সিনিয়র শিক্ষক
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০১:২৪ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
|
||||
পুনর্ভবা
কমল কুজুর
পুনর্ভবার তীরে
জন্ম নিয়ে
ধন্য জীবন,
মরি যেন তোমার কোলে।
চাও যদি, আসব ফিরে
কালো কাক হয়েই না হয়
আরও একটি বার
তোমার কোলে
এই নদী তীরে।
দিনাজপুর পুনর্ভবা নদীর ইতিহাস
দিনাজপুরের পুনর্ভবা নদীর ইতিহাস অনেকের অজানা। দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় মিলে ছিলো বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা, তখন দিনাজপুরে মোট নদী ছিল ১৯টি। ঐতিহ্যের দিক থেকে দিনাজপুর জেলার নদ-নদী গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল পূনর্ভবা (কাঞ্চন) নদী। ভৌগোলিক ভাবে নদীটি ছিল চমৎকার অবস্থানে। পুনর্ভবা নদীটি দিনাজপুর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। নদীটি খনন বা ড্রেজিং করা হয়নি কোন দিন, এমন কি রক্ষণা বেক্ষণের জন্য নেয়া হয়নি তেমন কোন উদ্যোগ।
দিনাজপুর জেলায় ব্যবসা বাণিজ্যে প্রধান ছিল এই নদী। কেনা-বেচা থেকে শুরু করে মাছ ধরার ইতিহাস ছিল। কি ছিলো না এই নদীতে। অনেক অজানা ইতিহাস রয়ে গেছে এই নদীর। এই পুর্নভবা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত তখনকার সময় প্রায় ৫ হাজারের চেয়ে বেশি মানুষ। অনেক জেলে পরিবার আজ বেঁচে নেই। কিন্তু যে জেলে পরিবারগুলো আছে তাঁদের কাছে জানা গেল পুর্নভবা নদীর ইতিহাস। তৎকালীন জেলে ৯৮ বছরের করিম মিয়া আজও বেঁচে আছেন। পুনর্ভবা নদীর কথা জানতে চাওয়ায় তিনি কেঁদে ফেলেন। কান্নার কারণ রয়েছে তার। এই নদীতে বন্যায় ভেসে গেছে তাঁর পরিবার এবং ঘরবাড়ী। বালুয়াডাঙ্গার হঠাৎ পাড়ায় স্যাঁতস্যাতে ভাঙ্গা ঘরে এখন তাঁর বসবাস। তার কাছে দিনাজপুর শহরের পশ্চিম প্রান্তের এই পুনর্ভবা নদীর ইতিহাস নতুন করে রঙিন হয়ে উঠল।
৯৮ বছরের জেলে করিম মিয়া বলেন, দিনাজপুর জেলার পূনর্ভবা (কাঞ্চন) নদীর উপর দিয়ে ছুটে চলত এক সময় নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার। ষাট-এর দশকেও ভাটিয়ালী গানের সুরে পাল তোলা নৌকা নিয়ে ছুটে চলা ভরা যৌবনা উত্তাল পূনর্ভবা (কাঞ্চন) নদীর বুকে এখন দোল খেতে দেখা যায় সবুজ ধানক্ষেত।
খুব বেশি আগের কথা নয়। ষাটের দশক জুড়েই ভরা যৌবনা ছিল পূনর্ভবা (কাঞ্চন) নদী। আশির দশক থেকে ক্রমেই যৌবন হারাতে থাকে এ নদী। এখন এসে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে নদীটির আর হারানোর কিছুই নেই। সেই অতীতে পূনর্ভবা নদীতে ঢেউয়ের তালে তালে চলাচল করতো অসংখ্য নৌকা, স্টিমার, লঞ্চ। ভাটিয়ালী-পল্লীগীতি গানের সুরে মাঝিরা নৌকা নিয়ে ছুটে চলতো ব্যবসা কেন্দ্রিক কেন্দ্রগুলোতে।
এই নদীকে ঘিরে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা বড় বড় হাট বাজার সমূহে ব্যবসার জন্য ধান, পাট, আলু, বেগুন, সরিষা, কালাই, গমসহ নানান কৃষিপণ্য নিয়ে। সওদাগরদের নিয়ে মাঝিরা ছুটে চলতেন নৌকার পাল তুলে বিভিন্ন প্রান্তে। অসংখ্য মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবন জীবিকার রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল।
নদীর পানি দিয়ে কৃষক দুই পাড়ের উর্বরা জমিতে ফসল ফলাতো। সে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। জীবিকার সন্ধানে নদী সংলগ্ন ও আশপাশ এলাকার অসংখ্য জেলে পরিবারের বসতী গড়ে উঠেছিল। ছোট বড় নানা প্রজাতির মাছের অফুরন্ত উৎস ছিল এ নদীতে। মাছ পাওয়া যেত সারা বছর। জীবিকার জন্য মাছের আশায় জেলেরা রাতদিন ডিঙ্গি নৌকায় জাল-দড়ি নিয়ে চষে বেড়াতেন নদীর এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ধরা পড়তো প্রচুর মাছ। সেই সোনালি দিন শেষে হয়ে গেছে অনেক আগেই। সময় গড়িয়ে চলার সাথে সাথে সেই ভরা যৌবনা পূনর্ভবা (কাঞ্চন) নদী এখন মরাখালে পরিণত হওয়ায় পূনর্ভবা (কাঞ্চন) নদীর ধারে গড়ে ওঠা অসংখ্য হাটবাজার এখন হয়েছে বিরাণ অঞ্চল, কৃষি জমিগুলো পরিণত হয়েছে ধূ ধূ প্রান্তরে, জেলে পরিবার গুলো হয়ে গেছে বিলীন আর সে সময়ের ব্যবসা- বাণিজ্য এর উৎসগুলো হয়ে গেছে প্রায় বন্ধ। এসবই এখন কালের সাক্ষী।
ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলার এই নদী ও বিল গুলো প্রবাহিত হয়েছে ৭২৪ কিঃমিঃ জুড়ে।
বৃহত্তর দিনাজপুর ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া’র ছোট ঢেপা।
আটোয়ারী উপজেলার ভুল্লী বিল।
বীরগন্জ উপজেলার ঢেপা, প্রাণ নগর এলাকায় পুনর্ভবা নদী, পলাশবাড়ী বিল পাথরকাটা, সাতোর বিল।
খানসামা উপজেলার আত্রাই নদী, করতোয়া নদী ও শেওলা কুড়ি বিল।
চিরিরবন্দর উপজেলার ভূষিরবন্দরের কাঁকড়া নদী, ভেলামতি বিল এবং ৭নং ইউপি।
কাহারোল উপজেলার ডাবোর ইউনিয়নে তেতুলিয়া তুলাই নদী।
পার্বতীপুর উপজেলার বড় চন্ডীপুর ইউনিয়ন ছাতিয়ান গড় বিলের ইছামতি, পাটিকা ঘাট বিলের নল সীশা।
বিরামপুর উপজেলার ধানপাড়া বিলের তুলসীগঙ্গা, জোদ মাধুব বিল।
নবাবগঞ্জ উপজেলার মাসুদপুর করতোয়া মাইলা।
সবাইকে শুভ কামনা জানাই।
কমল কুজুর
সহকারী শিক্ষক
বাংলাহিলি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
দিনাজপুর।
২
২ মন্তব্য