মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন রচিত 'অর্ধাঙ্গী' প্রবন্ধটি বাংলা সাহিত্যে নারী জাগরণ ও নারী-পুরুষের সমঅধিকার আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক দলিল। এটি তাঁর বিখ্যাত 'মতিচূর' (১ম খণ্ড, ১৯০৪) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রবন্ধে তিনি অত্যন্ত যুক্তি, সাহসিকতা ও হাস্যরসের ছলে তৎকালীন সমাজে নারীর পরাধীনতা এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অসারতা তুলে ধরেছেন।
নিচে প্রবন্ধটির মূল বিষয়বস্তু ও সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
১. 'অর্ধাঙ্গী' শব্দের প্রকৃত অর্থ ও বাস্তবতা
- তাত্ত্বিক বনাম বাস্তব রূপ: পুরুষেরা মুখে নারীকে 'অর্ধাঙ্গী' (শরীরের অর্ধেক অংশ) বা 'সহধর্মিণী' বলে সম্মান দেখানোর ভান করলেও, বাস্তবে নারীকে দাসী বা খেলনা হিসেবে গণ্য করে।
- অঙ্গহানি সমাজ: বেগম রোকেয়া চমৎকার একটি রূপক ব্যবহার করে বলেছেন, স্বামী যদি সমাজের 'দক্ষিণ হস্ত' (ডান হাত) হয়, তবে স্ত্রী হলো তার 'বাম হস্ত' (বাম হাত)। কিন্তু তৎকালীন সমাজে বাম হাতটিকে (নারীকে) অকেজো ও পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। একটি হাত পঙ্গু থাকলে যেমন পুরো শরীর অবশ হয়ে যায়, তেমনি নারীকে পিছিয়ে রেখে সমাজ কখনো উন্নত হতে পারে না।
২. শিক্ষা ও যোগ্যতার বৈষম্য
- মানসিক দাসত্ব: পুরুষেরা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করছে; আর নারীরা ঘরের কোণে বন্দি থেকে কেবল রান্নাবান্না ও সন্তান পালনেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
- দৃষ্টান্ত: রোকেয়া দেখিয়েছেন, একজন উচ্চশিক্ষিত বি.এ. বা এম.এ. পাস স্বামীর পাশে যখন একজন নিরক্ষর বা নামমাত্র অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন স্ত্রী বসেন, তখন তাদের মানসিকতায় কোনো মিল থাকে না। স্ত্রী তখন স্বামীর প্রকৃত জীবনসঙ্গী না হয়ে কেবল একজন গৃহদাসী বা বাধ্য আশ্রিতা মাত্র হয়ে ওঠেন।
৩. অলংকার ও কৃত্রিম সৌন্দর্যের মোহ
- অলংকার হলো দাসত্বের শৃঙ্খল: পুরুষেরা নারীদের দামী গহনা ও ভালো কাপড় দিয়ে ভুলিয়ে রাখে, যাতে তারা নিজেদের পরাধীনতার কথা ভুলে থাকে। রোকেয়া এই অলংকারকে 'দাসত্বের কঙ্কণ' বা বন্দিত্বের শৃঙ্খল হিসেবে অভিহিত করেছেন। কুকুরের গলায় যেমন দামী চেইন পরালে সে স্বাধীন হয় না, তেমনি স্বর্ণালংকারে ভূষিত হলেই নারীর মুক্তি আসে না।
৪. স্বাবলম্বিতা ও নারী জাগরণের ডাক
- পুরুষের দয়া বর্জন: নারীদেরকে পুরুষের কৃপা বা দয়ার ওপর বেঁচে থাকা বন্ধ করতে হবে। নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেদেরই শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে।
- সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা: রোকেয়া স্পষ্ট করেছেন যে, সমাজকে সচল রাখতে হলে নারী ও পুরুষ উভয় চাকাকেই সমান শক্তিশালী হতে হবে। গাড়ি যেমন একটি বড় আর একটি ছোট চাকা নিয়ে চলতে পারে না, সমাজও তেমনি পুরুষকে শিক্ষিত আর নারীকে অশিক্ষিত রেখে প্রগতির পথে এগোতে পারে না।
মূল চেতনা:
'অর্ধাঙ্গী' প্রবন্ধের মূল বাণী হলো—নারী পুরুষের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযাত্রী। সমাজ ও মানবজাতির সার্বিক কল্যাণের জন্য নারীর বুদ্ধি, শিক্ষা ও চিন্তার মুক্তি অপরিহার্য। বোরকা ও চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে বেরিয়ে এসে নারীকে তার যোগ্য আসনটি ছিনিয়ে নেওয়ার আহ্বানই এখানে জানানো হয়েছে।