Loading..

ব্লগ

রিসেট

০২ মে, ২০২১ ০৯:৫১ অপরাহ্ণ

এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যাকাতের ভূমিকা

দারিদ্র্য আর প্রাচুর্য বিপরীতমুখী এ শব্দ দুটি মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এ শব্দ দুটি অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সমাজের বৈষম্যও নির্দেশ করে দারিদ্র্য আর প্রাচুর্যে। এ বৈষম্য হ্রাসে ধনীর ওপর দরিদ্রদের এক ধরনের অধিকার দিয়েছে ইসলাম ধর্ম। এ অধিকার বৈষম্য হ্রাসের, সম্পদের মালিকানা হস্তান্তরের। ইসলামিক পরিভাষায় একে বলা হয় জাকাত।

যাকাতের ব্যবহারে ইন্দোনেশিয়ায় গড়ে তোলা হয়েছে ডম্পেট ডুফা বা এতিমদের মানিব্যাগ নামক এক সংস্থা। এটি ধনীদের থেকে জাকাত, সদকা ও ওয়াকফ্কৃত সম্পদ সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে এবং সেখান থেকে দরিদ্রদের সহায়তা করে। প্রতিবছর সংগৃহীত জাকাতের প্রায় ১০ শতাংশ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রোগ্রামের বরাদ্দ রাখে ডম্পেট ডুফা।

সুদানেও এ ধরনের তহবিল গড়ে তোলা হয়েছে, যার নাম আল-আমান মাইক্রোফাইন্যান্স। দেশটির ব্যাংক অব খার্তুমের অধীনে ২০০৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশটির জাকাত ব্যবস্থাপনা সংস্থা দিওয়ান জাকাত থেকে এজন্য সরবরাহ করা হয় ২০ কোটি সুদানি ডলার। এ ছাড়া দিওয়ান যাকাত প্রতিবছর সংগৃহীত জাকাতের ২৫ শতাংশ অর্থ আল-আমান মাইক্রোফাইন্যান্সে দেওয়া হয়। এ অর্থ সুদানের উৎপাদনশীল খাতে (যেমন: বাণিজ্য, কৃষি ও কারিগরি) সরবরাহ করা হয়।

মুসলমান প্রধান দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও জাকাত ব্যবস্থা বহুল প্রচলিত। তবে দেশে জাকাত ব্যবস্থা সংগঠিত নয়। মূলত বিত্তবান ও সামর্থ্যবানরা নিজ উদ্যোগে এসব জাকাত বণ্টন করেন। আবার অনেকে কেন্দ্রীয় জাকাত বোর্ডেও তা জমা দেন। সেখান থেকে জাকাত বণ্টিত হয়। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও বণ্টিত না হওয়ায় বাংলাদেশে জাকাতের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জাকাত একটি দেশের অর্থনীতি বা দারিদ্র্য বিমোচনে কতটুকু অবদান রাখতে পারে তা উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে।

‘ইসলামিক ফাইন্যান্স: এ ক্যাটালিস্ট ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি?’ শীর্ষক এ প্রতিবেদনে মুসলিম দেশগুলোয় যাকাতের অর্থনীতির কতটুকু, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সম্পদের ব্যবধান বা কতটা, আর সে দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত কী ভূমিকা রাখতে পারে ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসেবে ১০টি দেশে যাকাতের অবদান প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এতে দেখা যায়, বিভিন্ন মুসলিম দেশের মধ্যে বাংলাদেশে জাকাতের অর্থনীতির সম্ভাবনা অনেক বেশি, যার পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ৬৩ শতাংশ। বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এ হার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ছিল ১৭ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে জাকাতের অর্থনীতির সম্ভাবনা ২৮ হাজার ২৩১ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ এক বছরের দেশের জাকাতের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যাবে। যদিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারি জাকাত ফান্ডে জমা পড়ে মাত্র দুই কোটি ৩৬ লাখ টাকা, যা সম্ভাবনার দশমিক শূন্য এক শতাংশের চেয়েও কম।

জানতে চাইলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত সরকারি জাকাত বোর্ডের পরিচালক ড. মুহাম্মাদ আবদুস সালাম শেয়ার বিজকে বলেন, যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার। দুুস্থ ও নিঃস্ব নারী-পুরুষকে সমাজে পুনর্বাসন করা এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সেতুবন্ধন ভ্রাতৃত্ববোধের সৃষ্টি করাই জাকাত আদায়ের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু সরকারি ফান্ডে যে যাকাতের অর্থ আসছে তা তুলনামূলক অনকে কম। এ ফান্ডের আওতা বাড়ানোর জন্য সচেতনতার পাশাপাশি জাকাত বোর্ডে জনবল সংকট দূর করা জরুরি।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, জাকাতের অর্থনীতির সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে, যার পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার জাকাতের অর্থনীতির পরিমাণ জিডিপির এক দশমিক ৫৯ শতাংশ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা সুদানের জিডিপির এক দশমিক ৪৪ শতাংশ ও পঞ্চম স্থানে থাকা মালয়েশিয়ার জিডিপির এক দশমিক ১১ শতাংশ রয়েছে যাকাতের অর্থনীতি। এ ছাড়া নাইজেরিয়ার দশমিক ৮৬, তানজানিয়ার দশমিক ৫৪, ভারতের (মুসলিম জনগোষ্ঠী) দশমিক ২৬, কেনিয়ার দশমিক ১৩ ও দক্ষিণ আফ্রিকার দশমিক শূন্য তিন শতাংশ যাকাতের অর্থনীতি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সম্পদের ব্যবধান প্রচুর। বিশেষত দৈনিক মাথাপিছু দুই ডলারের নিচে আয় রয়েছে জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশের। জাকাতের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার করা গেলে এ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণ সহজ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশে জাকাতের সম্ভাবনা ব্যাপক। কিন্তু এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম এ যাকাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন জাকাত শুমারি। দেশের শীর্ষ স্থানীয় আলেমদের সমন্বয়ে এ শুমারি করাটা সরকারের দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্যই জাকাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মোট বাজেটের ১৭ শতাংশ ব্যয় হয় দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে। সঠিকভাবে জাকাত আদায়ের পর তা বিতরণ করা হলে সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের অর্থ দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করতে পারবে। এর ফলে একদিকে যেমন দারিদ্র্য বিমোচন গতি পাবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

মন্তব্য করুন