Loading..

ব্লগ

রিসেট

১২ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

"প্রাথমিক শিক্ষা অভিনব এক চক্রবুহে আবদ্ধ"

প্রাথমিক শিক্ষা: এক অভিনব চক্রব্যূহের আবর্তে

একটি জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপিত হয় তার প্রাথমিক শিক্ষার ওপর। বুনিয়াদি শিক্ষা হিসেবে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব তাই সর্বাধিক এবং এ কথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান সরকার এই খাতকে শক্তিশালী করতে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, নতুন বই বিতরণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। কিন্তু প্রশংসার পাশাপাশি যখন গভীরে দৃষ্টিপাত করা হয়, তখন কিছু তিক্ত বাস্তবতাও সামনে আসে। প্রচলিত সমালোচনা বা ফেসবুকের আলোচিত বিষয়গুলোকে ছাপিয়ে আজ আমরা যদি প্রান্তিক অঞ্চলের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাবআমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা এক অভিনব ও জটিল চক্রব্যূহে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ সহজে মিলছে না।

এই চক্রব্যূহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উপজেলা শহর থেকে ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রত্যন্ত গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০০-এর কাছাকাছি থাকলেও শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪, ৫ বা সর্বোচ্চ ৬ জনে সীমাবদ্ধ। শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হলো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যৌক্তিক অনুপাত। এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র কয়েকজন শিক্ষকের পক্ষে কখনোই মানসম্মত পাঠদান, ব্যক্তিগত মনোযোগ এবং শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ফলে গোড়াতেই একটি বড় ঘাটতি নিয়ে এই বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে চলে।

সমস্যার দ্বিতীয় স্তরটি আরও জটিল। এই স্বল্প সংখ্যক শিক্ষকের মধ্যে যাঁরা শহর থেকে আসেন, তাঁদের অধিকাংশই গ্রামীণ পরিবেশে স্থায়ী হতে চান না। উন্নত জীবনযাত্রা, পারিবারিক সুবিধা এবং উন্নত পরিবেশের আকর্ষণে তাঁরা প্রতিনিয়ত শহরে বদলি হওয়ার চেষ্টা করেন। এটি কোনো একক শিক্ষকের দোষ নয়, বরং একটি সামাজিক ও কাঠামোগত বাস্তবতা। ফলে একটি বিদ্যালয়ে থিতু হওয়ার আগেই তাঁরা সুযোগ বুঝে বদলি হয়ে যান। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের পদগুলো দীর্ঘদিনের জন্য শূন্য হয়ে পড়ে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গভীর ক্ষত তৈরি করে।

এই শূন্যতা পূরণের প্রক্রিয়াটিই যেন চক্রব্যূহটিকে আরও মজবুত করে তোলে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যখন শূন্য পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন প্রায়শই তাঁরা হন প্রশিক্ষণবিহীন। একজন নতুন ও অনভিজ্ঞ শিক্ষকের পক্ষে গ্রামীণ বিদ্যালয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা এমনিতেই কঠিন। কিন্তু বিড়ম্বনা এখানেই শেষ নয়। চাকরিতে যোগদানের কিছুদিন পরেই এই নতুন শিক্ষকদের বাধ্যতামূলক সি-ইন-এড বা ডিপিএড প্রশিক্ষণে চলে যেতে হয়। যে শিক্ষক স্বল্পতার সংকট দূর করতে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হলো, সেই সংকট প্রশিক্ষণের কারণে আগের চেয়েও তীব্রতর হয়ে ফিরে আসে। বিদ্যালয়টি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে।

এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ পাওয়া তরুণ নারী শিক্ষকেরা একসময় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যান। এটি তাঁদের  আইনগত অধিকার, কিন্তু আমাদের ভঙ্গুর ব্যবস্থার কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটিও শিক্ষক সংকটের আগুনে ঘি ঢালে। ফলে পরিস্থিতি সেই ‘যে লাউ, সেই কদুই’ থেকে যায়। এর ওপর রয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের জেরে সৃষ্ট ‘ডেপুটেশন’ নামক এক অদ্ভূত ব্যবস্থা, যা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষকশূন্য করে ফেলে।

সুতরাং, বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে অনেকটা এ রকম: অপর্যাপ্ত শিক্ষক পদ শিক্ষকদের বদলির প্রবণতা > দীর্ঘমেয়াদী শূন্যপদ > প্রশিক্ষণবিহীন নতুন নিয়োগ > প্রশিক্ষণে গমনের ফলে পুনরায় সংকট > মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ডেপুটেশনের কারণে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়া। এটি এমন এক দুষ্টচক্র, যা থেকে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে গ্রামীণ শিক্ষা, বের হতে পারছে না। প্রতিটি সমাধানই যেন একটি নতুন সমস্যার জন্ম দিচ্ছে।

এই চক্রব্যূহ থেকে মুক্তির পথ হয়তো কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিকেন্দ্রীভূত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, শিক্ষকদের আবাসন নিশ্চিত করা, স্থানীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াটিকে চাকরিতে যোগদানের পূর্বে বা বিকল্প কোনো উপায়ে সম্পন্ন করার কথা ভাবতে হবে।

যতদিন না আমরা এই চক্রব্যূহ ভাঙার জন্য সমন্বিত ও টেকসই পদক্ষেপ নিতে পারছি, ততদিন মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার স্বপ্ন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তবু আমরা স্বপ্ন দেখি, কারণ স্বপ্নকে কোনো চক্রব্যূহ আটকে রাখতে পারে না। একদিন হয়তো আমাদের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এই নীরব সংকটের গভীরে পৌঁছাবে এবং প্রান্তিক শিশুদের কলরবে মুখরিত বিদ্যালয়গুলো সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারখানায় পরিণত হবে।

মন্তব্য করুন