Loading..

পাঠসংশ্লিষ্ট ছবি/ইমেজ

রিসেট

০৫ নভেম্বর, ২০২৬ ০৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমি

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) জনগণের মাতৃভাষার অধিকার ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম। এ আন্দোলনের মূল পটভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই তৈরি হয়েছিল।

১. পাকিস্তান সৃষ্টি ও ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য (১৯৪৭) ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে পাকিস্তান গঠিত হয় দুটি অংশ নিয়ে—পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। ভৌগোলিক দূরত্ব ছাড়াও দুই অংশের ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিশাল অমিল ছিল। সমগ্র পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৬ শতাংশ ছিল বাঙালি এবং তাদের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অথচ শাসকগোষ্ঠীর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা শুরু থেকেই সংখ্যাগরিষ্ঠের মুখের ভাষাকে উপেক্ষা করতে শুরু করে।

২. প্রাথমিক বিতর্ক ও তমদ্দুন মজলিস ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর তীব্র প্রতিবাদে ঢাকায় বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রসমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে গঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’ বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পুস্তিকা প্রকাশ করে এবং প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলে।

৩. ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক দাবি (১৯৪৮) ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে করাচির অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহারের দাবি উত্থাপন করেন। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানসহ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ এ দাবি নাকচ করে দেন, যা বাঙালি সমাজের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

৪. জিন্নাহর বিতর্কিত ঘোষণা (১৯৪৮) ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন—"Urdu, and only Urdu, shall be the state language of Pakistan." কার্জন হলে উপস্থিত ছাত্ররা তাৎক্ষণিকভাবে "No, No" বলে তাঁর এই একতরফা সিদ্ধান্তের জোরালো প্রতিবাদ জানায়।

৫. আরবি হরফে বাংলা চালুর অপচেষ্টা বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষাকে দুর্বল করার লক্ষ্যে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার আরবি কিংবা রোমান হরফে বাংলা লেখার অদ্ভুত ও অবাস্তব প্রস্তাব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা এর কঠোর প্রতিবাদ জানান।

৬. খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণা ও ১৯৫২ সালের বিস্ফোরণ ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পুনরায় ঘোষণা করেন যে, কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এ ঘোষণা আগুনে ঘি ঢালে। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়।

৭. ১৪৪ ধারা ও চরম পরিণতি (২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) বিক্ষোভ দমন করতে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজপথে মিছিল বের করেন। পুলিশ মেডিকেল কলেজ ও হোস্টেল এলাকায় ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং একপর্যায়ে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে বরকত, রফিক, সালাম, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।

এই রক্তক্ষয়ী আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই ভাষা আন্দোলন তীব্র গণজাগরণে রূপ নেয়, যা পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে সরকারকে বাধ্য করে এবং বাঙালির স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল ভিত রচনা করে।

মন্তব্য করুন

সম্পর্কিত পোস্ট