সহকারী অধ্যাপক
৩০ মে, ২০২১ ০১:৫৭ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
গৌতম বুদ্ধ দার্শনিক,সংস্কারক ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ
গৌতম বুদ্ধ ছিলেন একজন সম্যাক সম্বুুদ্ধ ও জ্ঞানী,
যাঁর তত্ত্ব অনুসারে বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তিত হয়। তিনি সিদ্ধার্থ
গৌতম, শাক্যমুনি বুদ্ধ, বা ‘বুদ্ধ’ উপাধি অনুযায়ী
শুধুমাত্র বুদ্ধ নামেও পরিচিত। অনুমান করা হয়, তিনি
খ্রিস্টপূর্ব ৬২৫ অব্দে এক সময়ে প্রাচীন ভারতের
পূর্বাঞ্চলে জীবিত ছিলেন এবং শিক্ষাদান করেছিলেন।
জন্ম: লুম্বিনী, নেপাল
মারা গেছেন: কুশিনগর, ভারত
স্ত্রী: যশোধরা
বাবা ও মা: শুদ্ধোধন, মায়াদেবী
সন্তান: রাহুল
বিস্তারিতঃ
সিদ্ধার্থ গৌতম শাক্য প্রজাতন্ত্রের নির্বাচিত প্রধান
ক্ষত্রিয় বংশের শুদ্ধোধনের পুত্র ছিলেন। তার মাতা
মায়াদেবী কোলিয় গণের রাজকন্যা ছিলেন। শাক্যদের
প্রথা অনুসারে গর্ভাবস্থায় মায়াদেবী শ্বশুরালয়
কপিলাবস্তু থেকে পিতৃরাজ্যে যাবার পথে অধুনা
নেপালের তরাই অঞ্চলেরে অন্তর্গত লুম্বিনী গ্রামে এক
শালগাছের তলায় সিদ্ধার্থের জন্ম দেন। তার জন্মের
সময় বা সপ্তম দিনে মায়াদেবীর জীবনাবসান হয়।
শুদ্ধোধন শিশুর জন্মের পঞ্চম দিনে নামকরণের জন্য
আটজন ব্রাহ্মণকে আমন্ত্রণ জানালে তারা শিশুর নাম
রাখেন সিদ্ধার্থ অর্থাৎ যিনি সিদ্ধিলাভ করেছেন। এই
সময় পর্বতদেশ থেকে আগত অসিত নাম একজন সাধু
নবজাত শিশুকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে এই শিশু
পরবর্তীকালে একজন রাজচক্রবর্তী অথবা একজন
সিদ্ধ সাধক হবেন। একমাত্র সর্বকনিষ্ঠ আমন্ত্রিত ব্রাহ্মণ
কৌণ্ডিন্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই শিশু
পরবর্তীকালে বুদ্ধত্ব লাভ করবেন। মাতার মৃত্যুর পর
তিনি বিমাতা মহাপজাপতি গোতমী কর্তৃক লালিত হন।
ষোলো বছর বয়সে তাকে সংসারের প্রতি মনোযোগী
করার জন্য তার পিতামাতা তাকে কোলিয় গণের
সুন্দরী কন্যা যশোধরার সাথে বিবাহ দেন ও রাহুল
নামক এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সিদ্ধার্থ তার
জীবনের প্রথম উনত্রিশ বছর রাজপুত্র হিসেবে
অতিবাহিত করেন। বৌদ্ধ পুঁথিগুলি অনুসারে পিতা
শুদ্ধোধন তার জীবনে বিলাসিতার সমস্ত রকম ব্যবস্থা
করা সত্ত্বেও সিদ্ধার্থ বস্তুগত ঐশ্বর্য্য যে জীবনের লক্ষ্য
হতে পারে না, তা উপলব্ধি করা শুরু করেন।
কথিত আছে, উনত্রিশ বছর বয়সে রাজকুমার সিদ্ধার্থ
প্রাসাদ থেকে কয়েকবার ভ্রমণে বেরোলে তিনি একজন
বৃদ্ধ মানুষ, একজন অসুস্থ মানুষ, একজন মৃত মানুষ
ও একজন সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। সাংসারিক দুঃখ
কষ্টে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ সিদ্ধার্থ তার সারথি ছন্নকে
এঁদের প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে,ছন্ন তাকে বুঝিয়ে বলেন
যে সকল মানুষের নিয়তি যে তারা একসময় বৃদ্ধ,অসুস্থ
হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হবে।মুণ্ডিতমস্তক পীতবর্ণের জীর্ণ
বাস পরিহিত সন্ন্যাসী সম্বন্ধে ছন্ন তাকে বলেন,যে তিনি
মানুষের দুঃখের জন্য নিজ গার্হস্থ্য জীবন ত্যাগ
করেছেন,তিনিই সন্ন্যাসী।এই নূতন অভিজ্ঞতায় বিষাদ
গ্রস্ত সিদ্ধার্থ বাধর্ক্য, জরা ও মৃত্যুকে জয় করার জন্য
বদ্ধপরিকর হয়ে একজন সন্ন্যাসীর জীবনযাপনের
সিদ্ধান্ত নেন। সংসারের প্রতি বীতরাগ সিদ্ধার্থ একরাত্রে
ঘুমন্ত স্ত্রী, পুত্র, পরিবারকে নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে প্রিয়
অশ্ব কন্থক ও সারথি ছন্নকে নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন।
প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে বনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে রাজবস্ত্র
ত্যাগ করে তলোয়ার দিয়ে তার লম্বা চুল কেটে
মুণ্ডিতমস্তক হন। এরপর কন্থক ও ছন্নকে বিদায়
জানিয়ে রাজগৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
প্রথমে তিনি আলার কালাম নামক একজন সন্ন্যাসীর
নিকট যোগ শিক্ষা করেন। কিন্তু তার প্রশ্নের
সন্তোষজনক উত্তর লাভ না করায় এরপর তিনি উদ্দক
রামপুত্ত নামক অপর একজন সন্ন্যাসীর নিকট শিষ্যত্ব
গ্রহণ করে যোগশিক্ষা লাভ করেন।কিন্তু এখানেও তার
জিজ্ঞাসা পূরণ না হওয়ায় তিনি তাকে ত্যাগ করে
বুদ্ধগয়ার নিকট উরুবিল্ব নামক একটি রম্য স্থানে গমন
করেন।
শরীরকে অপরিসীম কষ্ট প্রদানের মাধ্যমে মুক্তিলাভ হয়
এই বিশ্বাসে তিনি ও অন্য পাঁচজন তপস্বী ছয় বছরধরে
অনশন, শারীরিক নিপীড়ন ও কঠোর সাধনায়
অতিবাহিত করেন। দীর্ঘকাল ধরে কঠোর তপস্যার পর
তার শরীর অস্থিচর্মসার হয়ে পড়ে ও তার অঙ্গ
সঞ্চালনের ক্ষমতা কমে গিয়ে তিনি মরণাপন্ন হলে তার
উপলব্ধি হয় যে, অনশনক্লিষ্ট দুর্বল দেহে শরীরকে
অপরিসীম কষ্ট দিয়ে কঠোর তপস্যা করে বোধিলাভ
সম্ভব নয়।ধর্মচক্রপ্রবর্তন সূত্রানুসারে, অসংযত বিলাস
বহুল জীবনযাপন এবং কঠোর তপস্যার মধ্যবর্তী
একটি মধ্যম পথের সন্ধান করে বোধিলাভ সম্ভব বলে
তিনি উপলব্ধি করেন। তিনি তাই আবার খাদ্য গ্রহণের
সিদ্ধান্ত নিলেন ও সুজাতা নাম্নী একস্থানীয় গ্রাম্যকন্যার
কাছ থেকে তিনি এক পাত্র পরমান্ন আহার করেন।
সিদ্ধার্থকে খাদ্য গ্রহণ করতে দেখে তার পাঁচজন সঙ্গী
তার ওপর বিরক্ত হয়ে তাকে ছেড়ে চলে যান।
এই ঘটনার পরে একটি অশ্বত্থ গাছের তলায় তিনি
ধ্যানে বসেন এবং সত্যলাভ না করে স্থানত্যাগ করবেন
না বলে প্রতিজ্ঞা করেন।উনপঞ্চাশ দিন ধরে ধ্যানকরার
পর তিনি বোধি প্রাপ্ত হন।এই সময় তিনি মানব জীবনে
দুঃখ ও তার কারণ এবং দুঃখ নিবারণের উপায় সম্বন্ধে
অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন, যা চতুরার্য সত্য নামে খ্যাত হয়।
তার মতে এই সত্য সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করলে মুক্তি বা
নির্বাণ লাভ সম্ভব।
বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে তপুস্স ও ভল্লিক
নামক বলখ অঞ্চলের দুইজন ব্যবসায়ীর সাক্ষাত হয়,
যারা তাকে মধু ও বার্লি নিবেদন করেন। এই দুইজন
বুদ্ধের প্রথম সাধারণ শিষ্য। বুদ্ধ তার প্রাক্তন শিক্ষক
আলার কালাম ও উদ্দক রামপুত্তের সাথে সাক্ষাত করে
তার নবলব্ধ জ্ঞানের কথা আলোচনার জন্য উৎসাহী
ছিলেন, কিন্তু তাদের দুইজনেরই ততদিনে জীবনাবসান
হয়ে গেছিল।এরপর তিনি বারাণসীর নিকট ঋষিপতন
এর মৃগ উদ্যানে যাত্রা করে তার সাধনার সময়ের পাঁচ
প্রাক্তন সঙ্গী,যারা তাকে একসম পরিত্যাগ করেছিলেন,
তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন ও তাদেরকে তার প্রথম
শিক্ষা প্রদান করেন, যা বৌদ্ধ ঐতিহ্যে ধর্মচক্রপ্রবর্তন
নামে খ্যাত।এই ভাবে তাদের নিয়ে ইতিহাসের প্রথম
বৌদ্ধ সংঘ গঠিত হয়।
এরপর মহাকশ্যপ নামক এক অগ্নি-উপাসক ব্রাহ্মণ ও
তার অনুগামীরা সংঘে যোগদান করেন। বুদ্ধ সম্রাট
বিম্বিসারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিমতো বুদ্ধত্ব লাভের পরে
রাজগৃহ যাত্রা করলে সঞ্জয় বেলাঢ্বিপুত্তের দুইজন শিষ্য
সারিপুত্ত ও মৌদ্গল্যায়ন সংঘে যোগদান করেন।বুদ্ধত্ব
লাভের এক বছর পরে শুদ্ধোধন তার পুত্রকে কপিলা
বস্তু শহরে আমন্ত্রণ জানান। একদা রাজপুত্র গৌতম
রাজধানীতে সংঘের সাথে ভিক্ষা করে খাদ্য সংগ্রহ
করেন। কপিলাবস্তুতে তার পুত্র রাহুল তার নিকট
শ্রমণের দীক্ষাগ্রহণ করেন। এছাড়া আনন্দ ও অনুরুদ্ধ
নামক তার দুইজন আত্মীয় তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
মহাকশ্যপ, সারিপুত্ত,মৌদ্গল্যায়ন,আনন্দ,অনুরুদ্ধ ও
রাহুল ছাড়াও উপলি, মহাকাত্যায়ন, পুণ্ণ ও সুভূতি
বুদ্ধের দশজন প্রধান শিষ্য ছিলেন।
তিন বছর পরে রোহিণী নদীর জলের অংশ নিয়ে
শাক্যদের সাথে কোলীয় গণের একটি বিবাদ উপস্থিত
হলে বুদ্ধ সেই বিবাদের মীমাংসা করেন। এর কয়েক
দিনের মধ্যে শুদ্ধোধন মৃত্যুবরণ করলে গৌতম বুদ্ধের
বিমাতা মহাপজাপতি গোতমী সংঘে যোগদানে ইচ্ছা
প্রকাশ করেন। গৌতম প্রথমে নারীদের সংঘে
যোগদানের ব্যাপারে অমত প্রকাশ করলেও আনন্দের
উৎসাহে তিনি সংঘ গঠনের পাঁচ বছর পরে সংঘে
নারীদের ভিক্ষুণী হিসেবে প্রবেশের অনুমতি দেন।
মহাপরিনিব্বাণ সুত্ত অনুসারে গৌতম বুদ্ধের বয়স যখন
আশি বছর, তখন তিনি তার আসন্ন মৃত্যুর কথা
ঘোষণা করেন। পওয়া নামক একটি স্থানে অবস্থান
করার সময় চণ্ড নামক এক কামার তাকে ভাত ও
শূকরমদ্দভ ইত্যাদি খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
এই খাবার খাওয়ার পরে গৌতম আমাশয় দ্বারা
আক্রান্ত হন।চণ্ডের দেওয়া খাবার যে তার মৃত্যু কারণ
নয়,আনন্দ যাতে তা চণ্ডকে বোঝান,সেই ব্যাপারে বুদ্ধ
নির্দেশ দেন।এরপর আনন্দের আপত্তি সত্ত্বেও অত্যন্ত
অসুস্থ অবস্থায় তিনি কুশীনগর যাত্রা করেন।এইখানে
তিনি আনন্দকে নির্দেশ দেন যাতে দুইটি শাল বৃক্ষের
মধ্যের একটি জমিতে একটি কাপড় বিছিয়ে তাকে
যেন শুইয়ে দেওয়া হয়। এরপর শায়িত অবস্থায় বুদ্ধ
উপস্থিত সকল ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষকে তার শেষ
উপদেশ প্রদান করেন।তার অন্তিমবাণী ছিল “বয়ধম্মা
সঙ্খারা অপ্পমাদেন সম্পাদেথা”, অর্থাৎ “সকল
জাগতিক বস্তুর বিনাশ আছে। অধ্যবসায়ের সাথে
আপনার মুক্তির জন্য সংগ্রাম কর।”
বিভিন্ন পুঁথিতে অনুবাদবিভ্রাট ও লিখনশৈলীর
পার্থক্যের জন্য গৌতম বুদ্ধের অন্তিম আহার্য্য বস্তু
সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। আর্থার ওয়েলির
মতে থেরবাদ ঐতিহ্যানুসারে শূকরমদ্দভ বলতে
শূকরের নরম মাংস বোঝানো হয়। যদিও কার্ল ইউজিন
নিউম্যান এই শদের অর্থ করেছেন শূকরের নরম
আহার। নিউম্যান ও ওয়েলি আবার এও মত প্রকাশ
করেছেন যে এই আহারের সাথে শূকর শব্দটি যুক্ত
হলেও হয়তো এটি একটি শুধুমাত্র একটি উদ্ভিদ, যাকে
আহার হিসেবে ব্যবহার করা হত।পরবর্তীকালে কয়েক
শতাব্দী পরে বুদ্ধের জীবনী রচনার সময় এই শব্দের
অর্থ সাধারণ ব্যবহারে অপ্রচলিত হয়ে পড়ায়
শূকরমদ্দভ শব্দটি শূকরের নরমমাংস হিসেবে ব্যবহৃত
হতে থাকে। অস্কার ভন হিনুবার মত প্রকাশ করেছেন
যে, বুদ্ধের মৃত্যু খাদ্যে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হয় নি,বরং
সুপিরিয়র মেসেন্ট্রিক আর্টারি সিনড্রোম নামক
বার্ধক্যের সময়ের একটি রোগের কারণে হয়েছিল।
দীপবংশ ও মহাবংশ নামক শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ
ধর্মগ্রন্থানুসারে, বুদ্ধের মৃত্যুর ২১৮ বছর পরে সম্রাট
অশোকের রাজ্যাভিষেক হয়, সেই অনুযায়ী ৪৮৬
খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মৃত্যু হয়।অন্যদিকে চীনা পুঁথি
অনুসারে, বুদ্ধের মৃত্যুর ১১৬ বছর পরে অশোকের
রাজ্যাভিষেক হয়, সেই অনুযায়ী ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে
বুদ্ধের মৃত্যু হয়। যাই হোক,থেরবাদ বৌদ্ধ ঐতিহ্যে
৫৪৪ বা ৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ ঘটে
বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। মায়ানমারের বৌদ্ধরা
৫৪৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১৩ইমে এবং থাইল্যান্ডের বৌদ্ধরা
৫৪৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১১ই মার্চ বুদ্ধের মৃত্যুদিবস বলে
মনে করে।
৭৩
১৪৬ মন্তব্য