Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০১:২৯ অপরাহ্ণ

গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতির শ্লোগান দিনে দিনে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

পরিবেশের ক্ষতিসাধন না করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নয়নই সবুজ অর্থনীতি। সহজভাবে বলতে গেলে, সবুজ অর্থনীতি এমন অর্থনীতিকে বোঝায় যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকি কমাবে এবং অভাব দূর করবে।

আধুনিক বিশ্ব এখন সবুজ অর্থনীতির কথা ভাবছে। প্রতি বছর ৫২ গিগাটন কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। এ কারণে বিশ্ব সবুজায়নের পথে অগ্রসর হতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। বিশ্বে এখন সবুজের সমারোহের চেয়ে জঞ্জালের সমারোহ বেশি। ইট, বালু, সিমেন্ট আর রডের নির্মিত দালান কোটা, শপিংমল এগুলো সবুজকে ধ্বংস করছে।

কার্ল বুরকাত এর মতে সবুজ অর্থনীতি ৬টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে।

নবায়নযোগ্য শক্তি

সবুজ দালান

টেকশই পরিবহন ব্যবস্থা

সুষ্ঠ পানি ব্যবস্থাপনা

সুষ্ঠ আবর্জনা ব্যবস্থাপনা

ভূমি ব্যবস্থাপনা

সম্প্রতি সবুজ অর্থায়নে যুক্ত হয়েছে তিন পণ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নযোগ্য খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে নতুন এই তিন পণ্য যুক্ত হলো। এখন এই তহবিলে মোট পণ্য সংখ্যা দাঁড়ালো ৪৭-এ।


নতুন যুক্ত হওয়া তিনটি পণ্য হলোঃ সবুজ শিল্প (গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি) প্রতিষ্ঠা,সোলার পাম্পের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি উত্তোলন ও সরবরাহ প্রকল্পএবং কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। 


এই তহবিলের আওতায় সোলার পাম্পের মাধ্যমে মাটির ওপরের অংশ থেকে পানি উত্তোলন ও পরিশোধনপূর্বক সরবরাহ প্রকল্পে সর্বোচ্চ তিন কোটি টাকা ঋণ পাবে গ্রাহক। সবুজ শিল্প স্থাপনে মিলবে সর্বোচ্চ ২০ কোটি টাকা। বস্ত্র ও পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্পে মিলবে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকার ঋণ। সোলার পাম্প প্রকল্পে ঋণ পাবে সমবায় সমিতি, যৌথ বা একক ভিত্তিতে ব্যবহারকারী পরিবার বা প্রতিষ্ঠান। অথবা যৌথ কারবারি প্রতিষ্ঠান। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নিবন্ধিত ক্ষুদ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানও এই ঋণ নিতে পারবে। তবে এ ক্ষেত্রে উপকারভোগী গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণের   বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে এবং ঋণের মেয়াদ শেষে প্রকল্পটির মালিকানা উপকারভোগীর কাছে হস্তান্তর করতে হবে।

পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’শ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ব্যাংক রেটে (শতকরা ৫ টাকা সুদে) পুনঃ অর্থায়ন নিয়ে ব্যাংকগুলো প্রকল্প ভেদে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৯ থেকে ১১ শতাংশ হারে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।

সম্প্রতি ‘গ্রিন ট্যাক্স’ আদায়ের লক্ষ্যে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্পখাতে পরিবেশ দূষণ করছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন ট্যাক্সের আওতায় এনে নির্ধারিত ১ শতাংশ হারে শিল্পখাতে আরোপিত নতুন করে গ্রিন ট্যাক্স আদায় করা হবে। গ্রিন ট্যাক্স তথা সারচার্জ আরোপের জন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নির্দিষ্টকরণ করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত লক্ষাধিক প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্র নিয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপায়ে পরিবেশ দূষণের সঙ্গে জড়িত। প্রচলিত আইনে পরিবেশ দূষণ করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে না থাকায় পরিবেশ দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আমাদের পরিকল্পনায় পরিবেশ সুরক্ষায় ২ শতাংশ হারে গ্রিন ট্যাক্স নামে নতুন কর আরোপের বিধান করা দরকার। এই কর কীভাবে আদায় করা হবে, সে বিষয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করতে হবে এনবিআর।

পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারের উদ্দেশ্যেই এখন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এ জন্য জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপেক্ষা করে উন্নত সমৃদ্ধ সমাজ, অর্থনীতি, সুন্দর জীবনযাপনের কথা ভাবা যায় না। মোটকথা পরিবেশকে উপেক্ষা করে পৃথিবীতে কিছুই করা যায় না। সুন্দর অনুকূল পরিবেশ উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশ যদি বিপন্ন হয়, তাহলে অর্থনীতিও বিপন্ন হয়। যার প্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামগ্রিক সমৃদ্ধির জন্য পরিবেশগত ভারসাম্য ও অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি এখন জোর দিচ্ছেন সবাই। অতীতে এ বিষয়ে তেমন কোনো সচেতনতা ছিল না। কিন্তু বিশ্বব্যাপী শিল্পায়ন ও নগর সভ্যতার ক্রম বিকাশের প্রভাবে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি এবং ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটায়; এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ বিষয়ে প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে প্রকৃতিক পরিবেশ যখন হুমকির মুখে পড়েছে তখন গ্রিন ইকনোমির ধারণা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য সবুজ অর্থনীতির নানা কর্মকৌশল কার্যকর ও ফলদায়ক হিসেবে প্রমাণিত হওয়ায় এখন বাংলাদেশে এ বিষয়ে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন সবাই। যে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধু উত্পাদন, বণ্টন এবং সেবা ও পণ্যের ভোগকে কেন্দ্র করে আবর্তিত না হয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব না ফেলে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত হয় সেগুলোকে গ্রিন ইকনোমির অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

গ্রিন ইকনোমির জন্য দেশে গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি হলেও বাংলাদেশে এটা আজও প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছুতে পারেনি। গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদাভাবে গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম তদারক এবং যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য গ্রিন ব্যাংকিং এন্ড সিএসআর বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে। আধুনিক উন্নত বিশ্বের ব্যাংকগুলো তাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ ঝুঁকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে   বিবেচনা করছে। আমাদের দেশেও এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে এটি আশার কথা নিঃসন্দেহে। আরো আগে আমাদের এখানে যেভাবে গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম চলে আসছিল সাম্প্রতিক সময়ে তা আরো জোরদার হয়েছে।

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্প ও ব্যবসায় ঋণ প্রদান কমানো অথবা একেবারেই ঋণ প্রদান না করা, মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা অধিকাংশ পরিবেশবান্ধব শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা, পরিবেশবান্ধব পণ্য উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত পণ্য উত্পাদন প্রকল্পে অর্থায়ন, গ্রিন ফাইন্যান্সের আওতায় পরিবেশগত অবকাঠামোসহ অন্যান্য পরিবেশবান্ধব খাতে অর্থায়ন। যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ প্রকল্প, দূষিত পানি বিশুদ্ধকরণ প্রকল্প, বায়োগ্যাস প্রকল্প, জৈবসার প্রকল্প, বনায়ন প্রভৃতি। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রকল্পে অর্থায়ন বা অন্য কোনোরূপ সংশ্লিষ্টতা এড়িয়ে পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখার ব্যাপারে সব মহলকে তত্পর হওয়াই গ্রিন ইকনোমির মূল প্রতিপাদ্য বিবেচনা করতে হবে। সবুজ অর্থনীতি বিকাশের লক্ষ্যে পরিবেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন সংবেদনশীল সেক্টর ও অন্যান্য প্রকল্পে আলাদা নীতিমালা ও কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও ব্যবস্থা  (পোল্ট্রি ও ডেইরি), কৃষি খামার, ট্যানারি, মত্স্য চাষ, চিনি শিল্প ও হাউজিং, রাবার বাগান ও শিল্পে ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে  ব্যাংকগুলোর বিশেষ কর্মপন্থা প্রণয়নের কথা বলা যায়। নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে সবুজ অর্থনীতির কার্যকারিতা ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। এখন সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবুজ অর্থনীতি বা গ্রিন ইকনোমি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।

মন্তব্য করুন

ব্লগ