Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ জুন, ২০২০ ১২:০৫ অপরাহ্ণ

আযানের শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ, আজানের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং আযানের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সমূহের আলোচনা

আযান শব্দটি আরবি, এর আভিধানিক অর্থ ঘোষণা দেওয়া, আহবান করা, জানিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। শরীয়তের পরিভাষায় সুনিদ্দির্ষ্ট শব্দাবলী দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ে মুসলমানদের কে সালাতেরর সময়ের এ'লানকে আজান বলা হয়।

পবিত্র কুরআনে আজান শব্দ: মহান আল্লাহ তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন,  واذان من الله ورسوله অর্থ: আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা। সূরা তাওবা (০৩)

আরো এরশাদ করেছেন, “ফা’আযযানা মুয়াজ্জিনুম বাইনাহুম।” অর্থ: একজন ঘোষণাকারী তাদের মধ্যে ঘোষণা করলো। সূরা আল-আরাফ (৪৪)

 সুরা জুমআতে এরশাদ হয়েছে, “ হে ঈমানদারগণ, যখন জুমাআর দিন নামাযের আযান হয়। তখন আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর।  সূরা জুমুআ (৯)

আজানের সূচনা: মদীনায় হিজরতের পর নামাযের জন্য আহবান করার নির্দিষ্ট কোন নিয়ম ছিলনা। প্রত্যেকে নিজ নিজ উদ্যোগে মসজিদে একত্রিত হলে নামায আরম্ভ হতো। যখন মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলো তখন সাহাবায়ে কেরাম নামাযের সময় সম্পর্কে মুসলমানদেরকে জানিয়ে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবলেন। স্ব-স্ব মত প্রকাশ করলেন, কেউ প্রস্তাব দিলেন নামাযের সময় আগুন জ্বালানো হোক। এ প্রস্তাবে আপত্তি হলো কারণ এটা ইয়াহুদীদের প্রথা। কেউ প্রস্তাব করলেন ঘণ্টা বাজানো হোক। এর উপরও আপত্তি হলো কারণ এটা খৃষ্টানদের প্রথা। মুসলমানরা বিজাতীয় সংস্কৃতি অনুসরণ করতে পারে না। ঐ রাতেই প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন যায়দ (রা.) স্বপ্নযোগে আজানের শব্দগুলো শুনতে পান, ইকামতের বাক্যগুলোও তাঁকে শিখিয়ে দেওয়া হয়। তিনি সকালে স্বপ্নের ঘটনা বিস্তারিতভাবে নবীজিকে ব্যক্ত করলেন, ঘটনা শুনে নবীজি বললেন এটি সত্য স্বপ্ন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাক্যগুলো হযরত বেলাল (রা.) কে শিখিয়ে দিতে বললেন। বোখারী শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত ওমর (রা.) বললেন, নামাযের ঘোষনা দেওয়ার জন্য তোমরা কি একজন লোক পাঠাতে পার না? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বেলাল! উঠ নামাযের জন্য ঘোষণা দাও। আজান শুনে হযরত ওমর (রা.) নবীজিকে জানান তিনিও রাতে স্বপ্নযোগে অনুরূপ আজানের বাক্য শুনেছেন। (মিরআতুল মানাজীহ ১ম খণ্ড, আযান অধ্যায়)

হযরত বেলাল (রা.)’র কন্ঠে প্রথম আযান ধ্বনিত হয়। মদীনার মসজিদে নববী শরীফে তিনি প্রথম আজান দেন। পরবর্তী পর্যায়ে মক্কা শরীফ বিজয়ের পর কাবাঘরে তিনিই প্রথম আজান দেন।

হাদীস শরীফের আলোকে আযানের ফযীলত: প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি সাত বৎসর যাবত শুধু সওয়াবের জন্য আযান দেয়, তার জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তি লিখে দেওয়া হয়। (তিরমিযী, আবু দাউদ ও ইবনে মযাহ শরীফ)

হযরত মুয়াবিয়া  রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “মুয়াজ্জিনগণ কিয়ামতের দিন সবচেয়ে উচুঁ গর্দানের অধিকারী হবে।” (সহীহ মুসলিম শরীফ।

হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “আযান ও ইকামতের মাঝখানের দু'আ ফেরত দেওয়া হয় না, অতএব তোমরা এ সময় দু’আ কর।” (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং: ৫২১)

আজানের শরয়ী বিধান: পঞ্জেগানা নামায ও জুমার জন্য আযান দেওয়া সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। যদি আজান দেয়া না হয়, সকলে গুনাহগার হবে। ওয়াক্ত হওয়ার পর আজান দিবে। নামাযের ওয়াক্ত হওয়ার আগে আজান দিয়ে দিলে ওয়াক্ত হওয়ার পর পূনরায় আজান দেওয়া জরুরি। (আলমগীরি, বাহারে শরীয়ত)

ফরজ নামায ব্যাতীত অবশিষ্ট নামাযের যেমন বিতর, জানাযা, দুই ঈদের নামায, সুন্নাত নামায, তারাবীর নামায, মান্নাতের নামায, বৃষ্টি প্রার্থনার নামায, দ্বি প্রহরের নামায, চন্দ্র গ্রহণ ও সূর্য গ্রহণের নামায এবং সর্ব প্রকার নফল নামাযের জন্য আজান নেই। (বাহারে শরীয়ত, ৩য় খণ্ড)

ঘরে নামায আদায় কারীর জন্য মহল্লার মসজিদের আজানই যথেষ্ট। তবে একাকী নামায আদায়কারীর জন্য ইকামত দিয়ে নামায আদায় করা উত্তম। অনুরূপ ঘরে জামাতসহকারে নামায আদায়ের জন্য আজান দেওয়া উত্তম, ইকামত দেওয়া আবশ্যক। অজু সহকারে কেবলামূখী হয়ে দাড়িয়ে উভয় কানের ছিদ্র পথে শাহাদাত আঙ্গুলী প্রবেশ করিয়ে শুদ্ধভাবে আজানের বাক্যগুলো সুুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে আজান দেওয়া সুন্নাত। অজু বিহিন আজান দেয়া মাকরুহ। বসে আজান দেয়া মাকরুহ। কেউ বসে দিলে দাঁড়িয়ে পুনরায় দিতে হবে। (বাহারে শরীয়ত, আলমগীরি)


আজানের জবাব দু’ প্রকার: (১) জওয়াবে ফেলী তথা কার্যত জবাব। নামায আদায়ের প্রস্ততি গ্রহণ পূবর্ক প্রত্যহ পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায়ের মাধ্যমে আজানের জবাব দেয়া মুসলমানের জন্য ফরজ।


(২) জওয়াবে কাওলী তথা মৌখিক জবাব। মুয়াযযিনের আজানের শব্দাবলী শুনার পর অনুরূপ মৌখিক জবাব দেওয়াকে অনেক ফকীহগণ সুন্নাত বলেছেন। কারো কারো মতে মুস্তাহাব। হানফী মাযহাব মতে আজানের বাক্য হচ্ছে পনেরটি ইক্বামতের সতেরটি। আযান শ্রবণকারীর উপর মৌখিক জবাব দেওয়া সুন্নাত মুয়াযযিন যে বাক্য বলবে শ্রোতাও ওই বাক্য বলবে তবে মুয়াযযিন যখন “আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রাসূলুল্লাহ” বাক্যটি বলবে শ্রোতা শ্রবণের পর প্রিয় নবীর প্রতি তাজীম-সম্মান প্রদর্শনার্থে নিজের দু'হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিদ্বয়ের নখে মুখ দ্বারা চুমু দিয়ে “সাল্লাল্লাহু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ” বলে নিজের চোখে লাগানো বরকতময় মুস্তাহাব আমল। দ্বিতীয় বারে শ্রোতাগণ “মুহাম্মাদার রাসূলাল্লাহ বাক্য শ্রবণের পর পূর্ব নিয়মে “কুররাতু আইনি বিকা ইয়া রাসূলাল্লাহ” বলে দু'চোখে বৃদ্ধাঙ্গুলি চুমু দিয়ে চোখে লাগাতে হয়। অত:পর বলতে হয় “আল্লাহুম্মা মাত্‌তি’নী বিসসাময়ী ওয়াল বাছারী” অত:পর মুয়াযযিনের অনুরূপ শ্রোতাগণও আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ বলবে। (সূত্র: ফতোওয়ায়ে শামী ১/৩৯৮ পৃ:, আযান অধ্যায়)

এ মর্মে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) থেকে হাদীস বর্ণিত, হয়েছে তিনি মুয়াযযিনকে আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলাল্লাহ বলতে শুনেছেন তখন তিনিও অনুরূপ বললেন এবং বৃদ্ধাঙ্গুলীদ্বয়ে চুমু দিয়ে তা চোখে মালিশ করলেন এ আমল দেখে নবীজি এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার বন্ধুর ন্যায় আমল করবে তার জন্য আমার সুপারিশ বৈধ হয়ে গেল। (মাকাসিদুল হাসানা, পৃ: ৩৮৩, হাদীস নং: ১০২১)

মুয়াযযিনের হাইয়্যা আলাস সালাহ ও হাইয়্যা আলাল ফালাহ এর জবাবে লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ বলবে। উভয়টা বলা উত্তম। ফজরের আজানে আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম এর জবাবে “সাদাক্বতা ওয়া বারারতা ওয়াবিল হাক্বকি নাতাক্বতা বলবে।” (ফতোওয়ায়ে শামী, বাহারে শরীয়ত)

মহান রাব্বুল আলামিন সকল মুসলমানদেরকে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্য করুন