Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ মে, ২০২১ ০৩:৪৮ অপরাহ্ণ

যাকাত কি? এর বিস্তারিত পরিচয় বর্ণনা।

যাকাত ইসলামের অন্যতম রুকন-অর্থনৈতিক ইবাদাত। আরবী শব্দ (زكوة) যাকাতের অর্থ পবিত্রতা, আধিক্য, ক্রমবৃদ্ধি প্রভৃতি। (زكوة) শব্দটি এসেছে زكاء থেকে,যার অর্থ করা হয়েছে طهارة , صلاح । আরবিতে যখন কোন বস্তু তার মূল অবস্থা হতে প্রবৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় তখন বলা হয় ( زكاء الشئ )। মাওলানা আব্দুর রহীম বলেন, যাকাত শব্দের আসল অর্থ হচ্ছে প্রবৃদ্ধি ((Growth), প্রবৃদ্ধি লাভ (Increase), প্রবৃদ্ধির কারণ (To Cause to grow) ইত্যাদি যা আল্লাহ প্রদত্ত বারাকাত (Blessing) থেকে অর্জিত হয় । আল্লামা আবুল হাসান বলেন, যাকাতের অর্থ  الطهارة والبركة والنماء والمدح পবিত্রতা, বৃদ্ধি, বরকত ও প্রশংসা ।

পবিত্র আল কুরআনে যাকাতের সমার্থক আরেকটি শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। তা হলো ‘ صدقة’। উদাহরণ স্বরূপ: خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِ “ তাদের সম্পদ হতে তুমি ‘সাদকা’ গ্রহণ করবে। এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশোধিত করবে” 

বিভিন্ন হাদীসেও এ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়। (ص ـ د ـ ق) শব্দমূল হতে উৎকলিত এ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে সত্য। সত্যবাদীকে বলা হয় “صادق”। প্রকৃত ও অকৃত্রিম বন্ধুকে বলা হয়  صديق। মূলত যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে স্বোপার্জিত সম্পদের কিয়দাংশ নি:স্ব-অভাবগ্রস্থদের জন্য ব্যয় করল সে যেন এ কথারই প্রমাণ দিল যে সে পরকালের প্রতি বিশ্বাসী এবং তার এ সম্পদ মূলত আল্লাহরই একটি অনুগ্রহ।

 

বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবিদগণ যাকাতের বিভিন্ন সংজ্ঞা দিয়েছেন। ১.

الزكاة في الشرع : تطلق على الحصة المقدرة من المال التي فرضها الله للمستحقين ، كما تطلق على نفس إخراج هذه الحصة.

“শরীয়াতের দৃষ্টিতে যাকাত ব্যবহৃত হয় ধন-মালে সুনির্দিষ্ট ও ফরযকৃত অংশ বোঝানোর জন্য। যেমন পাওয়ার যোগ্য লোকদের মাঝে নির্দিষ্ট অংশের ধন-মাল দেওয়াকে যাকাত বলা হয়”।

২. “ইসলামী শরী‘য়াতের পরিভাষায় যাকাত হচ্ছে, কোন সম্পদশালীর  সম্পদের ঐ অংশ বিশেষ, যা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক চিহ্নিত হকদারদের প্রদান তার জন্য অবশ্যম্ভাবী করা হয়েছে। অনুরূপ যাকাত বলতে ঐ নির্ধারিত অংশকে পৃথক করে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে আদায় করাও বুঝায়”। 

অতএব যাকাত হচ্ছে ছাহেবে নিসাবের ধন-সম্পদ ইসলামী শরীয়ত নির্ধারিত পন্থায় অবশ্যই পরিশোধযোগ্য সেই অংশকেই যাকাত বুঝায় যা আল্লাহ পাকের রেজামন্দি হাছিলের জন্য নির্ধারিত আটটি খাতে ব্যয় করা হয়।  


যাকাত ইসলামের আর্থিক ইবাদত। এ ইবাদতের মাধ্যমে মুসলিম সমাজে ন্যায়-ইনছাফ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুসলিম সমাজকে সুখী-সমৃদ্ধশালী  ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজে পরিণত করা হয়। “যাকাতকে আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রিক ভাষায় সামাজিক নিরাপত্তা বিধান বা Social Security System বলা হয়। যাকাত গতানুগতিক কোন দান কিংবা করুণা নয়। আল্লাহ কর্তৃক ধনীদের সম্পদে গরীবের অধিকার। নামায ও যাকাত সমমানের ফরজ। আল কুরআনে যখনই নামায কায়িমের কথা বলা হয়েছে, সাথে সাথে (প্রায় সমসংখ্যক বার)  যাকাত আদায়ের প্রসঙ্গটিও এসেছে। আল্লাহ পাক আল কুরআনে সরাসরি ৩২ বার যাকাতের কথা বলেছেন। এর মধ্যে ২৮ বার  নামায ও যাকাত একত্রে উল্লেখিত হয়েছে। ইসলামী বিশ্বকোষ-এর  তথ্যানুযায়ী পবিত্র কুরআনে নামাযের মতো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৮২ বার যাকাতের কথা বলা হয়েছে”। 

সুতরাং এ সত্য প্রতিভাত হয় যে সম্পদের ত্রæটি-বিচ্যুতি দূরীকরণ ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য যাকাত ইসলামী শরীয়াতের অনন্য বিধান। এ বিধান মুসলমানদের ইহ-পারলৌকিক সাফল্য এনে দেয়। পূঁজিবাদের ভিত্তি সুদ, সমাজতন্ত্রের ভিত্তি সম্পদের রাষ্ট্রীয়করণ আর ইসলামের ভিত্তি হল যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। তাই বলা যায়, যাকাত ইসলামী রাষ্ট্রের এমন এক নিয়ামক শক্তি যার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দুনিয়া ও আখিরাতে জবাবদিহিতামূলক জীবন গঠন করা সম্ভব হয়।  

যাকাত সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা খুব পরিস্কার। আর তা হলো, একটি রাষ্ট্রে এমনভাবে যাকাত আদায় করতে হবে যাতে এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে যাকাত গ্রহণকারীর সংখ্যা কমে আসতে থাকে। ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন শাসনভার গ্রহণ করেন তখন তিনি যাকাতকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং যাকাত আদায়ের জন্য কর্মচারী নিয়োগ করেন। যাকাতের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ রাষ্ট্রের দুঃস্থ, গরীব ও বেকারদের কল্যাণে ব্যয় হত। যাকাতের মাল সংগ্রহ ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অধিকার ছিল না, রাষ্ট্রই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করত। মহানবীর পরে খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলেও এ নিয়ম চালু ছিল। 

মন্তব্য করুন