সহকারী শিক্ষক
২৫ মে, ২০২১ ০১:৪৭ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
বহুমাত্রিক নজরুল
“মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য”
বিদ্রোহী - কাজী নজরুল ইসলাম
এক হাতে প্রেম; অন্য হাতে দ্রোহ নিয়ে যিনি নাড়াচাড়া করেছেন তাঁর পুরো স্বাভাবিক জীবনে তাঁকে যে কোনো মাত্রায় বেঁধে রাখা যায় না, তা সহজেই অনুমান করা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যে ক’জন পুরোধা ব্যক্তিত্ব আছেন, তাঁর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম(১৮৯৯-১৯৭৬)। তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভার বিচ্ছুরণ যেন সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নতুন রূপে উদ্ভাসিত করে তুলেছে। কী নেই তাঁর সৃষ্টিকর্মে! তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক, গীতিলেখ্য-গীতিনাট্য রচয়িতা, স্বরলিপিকার, সুরকার, গায়ক, বাদক, অভিনেতা, সাংবাদিক, সম্পাদক, পত্রিকা-পরিচালক, চলচ্চিত্রের-কাহিনীকার, শ্রমিক, রাজনীতিক, আধ্যাত্মসাধক। মূলকথা তাঁর কর্মভুবনের বিস্তৃতি ব্যাপক। ব্যাপকতা থাকলে বিভিন্ন পরিচয়ের মধ্যে সম্মিলন সাধারণত দেখা যায় না; কিন্তু নজরুল একদমই ব্যতিক্রম, তিনি তাঁর প্রতিটি পরিচয়ে সমানভাবে সমুজ্জ্বল, সাবলীল, অনায়াস।
শিল্পত্বে বিহার-বিচরণ:
নজরুলের কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পী জীবনের সূত্রপাত লেটোদল থেকে; এখানেই তাঁর কবিতা, গান ও নাটক রচনার শুরু; হিন্দুপুরাণ ও রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ও ঘটে এ লেটো দলেই। ত্রিশাল-দরিরামপুর স্কুলজীবনে নজরুল ময়মনসিংহ অঞ্চলের তথা পূর্ববাংলার লোকসঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হন। সৈনিকজীবনে সামরিক ব্যান্ডের দৌলতে তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও ফারসি কবিতার সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে গজলের রসবোদ্ধা হন। নজরুল আনুষ্ঠানিকভাবে আধুনিক বাংলা গানের ভুবনে প্রবেশ করেন কলকাতায় বিশের দশকের শুরুতে এবং নিয়মিত গান রচনা শুরু করেন ১৯২৪ সাল থেকে অসহযোগ, খিলাফত, সন্ত্রাসবাদী বিপ্লব প্রভৃতি ইংরেজ সরকারবিরোধী আন্দোলনের অনুপ্রেরণায়।
দ্রোহ ও প্রেমের কবি নজরুল:
কবি কাজী নজরুল ইসলামের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা (১৯২২)। আর কবির অনুপম নিদর্শন বিদ্রোহী কবিতা। বিদ্রোহী কবিতার ১৩৯ ছত্রে প্রেম-বিদ্রোহ পাশাপাশিই চলেছে।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আবার
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তাঁর কাঁকন-চুরির কন-কন।
‘দোলন-চাঁপা’(১৯২৩) কাব্যেও প্রেম ও বিদ্রোহ পাশাপাশি। ‘বিষের বাঁশি’ ও ‘ভাঙার গান’ কাব্যগন্থ দুটি ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হয়। ‘ছায়ানট’ ও ‘পুবের হাওয়া’ কাব্যগ্রন্থ দুটি ১৯২৫ সালে প্রকাশিত। ‘সাম্যবাদী’(১৯২৫) কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় বেশিরভাগই মানবিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘ঝিঙে ফুল’ সাধারণত শিশুতোষ।‘ফণিমনসা’(১৯২৭) ও ‘সিন্ধু-হিন্দোল’(১৯২৮) কাব্যে প্রেম ও প্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ১৯২৯ সালে রচিত হয় দুটি কাব্যগ্রন্থ; চক্রবাক ও সন্ধ্যা। চক্রবাকের বেশিরভাগ কবিতা প্রেম বিষয়ক। আর বিদ্রোহভাব ফুটে উঠেছে সন্ধ্যা কাব্যের কবিতাগুলোতে। ‘প্রলয় শিখা’ ১৯৩০ সালে প্রকাশিত অন্যতম কাব্যগ্রন্থ। ‘নতুন চাঁদ’(১৯৪৫) ও ‘শেষ সওগাত’(১৯৫৮) কাব্য দুটির বেশিরভাগ কবিতাও বিদ্রোহী ভাবের। ‘ঝিঙে ফুলে’র পর আর একটি শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘সঞ্চয়ন’(১৯৫৫)। শিশুতোষ কবিতা-ছড়ায় ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এনেছেন নতুনত্ব। ‘লিচু-চোর’ কবিতায় বর্ণিত হয়েছে সহজ-সরল গ্রামীণ জীবনের একটি স্বাভাবিক ঘটনা। এখানে আছে কোনো এক কিশোর লিচু চুরি করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়া তারপর মিথ্যা না বলার/চুরি না করার প্রতিশ্রুতি। ‘ঝিঙে ফুল’এ-
ঝিঙে ফুল! ঝিঙে ফুল।
সবুজ পাতার দেশে ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল-
ঝিঙে ফুল।
কী! দারুণ বর্ণনা। রং এবং ফুল একইসাথে শিশুমনকে দোলা দেয় এবং শিশুমনে গ্রথিত হয়। আবার ‘খুকি ও কাঠবিড়ালী’ বা ‘সংকল্প’ কবিতাটি আবৃত্তি করেননি এমন বাঙালি পাওয়া যাবে না! ঝড় (১৯৬০) কম আলোচিত কাব্য হলেও গবেষণাধর্মী।
নজরুলের কবিতায় ‘বীর-রুদ্র-বীভৎস রস’ প্রবলভাবে উপস্থিত। ‘আমি’- এর ব্যবহার নজরুলের বীর রসের বড় উদাহরণ।
বাংলা কবিতায় লিঙ্গ-বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নজরুল। ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় বারাঙ্গনাদের সম্মানিত করেছেন নজরুল। অন্যদিকে শোষণের বিরুদ্ধে কুলি-শ্রমিককে রুখে দাঁড়ানোর মন্ত্র দিয়েছেন এভাবে,
‘ওরে ধ্বংস পথের যাত্রীদল!
ধর হাতুরি, তোল কাঁধে শাবল... মোদের যা ছিল সব দিইছি ফুঁকে,
এইবার শেষ কপাল ঠুকে!
পড়ব রুখে অত্যাচারীর বুকেরে!
অমৃতসুধা নজরুল গীতি:
১৯২৪ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নজরুল বেশ কিছু উদ্দীপনামূলক গান রচনা করেন, কালানুক্রমিকভাবে যেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ‘শিকল পরা ছল মোদের’, ‘কারার ঐ লৌহ কবাট’, ‘ধ্বংস পথের যাত্রীদল’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার’, ‘আমরা শক্তি আমরা বল’ প্রভৃতি। এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, নজরুলের সঙ্গীত-প্রতিভার প্রথম স্ফূরণ ঘটে উদ্দীপনামূলক গানে। গানগুলিতে তিনি মূলত স্বদেশী সুর ও ঢং ব্যবহার করলেও তাতে দৃঢ় বলিষ্ঠতা সংযোজন করেন।
১৯২৬ সালের শেষ দিকে তিনি গজল রচনা শুরু করেন এবং ১৯৩০ সাল পর্যন্ত প্রায় একটানা বহু উৎকৃষ্ট গজল গান রচনা করেন। নজরুলের গজলের বিষয়বস্তু প্রেম ও প্রকৃতি মিশ্রিত। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গজল হলো: ‘আসে বসন্ত ফুলবনে’, ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘এত জল ও কাজল চোখে’, ‘ভুলি কেমনে আজো যে মনে’, ‘কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে’, ‘কেন কাঁদে এ পরাণ’, ‘চেয়ো না সুনয়না’, ‘বসিয়া নদীকূলে’ ইত্যাদি। তাঁর বুলবুল (১৯২৮), চোখের চাতক (১৯২৯) এবং চন্দ্রবিন্দু (১৯৩০) গীতি-সংকলনের অনবদ্য সৃষ্টি। নজরুলের বিচিত্র আঙ্গিকের গানের সুরকে রাগভিত্তিক করার পরিচয় তাঁর নজরুল-গীতিকা (১৯৩০) গ্রন্থে সংকলিত গানগুলির মধ্যে রয়েছে। এর গানগুলির যে শ্রেণিবিন্যাস নজরুল নিজেই করেছেন, তা হলো: ওমর খৈয়াম গীতি, দীওয়ান-ই-হাফিজ গীতি, দেশাত্মবোধক ও উদ্দীপনামূলক স্বদেশী গান, ঠুমরি, গজল, কাজরী, টপ্পা, কীর্তন, বাউল-ভাটিয়ালি, ধ্রুপদ, হাসির গান, ঝুমুর ও খেয়াল। ১৯৩০-৩১ সাল থেকে নজরুল হিন্দু ভক্তিমূলক এবং ইসলামি গান রচনা শুরু করেন। হিন্দু ভক্তিগীতির মধ্যে তিনি প্রথম রচনা করেন ‘জাগো জাগো শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী’, ‘তিমির বিদারী অলখ বিহারী’, ‘জাগো হে রুদ্র’ ইত্যাদি। ইসলামি গানের মধ্যে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘মোহররমের চাঁদ’, ‘তোরা দেখে যা’ প্রভৃতি। নজরুল প্রায় এক হাজার ধর্মীয় সঙ্গীত রচনা করেন, যার মধ্যে হিন্দু ঐতিহ্যের শ্যামাসঙ্গীত, ভজন, কীর্তন এবং ইসলামি ঐতিহ্যের হামদ্, নাত, নামায, রোজা, হজ্জ, যাকাত, ঈদ, মর্সিয়া প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ের গান রয়েছে। ১৯৩২-৩৪ সালে নজরুলের ৬টি গীতি-সংকলন প্রকাশিত হয়: সুরসাকী, জুলফিকার, বনগীতি, গুলবাগিচা, গীতিশতদল ও গানের মালা। নজরুলের সঙ্গীত-জীবনের পঞ্চম ও শেষ পর্যায় হচ্ছে রাগভিত্তিক গান সৃষ্টির পর্ব; তিনি রাগভিত্তিক গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ‘বেণুকা’ ও ‘দোলনচাঁপা’ নামে দুটি রাগিণী সৃষ্টি করেন। নজরুল প্রায় ৩০০০ গান রচনা, অধিকাংশে সুরারোপ করেছেন যেগুলো এখন নজরুল সঙ্গীত বা নজরুল গীতি নামে পরিচিত এবং বিশেষ জনপ্রিয়।
গদ্য-গল্প সৃজনে দুখু:
বিস্ময়কর মনে হলেও কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত নজরুলের সাহিত্যে আবির্ভাব গদ্য রচয়িতা হিসেবে। প্রথম রচিত গদ্য ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটেছিল। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন, এর মধ্যে রয়েছে: হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান। পরবর্তীতে ‘রিক্তের বেদন’(১৯২৫) ও ‘শিউলি মালা’(১৯৩১) প্রকাশিত হয়। এখানেও জোয়ার-ভাঁটার মত গল্পগুলোও একই আঙ্গিকের ছিলোনা। বহুমাত্রিকতা এখানেও বহমান। গল্পগ্রন্থে সন্নিবেশিত বিভিন্ন ধরণের গল্পের বিন্যাস নতুন স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ দান করে। যেমন- রিক্তের বেদন গল্পে কিশোরের যুদ্ধযাত্রা আর সেই সাথে কিশোরী শাহিদাকে ফেলে যাওয়ার অপার চিন্তা; আবার ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’তে ফুটে উঠেছে ‘অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়’। সব গল্পেই যেন প্রেম-প্রেমী লুকিয়ে আছে, শুধু যে নর-নারীর মধ্যের প্রেম তা নয় প্রকৃতি-প্রেম, সন্তান-প্রেম, দেশপ্রেম প্রভৃতি।
দরদি ঔপন্যাসিক:
‘বাঁধন-হারা’(১৯২৭), ‘মৃত্যুক্ষুধা’(১৯৩০) ও ‘কুহেলিকা’(১৯৩১)-নজরুলের মোট এ তিনটি উপন্যাস আমাদের হাতে এসেছে। নজরুলের উপন্যাসের অধিকাংশ বাক্য ছোট ছোট। প্রথম লাইন থেকে নজরুলের উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় এবং পাঠককে কৌতূহলী করে তোলে। মাঝে মধ্যেই তার উপন্যাসের বাক্যাবলি উজ্জ্বল কৌতুক-রস ছড়ায়। তাঁর উপন্যাসে সমাজ সচেতনতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, নর-নারীর প্রেমের প্রতি দরদি মনোভাব আমাদের মুগ্ধ করে। মাত্র তিনটি উপন্যাস রচনা করলেও নজরুলের উপন্যাস সমাজ, দেশ, মাটি-মানুষের কাছাকাছি, বিশেষ করে মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাস। কাহিনী বৈচিত্র্য, ভাষা ও রচনাশৈলীতে নজরুলের উপন্যাসগুলো অসাধারণ। নিঃসন্দেহে নজরুল সমাজ-সচেতন, ইতিহাস-সচেতন, দেশপ্রেমিক, কুশলী ঔপন্যাসিক।
নজরুলের নাটক-পূর্নাঙ্গ সিম্ফনি:
কাজী নজরুল ইসলাম জীবনের শুরুতে জীবিকার তাগিদে যোগ দিয়েছিলেন গ্রাম্য লেটো গানের দলে। এর মাধ্যমেই পাঁচালি, পালা ও লোকজীবনের সঙ্গে অঙ্গীকৃত মানবিক ভাবনার মহৎ প্রকাশ ঘটেছে। ফলে নজরুলের ভেতরে, শিল্পের পথে যাত্রার শুরুতে, ১২/১৩ বছর বয়সে প্রাণের যে সুরধারা প্রতিষ্ঠা পেল, তা সারাটা জীবন তাঁকে তাড়িয়ে নিয়েছে নব নব সৃজনের সার্থক ভুবনে। লেটো গানে পালা রচনার (তাঁর রচিত ১৩টি পালা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে) মধ্য দিয়ে নজরুলের নাট্যপ্রতিভার উন্মেষ বলেই সুর ও কাব্য তাঁর পরিণত জীবনে লেখা নাটক থেকে বিসর্জিত হয়নি। সেটার পরিণত ও আধুনিক প্রকাশ হল ‘ঝিলিমিলি’(১৯৩০), ‘সেতুবন্ধ’(১৯৩০), ‘পুতুলের বিয়ে’(১৯৩০), ‘আলেয়া’(১৯৩১), ‘শিল্পী’, ‘মধুমালা’(১৯৬০), ‘ঝড়’(১৯৬০) প্রভৃতি নাটক। তাঁর নাট্য রচনার পরিণতি ও সমৃদ্ধি ঘটেছে নাট্যমঞ্চের সরাসরি সম্পর্কের মাধ্যমে। তিনি উপলব্ধি করেছেন, মঞ্চ ব্যতিরেকে নাটকের প্রায়োগিক শৈলী কখনোই শরীরী হয়ে ওঠে না।
প্রবন্ধ গুণে সফল সাংবাদিক ও রাজনীতিক:
প্রাবন্ধিক হিসেবে কবির পরিচয় ফুটে উঠেছে সাংবাদিকতার সূত্রে। সান্ধ্য দৈনিক 'নবযুগ' , অর্ধসাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ সাপ্তাহিক 'লাঙল' ও সাপ্তাহিক 'গণবাণী' ‘সমকাল’-এ স্বদেশ ও বিশ্বের সাড়া জাগানো ঘটনা ও প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক সম্পাদকীয় নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। সেগুলোতে তাঁর রাজনীতিক ভাবনার পরিচয় বিধৃত আছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগুলি ‘যুগবানী’(১৯২৬), ‘ঝিঙ্গে ফুল’(১৯২৬), ‘দুর্দিনের যাত্রী’(১৯২৬), ‘রুদ্র মঙ্গল’(১৯২৭), ‘ধূমকেতু’(১৯৬১)।
নজরুলের নান্দনিক সাফল্য এবং চলচ্চিত্র:
বাংলা চলচ্চিত্রের সবাক যুগের শুরুতে প্রথম বাঙালী মুসলমান চলচ্চিত্রকার রূপেও আবির্ভূত হন নজরুল। অভিনেতা, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, সংগীত পরিচালক, পরিচালক হিসেবে তাঁর অবদান অতুলনীয়। ১৯৩১ থেকে ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র অঙ্গনে ছিলেন এক সক্রিয় কর্মী। শুধু বাংলা চলচ্চিত্র নয়, তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে হিন্দি, উর্দু, পাঞ্জাবি এবং ইংরেজি ভাষায় নির্মিত চলচ্চিত্রও। ১৯৩১ সালে নজরুল পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ধূপছায়া’। নজরুলের অভিনীত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’ ১৯৩৪ সালে মুক্তি পায়। তিনি এই চলচ্চিত্রে "নারদের" ভূমিকায় অভিনয় করেন। পাতালপুরী, গ্রহেরফের, গোরা, নন্দিনী, চৌরঙ্গী প্রভৃতি চলচ্চিত্রে নজরুল সুরকার,গীতিকার, সংগীত পরিচালক হিসেবে জড়িত ছিলেন। বিদ্যাপতি (বাংলা ও হিন্দি), সাপুড়ে এই চলচ্চিত্রগুলোর কাহিনী-গীত-সুর রচনা করেন তিনি।
সব্যসাচী নজরুল:
‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’(১৯২৩), ‘দিওয়ানে হাফিজ’(১৯৩০), ‘কাব্যে আমপারা’(১৯৩৩), ‘মক্তব সাহিত্য’(১৯৩৫), ‘রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম’(১৯৫৮) প্রভৃতি অনুবাদ গ্রন্থে নজরুল যে সাবলীলতার পরিচয় দেখিয়েছেন তা প্রকৃতপক্ষে অসাধারণ।
ভারতবর্ষের সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক চাঞ্চল্যের যুগে ‘সৃষ্টি-মাতাল নজরুলের’ জন্ম যখন এ-অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা সবে জেগে উঠতে শুরু করেছে। তিনি ইহজাগতিকতা, মানবিকতা বোধ, অসাম্প্রদায়িকতা চেতনা, তীব্র আত্মজাগরণ, ধর্মীয় উদ্দীপনা ইত্যাদিকে একটি সুতোয় বেঁধে সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন সাহিত্য শুধু চর্চার বিষয় নয়, ধারণ ও উপলব্ধির অন্যতম অনুষঙ্গ। তাঁর কণ্ঠে-লেখনীতে বারবার উচ্চারিত হয়েছে-
‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’।।
ইতিকথা:
রেনেসাঁসের প্রতিভূ নজরুল কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নয়, সমগ্র মানব জাতির। একজন কিশোর, মক্তব-শিক্ষক, শ্রমিক, পালা-লেখক, প্রেমিক, সৈনিক সামগ্রিক সংগ্রামী জীবনকে সঙ্গী করে তাঁর বহুমাত্রিক সত্তাকে সাহিত্যাকাশে বিচ্ছুরিত করেছেন এবং সফল হিসেবে তুঙ্গকে স্পর্শ করেছেন অবলীলায়। বাঙালীর জীবনের সকল আনন্দ-বিদ্রোহ-বেদনায় নজরুল-সৃজনী অন্যতম ভাবনা যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’। তাঁর নানামাত্রিক ভাবনা বর্তমান সময়েও, সমান প্রাসঙ্গিক। তাই নজরুল চর্চা হোক নৈমিত্তিক ঘটনা।
৫
৫ মন্তব্য