সহকারী শিক্ষক
২৮ মে, ২০২১ ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে বজ্রপাত খুব পরিচিত, সুন্দর, রহস্যময় এবং একই সাথে আতঙ্কের। সূর্যপৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় সমান মাত্রার স্ফুলিঙ্গ আর ভয়াবহ গর্জন বহুকাল ধরেই মানুষের পিলে চমকানোর কাজটি দায়িত্বের সাথে পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। একই সঙ্গে মৃত্যুর হারও বেড়েছে। বজ্রপাতের সৌন্দর্যের এই ভয়ালরূপের পাশাপাশি আমাদের মনে রহস্যের জন্ম দেয়, বজ্রপাতের কারণ কী? ছোটবেলায় এই প্রশ্নের কারণ খুঁজতে গিয়ে আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উত্তর পেয়েছি, মেঘে মেঘে সংঘর্ষের ফলাফল হলো এই বজ্রপাত। আসলেই কি তাই?
(১) বজ্রপাত কেন হয়?
(২) বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ চমকায় কেন?
(৩) বজ্রপাতের সময় শব্দ উৎপন্ন হয় কেন?
(৪) বজ্রপাত হলে কেন আলো আর শব্দ একসংগে শোনা যায় না?
(৫) বজ্রপাতের সময় করণীয় কী কী?
জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘে পরিণত হওয়ার সময় এতে প্রচুর স্থির বৈদ্যুতিক চার্জ (electrostatic charge) জমা হয়। মেঘ কিভাবে চার্জিত হয় তা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে বেশ মতভেদ থাকলেও সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত মতবাদ হচ্ছে, পানিচক্রে জলকণা যখন ক্রমশ ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে থাকে তখন তারা মেঘের নিচের দিকের বেশি ঘনীভূত বৃষ্টি বা তুষার কণার সাথে সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়।ঝড় এর সময় মেঘ বা জলীয়বাষ্প বা ঘন বায়ু প্রচন্ড বেগে পরস্পরের মধ্যে সংঘর্ষ এর ফলে প্লাজমা অবস্থার তৈরি হয়।
যার ফলে উপরের দিকে উঠতে থাকা অনেক বাষ্প পরমাণু বেশ কিছু ইলেকট্রন হারায়। যে পরমাণু ইলেকট্রন হারায় তা পজিটিভ চার্জে (Positive Charge) এবং যে পরমাণু ইলেকট্রন গ্রহণ করে তা নেগেটিভ চার্জে (Negative Charge) চার্জিত হয়। অপেক্ষাকৃত হাল্কা পজিটিভ চার্জ চলে যায় মেঘের উপর পৃষ্ঠে যার প্রবাহকে পজিটিভ বজ্র (positive lightning) বলে এবং ভারী নেগেটিভ চার্জ জমা হয় মেঘের নিচে বা মাঝামাঝি অবস্থানে যার প্রবাহকে নেগেটিভ বজ্র (negative lightning) বলে ।
যথেষ্ট পরিমাণ পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জ জমা হওয়ার পর পজিটিভ ও নেগেটিভ চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণের দরুণ ইলেক্ট্রস্ট্যাটিক ডিসচার্জ (electrostatic discharge) প্রক্রিয়া শুরু হয়। ডিসচার্জ বিভিন্ন ভাবে হতে পারে-
(ক) মেঘের নিজস্ব পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-) চার্জের মধ্যে (একে বলা হয় Intra Cloud বা IC discharge) । এ অবস্থায় শর্ট সার্কিট (short circuit) অর্থাৎ নেগেটিভ (-) এবং পজিটিভ (+) স্ট্রিম মিলে গিয়ে নিউট্রালাইজ এর ঘটনা ঘটে, তখন প্রচণ্ড শব্দ হয়। এ ধরনের বজ্রপাত মেঘের মধ্যেই হয়। যা ইন্ট্রাক্লাউড লাইটনিং (Intracloud Lightning) নামে পরিচিত। অধিকাংশ বজ্রপাত এই ধরনের।
(খ) একটি মেঘের পজেটিভ (+) কিংবা নেগেটিভ (-) চার্জের সাথে অন্য মেঘের নেগেটিভ (-) কিংবা পজেটিভ (+) চার্জের সাথে (একে বলা হয় Cloud to Cloud বা CC discharge)
(গ) মেঘের পজেটিভ (+) চার্জের সাথে ভূমির (একে বলা হয় Cloud to Ground বা CG discharging)
এ অবস্থায় পৃথক হওয়া বিপুল পরিমাণ চার্জ মেঘ থেকে সরাসরি ভূমিতে এসে আঘাত হানে এবং নিউট্রালাইজড হয়। এটি মূলত দুই ধরনের যথা পজিটিভ এবং নেগেটিভ।
একীভূত নেগেটিভ চার্জ (মেঘের নিচে বা মাঝামাঝি) থেকে ইলেক্ট্রন এর প্রবাহ সরাসরি ভূমিতে এসে নিউট্রালাইজ হয় যা “নেগেটিভ বজ্রপাত”। বজ্রপাতের অধিকাংশই হল এই ধরনের নেগেটিভ বজ্রপাত যাতে কারেন্ট থাকে ২০-৫০ হাজার অ্যাম্পিয়ার এবং ভোল্টেজ থাকে ৩০ হাজার থেকে কয়েক লাখ ভোল্ট। নাসা ২ লক্ষ এম্পিয়ার কারেন্ট এর নেগেটিভ বজ্রপাতও রেকর্ড করেছে। নেগেটিভ বজ্রপাতের এর ঘটনা বৃষ্টি কালীন হয়।
অন্যদিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক হল পজিটিভ বজ্রপাত অর্থাৎ জমাকৃত বিপুল পরিমাণ পজিটিভ চার্জ (মেঘের উপরে) সরাসরি ভূমিতে এসে ভূমির গভীরে চলে যায় বা গ্রাউন্ড থেকে ইলেক্ট্রন এর প্রবাহ উল্টো পথে উঠে অর্থ্যাৎ উপরে গিয়ে একে নিউট্রালাইজ করে।মোট CG বজ্রপাতের ৫% হল এ ধরনের পজিটিভ বজ্রপাত যাতে ভোল্টেজ থাকে ১০০ কোটি ভোল্ট (1 billion volt) এবং কারেন্ট থাকে ৩ লক্ষ অ্যাম্পিয়ার !
মজার ব্যাপার হলো এটি কখনো বৃষ্টির মধ্যে হয় না বরং বৃষ্টি ছাড়া ঝড়ো আবহাওয়া তে হয়। অর্থাৎ একে বলা যায় বিনা মেঘে বজ্রপাত (Bolt from the blue).সাধারণত, পাওয়ার সাবস্টেশন নষ্ট হওয়া বা বন জংগলে আগুন লাগার অন্যতম প্রধান কারণ এই পজিটিভ বজ্রপাত (positive CG strike).
এছাড়াও Cloud-to-Ground Lightning, Anvil Crawlers, Cloud-to-Air Lightning, Bead Lightning, Ribbon Lightning, Sheet Lightning ইত্যাদি অনেক ধরনের বজ্রপাত হয়।
উল্লেখ্য যে, বাসা-বাড়িতে আমরা যে সিলিং ফ্যান ব্যবহার করি তা ২২০ ভোল্ট এবং ০.৫ অ্যাম্পিয়ার-এ চলে।
মানব দেহ দিয়ে মাত্র ০.২ অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট প্রবাহ এত বিপজ্জনক যে, এতে যে কারো অবচেতন হয়ে প্যারালাইজড্ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যু অবধারিত যদি মিনিট খানেক স্থায়িত্ব হয় এ মাত্রার কারেন্ট। সেজন্য কারও উপর বজ্রপাত হলে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
বজ্রপাত এর সময় বাতাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। আমরা জানি বাতাস বিদ্যুৎ অপরিবাহী। কিন্তু মেঘে জমা হওয়া স্থির বিদ্যুৎ এত উচ্চ বিভব শক্তি (১০ মিলিয়ন ভোল্ট পর্যন্ত) উৎপন্ন করে যে, তা বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার জন্য বাতাসের একটা সরু চ্যানেলকে আয়নিত করে পরিবাহী পথ (conductive path) তৈরি করে। আয়নিত পরমাণু বিকীর্ণ শক্তি থেকে তীব্র আলোকচ্ছটা তৈরি হয়।
ডিসচার্জ হওয়ার সময় বাতাসের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, একে বলা হয়। এ সময় বাতাসের যে চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় তার তাপমাত্রা প্রায় ২৭০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (যা সূর্যের তাপমাত্রা থেকে বেশি) এ উন্নীত হয় এবং বাতাসের চাপ স্বাভাবিক চাপ থেকে ১০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এ চাপ এবং তাপমাত্রায় পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র এক সেকেন্ডের কয়েক হাজার ভাগের এক ভাগ। এত কম সময়ে তাপমাত্রা ও চাপের এত ব্যাপক পরিবর্তন চারপাশের বায়ুমণ্ডলকে প্রচণ্ড গতিতে (বিস্ফোরণের মত) সম্প্রসারিত করে। এ সময় যে শব্দ তরঙ্গ উৎপন্ন হয় সেটাই আমরা শুনতে পাই।
বজ্র পাতের ক্ষেত্রে আলো কোনো বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আসে না। বজ্রই আলো উৎপাদন করে আর সেই আলো সোজা আমাদের চোখে এসে পড়ে। তখন আমরা বাজের ঝলক দেখতে পাই।
অন্যদিকে শব্দ তরঙ্গ মানুষের কানের ভেতর দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কের এক বিশেষ পর্দায় আঘাত হানে। তখন মস্তিষ্কের সেই পর্দায় কম্পন সৃষ্টি হয়। সেই কম্পনকেই আমরা শব্দ হিসেবে শুনি।
এখন আলোর সাথে শব্দের তুলনা করা যাক। আলোর বেগ সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। আর শব্দের বেগ বাতাসে সেকেন্ডে প্রায় ৩৩২ মিটার বা ০.৩৩২ কিলোমিটার মাত্র। অর্থ্যাৎ আলোর বেগ শব্দের বেগের প্রায় নয় লক্ষ গুণ। মেঘ সাধারণত মাটি থেকে ২ থেকে ৫ কিলোমিটার ওপরে অবস্থান করে। সেজন্য এই দূরত্ব অতিক্রম করে বজ্রপাতে আলো আমরা তাৎক্ষণিক দেখি এবং সৃষ্ট শব্দে শুনতে প্রায় ৯ সেকেন্ড সময় লেগে যায়। তাই বাজ্রপাতের আলো আর কান ফাটানো আওয়াজ একসাথে দেখা ও শোনা যায় না।
১. বজ্রপাতের ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির ধাতব রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না।
২. প্রতিটি বিল্ডিংয়ে বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন নিশ্চিত করুন।
৩. খোলাস্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান।
৪. কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকে তাহলে সবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান।
৫. খোলা জায়গায় কোনো বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেয়া যাবে না। গাছ থেকে চার মিটার দূরে থাকতে হবে।
বজ্রপাত এর সময় যা করতে হবেaloasbei.com৬. ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকতে হবে। বৈদ্যুতিক তারের নিচ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে।
৭. ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির প্লাগগুলো লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে হবে।
৮. বজ্রপাতে আহতদের বৈদ্যুতিক শকের মতো করেই চিকিৎসা দিতে হবে।
৯. এপ্রিল-জুন মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। এই সময়ে আকাশে মেঘ দেখা গেলে ঘরে অবস্থান করুন।
১০. যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
১১. বজ্রপাতের সময় বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায় থাকবেন না এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকুন।
১২. ঘন-কালো মেঘ দেখা গেলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন।
১৩. উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, তার, ধাতব খুঁটি ও মোবাইল টাওয়ার ইত্যাদি থেকে দূরে থাকুন।
১৪. বজ্রপাতের সময় জরুরি প্রয়োজনে প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন।
১৫. বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, মাঠ বা উঁচু স্থানে থাকবেন না।
১৬. কালো মেঘ দেখা দিলে নদী, পুকুর, ডোবা, জলাশয় থেকে দূরে থাকুন।
১৭. বজ্রপাতের সময় শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখুন এবং নিজেরাও বিরত থাকুন।
১৮. বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ুন।
১৯. বজ্রপাতের সময় গাড়ির মধ্যে অবস্থান করলে, গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না। সম্ভব হলে গাড়িটিকে নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
২০. বজ্রপাতের সময় মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করুন।
তথ্যসুত্রঃ সায়েন্স জার্নাল
শুভেচ্ছান্তে
মোঃ মামুনুর রহমান
সহকারী শিক্ষক(আইসিটি), আইসিটি জেলা অ্যাম্বাসেডর, রাজশাহী ও ব্রিটিশ কাউন্সিল কো-অর্ডিনেটর, রাজশাহী
গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়
গোদাগাড়ী, রাজশাহী
Email: [email protected]
Mobile & Whatsapp: +8801768927380
৭১
১৪৫ মন্তব্য