সহকারী শিক্ষক
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ১২:৩৭ অপরাহ্ণ
(موضوع - ﺻﺤﻴﺢ ) সহীহ্ ও বানোয়াট।(موضوع - ﺻﺤﻴﺢ ) সহীহ্ ও বানোয়াট
(موضوع - ﺻﺤﻴﺢ ) সহীহ্ ও বানোয়াট
হাদিস:
হাদিস বলা হয় শেষ নবী হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা, কাজ ও কোনো কাজের প্রতি সমর্থন কিংবা মৌন সম্মতিকে। আর যে হাদিসটি নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন. যার সনদ পরস্পর সম্পৃক্ত, তার মধ্যে গোপন কোনো ত্রুটি নেই এবং তা অন্য কোনো অধিকতর নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বর্ণনার বিরোধীও নয়- তাকে সহিহ হাদিস বলে।
প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থগুলো হলো- সহিহ বোখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ ও সুনানে ইবনে মাজাহ। এই ছয়টি গ্রন্থকে একত্রে সিহাহ সিত্তা বলা হয়।
এ ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রসিদ্ধ হাদিস গ্রন্থ হলো- মুসনাদে আহমাদ, মুয়াত্তা মালেক, দারাকুতনি, সুনানে দারেমি ও সুনানে বায়হাকি।
ইলমে হাদিসের কয়েকটি পরিভাষা-
তাওয়াতুর,মুতাওতির,সনদ,মতন,মারফু,মাওকুফ,মাক্তু,মুযতারাব,মুদ্রায,মুত্তাসিল,মুনকাতি,মুরসাল,মুয়াল্লাক,মারুফ ও মুনকার,সহী,হাসান,গারীব,যাঈফ,মাঊযু,মাতরুক,,খবরে ওয়াহেদ,মাশহুর,আযীজ,হাদিসে কুদসী ইত্যাদি।
আর জাল হাদিস বলা হয়, যে কথাটি মানুষ তৈরি করেছে, অতঃপর সেটা তা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জাল হাদিস মূলত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী নয়। এগুলো মানুষের বানানো কথা। মুহাদ্দিসরা একে ‘মাওযু’ নামে অভিহিত করেছেন।
মাউযু (موضوع) হাদীস বা বানোয়াট বা জাল হাদীসঃ মূলতঃ ‘মাউজু’ (موضوع) শব্দটি আরবী। ‘ওয়ায’ শব্দ হতে গঠিত। ‘ওয়াযা’ শব্দটি অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। موضوع কর্মবাচক বিশেষ্য وَضْع ক্রিয়া বিশেষ্য থেকে উদ্গত, অর্থ বানোয়াট, তৈরিকৃত ও নির্মিত।
মাওযু হাদিসের পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে-
الموضوع: هو الحديث المكذوب على رسول الله صلى الله عليه وسلم – سواء كان عمدا أوخطأ
‘মাউজু’ বলা হয়, ঐ হাদীস কে যা রাসূল (সাঃ) এর নামে মিথ্যা রচনা করা হয়েছে, তা ইচ্ছাকৃত হোক বা ভুল বসত। (তথ্যসূত্রঃ তাওজিহুন নজর, ২/৫৭৪)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মনগড়া-বানানো মিথ্যা বাণীর প্রচার প্রসারকে জাল হাদিস বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে মিথ্যা ও বানোয়াট হাদিস বানিয়ে প্রচার-প্রসার করা সম্পূর্ণ হারাম। -আল-ওয়াজউ ফিল হাদিস : ১/৩১৭
রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেনঃ
حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ الْجَعْدِ، قَالَ أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ، قَالَ أَخْبَرَنِي مَنْصُورٌ، قَالَ سَمِعْتُ رِبْعِيَّ بْنَ حِرَاشٍ، يَقُولُ سَمِعْتُ عَلِيًّا، يَقُولُ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ” لاَ تَكْذِبُوا عَلَىَّ، فَإِنَّهُ مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ فَلْيَلِجِ النَّارَ
অর্থ- আলী ইবনুল জা‘দ (রহঃ)… ‘আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী বলেছেনঃ তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। (তথ্যসূত্রঃ ইলম বা জ্ঞান অধ্যায় :: সহিহ বুখারী :: খন্ড ১ :: অধ্যায় ৩ :: হাদীস ১০৮)।
রাসূল (সাঃ) আরও ইরশাদ করেছেন-
” مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ “
“যে আমার উপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়”। [তথ্যসূত্রঃ মুসলিম। আন-নুযহাহ্ঃ (পৃঃ১২১-১২২)]
এ জঘন্যতম অপরাধ তথা জাল হাদিস প্রচার-প্রসারের প্রারম্ভিক কাল সম্পর্কে কয়েকটি মতামত রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মত হচ্ছে, হিজরি ১ম শতাব্দীর চল্লিশের দশকের পর মিথ্যা বা জাল হাদিসের সূচনা হয়। বর্তমানে এ অপকর্মের সঙ্গে যোগ দিয়েছে মুসলিম নামধারী কিছু ভণ্ড ও প্রতারক। তারা এসব জাল হাদিসকে ব্যবহার করে তাদের অসৎ স্বার্থ হাসিলের অপচেষ্টায় লিপ্ত। আবার এক শ্রেণীর অসচেতন আলেমের দ্বারাও তাদের অজান্তে কিছু জাল হাদিস জনসমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক সময় সেসব জাল হাদিস সম্পর্কে অনবহিত ও অসচেতনার ফলে বিপথগামী হতে হয় অনেককেই। এ জন্য বহুল প্রচলিত কয়েকটি জাল হাদিসের পরিচয় দেওয়া হলো-
১. জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনে যেতে হলেও যাও (তবে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব প্রসঙ্গে প্রচুর হাদিস রয়েছে)।
২. জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়ে বেশি পবিত্র (এ জাতীয় ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, তবে এ বর্ণনা নেই)।
৩. সবুজ গাছপালা ও শস্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি পায়।
৪. আল্লাহ ওই বান্দাকে ভালবাসেন, যে তার ইবাদতে ক্লান্ত, নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
৫. আজানের মধ্যে আঙ্গুল চুম্বন করে চোখে মোছা ফজিলতের কাজ।
৬. এক ঘণ্টা গভীরভাবে চিন্তা করা ৬০ বছর ইবাদতের সমান।
৭. যারা মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেয় এবং মানুষকে ইসলাম গ্রহন করায় তাদের জন্য জান্নাত নিশ্চিত।
৮. পাগড়ী পরিধান করে নামাজ আদায় করেল ১৫টি পাগড়ী ছাড়া নামাজ আদায়ের সমান সওয়াব।
৯. আমার উম্মতের আলেমরা বনি ইসরাইলিদের নবীদের সমান।
১০. আমি তোমাদেরকে দু’টি উপশম বলে দিলাম- মধু এবং কোরআন।
১১. যদি আরবদের অধঃপতন হয়, তাহলে ইসলামেরও অধঃপতন হবে।
১২. যে কোরআন শেখানোর জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেয়, সে কোরআন শিখিয়ে আর কোনো সওয়াব পাবে না।
১৩. বিয়ে করো, আর কখনও তালাক দিয়ো না, কারণ তালাক দিলে আল্লাহর আরশ কাঁপে।
১৪. যে বরকতের আশায় তার ছেলের নাম মুহাম্মদ রাখবে সে এবং তার ছেলে জান্নাত পাবে।
১৫. যে স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি না নিয়ে ঘরের বাইরে যায়, সে ফেরত না আসা পর্যন্ত আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে থাকবে বা যতক্ষণ না তার স্বামী তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়।
১৬. যদি নারী জাতি না থাকতো, তাহলে আল্লাহর যথাযথ ইবাদত হতো।
১৭. নারীর উপদেশ মেনে চললে অনুশোচনায় ভুগবে।
১৮. দুনিয়া আখেরাতের ফসলি ভূমি।
১৯. আলেমরা ব্যতীত সব মানুষই ধ্বংসের পথে। আমলকারীরা ব্যতীত আলেমরাও ধ্বংসের পথে।
২০. মসজিদে অপ্রয়োজনীয় কথা বললে তা সৎকাজগুলোকে ধ্বংস করে, যেভাবে প্রাণী ঘাস সাবাড় করে।
২১.যে হজ্জের উদ্দেশে মক্কায় গেছে কিন্তু মদিনায় গিয়ে আমার কবর জিয়ারত করেনি সে আমাকে অপমান করেছে। আস-সাগানি, ইবন জাওযি, আশ-শাওকানি
২২.যে আমার (মুহম্মাদ ﷺ) কবর জিয়ারত করে তার জন্য সুপারিশ করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে যায়। আলবানি
২৩.যারা মিউজিক শুনে তাদের কানে উত্তপ্ত গলিত শিশা ঢেলে দেয়ার হাদিসটিও বানোয়াট এবং বাতিল।
গানবাজনা হারাম হওয়ার বিষয় আরও হাদিস আছে। কিন্তু শাস্তি সংক্রান্ত এই হাদিসটি বাতিল ও বানোয়াট।
من جلس إلى قينة صب في أذنه الآنك يوم القيامة
“যে ব্যক্তি গান শুনার উদ্দেশ্যে গায়িকাদের মজলিসে বসে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কানে (উত্তপ্ত গলিত) শিশা ঢেলে দিবেন।” [ইবনে আসাকির-আনাস রা: হতে মারফু সূত্রে বর্ণিত]
বিজ্ঞ মুহাদ্দিসদের দৃষ্টিতে এটি একটি বানোয়াট বা বাতিল হাদিস যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়।
২৪.আলেমের ঘুম জাহেলের ইবাদত থেকেও উত্তম। এ হাদিসটি লোকমুখে শুনা যায়: نوم العالم خير من عبادة الجاهل
এ কথাটি কোন হাদিস নয়-এমনকি কোন সাহাবী বা তাবেয়ীর উক্তিও নয়। বরং তা শিয়াদের কিতাব থেকে নেওয়া একটি বাতিল, ভ্রান্ত ও জাল হাদিস।
অনেক ওয়ায়েজ ও বক্তাদের মুখে এগুলো হাদিস হিসেবে বলতে শোনা যায়। অনেকে লেখার মাঝেও এগুলো হাদিস হিসেবে বর্ণনা বরে থাকেন। কিন্তু হাদিসের গ্রন্থসমূহে অনুসন্ধান করলে হাদিস হিসেবে এসবের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।
আসুন এবার বিজ্ঞ চার মাযহাবের মুহাদ্দীসগণের কাছ থেকে হাদীস গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক।
[১] ছগানী (রহঃ) হাদিসগুলো জাল বলেছেন। (মাউদুয়াতুছ ছগানী, হা/১০৬, ১/৬৪)।
(المحدث:الصغاني المصدر:موضوعات الصغاني الجزء أو الصفحة:64 حكم المحدث:موضوع)
.
[২] সাবকী (রহঃ) বলেন- আমি এর কোনো সানাদ খুজে পাইনি। (ত্ববক্বতু আশ-শাফিয়িয়াতুল কুবরা, ৬/৩৫৬)
(المحدث:السبكي (الابن) المصدر:طبقات الشافعية الكبرى الجزء أو الصفحة:6/356 حكم المحدث:[لم أجد له إسنادا])
[৩] মোল্লা আলী কারী (রহঃ) বলেনঃ কেউ বলে উক্ত হাদীস সমুহের কোনো উৎস নেই আবার কেউ এসব বানোয়াট বলে। (আল-আসারারুল মারফুয়াহ, ২০৬)
(المحدث:ملا علي قاري المصدر:الأسرار المرفوعة الجزء أو الصفحة:206 حكم المحدث:قيل لا أصل له أو بأصله موضوع)
[৪] ফাত্তানী (রহঃ) উক্ত হাদীস সম্পর্কে বলেন বলেনঃ এর কোনো ভিত্তি নেই। (তাজকিরাতুল মাউদুয়াত, ১/১৭৪)
(حكم المحدث: لَمْ أَقِفْ عَلَيْهِ.)
[৫] আহমাদ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বলী (রহ) উক্ত হাদীস সম্পর্কে বলেন বলেনঃ এর কোনো ভিত্তি নেই। (আল ফাওয়াহিদ আল মাউদুয়াহ ফিল আহাদিছুল মাউদুয়াহ, হা/১৭৮, ১/১৩৩)
(حكم المحدث: قَالَ بَعْضُهُمْ: لَمْ أَقِفْ عَلَيْهِ.)
[৬] মুহাম্মাদ আল-আমির আল-কাবির আল-মালিকী (রহঃ) বলেনঃ এ সম্পর্কে আমার জানা নেই। (الكتاب: النخبة البهية في الأحاديث المكذوبة على خير البرية, হা/১২৫, ১/৬০)
(حكم المحدث: لم يعرف.)
.
[৭] ইবনুল যাওযী (রহঃ) এই হাদীস সমুহ মুনকার বলেন। (আত-তাইস্যার বিশারহুল জামিউস ছগীর, ২/২৪)
আমরা যেনো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) –এর হাদীছ বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করি। আল্লাহ যেন আমাদের দ্বঈফ ও জাল হাদীছ বর্জন করে সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার এবং তা অন্য ভাই-বোনদের কাছে পৌছে দেয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন।
২
২ মন্তব্য