সহকারী শিক্ষক
১৬ আগস্ট, ২০২১ ০৫:৩৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রতিবেদন লেখা নিয়ে ইদানিং শিক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তা করতে দেখা যায়। প্রতিবেদন লেখা নিয়ে তারা দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে। এই দ্বিধা-দ্বন্দ দূর করার জন্যই আমার এই লেখার অবতারণা। আশা করছি শিক্ষার্থীদের কিছুটা হলেও উপকার হবে। (অনুগ্রহ করে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়বেন)
প্রতিবেদন কী :
প্রতিবেদন শব্দের আক্ষরিক অর্থ বিবরণী। শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘Report’-এর পরিভাষা হিসেবে। তবে শব্দটি বর্তমানে আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। প্রতিবেদন দ্বারা ঘটনার অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণমূলক বিবৃতি বোঝায়। প্রতিবেদন হল কোন নির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ বিবরণ । যিনি প্রতিবেদন রচনা করেন তাকে বলা হয় প্রতিবেদক।
এক কথায় বলা যায়, কোন একটি ঘটনা বা সংবাদকে সুশৃংঙ্খল ভাবে তথ্য বহুল করে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করাকে প্রতিবেদন বলে।
সংবাদপত্রের খবর, টিভির খবর এগুলো সবই এক একটি প্রতিবেদন। এছাড়াও, স্কুল/কলেজে, অফিসে, চাকুরিক্ষেত্রে, কোনো অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রে, সরকারি/বেসরকারি অফিসের গোপনীয় তথ্য পাঠাতে প্রতিবেদন ব্যবহার হয়।
প্রতিবেদনের প্রকারভেদ :
প্রতিবেদন প্রধানত দুই প্রকার : সংবাদ প্রতিবেদন এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন।
১। সংবাদ প্রতিবেদন : সাধারণত নাগরিক জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, কোথাও ঘটে যাওয়া জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, দুর্ঘটনা, কোনো বিষয় বা প্রসঙ্গ সম্পর্কে লেখা তথ্যমূলক বিবৃতিই সংবাদ প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন লেখার উদ্দেশ্য পাঠককে জানানো বা কতৃপ্রক্ষর দৃষ্টি আকর্ষণ করা।
প্রতিবেদন এ অবশ্যই থাকতে হবে -
ক) শিরোনাম : সংক্ষিপ্ত কিন্তু আকর্ষণীয় হতে হবে।
খ) প্রতিবেদকের নাম ও ঠিকানা ।
গ) স্থান। ঘ) তারিখ ও সময়:
নমুনা :
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি শহরের সম্পর্কে প্রতিবেদন
মূল বক্তব্য লিখবে ---------
প্রতিবেদকের নাম, ঠিকানা, স্থান, সমায়, তারিখ ।
*** তোমাদের ৯ম-১০ম শ্রেণির বোর্ড বইয়ে শুধুমাত্র এই ধরণের প্রতিবেদনের উল্লেখ আছে।
প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন বিভিন্ন প্রকার হয়। যেমন -
১। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন : শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনুষ্ঠিত কোনো ঘটনা বা বিষয় সম্পর্কে বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা অথবা কোনো শিক্ষক/কর্মচারী যখন প্রধান শিক্ষকের নিকট কোনো প্রতিবেদন লিখে সেটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন প্রধান শিক্ষকের বরাবর লিখতে হয়। মনে রাখবে এই ধরনের প্রতিবেদন শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত/সংশ্লিষ্ট ঘটনা নিয়েই লেখা হয়। নমুনা :
তারিখ :------
প্রধান শিক্ষক,
--------- বিদ্যালয়, নাটোর।
বিষয় : বিদ্যালয়ে আয়োজিত ----- সম্পর্কে প্রতিবেদন।
সূত্র : ------------
জনাব,
সম্প্রতি বিদ্যালয়ে আয়োজিত/অনুষ্ঠিত ------ সম্পর্কে প্রতিবেদন পেশে আদিষ্ট হয়ে নিচের প্রতিবেদন পেশ করছি।
এরপর মূল প্রতিবেদন
২। তদন্ত প্রতিবেদন : তদন্ত প্রতিবেদন দুই ধরণের হতে পারে।
ক) প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন : প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানের কোনো ব্যক্তি বা বিষয় সম্পর্কে কোনো অভিযোগ এর ভিত্তিতে উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
খ) পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন : কোনো মামলা বা জিডি এর প্রেক্ষিতে পুলিশ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
৩। কারিগরি প্রতিবেদন : কারিগরি (ইঞ্জিনিয়ারিং/ডাক্তারি/ব্রিজ/মিল/ফ্যাক্টরির যন্ত্রাংশ/গবেষনা ইত্যাদি) বিষয় নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদন। যেমন, কোনো ব্রিজ তৈরির জন্য এলাকায় মাটির উপর করা জরিপ নিয়ে প্রতিবেদন। এই প্রতিবেদন কোনো নির্দিষ্ট পেশার মানুষ ঐ একই পেশার মানুষের কাছে করে থাকে।
৪। বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন : কোনো অফিস বা সংস্থায় চাকুরিরত কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে তার বস ঐ অফিস বা সংস্থার উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে যে প্রতিবেদন পাঠায়। এটি সাধারণত কেউ প্রমোশনের উপযুক্ত হলে তার সম্পর্কে নেওয়া হয়।
৫। দাপ্তরিক প্রতিদেন : সরকারি বা কোনো সংস্থার এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যে প্রতিবেদন পাঠানো হয়। যেমন, শিক্ষা মন্ত্রনালয় থেকে অর্থ মন্ত্রনালয় এ কোনো প্রতিবেদন পাঠানো হলে তা এই শ্রেণির প্রতিবেদন। নমুনা :
গণপ্রজানন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
শিক্ষা মন্ত্রনালয়
------ এর কার্যালয়
(ওয়েবসাইট এর ঠিকানা)
স্মারক নং : ---------- তারিখ :------
বিষয় : ----- সম্পর্কে প্রতিবেদন।
এরপর মূল প্রতিবেদন
৬। আর্থিক প্রতিবেদন (অডিট) : কোনো প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কিত যে প্রতিবেদন তাই আর্থিক প্রতিবেদন।
এছাড়াও গবেষনামূলক প্রতিবেদন, নির্বাহী প্রতিবেদন, সাময়িক প্রতিবেদন, বিধিবদ্ধ প্রতিবেদন, নিয়মিত প্রতিবেদন, কোম্পানী প্রতিবেদন ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবেদন রয়েছে।
মনে রাখতে হবে, সংবাদ প্রতিবেদন ছাড়া সকল ধরনের প্রতিবেদনই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদন। প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনগুলো লেখার নিয়ম এর মধ্যে কিছুটা মিল রয়েছে। সকল প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনই উর্ধ্বতন কতৃপক্ষ বরাবর লেখা হয়। তারপর মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
ভালো মানের প্রতিবেদন লিখতে হলে যেসব বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে:
1. প্রতিবেদন হবে সংক্ষিপ্ত এবং তথ্যপূর্ণ ।
2. সমস্ত তথ্য হবে নির্দিষ্ট, সুনির্বাচিত, নির্ভুল এবং সহজ সরল ভাষায় ।
3. প্রতিবেদনে একটি শিরোনাম থাকবে ।
4. শিরোনাম এমন হবে যেন শিরোনাম দেখে পাঠকের কৌতূহল জাগে এবং প্রতিবেদনটি পড়ার ইচ্ছা হয় ।
5. শিরোনামের সঙ্গে বিষয়বস্তুর মিল থাকা আবশ্যিক ।
প্রতিবেদন লেখার সময় অনুসরণযোগ্য বিষয়গুলো হলো
পরিকল্পনা : প্রতিবেদন রচনার আগে প্রতিবেদককে স্থির করতে হয় কোন ধরনের প্রতিবেদন তৈরি হবে এবং কীভাবে তা লেখা হবে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনা বা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে প্রথমে মূল এবং পরবর্তী অংশে অন্যান্য তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এটি বিশেষ করে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন লেখার সময় প্রযোজ্য। প্রশ্নপত্রে প্রতিবেদনের বিষয় উল্লেখ করে দেওয়া থাকে।
সংহতি : প্রতিবেদনে কেবল প্রয়োজনীয় বর্ণনা এবং তথ্যই দিতে হবে। অপ্রাসঙ্গিক বর্ণনা বর্জনীয়। প্রতিবেদনকে হতে হয় সংহত ও শিল্পশোভন রচনা। প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত আবেগ ও মতামত এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
নিরপেক্ষতা : প্রতিবেদক কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টির পক্ষে পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। প্রতিবেদককে নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে সব পক্ষের মতামত সমান গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করতে হয়। এমনকি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলে তার বক্তব্যও উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
পর্যাপ্ত তথ্য : প্রতিবেদনে অবশ্যই পর্যাপ্ত তথ্য থাকতে হবে। কখন, কোথায়, কী, কেন, কীভাবে ঘটনা ঘটেছে এবং কে বা কারা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইত্যাদি তথ্য প্রতিবেদনে থাকতে হয়।
ভাষা : প্রতিবেদনের ভাষা হবে সহজ-সরল এবং স্পষ্ট। প্রতিবেদনে দুর্বোধ্য, অস্পষ্ট কিংবা দ্ব্যর্থবোধক শব্দ প্রয়োগ করা উচিত নয়।
অনুচ্ছেদ : প্রতিবেদনে ভিন্ন প্রসঙ্গের জন্যে নতুন অনুচ্ছেদ তৈরি করা বাঞ্চনীয়। একই অনুচ্ছেদ অন্য ধরনের প্রসঙ্গের অবতারণা করা উচিত নয়।
সূত্র নির্দেশ : প্রতিবেদনে অবশ্যই যথাসম্ভব সর্বজন গৃহীত ও স্বীকৃত সূত্র উল্লেখ করে তথ্য উপস্থাপন করতে হয়। সূত্রবিহীন প্রতিবেদন অন্যদের কাছে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন মনে হতে পারে।
সঙ্গতি রক্ষা : প্রতিবেদন অবশ্যই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রচিত হতে হবে। অর্থাৎ প্রতিবেদক কিছুতেই তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হবে না।
প্রযুক্তির সহায়তা : প্রতিবেদনের সত্যতা ও অবস্থার প্রমাণ সংগ্রহের জন্য প্রতিবেদক প্রযুক্তির সহায়তা (সচল বা স্থিরচিত্র গ্রহণ এবং কথোপকথন রেকর্ড করা) নিতে পারে। প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রয়োজন মোতাবেক তা সংযুক্ত করাও যেতে পারে।
৫৩
৯২ মন্তব্য