ইংরেজি সাল কখন থেকে গণনা করা হয়?
খ্রিষ্টপূর্ব বলতে বোঝায় যিশু খ্রিস্ট অর্থাৎ ঈসা (আ) এর জন্মের পূর্বের বছর গুলো।
যিশু খৃষ্টের জন্মের পূর্বের সাল খৃষ্ট পূর্ব দ্বারা গণনা করা হয়। আর জন্মের পরেরটা খৃষ্টাব্দ দ্বারা গণনা করা হয়।
খৃষ্টপূর্ব বলতে- BC(খৃষ্টপূর্ব) Before Christ.
অতএব, খৃষ্টপূর্ব মানে খৃষ্টের জন্মের আগে।
যীশু খ্রিষ্ট (হযরত ইসা আঃ) এর জন্মের পর থেকে ইংরেজি তারিখ গণনা শুরু করা হয়। এই জন্য ইংরেজি তারিখের সালকে খ্রিস্টাব্দ বলা হয় (খ্রিষ্ট+অব্দ=খ্রিস্টাব্দ; অব্দ মানে বৎসর)।
প্রতিদিন আমরা ভুলভাবে খ্রিষ্টীয় সাল ব্যবহার করছি ইংরেজি সাল হিসেবে। এমনকি আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষও ভুলভাবে ইংরেজি সাল ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন! কেউ জেনে আবার কেউ না-জেনে ব্যবহার করছেন প্রতিনিয়ত। এমনকি জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন আমাদের দেশে খুব জাঁকজমকভাবে ইংরেজি নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বহুবছর ধরে এই দিনকে ঘিরে উৎসবও হচ্ছে। বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়ার কারণে এর প্রচার-প্রসার এবং ব্যবহার এখন বহুমুখী।
এমনকি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন নথিপত্রে, পত্র-পত্রিকায়, অফিস-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, গণমাধ্যমে, দৈনন্দিন কাজে, দিনলিপিতে খ্রিষ্টাব্দকে ইংরেজি বছর হিসেবে চিহ্নিত ও ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ‘২০১৯ ইং অথবা ০১/০১/২০২০ ইং’। আসলে ইং এর স্থলে হবে খ্রিষ্টাব্দ, সংক্ষেপে খ্রি.। জানুয়ারির প্রথম দিনকে অনেকে বলেন ‘ইংরেজি’ বছরের প্রথম দিন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই পৃথিবীতে ইংরেজি বছর বা সাল বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আসলে ইংরেজদের নিজস্ব কোনো সাল নেই। আমরা খ্রিষ্টীয় সালকে ইংরেজি মনে করি।
ইংরেজদের চেয়ে আমরা এগিয়ে আছি সালের দিক থেকে- সেকথা ভাবলে বা বললে ভুল হবে না। কারণ আমাদের নিজস্ব বাংলা সাল আছে। আমাদের দেশে আমরা সাধারণত হিজরি, বাংলা এবং খ্রিষ্টীয় সাল ব্যবহার করে থাকি। প্রকৃতপক্ষে সঠিকটা জেনে বুঝে ব্যবহার ও প্রয়োগ করাই একজন সচেতন ব্যক্তির কাজ। ইতিহাস বিকৃত করে বা ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুল ব্যবহার বা শব্দের ভুল প্রয়োগ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বাঙালি হিসেবে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গৌরব রয়েছে। সেক্ষেত্রে সঠিকটা জেনেশুনে ব্যবহার করা সমীচীন। আমাদের দায়িত্বশীল কাজ হলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা দেয়া। তাদের বিভ্রান্ত না করা। তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেয়া। তাহলে একটা জাতি ভুল ও বিকৃত শিক্ষা থেকে যেমন দূরে থাকবে ঠিক একইভাবে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।
এবার আসি খ্রিষ্টীয় সালের শুরুর ইতিহাসের দিকে। ‘খ্রিষ্টাব্দ’ শব্দটির শুরুর ইতিহাস আমরা অনেকেই জানতে চাই। মূলত এর উৎপত্তির একটু ধারণা দেয়ার জন্যই আজকে এই লেখা। আসলে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিষ্টের জন্মের বছর থেকে যে বছর গণনা করা হয়, তাকেই খ্রিষ্টাব্দ বলে। যিশুখ্রিষ্টের জন্ম, জীবন, সেবা কাজ, মৃত্যুকে অবিস্মরণীয় করে রাখার জন্য পোপ গ্রেগরি নতুন এই বছরের গণনা শুরু করেন। বর্তমান পৃথিবীতে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও প্রচলিত।
বছর গণনায় আমাদের দেশে ইংরেজিতে BC ও AD দুটি শব্দ প্রচলিত। BC শব্দের অর্থ হলো Before Christ. বঙ্গানুবাদ হলো খ্রিষ্টপূর্ব বা খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আর AD এসেছে লাতিন শব্দ Anno Domini Nostri Jesu Christi থেকে। যার ইংরেজি অনুবাদ হলো The year of our Lord. বা বাংলায় খ্রিষ্টাব্দ। সহজভাবে বলা যায়, যিশুখ্রিষ্টের জন্মবছর থেকে যে বছরের গণনা শুরু করা হয়েছে, তা হলো খ্রিষ্টাব্দ। আর যিশুখ্রিষ্টের জন্মের আগ থেকে যে বছর গণনা করা হয়, তা হলো খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। এই গণনার রীতি অনুযায়ী কোনো শূন্য বছর নেই। অর্থাৎ যিশুখ্রিষ্টের জন্মবছরই হলো খ্রিষ্টপূর্ব (BC) আর তাঁর জন্মের পরের বছর থেকে খ্রিষ্টাব্দের (AD) প্রথম বছর।
কেমন করে এলো খ্রিস্টাব্দের হিসাব
যিশুখ্রিস্ট যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে আজ তার বয়স হত ২০২০ বছর।
অন্তত, অর্থানুসারে তাই হওয়া উচিৎ। খ্রিস্ট জন্ম থেকেই তো খ্রিস্টাব্দ। কিন্তু তাহলে তো যিশুর জন্ম পয়লা জানয়ারি হওয়া উচিৎ। সে তো নয়, আমরা তো পঁচিশে ডিসেম্বর…
মাঝখানের ছ’ছটা দিন কোথায় গায়েব হয়ে গেল?
ছোটবেলায় প্রশ্নটা আমাকে ভাবাত খুব। আর তখন তো হাতের কাছে সবজান্তা গুগল ছিল না। যাই হোক, পরবর্তীতে এই নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করে যা পেলাম, তাতে তো আরও চমকে চুয়াল্লিশ! জন্ম তারিখের কথা বাদ দিন, গবেষকরা বলছেন, যিশুর জন্ম চার খ্রিস্টপূর্বাব্দে। বুঝুন ঠ্যালা! যিশুর জন্ম নাকি যিশুর জন্মের চার বছর আগেই!
তাহলে আসুন, এই বিষয়ে যা পড়াশুনা করেছি তারই নির্যাসের এই লেখা, শোনাই খ্রিস্টাব্দের ইতিকথা।
প্রথমে আসি, বারোটি মাসের নামকরণ বিষয়ে।
সেপ্টেম্বর কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘সপ্তম’ বা ল্যাটিন ‘সেপ্টেম’ থেকে। গ্রিক, ল্যাটিন তথা প্রায় সমস্ত ইউরোপিয় ভাষার অনেক শব্দই উচ্চারণে ও অর্থে সংস্কৃতের সঙ্গে মেলে। তেমনি, অক্টোবর এসেছে, অষ্টম বা অক্টা থেকে, নবম বা নভেম থেকে নভেম্বর, দশম বা ডিসেম থেকে ডিসেম্বর।
জুলিয়াস সিজার তার জন্মমাস কুইন্টিলিস এর নাম পরবর্তন করে জুলাই করেন। শুধু তাই নয়, ফেব্রয়ারি মাস থেকে এক দিন কেটে জুলাই মাসে এক দিন যোগ করে দেন।
জানি ভাবছেন, সেপ্টেম্বর তো সপ্তম মাস নয়, নবম মাস, তেমনি অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বরও যথাক্রমে দশম, একাদশ আর দ্বাদশ। আরে দাদা, দিদিরা, রসুন (গার্লিক না কিন্তু)।
বিদ্যা বুদ্ধিতে, শক্তিতে, সে সময় রোম সাম্রাজ্যের খুব নামডাক ছিল।এই রোমানরা একপ্রকার ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত। সম্ভবত রোমান সম্রাট রোমুলাস ৭৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ক্যালেন্ডার চালু করেন। এতে থাকত দশটি মাস, যার শুরু মার্চ মাসে আর শেষ ডিসেম্বরে। সেই হিসাবে দাদা দিদিরা, সাতে সেপ্টেম্বর, আটে অক্টোবর, নয়ে নভেম্বর আর দশে ডিসেম্বর।ছয়ে ছিল সেক্সটিলিস, আর পাঁচে কুইন্টিলিস, যে দুটো মাসকে এখন আমরা অগাস্ট আর জুলাই নামে চিনি।
জুন মাসের নামকরণ হয়েছে রোমান দেবতা জুপিটারের স্ত্রী জুনোর নামে, মে হয়েছে ‘মেইয়া’, এপ্রিল ‘আফ্রেদিৎ’ আর মার্চ যুদ্ধের দেবতা মার্সের নামে।
দশ মাসের বছরে ছিল মোট তিনশ চার দিন। স্বভাবতই এই ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে চাষবাস, পালাপার্বণ কিছুই ঠিকমতো করা যেত না। তার ওপর, রাজা মহারাজারা ইচ্ছাখুশি ক্যালেন্ডারে দিন-টিন বাড়িয়ে কমিয়ে দিতেন।
পরবর্তী কালে সম্রাট নুমা পূর্বের দশ মাসের সঙ্গে আরও দুটি মাস জানয়ারি আর ফেব্রুয়ারি যোগ করেন। বাইশ দিনের একটি তেরোতম মাসও সে সময় ক্যালেন্ডারে এসেছিল, যেটি এক বছর অন্তর অন্তর ক্যালেন্ডারে জায়গা পেত। মাসটির নাম ছিল মার্সিডানাস।
মিশরিয়রা সে সময় জ্যোতির্বিদ্যায় অনেকখানি পারঙ্গম হয়ে উঠেছিল। আটচল্লিশ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার মিশর থেকে একটি ক্যালেন্ডার আমদানি করেন ও পরিমার্জন করে রাজ্যে তিনশ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে সৌরবৎসর এরকম ক্যালেন্ডার চালু করে জানুয়ারি আর ফেব্রুআরি এই দুটি মাসকে বছরের শুরুতে নিয়ে আসেন।
শুরুতে ফেব্রুয়ারি মাস ত্রিশ দিনেরই ছিল। কুইন্টিলিসও ছিল ত্রিশ দিনের মাস। জুলিয়াস সিজার তার জন্মমাস কুইন্টিলিস এর নাম পরবর্তন করে জুলাই করেন। কিন্তু রাজার নামে মাস; অন্য মাসের চেয়ে ছোট হয় কী করে? তাই ফেব্রয়ারি থেকে এক দিন কেটে জুলাই মাসটি একত্রিশ দিনের করেন।
জুলিয়াস সিজারের পরবর্তী রোমান সম্রাট সিজার অগাস্টাস সেক্সটিলিস মাসটির নাম পরিবর্তন করে অগাস্ট করেন এবং এবারও একই ভাবে বেচারা ফেব্রুয়ারির আরেকটি দিন কাটা যায়।
জুলিয়াস সিজারের নামে এই ক্যালেন্ডার ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ নামে পরিচিত হয়। কিন্তু তখন খ্রিস্টই নেই; তাই খ্রিস্টাব্দও নেই।
সময়ের হিসাবে ৫২৫ খ্রিস্টাব্দে, তখন বাইজানটিয়াম শাসকদের অব্দ প্রচলিত ছিল, যারা কিনা বহু খ্রিশ্চান নিধনের সঙ্গে যুক্ত, সে সময় পোপ ডাইনোসিস এক্সিগুয়াস হিসাব নিকাশ করে একেবারে ৫২৫ AD চালু করেন।
২১ শে মার্চ মহাবিষুব, তার চার দিন পর অর্থাৎ ২৫ শে মার্চ খ্রিস্টানদের একটি অতি পবিত্র দিন। ওই দিন গ্যাব্রিয়েল মেরিকে দর্শন দিয়ে যিশুর আগমনের সুসমাচার দিয়েছিল। আর ২১ শে মার্চ থেকে নয় মাস পরে অর্থাৎ ২৫শে ডিসেম্বর দিনটিকে যিশুর জন্মদিন ধরা হয়।
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরি লক্ষ করলেন, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে মহাবিষুবের তারিখ হচ্ছে ১০ই মার্চ অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ১১ দিন পিছিয়ে পড়েছে। তিনিই জ্যোতির্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে ক্যালেন্ডারে ১১ দিন যোগ করেন, লিপ ইয়ারের নিয়ম চালু করেন।
১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে ইংলন্ড আইন করে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বাতিল করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। পরে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশই এই ক্যালেন্ডার মেনে চলতে শুরু করে।
ইস্টার্ন অর্থোডক্সিয়ানরা গ্রেগরের এই সংস্কার মানেনি। তাই ওরা ২৫শে ডিসেম্বরের সঙ্গে ১১ দিন যোগ করে ৬ই জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন। বর্তমানে আর্মেনিয়াতে ও আরও কয়েকটি দেশে ৬ই জানুয়ারি বড়দিন।
রাশিয়া অনেক পরে (১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে রুশ বিপ্লবের পরে) গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। ১৯০৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে রাশিয়ান দল ১১ দিন পরে পৌঁছায়।
৭১
১৪৫ মন্তব্য