Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ জুলাই, ২০২১ ১১:২০ অপরাহ্ণ

কুরআন ও হাদিসের আলোকে কুরবানী , পশু, সময় ও শর্তের বিবরণ (পর্ব-১)

কুরআন ও হাদিসের আলোকে কুরবানী , পশু, সময় ও শর্তের বিবরণ (পর্ব-১)

মাওলানা মুহাম্মদ রাহাত উল্লাহ
সহকারী শিক্ষক, উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়
01811867584
[email protected]

কুরবানী (আরবি: قربانى‎‎), কুরবান অথবা আদ্বহা বা আযহা ( أضحية) কে ইসলামী আইন হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা ঈদ উল আযহার সময় পশু উৎসর্গের অনুষ্ঠান। কুরবানী

শব্দটি হিব্রু কোরবান (קרבן‬) আর সিরিয়াক ভাষার কুরবানা শব্দদুটির সংগে সম্পর্কিত যার আরবী অর্থ "কারো নিকটবর্তী হওয়া"।
 
ইসলামি মতে কুরবানী হচ্ছে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পুরস্কার লাভের আশায় নির্দিষ্ট পশু জবেহ করা। মুসলমানদের পবিত্র আল কোরআনের তিনটি স্থানে কুরবানির উল্লেখ আছে যার একটি পশু কুরবানির ক্ষেত্রে এবং বাকি দুটি সাধারণ ভাবনার কাজ বোঝাতে যা
দ্বারা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। ঈদ উল আযহার নির্দিষ্ট দিনের বাইরে খাওয়ার জন্যে পশুহত্যা কে ইসলামে জবেহ বলা হয়ে থাকে।

 মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন শরীফে কুরবানী সম্পর্কে একাধিক সুরায় উল্লেখ আছে।

অতএব হে মানুষ! আল্লাহ-সচেতন হও। আল্লাহর ধর্মবিধান লঙ্ঘন হতে দূরে থাকো। জেনে রাখো, আল্লাহ মন্দ কাজের শাস্তিদানে কঠোর। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৬)

হে নবী! কিতাবিগণকে আদমের দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের ঘটনা ভালো করে বর্ণনা করো। তারা যখন কোরবানি করেছিল, তখন একজনের কোরবানি কবুল হলো। কিন্তু অন্যজনের কোরবানি কবুল হলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে সে বলল, আমি তোমাকে খুন করবো। অপরজন বলল, প্রভু তো শুধু আল্লাহ-সচেতনদের কোরবানিই কবুল করেন। (সূরা মায়েদা, আয়াত-২৭)

হে নবী! ওদের বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ-আমার সবকিছুই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্যে। তিনি একক ও অদ্বিতীয়। এ আদেশই আমি পেয়েছি। আমি সমর্পিতদের মধ্যে প্রথম।’ (সূরা আনআম, আয়াত ১৬২-১৬৩)

আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্যে কোরবানিকে ইবাদতের অংশ করেছি। যাতে জীবনোপকরণ হিসেবে যে গবাদি পশু তাদেরকে দেয়া হয়েছে, তা জবাই করার সময় তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে আর সব সময় যেন মনে রাখে একমাত্র আল্লাহই তাদের উপাস্য। অতএব তাঁর কাছেই পুরোপুরি সমর্পিত হও। আর সুসংবাদ দাও সমর্পিত বিনয়াবনতদের, আল্লাহর নাম নেয়া হলেই যাদের অন্তর কেঁপে ওঠে, যারা বিপদে ধৈর্যধারণ করে, নামাজ কায়েম করে আর আমার প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে দান করে। (সূরা হজ, আয়াত ৩৪-৩৫)

কোরবানির পশুকে আল্লাহ তাঁর মহিমার প্রতীক করেছেন। তোমাদের জন্যে এতে রয়েছে বিপুল কল্যাণ। অতএব এগুলোকে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় এদের জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। এরপর এরা যখন জমিনে লুটিয়ে পড়ে, তখন তা থেকে মাংস সংগ্রহ করে তোমরা খাও এবং কেউ চাক না চাক সবাইকে খাওয়াও। এভাবেই আমি গবাদি পশুগুলোকে তোমাদের প্রয়োজনের অধীন করে দিয়েছি, যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় করো। (সূরা হজ, আয়াত ৩৬)

কিন্তু মনে রেখো কোরবানির মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের নিষ্ঠাপূর্ণ আল্লাহ-সচেতনতা। এই লক্ষ্যেই কোরবানির পশুগুলোকে তোমাদের অধীন করে দেয়া হয়েছে। অতএব আল্লাহ তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের মাধ্যমে যে কল্যাণ দিয়েছেন, সেজন্যে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করো। হে নবী! আপনি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দিন যে, আল্লাহ বিশ্বাসীদের রক্ষা করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোন বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না। (সূরা হজ, আয়াত ৩৭-৩৮)

ছেলে যখন পিতার কাজকর্মে অংশগ্রহণ করার মতো বড় হলো, তখন ইব্রাহিম একদিন তাকে বলল, ‘হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে কোরবানি দিতে হবে। এখন বলো, এ ব্যাপারে তোমার মত কী? ইসমাইল জবাবে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাল্লাহ! আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে বিপদে ধৈর্যশীলদের একজন হিসেবেই পাবেন।’ (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০২)

মনে রেখো, এ ছিল এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে সুযোগ দিলাম এক মহান কোরবানির। পুরো বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখলাম প্রজন্মের পর প্রজন্মে। ইব্রাহিমের প্রতি সালাম। এভাবেই আমি সৎকর্র্মশীলদের পুরস্কৃত করি। (সূরা সাফফাত, আয়াত ১০৬-১১০)

অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্যেই নামাজ পড় ও কোরবানি দাও। নিশ্চয়ই তোমার প্রতি যেই বিদ্বেষ পোষণ করবে, বিলুপ্ত হবে ওর বংশধারা। (সূরা কাওসার, আয়াত ২–৩)


কুরবানী প্রসঙ্গে কতিপয় হাদিস 

(১) হজরত  আবু        হুরায়রা  رضي   الله   عنه    হতে   বর্ণিত।       হুজুর   ﷺ বলেছেন   - সামর্থ    থাকা   সত্ত্বেও যে ব্যক্তি    কুরবানী করবেনা সে   যেন আমার ঈদগাহের নিকটে না আসে। (ইবনে মাজাহ শরীফ) 


(২) হজরত আয়েশা رضي الله عنها হতে বর্ণিত। হুজুর ﷺ বলেছেন - আল্লাহর  নিকট আদম  সন্তানের সবচেয়ে   প্রিয়  আমল হলো কুরবানীর দিনে কুরবানী করা। (তিরমিজী ও ইবনে মাজাহ শরীফ) 


(৩)   হজরত ইমাম    হাসান        رضي   الله  عنه  হতে        বর্ণিত।   হুজুর ﷺ বলেছেন  -   যে    ব্যক্তি  সওয়াবের  উদ্দেশ্যে    আনন্দ  সহকারে  কুরবানী করেছে সে জাহান্নাম হতে নিষ্কৃতি পেয়েছে। (তিবরানী শরীফ) 


(৪)  হজরত  ইবনু  আব্বাস رضي        الله عنه   হতে   বর্ণিত।    হুজুর       ﷺ বলেছেন - সবচেয়ে উত্তম পয়সা হলো     তা  যা ঈদের দিন কুরবানীতে খরচ করা হয়। (তিবরানী শরীফ) 


(৫)   হজরত     উম্মে  সালামা   رضي الله   عنها হতে   বর্ণিত।     হুজুর    ﷺ বলেছেন  -   যে   ব্যক্তি  জিলহাজের   চাঁদ  দেখেছে  এবং কুরবানী করার ইচ্ছা     করেছে,   সে যেন  কুরবানী করার    পূর্বে  চুল ও নখ      না      কাটে। (তিরমিজী ও নাসায়ী শরীফ) 


(৬)  হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসাউদ رضي  الله   عنه  হতে বর্ণিত। হুজুর ﷺ বলেছেন   - গরু ও          উট সাত       জনের   পক্ষ হতে    কুরবানী     করা জায়েজ। (তিবরানী শরীফ) 


(৭) হজরতে   ইবনু     আব্বাস  رضي     الله     عنه  হতে বর্ণিত।   হুজুর  ﷺ বলেছেন -      কান     কাটা ও     শিং ভাঙা  পশুর   কুরবানী   করা  যাবে   না। (ইবনে মাজাহ শরীফ) 

২। কুরবানীর অর্থ ও শর্ত

নিদিষ্ট দিনে     আল্লাহ্        পাকের  নৈকট্য   লাভের   উদ্দেশ্যে     নির্দিষ্ট  পশু জবেহ      করার       নাম  কুরবানী।    কুরবানী   হজরত  ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাত। এই সুন্নাতকে কেয়ামত পর্যন্ত চালু রাখার জন্য হুজুর ﷺ     সামর্থ্যবান উম্মতের প্রতি   ওয়াজিব করে দিয়েছেন। অবশ্য   সূরা কাওসারের   মধ্যে আল্লাহ্পাক হুজুর  ﷺ  কে সরাসরি   কুরবানী   করার নির্দেশ করেছেন। কুরবানী ওয়াজিব হবার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। যথাঃ-

(১) মুসলমান হওয়া অর্থাৎ অমুসলিমের প্রতি কুরবানী ওয়াজিব নয়। 

(২) মুকীম হওয়া অর্থাৎ মুসাফিরের প্রতি কুরবানী ওয়াজিব নয়। 

(৩) সামর্থ্যবান হওয়া অর্থাৎ   যার     প্রতি    সাদকায়ে  ফিতির ওয়াজিব। গরীবের প্রতি ওয়াজিব নয়। 

(৪) স্বাধীন   হওয়া    অর্থাৎ পরাধীনের  প্রতি     ওয়াজিব           নয়। পরাধীন বলতে কৃতদাস। বর্তমানে পৃথিবীতে  দাস    প্রথা নেই।  কুরবানীর জন্য পুরুষ হওয়া   শর্ত নয়।    যদি    কোনো  মহিলা  সামর্থ্যবান    হয়,   তাহলে কুরবানী    করা   ওয়াজিব  হবে।  নাবালেগ  সামর্থ্যবান     হলে  তার    প্রতি কুরবানী ওয়াজিব নয় (দুররে মুখতার)। 


অর্থ ও   শর্ত    সংক্রান্ত     কতিপয়    মাসয়ালাঃ      - 

মাসয়ালা(১) - মুসাফির       কুরবানী    করলে   নফল    হয়ে যাবে।   অনুরূপ        গরীব কুরবানী করলে নফল হয়ে যাবে। (আলমগিরী)

মাসয়ালা(২) - গরু ছাগলের মালিক তার কুরবানী করার নিয়ত করলে কুরবানী ওয়াজিব   হবেনা।   অনুরূপ পশু  ক্রয় করার সময়  কুরবানীর    নিয়ত  না থাকলে ক্রয় করার পর নিয়ত করলে কুরবানী করা ওয়াজিব হবে না।। (আলমগিরী)

মাসয়ালা(৩) -   হজ্ব   করতে গিয়া মুসাফির থাকলে কুরবানী  করা ওয়াজিব  হবে না। কিন্ত কুরবানী করলে সওয়াব পাবে। (রদ্দুলমুহতার) 

মাসয়ালা(৪) - কুরবানীর দিনগুলোর মধ্যে যদি     কোনো  সামর্থ্যবান   অমুসলিম মুসলিম হয়ে   যায় এবং কুরবানী   করার সময় থাকে  তাহলে তার প্রতি কুরবানী  করা  ওয়াজিব     হবে।        অনুরূপ  ঐ দিনগুলোর   মধ্যে কোনো গরীব  ধনী  হয়ে গেলে এবং কুরবানী   করার সময়     বাকী  থাকলে  তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব হবে। (আলমগীরি) 

মাসয়ালা(৫) -  কুরবানীর দিনে কুরবানীর নিয়তে মোরগ, মুরগী ইত্যাদি জবেহ করা নাজায়েজ (দুররে মুখতার)। 

মাসয়ালা(৬)   -    যে ব্যক্তি   দুইশত  দিরহাম   অথবা  কুড়ি দিনারের মালিক   হবে অথবা  প্রয়োজনীয়  জিনিষ পত্র ছাড়া এমন  জিনিষের মালিক হবে যার মূল্য  দুইশত  দিরহাম, এপ্রকার ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। প্রয়োজনীয়     জিনিষ   বলতে     ঘর-বাড়ি, পরিধানের কাপড়,   চলাচলের ঘোড়া  বা    সাইকেল     এবং  সংসারের যাবতীয়        আসবাবপত্র    ইত্যাদি (আলমগীরি)। 

মাসয়ালা(৭) - যার নিকট নেসাব পরিমাণ মাল রয়েছে, কিন্ত সাথে সাথে ঋণও রয়েছে,   যদি     ঋণ     পরিশোধ   করা  হয়   তাহলে       নেসাব  কমে  যাবে। এমতাবস্থায়  কুরবানী ওয়াজিব  হবেনা। অনুরূপ  যার    নিকট    বর্তমানে নেসাব  পরিমাণ মাল নেই বরং কুরবানীর দিন  অতিক্রম হবার পর সে পরিমাণ   মাল     হাতে এসেছে         তাহলে তার    উপর    কুরবানী ওয়াজিব হবেনা (আলমগীরি)। 

মাসয়ালা(৮) -  এক ব্যক্তির নিকটে   দুইশত দিরহাম  ছিলো।  বৎসর পূর্ণ  হবার কারণে পাঁচ দিরহাম জাকাত প্রদান করেছে। এখন একশত পঁচানব্বই দিরহাম    রয়েছে।    এমতাবস্থায়  কুরবানীর      দিন আসলে কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যাবে।      অবশ্য দুইশত  দিরহামের      মধ্যে  পাঁচ  দিরহাম নিজের প্রয়োজনে খরচ  করলে কুরবানী করতে হবে না (আলমগীরি)। 

মাসয়ালা(৯) - সামর্থ্যবান (সাহেবে নিসাব) কুরবানীর জন্য পশু ক্রয় করার পর তা হারিয়ে     গিয়েছে এবং মাল   নিসাব হতে     কম    হয়ে    গিয়েছে। এই অবস্থায়   কুরবানীর দিন  আসলে তার  প্রতি কুরবানী ওয়াজিব   হবেনা। কুরবানীর   দিনে     হারানো    পশুটি   পেলেও     কুরবানী   ওয়াজিব   হবেনা (আলমগীরি)। 

মাসয়ালা(১০) - স্ত্রী স্বামীর নিকট মোহরের টাকা পেলেও স্ত্রীকে মালিকে নিসাব ধরা  হবেনা।   অবশ্য স্ত্রীর নিকট তা ছাড়া নিসাব পরিমাণ মাল থাকলে কুরবানী করা ওয়াজিব হবে (আলমগীরি)। 

মাসয়ালা(১১)  -   যদি   কোরআন শরীফের     মুল্য  দুইশত  দিরহাম  হয় এবং   তা দেখে    ভালো  ভাবে     তিলাওয়াত করতে    পারে, তাহলে  কুরবানী  করা ওয়াজিব হবেনা। চাই তিলাওয়াত করুক অথবা নাই করুক। আর যদি তিলাওয়াত করতে না পারে, তাহলে  কুরবানী করা  ওয়াজিব। অনুরূপ প্রয়োজনীয়     কিতাব    থাকলে কুরবানী   ওয়াজিব         হবেনা।        অন্যথায় কুরবানী করা ওয়াজিব হবে (আলামগিরী)। 

মাসয়ালা(১২) - প্রয়োজনীয় জিনিষ ছাড়া অন্য জিনিষগুলোর মূল্য যদি দুইশত দিরহাম হয়,  তাহলে কুরবানী  করা ওয়াজিব হবে। একটি   ঘর শীতের জন্য   এবং  একটি    ঘর গরমের  জন্য  রাখলে   প্রয়োজনের     মধ্যে  গণ্য হবে। তা ছাড়া বেশি ঘর থাকলে সেই ঘরের মূল্য যদি দুইশত দিরহাম হয়,  তাহলে     কুরবানী  ওয়াজিব হবে।    অনুরূপ বাড়ির   মধ্যে  পরিধান করার কাপড়,  কাজ করার সময় পরিধান   করার কাপড়, জুমা  ও  ঈদে যাবার  সময় পরিধান  করার কাপড়  প্রয়োজনের   মধ্যে   গণ্য   হবে। তা ছাড়া বেশি কাপড় থাকলে যদি তার মূল্য দুইশত দিরহাম হয়, তাহলে কুরবানী ওয়াজিব হবে (রুদ্দুলমুহতার)। 

মাসয়ালা(১৩) - স্ত্রী    অথবা    বালেগ  সন্তানের   বিনা অনুমতিতে  কুরবানী করলে তাদের ওয়াজিব আদায় হবেনা। নাবালেগ সন্তানের পক্ষ হতে কুরবানী করা  উত্তম, যদিও তার   প্রতি  কুরবানী   ওয়াজিব নয়  (আলমগীরি)। 

মাসয়ালা(১৪)  - কুরবানী করলেই ওয়াজিব আদায়    হয়ে যাবে। অবশ্য  ভালো নিয়তে  করলে, আল্লাহর  ফজলে  আখিরাতে সওয়াব  পাবে    (দুররে মুখতার)। 

মাসয়ালা(১৫) – ১০ই জিলহজ্ব কুরবানী করা জরুরী নয়। ১২ই জিলহজ্ব পর্যন্ত জায়েজ। প্রথমদিনে যদি কারো কুরবানী করার সামর্থ্য না থাকে,  কিন্ত শেষদিনে সামর্থ্য হয় তাহলে  কুরবানী করা ওয়াজিব  হবে। প্রথম  দিন কুরবানী    করার সামর্থ্য  ছিলো কিন্ত  কুরবানী     করেনি,   শেষ দিনে যদি সামর্থ্য না থাকে, তাহলে ওয়াজিব হবেনা (আলমগিরী)। 

মাসয়ালা(১৬) - অসামর্থ্য গরীব মানুষ যদি কুরবানী করে থাকে এবং কুরবানীর দিনগুলোর  মধ্যে        ধনী    হয়ে   যায়,   তাহলে     পুনরায়         কুরবানী  করা ওয়াজিব  হবে।  অবশ্য কিছু উলামা   প্রথম  কুরবানী   যথেষ্ট  হবে  বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন (আলমগিরী)। 

মাসয়ালা(১৭) - যদি কোনো মানুষ সামর্থ থাকা সত্বেও   কুরবানী  না করে  এবং কুরবানীর সময়  শেষ হয়ে যাবার পর   গরীব হয়ে   যায় তাহলে একটি ছাগলের মূল্য  সদকা করা ওয়াজিব হবে। যদি ধনী ব্যক্তি   কুরবানী না করে   কুরবানীর  দিনে  ইন্তেকাল   করে     তাহলে   কোন  গোনাহ হবেনা (আলমগির)। 

মাসয়ালা(১৮)   - কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী  করা ওয়াজিব।    বিনা কারণে কুরবানী     না    করে  তার  মূল্য   সাদকা   করলে  জায়েজ হবেনা (আলমগির)। 

মাসয়ালা(১৯)  - কুরবানীর  সমস্ত   শর্তাবলি পাওয়া গেলে  একটি   বকরী   জবেহ করা ওয়াজিব অথবা উট,  গরু ও মহিষের সাত অংশের একাংশ দেয়া ওয়াজিব (রুদ্দুলমুহতার)। 
মাসয়ালা(২০)       -        সাত   অংশের  একাংশ  কম  হলে    কুরবানী  হবেনা। অংশীদারদের  মধ্যে যদি  কারো অংশ  সাত অংশের একাংশ কম  হয়, তাহলে কারো কুরবানী   হবেনা।  যথা   একটি  গরুর    মূল্য সাত   হাজার টাকা  সাতজন অংশীদারের  মধ্যে    একজনের  অংশমাত্র   ৫০০ টাকা হলে কারো কুরবানী জায়েজ হবেনা (রুদ্দুলমুহতার)। 


মাসয়ালা(২১) - সাতজন ব্যক্তি একটি গরু অথবা মহিষ বা উট কুরবানী করতে পারে। অনুরূপ সাতের কম    তিনজন চারজন, পাঁচজন, ছয়জন,  মিলে করতে পারে।   প্রত্যেকের  সমান    অংশ    হওয়া   জরুরী    নয়।      অবশ্য কমপক্ষে  একাংশ নেওয়া জরুরী।  দেড়, আড়াই, সাড়ে তিন, ও সাড়ে চার,  এই    প্রকারে   অংশ নেওয়া    জায়েজ   নয়   (রুদ্দুলমুহতার)। 


মাসয়ালা(২২) –সাত    ব্যক্তি   মিলে পাঁচটি গরু কুরবানী   করলে  জায়েজ  হবে। কিন্ত আট    ব্যক্তি মিলে সমান অংশে পাঁচটি অথবা ছয়টি  গরু কুরবানী করলে জায়েজ হবেনা (রুদ্দুলমুহতার)। 


মাসয়ালা(২৩) - সাত ব্যক্তি মিলিতভাবে সাতটি ছাগল কুরবানী করলে জায়েজ হবে।  অনুরূপ দুই  ব্যক্তি  মিলে  দুইটি  ছাগল কুরবানী   করলে জায়েজ হবে (রদ্দুলমুহতার)। 


মাসয়ালা(২৪) -  একাধিক ব্যক্তি একটি পশু কুরবানী    করলে মাংস ওজন করে বণ্টন  করতে হবে।   আনুমানিক বণ্টন জায়েজ    নয়। একপক্ষের মাংস বেশি হলে অপর পক্ষ ক্ষমা করলে ও ক্ষমা হবেনা (দুররে মুখতার)। 

৩। কুরবানীর সময়ের বিবরণ

কুরবানীর  সময় তিনদিন। অর্থাৎ   জিলহজ্ব    মাসের   ১০ তারিখ   সুবাহ সাদেকের পর হতে বারোই জিলহজ্বের সূর্য্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। অর্থাৎ তিনদিন দুইরাত (দুররে মুখতার) ।

মাসয়ালা(১) - রাত্রে কুরবানী করা মাকরুহ (আলমগির)। 

মাসয়ালা(২)  -  ১০ই জিলহজ্ব কুরবানী    করা সবচেয়ে  উত্তম।  তারপর  ১১ই জিলহজ্ব, তারপর ১২ই জিলহজ্ব।       আকাশ   মেঘাচ্ছন্ন    থাকার  কারণে যদি ১০ই তারিখে সন্দেহ হয়, তাহলে ১২তারিখের পূর্বে কুরবানী করা উত্তম।   যদি   ১২ই তারিখে কুরবানী করা   হয় এবং ১২   তারিখকে ১৩ তারিখ বলে সন্দেহ হয়, তাহলে সমস্ত মাংস  সাদকা করে   দেয়া উত্তম (আলমগির)। 

মাসয়ালা(৩)  - কুরবানীর  দিনে কুরবানী করা উটের মূল্য  সাদকা করা অপেক্ষা উত্তম। কারণ কুরবানী  করা   ওয়াজিব অথবা সুন্নাত এবং  সাদকা  করা কেবল নফল (আলমগিরী) 


মাসয়ালা(৪) - যার উপর কুরবানী ওয়াজিব তার  কুরবানী করতে হবে। সাদকা করলে ওয়াজিব আদায় হবেনা (বাহারে শরিয়াত) 

মাসয়ালা(৫) – শহরবাসীর জন্য   ঈদের   নামাজের পূর্বে কুরবানী করা  জায়েজ নয়।        শহরবাসীর    জন্য  ঈদের      খুতবাহ              পর কুরবানী করা   উত্তম (আলমগীরি) ।

মাসয়ালা(৬) -    গ্রামবাসীদের    জন্য  সুবহ সাদেক  হতে কুরবানী করা জায়েজ। কিন্ত    সূর্য্য   উদয়ের  পর       হতে  কুরবানী       করা      উত্তম।     (আলমগিরী) ।

জরুরীমাসয়ালা(৬.১)  - যে    সমস্ত গ্রামে জুমা   ও   ঈদের  নামাজ    হয়ে  থাকে    সেখানে ঈদের নামাজের পর কুরবানী করা উচিৎ। 

মাসয়ালা(৭)  - ঈদের  নামাজের পর খুতবাহর   পূর্বে    কুরবানী    করলে  কুরবানী হয়ে      যাবে।   কিন্ত  এই           প্রকার    করা        মাকরূহ   (বাহারে  শরিয়াত)। 

মাসয়ালা(৮) -  একই  শহরে বিভিন্ন স্থানে   ঈদের নামাজ   অনুষ্ঠিত হলে কোনো এক স্থানে নামাজ সমাপ্ত হলে সর্বত্র কুরবানী  করা জায়েজ হবে। সর্বত্র নামাজ শেষ    হওয়া   শর্ত     নয়।       (দুররে   মুখতার     ও  রদ্দুল       মুহতার) 

মাসয়ালা(৯) -    শহরবাসী  নামাজের পূর্বে   কুরবানী  করতে  ইচ্ছা প্রকাশ  করলে পশু গ্রামে পাঠিয়ে সেখানে হতে কুরবানী করে আনতে পারবে। (দুররে মুখতার)। 

মাসয়ালা(১০) -  গ্রামের    মানুষ  শহরে থাকলে   ঈদের   নামাজের  পূর্বে কুরবানী করা জায়েজ হবেনা (বাহারে শরীয়ত)। 

মাসয়ালা(১১)      -  ১০ই   জিলহজ্ব  ঈদের  নামাজ   না হলে             জাওয়ালের     পূর্বে কুরবানী করা জায়েজ হবেনা। অর্থাৎ ঈদের  নামাজের  সময় অতিক্রম হবার পর কুরবানী করতে হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে নামাজের পূর্বে কুরবানী জায়েজ। (দুররে মুখতার)

মাসয়ালা(১২) -  যেহেতু মিনা    শরিফে ঈদের   নামাজ হয়না,   সেহেতু    ফজরের পর হতে সেখানে কুরবানী করা জায়েজ। কোন শহরে ফিতনার কারণে যদি ঈদের নামাজ না হয় তাহলে সেখানে ১০ই জিলহজ্ব ফজরের পর কুরবানী করা জায়েজ হবে (রদ্দুল মুহতার)। 

মাসয়ালা(১৩) - ইমামের  সালাম   ফেরানোর  পূর্বে         পশু          জবেহ   হয়ে    গেলে কুরবানী জায়েজ হবেনা। ইমামের  একদিকে সালাম করার পর জবেহ করলে কুরবানী হয়ে যাবে। ইমামের খুতবা শেষ হবার পর জবেহ করা উত্তম (আলমগীরি) ।

মাসয়ালা(১৪) - ঈদের নামাজের পর কুরবানী করা হয়েছে। কিন্ত জানা গিয়েছে যে ইমাম বিনা অজুতে নামাজ পড়িয়েছেন এমতাবস্থায় পুনরায় নামাজ আদায়  করতে   হবে। কিন্ত   পুনরায়  কুরবানী  করা জরুরী       নয়  (দুররে মুখতার) ।

মাসয়ালা(১৫) -  ৯ই     জিলহজ্ব সম্পর্কে  কিছু মানুষ ১০ই  জিলহজ্ব   বলে   সাক্ষ্য প্রদান করেছে। এই সাক্ষির উপর নির্ভর করে নামাজ ও  কুরবানী করা হয়ে   গিয়েছে। পরে   সাক্ষ বাতিল   প্রমাণ   হয়ে   ৯ই  জিলহজ্ব  প্রমাণিত হয়ে   গেলে নামাজ     ও      কুরবানী   দুই      জায়েজ     হয়ে   গিয়েছে (দুররে মুখতার)।

মাসয়ালা(১৬) - যদি কোন   ব্যক্তি    কুরবানী না করে,  কুরবানীর  দিন  অতিক্রান্ত হয়ে যায়   এবং    পশু     অথবা   তার      মূল্য   সাদকা  না   করে থাকে  এবং দ্বিতীয় বৎসর কুরবানীর  দিন  উপস্থিত      হয়ে যায়  এবং   গত বৎসরের কুরবানীর কাজা আদায়  করতে চায়, তাহলে তা  জায়েজ হবেনা। বরং পশু      অথবা   তার  মূল্য সাদকা     করে  দিতে       হবে          (আলমগিরী)। 


মাসয়ালা(১৭) - যে পশুর কুরবানী  করা ওয়াজিব    ছিলো, কোনো কারণ বশতঃ কুরবানীর দিন অতিক্রম হয়ে গেলে যদি তা বিক্রয় করে থাকে তাহলে উক্ত টাকা সাদকা করে দেয়া ওয়াজিব। (আলমগিরী) 


মাসয়ালা(১৮) - যদি     কোনো  ব্যক্তি    কুরবানীর  জন্য মান্নত  করে  কোনো   পশু নির্দিষ্ট করে রাখে এবং কুরবানীর দিন অতিক্রম হয়ে যায় তাহলে ধনী হোক  বা গরীব, উক্ত  পশু   জীবিত অবস্থায়    সাদকা  করতে  হবে। যদি জবেহ  করে থাকে  তাহলে  সমস্ত  মাংস সাদকা   করতে হবে।   তা হতে কিছু  ভক্ষণ করা চলবেনা যদি  কিছু  মাংস খেয়ে থাকে  তাহলে যতটুকু খেয়েছে    ততটুকুর  মূল্য সাদকা  করতে হবে।  যদি    জবেহ   করা পশুর মূল্য জীবিত পশুর  মূল্য হতে কিছু কম হয়, তাহলে যত পরিমাণ হবে, তত পরিমাণ সাদকা    করে দিতে  হবে  (আলমগিরী   ও রদ্দুলমুহতার)। 

মাসয়ালা(১৯) - গরীব মানুষ যদি কুরবানী     নিয়তে    পশু   ক্রয় করে থাকে এবং কুরবানী দিন       অতিক্রম   হয়ে     যায় তাহলে     ঐ   নির্দিষ্ট  পশুটি  জীবিত অবস্থায় সাদকা করে দিতে হবে। যদি জবেহ করে থাকে তাহলে সমস্ত মাংস সাদকা করতে হবে (রদ্দুলমুহতার)। 

মাসয়ালা(২০) - ধনীব্যক্তি কুরবানীর জন্য পশু ক্রয় করলে যদি কোনো কারণে জবেহ করা না হয়ে থাকে তাহলে তা সাদকা করতে হবে। যদি জবেহ করে থাকে তাহলে সমস্ত মাংস সাদকা করতে হবে। যদি ধনী পশু ক্রয় করে      না   থাকে,     তাহলে একটি   ছাগলের মূল্য  সাদকা    করতে      হবে (দুররে মুখতার)। 

মাসয়ালা(২১) -   যদি   কোনো ব্যক্তি      অসিয়ত  করে থাকে   যে   তার পক্ষ    হতে কুরবানী করে  দিবে। কিন্ত গরু   অথবা ছাগল  তা  কিছু  বলেনি      অথবা কত    মূল্যের     পশু       দিতে       হবে     তাও  উল্লেখ   করেনি।      এমতাবস্থায় অসীয়াত জায়েজ হবে এবং একটি ছাগল কুরবানী করে দিলে অসীয়ত পূর্ণ হয়ে যাবে। (আলমগিরী) 

মাসয়ালা(২২) - গরু অথবা ছাগল নির্দিষ্ট না করে কেবল কুরবানী করার মান্নত করলে    একটি ছাগল   কুরবানী  করে       দিলে মান্নত     পূর্ণ     হয়ে     যাবে। অনুরূপ ছাগল কুরবানী     করার  মান্নত করে   গরু     অথবা  উট  কুরবানী করলে মান্নত পূর্ণ হয়ে যাবে। (আলমগিরী) 

মাসয়ালা(২৩)  -  কুরবানী              মান্নতের  হলে সমস্ত    মাংস চামড়া প্রভৃতি সাদকা করতে  হবে। তা হতে   কিছু   পরিমাণ  খেলে  সেইপরিমাণ মূল্য সাদকা করতে হবে। (আলমগিরী) 

৪। কুরবানীর পশুর বিবরণ

মাসয়ালা  (১)  - কুরবানী পশু কয়েক  প্রকার।  যথাঃ  উট, গরু, ছাগল। মহিষ গরুর মধ্যে গণ্য। অনুরূপ       ভেড়া ও   দুম্বা ছাগলের মধ্যে  গণ্য। এই      সমস্ত   পশুর    নর  ও   মাদাহ সবই          কুরবানী   করা                 জায়েজ। (আলমগিরী) 

মাসয়ালা(২)  -     জংলি জানোয়ার  যথা  হরিণ,   নীল গাই   ইত্যাদি  কুরবানী করা জায়েজ নয় (আলমগিরী)। 

মাসয়ালা(৩)  -   জংলি পশু ও পালিত   পশুর    মিলনে  বাচ্চা     পয়দা হলে  মাতার অবস্থা  গ্রহণযোগ্য  হবে।    যথা       হরিণ ও   বকরীর মিলনে  বাচ্চা পয়দা হলে   কুরবানী     জায়েজ হবে।   কিন্ত বকরা  ও হরিণীর        মিলনে      বাচ্চা পয়দা হলে কুরবানী জায়েজ হবেনা (আলমগিরী)। 

মাসয়ালা(৪)  -   উট পাঁচ বৎসর, গরু দুই বৎসর, ছাগল  একবৎসরের না  হলে কুরবানী     করা জায়েজ     হবেনা। দুম্বা    অথবা  ভেড়ার  ছয়মাসের  বাচ্চা যদি খুব        বড়    হয়   এবং  দেখতে একবৎসর     এর   মনে হয়,      তাহলে কুরবানী জায়েজ হবে। (দুররে মুখতার) 

মাসয়ালা(৫)  - ছাগলের  মূল্য  এবং মাংস    যদি গরুর     সাত অংশের একাংশের সমান হয়,    তাহলে ছাগল কুরবানী   করা  উত্তম   হবে।  আর যদি গরুর সপ্তমাংশ ছাগলের   থেকে  বেশী  মাংস হয়,  তাহলে      গরু    উত্তম  হবে। যখন  দুয়ের মাংস ও  মূল্য  সমান  হবে,   তখন    যার মাংস  ভালো হবে, তার কুরবানী   করা উত্তম হবে।     যদি মাংসের  পরিমাণ   কমবেশি  হয়, তাহলে যার মাংস বেশি হবে তার  কুরবানী  উত্তম হবে।  অনুরূপ মাংস ও  মূল্য সমান হলে দুম্বা   অপেক্ষা  দুম্বী, বকরী    (ধাড়ী) অপেক্ষা খাসী, উট   অপেক্ষা  উটনী  ও বলদ অপেক্ষা  গাভী   কুরবানী  করা   উত্তম  হবে (রুদ্দুল মুহতার)।

মন্তব্য করুন