সিনিয়র শিক্ষক
০৬ জুন, ২০২১ ০৩:০৬ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
শনিবার ৪৮তম বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতার লক্ষ্যে প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে ৫ জুন ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসাবে পালন করা হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো- ‘প্রকৃতির জন্য সময়’।
ইসলামকে বলা হয়, স্বভাবগত বা প্রকৃতির ধর্ম। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ মূলত সামাজিক জীব। মানুষকে ঘিরেই পরিবেশ-প্রকৃতি ও সমাজের সৃষ্টি। আর পরিবার, পরিবেশ ও সমাজ নিয়ে ইসলামের পরিবেশগত চিন্তা-ভাবনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তাদের জন্য নিদর্শন একটি মৃতভূমি। আমি একে সঞ্জীবিত করি এবং তা থেকে উৎপন্ন করি শস্য, তারা তা ভক্ষণ করে। আমি তাতে উৎপন্ন করি খেজুর এবং প্রবাহিত করি ঝর্ণাধারা, যাতে তারা ফল খায়।’ (সূরা ইয়াসিন, আয়াত ৩৩)।
পরিবেশের বাহ্যিক আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হচ্ছে আলো। কুরআনে কারিমে আলো-আঁধার, দিন-রাত সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা কি অনুধাবন করে না, আমি রাত সৃষ্টি করেছি তাদের বিশ্রামের জন্য এবং দিনকে করেছি আলোকিত। এতে মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা নমল, আয়াত ৮৬)।
পরিবেশ সুস্থ, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে রয়েছে ইসলামের তাকিদ। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরা ডেকে এনো না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৫)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন সমুদ্র ও স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সূরা আর রুম, আয়াাত ৪১)।
পরিবেশ দূষণ থেকে বাঁচতে হলে পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। কুরআনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা সম্পর্কে অনেকবার বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও। (সূরা বাকারা, আয়াত ২২২)।
আল্লাহতায়ালা পৃথিবীতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষায় বৃক্ষ সৃষ্টি করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে, ‘আমি বিস্তৃত করেছি ভূমিকে ও তাতে স্থাপন করেছি পর্বতমালা এবং উৎপন্ন করেছি নয়নাভিরাম বিবিধ উদ্ভিদরাজি। এটি আল্লাহর অনুরাগী বান্দাদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ। (সূরা কাফ, আয়াত ৭-৮)।
সমগ্র সৃষ্টিজগতের কল্যাণের জন্য আল্লাহপাক পাহাড়-পর্বত সৃষ্টি করেছেন। ভূমিকম্প কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যাতে মানুষকে নিয়ে এ পৃথিবী নড়াচড়া করতে না পারে। সে জন্য আল্লাহতায়ালা পাহাড়গুলোকে পেরেকের মতো গেড়ে দিয়েছেন বলে ইরশাদ করেছেন, ‘তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়। (সূরা আন নাহল, আয়াত ১৫)।
আমরা জানি, গাছ মানুষ ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। সবুজ গাছপালার ওপরই নির্ভর করে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর টিকে থাকা। এই গাছ ইচ্ছা হলেই কাটা যাবে না। কারণ ‘গাছের প্রাণ আছে’- এটা হাদিসের বাণী। হাদিসে রাসূল (সা.) থেকে জানা যায়, এক লোক যখন অকারণে একটি গাছের ডাল ভাংছিল তখন নবী করিম (সা.) সে লোকটির চুল মৃদুভাবে টান দিয়ে বলেন, তুমি যেমন শরীরে আঘাত পেলে ব্যথা পাও, গাছের পাতা বা ডাল ছিঁড়লে গাছও তেমন ব্যথা পায়। পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য গাছ লাগানোর শিক্ষা আমরা মহানবী (সা.)-এর হাদিস থেকে পাই। তিনি বলেছেন, যদি তুমি মনে করো আগামীকাল কিয়ামত হবে, তবু আজ একটি গাছ লাগাও।
সুন্দর ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সামাজিক পরিবেশ গঠনে খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, রাস্তাঘাট পরিষ্কার থাকা অপরিহার্য। নবী (সা.) বলেছেন, ইমানের ৭৩টি শাখা; তন্মধ্যে সর্বোত্তমটি হলো, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ; আর সর্বনিম্নটি হলো, রাস্তা থেকে ক্ষতিকারক বস্তু দূরীভূত করা।
তিনি আরও বলেছেন, পবিত্রতা ইমানের অর্ধাংশ। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সা.) পানিতে প্রস্রাব করতে নিষেধ করেছেন। হজরত মোয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমরা লানত পাওয়ার ৩টি কাজ অর্থাৎ পানির ঘাট, রাস্তার মাঝে এবং বৃক্ষের ছায়াতলে মলত্যাগ থেকে বিরত থাক।
আমরা অনেক সময় হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় মুখ ঢাকি না। এতে করে নির্গত ময়লা ও জীবাণু দ্বারা অন্যের ক্ষতি হতে পারে। হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূল (সা) যখন হাঁচি দিতেন, তখন তিনি মুখ ঢেকে নিতেন।
বস্তুত, আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবী নামক ছোট গ্রহকে জীবের বেঁচে থাকার জন্য সব উপাদান দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের নানাবিধ অত্যাচারে পৃথিবীর পরিবেশ দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ফলে জীবের বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ হারাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
প্রাকৃতিক গ্যাস আহরণে সুষ্ঠু নিয়ম মেনে চলা, মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হওয়া, বন-বনানী থেকে বৃক্ষ উজাড় না করা, গগনচুম্বী অট্টালিকা তৈরির জন্য পাহাড় না কাটা, পশু-পাখি নির্বিচারে শিকার না করা কলকারখানার বর্জ্য নিষ্কাষণে যথাযথ নিয়ম মেনে চলা, যানবাহনের বিষাক্ত ধোঁয়ার বিরুদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং জনসাধারণকে পরিবেশ সম্পর্কে আরও অধিক সচেতন করে তোলা গেলেই সম্ভব সুন্দর পরিবেশ গড়া।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পৃথিবীতে মানুষকে টিকে থাকতে হলে, সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশের নিশ্চয়তা নিজেদেরই দিতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণে ইসলামের অনন্য নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন করলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পেয়ে একটি সুস্থ পরিবেশ বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠবে।
১০
১২ মন্তব্য