Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৫ এপ্রিল, ২০২১ ০৯:১২ অপরাহ্ণ

বাংলা নববর্ষের উৎপত্তি ও পটভূমি বিশ্লেষণঃ

বাংলা নববর্ষের যত ইতিহাসঃ

খাজনা পরিশোধের গরমিলে পড়ে যেত বাংলার কৃষক। তাই প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কারের নির্দেশ দেন সম্রাট আকবর। প্রথমে এ সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিতি পায়। বাঙালির সর্বজনীন লোকোৎসব পয়লা বৈশাখ। একসময় মেলা, হালখাতা আর পুণ্যাহ উৎসব ছিল পয়লা বৈশাখের প্রাণ। বৈশাখী মেলায় থাকত গ্রামের কামার-কুমার আর তাঁতিদের হস্তশিল্পের আয়োজন। থাকত হাতে তৈরি মাটির খেলনা, মণ্ডা-মিঠাই, চরকি, বেলুন, ভেঁপু, বাঁশি আর ভাজাপোড়া খাবার-দাবার। মেলার প্রধান আকর্ষণ ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই প্রতিযোগিতা ছিল জনপ্রিয়। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে নৌকাবাইচ, বহুরূপীর সাজ, হাডুডু খেলার আয়োজনও থাকত। আশির দশকে নতুন আঙ্গিকে, নতুন উচ্ছ্বাসে বৈশাখী উৎসব জমে ওঠে। তবে করোনার বিপর্যস্ত জনজীবনে এ বছর সে উৎসব অনেকটাই মলিন হয়ে পড়েছে।

বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের জনক নিয়েও রয়েছে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। সেসব নিয়ে অহেতুক আর প্রশ্ন নয়। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার স্পষ্ট উচ্চারণে ভারতের মুঘল সম্রাট মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তক। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা বাংলার তরে বড় গৌরবের যে বাংলা সন বাংলাদেশের তথা বাঙালির নিজস্ব সন; যার উৎপত্তি ও বিকাশ ইসলামী উত্তরাধিকার-সঞ্জাত।

বাংলা সনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির ঐতিহ্যগত অনুভব আর একান্ত অনুভূতি। বাংলা সন বাংলার ঐতিহ্যপরম্পরায় এক অনন্য সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলা নববর্ষ এলে পয়লা বৈশাখে বাঙালিরা আনন্দঘন উল্লাসে বিমোহিত হয়। এ পরমতম অনুভূতি পুরো বছরটাকেই ধরে রাখে, যেন এর মধ্যে বাঙালির স্বকীয়তারই তাৎপর্য নিহিত। বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন বাংলা বর্ষপঞ্জি হলো বঙ্গদেশের একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌর পঞ্জিকাভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিনের গণনা শুরু। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন কয়েক ঘণ্টা লাগে। এ সময়টাই সৌরবছর।

গ্রেগরীয় সনের মতো বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস। অপূর্ব নামে অঙ্কিত মাসগুলো হলো- বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র।

আকাশের রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব শুরু। যেমন যে সময় সূর্য মেষ রাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ।

বাংলাদেশ ছাড়াও পূর্ব ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় এ বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়।

বঙ্গাব্দ শুরু পয়লা বৈশাখ দিয়ে। বঙ্গাব্দ সব সময়ই গ্রেগরীয়

বর্ষপঞ্জির অপেক্ষা ৫৯৩ বছর কম। সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় ১৯৮৭ সালে। সে অনুযায়ী আজকের তারিখ ১ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে বাংলা পঞ্জিকার প্রশ্নে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নেতৃত্বাধীন কমিটির রেখে যাওয়া সুপারিশ গ্রহণ করেছে। তবে ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন হিসেবে ধার্য করা হয়েছে। খ্রিস্টীয় পঞ্জিকার অধিবর্ষের বছরে ফাল্গুন মাসে এক দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

যেভাবে সনের উৎপত্তি

ভারত সাম্রাজ্যের সম্রাট আকবরের আদেশে ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তাঁরই বিজ্ঞ রাজজ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজির গবেষণার ঐতিহাসিক ফসল বাংলা সনের উৎপত্তি।

ব্রিটিশ রাজত্বের আগে বঙ্গদেশে বা বাংলায় হিজরি সনই প্রচলিত ছিল। সামাজিক ক্ষেত্র বিশেষ করে মৌসুমের প্রতি দৃষ্টিপাত করেই রাজস্ব বা খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক সৌর সনের প্রয়োজনবোধ করে বাংলা সন বঙ্গাব্দের উদ্ভব ঘটানো হয়।

মানুষ কাল বা সময় বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে আসছিল সভ্যতার বিকাশের আদি থেকেই। প্রয়োজনের তাগিদে বছর, মাস, সপ্তাহ দিন ইত্যাদি গণনার প্রচলন করে।

বাংলায় শকাব্দ, লক্ষ্মণাব্দ, পালাব্দ, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি সনের প্রচলন ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায় বাংলা বা বঙ্গাব্দের প্রচলন শুরু হলে।

এ সন প্রচলনের ইতিহাসে সংযোগ ঘটেছে বাঙালি জাতির একান্ত নিজস্ব অব্দ।

১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলা মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভুক্ত হয়। ১২০১ খ্রিস্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির বঙ্গজয়ের পর মুসলমান শাসনামলে তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দ ও লক্ষ্মণাব্দের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয়।

সন শব্দটি আরবি-উ™ূ¢ত, অর্থ বর্ষ। সাল কথাটা ফারসি। বাংলা সনের জনক হিসেবে রাজা শশাঙ্ক, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের নাম দু-এক জন লেখক দাবি করলেও তথ্য-উপাত্ত মুঘল সম্রাট আকবরকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতিহাসবিদদের যুক্তিবলে প্রমাণিত হয়েছে মহামতি আকবরই বাংলা সনের প্রবর্তনকারী।

বঙ্গদেশে সবাই হিজরি সন ব্যবহার করত। ফলে ফসল কাটায়  অসুবিধার সম্মুখীন হতে হতো। কারণ আগের বছর যে তারিখে ফসল কাটত, পরের বছর সে তারিখ ১১ দিন এগিয়ে যেত। ভারতসম্রাট আকবর যে হিজরি সন ছিল তখন থেকেই এক ‘সৌরসংবত’ প্রবর্তন করেন। আর সেটিই হচ্ছে বঙ্গাব্দ। সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ (হিজরি ৯৬৩) এবং ৯৬৩ বঙ্গাব্দ। এই থেকে ইতিহাসবিদরা একমত হন যে হিজরি থেকেই বঙ্গাব্দ চালু করা হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দ বা হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের শুরু থেকেই হিজরি সনের যাত্রা। হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে হিজরি সনের সৃষ্টি। হিজরি সনের শুরু ১৬ জুলাই, ৬২২ অব্দ ধরা হলেও আসলে হিজরতের তারিখ রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ সোমবার।

২০ সেপ্টেম্বর, ৬২২ অব্দ ধরা হলে আরব দেশের নিয়মানুযায়ী বছরের প্রথম মাস প্রথম মহররম থেকে বছর ধরা হয়েছে।

হিজরি সন চান্দ্র। হিজরি সন ও তারিখে হেরফের হতো, অর্থাৎ সৌরবছরের হিসাবের দিন তারিখ মাসের গরমিল হতো প্রচুর। সে কারণেই ৯৬৩ হিজরি = ৯৬৩ বাংলা সন সমন্বয় করে গণনা শুরু হয়। এভাবে ৯৬৩ = হিজরি = ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহণ ও পয়লা বৈশাখ, ৯৬৩ বাংলা সন। এসব একদিকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের (৬২২ খ্রিস্টাব্দ), বাংলা সনের শুরু ৬২২ খ্রিস্টাব্দে। আকবর সিংহাসনে বসার (১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ) স্মৃতিবহ এবং ইংরেজি সাল থেকে ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১১ দিন কম। বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ দিলেই ইংরেজি সাল মিলতে পারে। আকবর অবশ্য তাঁর রাজত্বের ২৯তম বর্ষে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে এই বাংলা সন চালু করেন। আকবর সিংহাসনে বসেন ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল। যদিও তাঁর সিংহাসনে বসার প্রকৃত দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। বাংলায় আদি থেকে ঋতুবৈচিত্র্য অনুসারে বাংলা সন চালু করা হয়। রাজার অভিষেক শুরু রাজ্যাভিষেকের বছর ধরে যেসব পঞ্জিকার বছর গণনা শুরু করা হয়, সেসব বছরের যে দিনেই রাজার অভিষেক হোক না কেন, ঐতিহ্যের খাতিরে বছর শুরুর দিন অপরিবর্তিত রাখা হয়।  ঋতুবৈচিত্র্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট বাংলা পঞ্জিকা বাঙালির জীবনে গুরুত্বপূর্ণই শুধু নয়, একান্ত অনুভূতিরও।





মন্তব্য করুন