সহকারী শিক্ষক
০৫ জুলাই, ২০২১ ০৯:০৫ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রজাপতির জীবনচক্র
প্রজাপতি, প্রজাপতি,
কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?
টুকটুকে লাল নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা
কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?
প্রজাপতি তার সুন্দর রঙিন পাখা মেলে কোথা থেকে কোথায় উড়ে চলে যায়। জানাই হয় না, কেন তার এত ব্যস্ততা? প্রজাপতি সারাদিন কী এমন কাজ করে, আজকে চল খুঁজে বের করি।
প্রজাপতির জীবনচক্র বলার আগে তোমাদের একটা মজার তথ্য দেই। বর্ষাকালে মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে কতগুলো শুঁয়োপোকা উঠে আসে না অনেকটা কেঁচোর মতো দেখতে কিন্তু সারা শরীর আঁশ, আঁশ? তোমরা হয়ত ওদের শুঁয়োপোকা বা অন্য কোনো নামে ডাক। অনেকেই ভয় পেয়ে তাদের মেরেও ফেল। ওরা কিন্তু আলাদা কোনো প্রাণী না। এই শুঁয়োপোকাগুলোই বড় হয়ে প্রজাপতি হয়। ভাবছ এক প্রাণী বড় হয়ে আবার আরেক প্রাণী কীভাবে হয়? তোমরা শুনলে অবাক হবে কিছু কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এমনটা হতেই পারে। জীববিজ্ঞান এই ঘটনাকে রূপান্তর বা ইংরেজিতে metamorphosis বলা হয়। যে সকল প্রাণীর ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা ঘটে তাদের জীবনকালের বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন দশার উদ্ভব হয়। প্রতিটি দশায় প্রাণীগুলোর দেহে আলাদা আলাদা ধরণের কোষের উদ্ভব হয় এবং ঘটনাটা খুব দ্রুত ঘটে।
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে এই ঘটনাটা কেন হয়? ব্যাখ্যাটা কিন্তু খুবই সোজা। এ ধরণের নিম্নবর্গের প্রাণীর ক্ষেত্রে জীবনটা খুব নৈর্ব্যক্তিক হয়। তাদের জীবনের নির্দিষ্ট কিছু ধাপ থাকে যেখানে তারা নিদিষ্ট কিছু কাজই করে। সেই কাজগুলোকে সহায়তা করতে যখন যেরকম কোষ-কলার প্রয়োজন ঠিক তক্ষুনি প্রকৃতি তাকে উপযুক্ত কোষটি যোগান দেয়।
বিষয়টি তুমি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে যদি তোমাদের প্রজাপতির পুরো জীবন চক্রটি ব্যাখ্যা করে বলা হয়। একটা প্রজাপতি যখন ডিম পাড়ার অবস্থায় এসে পৌছায় তখন সুন্দর একটি পাতা দেখে তার উপর অনেকগুলো ডিম পাড়ে। পাতাটি যে কেবল সুন্দর হলেই হয় তা কিন্তু নয়। মা প্রজাপতিটি খুব লক্ষ রাখে পাতটিতে ঠিকমতো আলো-বাতাস এসে পৌছায় কি-না, পাতাটি অন্য কোনো শিকারি পতঙ্গের কবলে সহজে পরে কি-না এবং জন্মের পরপরই ছানারা খাবার পায় কি-না। এত কিছু লক্ষ করার কারণ হচ্ছে, ডিম পাড়ার পরেই মা প্রজাপতিটি মরে যায়। তাই আগেই তার নিশ্চিত করতে হয় তার ছানাগুলো যেন নিরাপদে থাকে।
ডিম পাড়ার ৩-৪ দিনের মধ্যেই ডিম ফুটে শুঁয়োপোকাগুলো বের হয়। শুঁয়োপোকাগুলাকে ইংরেজিতে বলে লার্ভা। একটু বড় হলে বলে ক্যাটারপিলার। শুঁয়োপোকাগুলোর রঙ কেমন হবে তা নির্ভর করে এর প্রজাতির উপর। একদম শুরুতে সবাই দেখতে ফিকে সবুজ রঙের থাকলেও আস্তে আস্তে তাদের গায়ে একটি নির্দিষ্ট রঙ বা কয়েকটি রংয়ের ডোরাকাটা বিন্যাস ঘটে। ফিকে রঙ থেকে নির্দিষ্ট রঙ-এ আসতে শুঁয়োপোকাগুলিকে পাঁচ বার তাদের খোলস বদলাতে হয়। সাধারণত গায়ের রঙগুলো উজ্জ্বলই হয় যেন এই রঙ দেখে শিকারি পতঙ্গরা ভয় পেয়ে ওদের থেকে দূরে থাকে।
জন্মের পরপরই শুঁয়োপোকার একমাত্র কাজ থাকে খাওয়া দাওয়া করা আর নিজেকে হৃষ্ট-পুষ্ট করা। কেননা এটাই তার জীবনকালের একমাত্র সময় যখন সে খাদ্য গ্রহণ করে। দেহের সব রকমের শারীরিক বৃদ্ধিও এই ধাপেই ঘটে। শুঁয়োপোকা দশার একমাত্র খাদ্য হচ্ছে গাছের কচি পাতা ও ফুল। এভাবে ১০-১৪ দিন পর্যন্ত ফুল পাতা খাওয়ার পরে শুঁয়োপোকাগুলো খাবার গ্রহণ করা বন্ধ করে দেয়। এরপর শুরু হয় গুটি তৈরির কাজ।
শুঁয়োপোকা দশায় কিছু বিশেষ মুখ উপাঙ্গ থাকে এর সাহায্যে শুঁয়োপোকাটি পাতা কেটে খায়। পাতা খাওয়া শেষে মুখ উপাঙ্গটির নিচে থেকে রেশম বের করা শুরু করে। প্রথমেই তারা গাছের একটি নিরাপদ শাখায় রেশমের প্রলেপ দিয়ে পেছনের পা বরাবর নিজেকে আটকে নেয়। এরপর পর্যায়ক্রমে রেশমের সুতা মুখ থেকে বের করে ধীরে ধীরে নিজের শরীর ঘিরে সুন্দর একটি আবরণ তৈরি করে নেয়। যেন শীতের সময় সে গায়ে একটি কম্বল জড়িয়ে নিল। তবে এই আবরণটি অর্ধস্বচ্ছ হলেও বেশ অভেদ্যই থাকে।
গুটির ভিতরে সবার আড়ালে শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হবার প্রক্রিয়া চলে। এই দশাটিকে পিউপা বা কোকুন দশা বলে ইংরেজিতে। এই গুটি বা পিউপা তৈরি করতে শুঁয়োপোকাটির পুরো একদিন লাগে। গুটি বানানোর আগে শুঁয়োপোকাটি শেষবারের মতো তার আবরণ ত্যাগ করে। গুটি গঠন হবার পর পর শুরুতে গুটিটি বেশ নরম থাকে কিন্তু এক ঘণ্টার মধ্যে সেটি বেশ শক্ত হয়ে যায় যেন বাইরের পরিবেশ থেকে ভিতরের শুঁয়োপোকাটিকে রক্ষা করা যায়।
এখন গুটিটির ভিতরে শুঁয়োপোকাটি আস্তে আস্তে প্রজাপতি হয়ে যাবে। বাইরে থেকে দেখলে তুমি শুধু দেখতে পারে গুটিটির রং বদলাচ্ছে। এ থেকেই বুঝে নেবে যে ভেতরে মেটামরফোসিস হচ্ছে এবং শুঁয়োপোকার কোষগুলো প্রজাপতির কোষে পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে শরীরে যে কোষগুলো ছিল সেগুলোই এখন কলা তৈরি করছে এবং কলাগুলো মিলে একটি অঙ্গ। কোষে কলা কাকে বলে জান কি? একই ধরণের কোষের সমষ্টি যারা একটি নির্দিষ্ট কাজ করে তাদের কলা বলে আর কলাগুলো মিলে হয় একটি অঙ্গ। যেমন শুঁয়োপোকা দশার মুখ উপাঙ্গের কোষগুলো মিলে প্রজাপতির ফাঁপা পেঁচানো জিহ্বা হয়। ছোট, মোটা পাগুলো বদলে হয় লম্বা, সরু পা। এন্টেনা তৈরি, পাখা তৈরি হয় এবং প্রজনন অঙ্গও তৈরি হয়।
এরপর ১০ দিনের কাছাকাছি সময় লাগে পিউপা দশা সমাপ্ত হতে। পিউপা দশা শেষে প্রজাপতি গুটি কেটে বের হয়ে আসে। তখন শুধু মাঝের সরু দেহটিকেই বড় করে দেখা যায় কেননা রক্তসহ সকল জৈবিক রস ঐখানেই জমা থাকে আর পাখাগুলো বেশ সরু গোটানো অবস্থায় থাকে। গুটি থেকে বের হয়েই পাখায় পাম্প করে জৈবিক রস দেহ থেকে পাখায় যায় আর পাখাগুলো স্ফীত হতে থাকে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি ডানা মেলে আকাশে উড়ে যায়।
ব্লগটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
৫
৫ মন্তব্য