৃত্যুর পর সেই সমাজই আবার বিলাসীর আত্মহত্যাকে 'পাপ' বলে নিন্দা করতে ছাড়েনি।
  • ন্যাড়া উপলব্ধি করেছে যে, হিন্দু সমাজের তথাকথিত উচ্চবর্ণের কৃত্রিম ও নিয়মসর্বস্ব জীবনের চেয়ে বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়ের অন্ত্যজ, অকৃত্রিম ও ত্যাগী ভালোবাসার মর্যাদা অনেক বেশি।

মূল চেতনা:
'বিলাসী' গল্পটি মূলত প্রেমের চিরন্তন শক্তির জয়গান গায়, যা জাত-পাত, সমাজ ও ধর্মের সংকীর্ণ প্রাচীরকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। শরৎচন্দ্র এই গল্পের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, মানবতাই ধর্মের চেয়ে বড় এবং ভালোবাসার শক্তি সমাজের তৈরি যেকোনো নিয়মের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট