Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৮ আগস্ট, ২০২১ ১২:০৬ অপরাহ্ণ

নকশিকাঁথা বাংলার এক প্রাচীনতম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি

পুরানো শাড়ি বা কাপড়কে সেলাই করে বানানো হত কাঁথা। আর এ কাঁথা কালের আবর্তে পরিণত হতে লাগল ‘নকশি কাঁথায়’। কাঁথায় ধীরে ধীরে উঠতে লাগল আমাদের জাগতিক প্রাকৃতিক নানান চিত্র, নকশা। আধুনিক ভাবনায় মানুষ যখন উন্নীত হল-পুরানো শাড়ির পরিবর্তে নতুন শাড়িতে নকশা করে তৈরি হতে থাকল ‘নকশি কাঁথা’।নকশি কাঁথা আমাদের দেশীয় ঐতিহ্য, আমাদের অহংকার। এদেশের কারুশিল্পীদের নিপুন হাতের অনবদ্য সৃষ্টি। সেই আদিকাল থেকে আজ অবধি নকশি কাঁথার আবদার একটুও কমেনি। বরং সময়ের বিবর্তনে নকশি কাঁথার চাহিদা আরও বেড়েছে। যুক্ত হয়েছে আধুনিক ফ্যাশনেবল সব ডিজাইন আর নতুন নতুন নকশা। বর্তমানে ঘরের বিছানাতে ফ্যাশনেবল লুক আনতে নকশি কাঁথার জুড়ি মেলা ভার।

সংস্কৃত শব্দ ‘কন্থা’ ও প্রাকৃত শব্দ ‘কথ্থা’ থেকে ‘কাঁথা’ শব্দের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। কাঁথা শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘জীর্ণ বস্ত্রে প্রস্তুত শোয়ার সময়ে গায়ে দেয়ার মোটা শীতবস্ত্র বিশেষ’। বাংলাদেশের অঞ্চলভেদে কাঁথাকে খাতা, খেতা বা কেথা, কেতা নামে অভিহিত হয়। রংপুর অঞ্চলে কাঁথাকে ‘দাগলা’, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর অঞ্চলে ‘গুদুরি’ বলা হয়। সূচিকর্মে অলঙ্কৃত কাঁথাকে বলা হয় নকশি কাঁথা। অনেক জায়গায় নকশি কাঁথাকে সাজের কাঁথা বা নকশি খেতাও বলা হয়ে থাকে।

নকশি কাঁথা হলো সাধারণ কাঁথার উপর নানা ধরণের নকশা করে বানানো বিশেষ প্রকারের কাঁথা। নকশি কাঁথা বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটা অংশ। নকশি কাঁথা বাংলাদেশেরলোকশিল্পের একটা অংশ। সাধারণত পুরাতন কাপড়ের পাড় থেকে সুতা তুলে অথবা তাঁতীদের থেকে নীল, লাল, হলুদ প্রভৃতি সুতা কিনে এনে কাপড় সেলাই করা হয়। ঘরের মেঝেতে পা ফেলে পায়ের আঙ্গুলের সঙ্গে কাপড়ের পাড় আটকিয়ে সূতা খোলা হয়। এই সূতা পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য রেখে দেয়া হয়। সাধারণ কাঁথা সেলাইয়ের পর এর উপর মনের মাধুরী মিশিয়ে ফুঁটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন নঁকশা যার মধ্যে থাকে ফুল, লতা, পাতা ইত্যাদি।নকশি কাঁথা নকশা করা কাঁথা, বাংলার অন্যতম লোকশিল্প।বাংলাদেশে এ পারিভাষিক শব্দটির বহুল ব্যবহার শুরু হয় জসীমউদ্দীনের নক্সী কাঁথার মাঠ (১৯২৯) কাব্য থেকে।

আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে নকশিকাঁথা। এ যেন লোকায়ত শিল্পদর্শনের মূর্তপ্রতীক। কাঁথা অতি সাধারণ উপাদানে তৈরি এ দেশের কারুশিল্পীদের অনবদ্য সৃষ্টি। অনুপম শিল্পমাধুর্যের বাস্তব রূপ নকশিকাঁথা। কাঁথার সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। এ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবহূত উত্পাদিত শিল্পপণ্যের মাঝে নকশিকাঁথা অন্যতম। আমাদের দেশে এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কাঁথার ব্যবহার নেই। কাঁথা শব্দের অভিধানিক অর্থ ‘জীর্ণ বস্ত্রে প্রস্তুত শোয়ার সময়ে গায়ে দেয়ার মোটা শীতবস্ত্রবিশেষ’। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি কাঁথা, কেতা, কাতা এবং খেতা নামেও পরিচিত। সুনিপুণ হাতে সুঁই আর সুতায় গ্রামবাংলার বধূ-কন্যাদের মনের মাধুরী মেশানো রঙ দিয়ে নান্দনিক রূপ-রস ও বর্ণ-বৈচিত্র্যে ভরা যে কাঁথা, তাই নকশিকাঁথা। নকশিকাঁথায় আমরা প্রতিনিয়ত খুঁজে পাই আমাদের শিল্প, সংস্কৃতি, সমাজ-সভ্যতা, প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, গৌরবগাথা ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। নকশিকাঁথায় এ দেশের গ্রামীণ নারীদের লোকায়ত ভাবনা, আবেগ আর কল্পনার আরেক রূপ যেন সূচিকর্মের মাঝ দিয়ে মূর্ত প্রকাশ ঘটছে। গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির প্রবাহিত ধারায় তাইতো দেখা যায় নানা নকশাসমৃদ্ধ নকশিকাঁথা এবং কাঁথা নকশা অঙ্কিত বহুবিধ পণ্য। এটি মূলত গ্রামীণ মহিলাদের শিল্পকর্ম হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। নকশিকাঁথা শিল্পের সঙ্গে আমাদের আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডও জড়িয়ে আছে নিবিড়ভাবে।

মন্তব্য করুন