খাদ্য পিরামিড হলো আমাদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণের ডায়াগ্রাম্যাটিক উপস্থাপনা। আমাদের দেহের জন্য কোন খাদ্য উপাদান কতটুকু অনুপাতে প্রয়োজন, তা নিচ থেকে ওপরে ক্রমান্বয়ে সাজালে এই পিরামিড তৈরি হয়।
?খাদ্য পিরামিড বা বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিড-বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন পুষ্টিস্তরের পুষ্টি গঠনকে বা খাদ্যের যোগান ব্যবস্থাকে পরপর ক্রমপর্যায়ে নীচ থেকে উপরের দিকে সাজালে যে পিরামিড শিখর গঠিত হয়,তাকে খাদ্য পিরামিড বা বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিড বলে।1939 খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস এলটন সর্বপ্রথম এই খাদ্য পিরামিড বা বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিডের ধারণা দেন। চার্লস এলটনেরর নাম অনুসারে খাদ্য পিরামিডকে এলটোনিয়াম পিরামিডও বলা হয়।
?খাদ্য পিরামিডের গঠন-খাদ্য পিরামিডের ভূমিতে অবস্থান করে উৎপাদক জীব তথা সবুজ উদ্ভিদ। এই উৎপাদক স্তরে জীবের সংখ্যা, শক্তির পরিমাণ ও জীবভরের পরিমাণ সবথেকে বেশি থাকে।এরপর খাদ্য পিরামিডের অন্যান্য খাদ্য স্তরগুলিতে তথা প্রথম শ্রেণীর খাদক, দ্বিতীয় শ্রেণীর খাদক, তৃতীয় শ্রেণীর খাদক প্রভৃতি প্রতিটি পুষ্টিস্তরে জীবের সংখ্যা, শক্তির পরিমাণ ও জীবভরের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকে এবং সর্বোচ্চ স্তরে জীবের সংখ্যা, শক্তির পরিমাণ ও জীবভরের পরিমাণ সবচেয়ে কম হয়। এইভাবে বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে খাদ্য-খাদক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে একটি পিরামিড আকৃতির চিত্র অংকিত হয় বা খাদ্য পিরামিড বা বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিড গঠিত হয়।
?খাদ্য পিরামিডের বৈশিষ্ট্য-
১)ভিত্তি স্তর-উৎপাদক বা সবুজ উদ্ভিদ খাদ্য পিরামিডের ভিত্তি স্তর গঠন করে। এই স্তরে জীবের সংখ্যা, শক্তির পরিমাণ ও জীব ভরের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হয়।
২)সর্বোচ্চ স্তর-খাদ্য পিরামিডের শিখরে অবস্থান করে সর্বোচ্চ শ্রেণীর খাদক তথা মানুষ সহ অন্যান্য মাংসাশী প্রাণী। এই সর্বোচ্চ স্তরে জীবের সংখ্যা, শক্তির পরিমাণ ও জীব ভরের পরিমাণ সবচেয়ে কম হয়।
৩)মধ্যবর্তী স্তর-খাদ্য পিরামিডের মধ্যবর্তী স্তরে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর খাদক অবস্থান করে।
৪)খাদ্যস্তরের সংখ্যা-প্রতিটি খাদ্য পিরামিডে 2-4টি খাদ্য স্তর থাকে এবং একই শ্রেণীর খাদ্য-খাদক সম্পর্কযুক্ত জীবগুলি খাদ্য পিরামিডের একই স্তরে অবস্থান করে ও পুষ্টি সংগ্রহ করে।
৫)ক্রমহ্রাসমান জীবসংখ্যা-খাদ্য পিরামিডের ভূমি থেকে ওপরের দিকে অগ্রসর হলে প্রতিটি পুষ্টিস্তরে বসবাসকারী জীবের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পায় এবং খাদ্য শক্তির যোগান কমে যায়। তাই খাদ্য পিরামিডের শীর্ষদেশ সরু ও তীক্ষ্ণ আকার ধারণ করে।
৬)বিয়োজকের উপস্থিতি-খাদ্য পিরামিডের প্রতিটি স্তরেই বিয়োজকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
?খাদ্য পিরামিডের শ্রেণীবিভাগ-
পুষ্টি, শক্তি ও জীবভরের ভিত্তিতে খাদ্য পিরামিড তিন প্রকারের হয়। যথা-
A)সংখ্যার পিরামিড-
সংজ্ঞা-কোন বাস্তুতন্ত্রে পুষ্টি স্তর অনুসারে বিভিন্ন জীবের সংখ্যাকে ক্রমপর্যায়ে সাজালে যে বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিড গঠিত হয়, তাকে সংখ্যার পিরামিড বলে।
গঠন-সংখ্যার পিরামিডে প্রতিটি পুষ্টি স্তরে জীবের সংখ্যার বিশেষ তারতম্য ঘটে। সংখ্যাধিক্য থাকায় উৎপাদক পিরামিডের ভূমিতে অবস্থান করে এবং ভূমির ওপরের দিকে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং সর্বোচ্চ শ্রেণীর খাদকেরর সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। সর্বোচ্চ স্তরে খাদকের সংখ্যা সব থেকে কম হয়।
বৈশিষ্ট্য-
১)সংখ্যার পিরামিডে উৎপাদকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং মাংসাশী বা সর্বভুক প্রাণীর সংখ্যা সবচেয়ে কম থাকে।
২)ভূমি থেকে ক্রমোচ্চ স্তরগুলিতে জীবের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পায় বলে এই ধরনের পিরামিড খাড়া প্রকৃতির হয়।
৩)এই ধরনের খাদ্য পিরামিডের ভূমিতে উৎপাদক এবং শীর্ষে মাংসাশী প্রাণী অবস্থান করে।
৪)পরজীবীয় খাদ্য শৃংখলে সংখ্যার পিরামিড সর্বদা উল্টানো প্রকৃতির হয়।
৫)এই ধরনের খাদ্য পিরামিড দ্বারা প্রজাতির সংখ্যা জানা যায়।
৬)সংখ্যার পিরামিডের একক হলো সংখ্যা/বর্গমিটার/বছর।
উদাহরণ-একটি তৃণভূমির বাস্তুতন্ত্রে উৎপাদক প্রজাতির সংখ্যা সবথেকে বেশি হয় এবং ক্রমপর্যায়ে শাকাশী(হরিণ)-মাংসাশী(শৃগাল)-সর্বোচ্চ খাদকস্তরের (বাঘ) জীবের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। সর্বোচ্চ স্তরে খাদক সংখ্যা সর্বাপেক্ষা কম হয়।
B)শক্তির পিরামিড-
সংজ্ঞা-কোন বাস্তুতন্ত্রে পুষ্টিস্তর অনুসারে বিভিন্ন জীবের মধ্যে অর্জিত শক্তির পরিমাণকে ক্রমপর্যায়ে সাজালে যে বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিড গঠিত হয়, তাকে শক্তির পিরামিড বলে।
গঠন-শক্তির পিরামিডের প্রতিটি পুষ্টি স্তরে জীবের মধ্যে অর্জিত শক্তির বিশেষ তারতম্য ঘটে। এই ধরনের খাদ্য পিরামিডের সর্বনিম্ন পুষ্টি স্তরে তথা উৎপাদক স্তরে সৌরশক্তি থেকে অর্জিত শক্তির পরিমাণ সবথেকে বেশি হয়। পরবর্তী পুষ্টিস্তরগুলিতে নিম্নস্তর থেকে প্রাপ্ত শক্তির পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকে।লিন্ডেম্যানের সূত্রানুসারে এই খাদ্য পিরামিডের প্রতিটি স্তরে মোট অর্জিত শক্তির মাত্র 10% দেহ গঠনের কাজে ব্যবহৃত হয় এবং বাকি 90% শক্তি পুষ্টিস্তরে স্থানান্তরিত হয়। এই ধরনের খাদ্য পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তরে শক্তির যোগান সর্বাপেক্ষা কম হয়।
বৈশিষ্ট্য-
১)শক্তির পিরামিডে উৎপাদক স্তরে অর্জিত শক্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং সর্বোচ্চ স্তরে অর্জিত শক্তির পরিমাণ সবচেয়ে কম।
২)এই ধরণের খাদ্ পিরামিডের ভূমি থেকে ক্রমোচ্চ স্তরগুলিতে শক্তির পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পায়।
৩)এই ধরনের খাদ্য পিরামিডের ভূমিতে উৎপাদক এবং শীর্ষে মাংসাশী প্রাণী অবস্থান করে।
৪)এই ধরনের খাদ্য পিরামিড দ্বারা বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের উৎপাদনশীলতা জানা যায়।
৫)শক্তির পিরামিডের একক হলো কিলোক্যালোরি/বর্গমিটার/বছর।
উদাহরণ-একটি তৃণভূমির বাস্তুতন্ত্রে উৎপাদক তৃণ প্রজাতির মধ্যে অর্জিত শক্তির পরিমাণ সর্বাধিক। এরপর ওপরের দিকে প্রাথমিক খাদক (ঘাস ফড়িং), গৌণ খাদক (শৃগাল) এবং সর্বোচ্চ খাদক (বাঘ) স্তরে অর্জিত শক্তির পরিমাণ ক্রমশ কমতে থাকে।সর্বোচ্চ স্তরে খাদকের দেহে অর্জিত শক্তির পরিমাণ সবচেয়ে কম হয়।
C)জীবভর পিরামিড-
সংজ্ঞা-কোন বাস্তুতন্ত্রে পুষ্টিস্তর অনুসারে বিভিন্ন জীবের শুষ্ক ওজন বা জীবভরের পরিমাণকে ক্রমপর্যায়ে সাজালে যে বাস্তুতান্ত্রিক পিরামিড গঠিত হয়, তাকে জীবভর পিরামিড বা বায়োমাস পিরামিড বলে ।
গঠন-সংখ্যার পিরামিড ও শক্তিভিত্তিক পিরামিডের মতো জীবভর পিরামিডেরর ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পুষ্টি স্তরে তথা উৎপাদক স্তরে জীবভরের পরিমাণ সবথেকে বেশি হয় এবং তারপর উৎপাদক থেকে শাকাশী, শাকাশী থেকে মাংসাশী এবং মাংসাশী থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণীর খাদক স্তরে জীবভর ক্রমশ হ্রাস পায়। লক্ষ্য করে দেখা গেছে যে বিভিন্ন খাদ্য পিরামিডের ক্ষেত্রে একটি খাদ্যস্তরের 15%-20% জীবভর পরবর্তী খাদ্যস্তরে পরিবাহিত হয়। তাই জীবভর পিরামিডের প্রাথমিক খাদ্যস্তর থেকে উচ্চতর খাদ্যস্তরগুলির দিকে জীবভরের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পায় এবং সর্বোচ্চ খাদ্যস্তরে জীবভরের পরিমাণ সবচেয়ে কম হয়।
বৈশিষ্ট্য-
১)জীবভর পিরামিডে উৎপাদক স্তরে জীব ভরের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি এবং সর্বোচ্চ স্তরে জীবভরের পরিমাণ সবচেয়ে কম।
২)এই ধরণের খাদ্য পিরামিডের ভূমি থেকে ক্রমোচ্চ স্তরগুলিতে জীব ভরের পরিমাণ ক্রমশ হ্রাস পায়।
৩)এই ধরনের খাদ্য পিরামিডের ভূমিতে উৎপাদক এবং শীর্ষে মাংসাশী প্রাণী অবস্থান করে। তাই জীবভর পিরামিডের ভূমিভাগ বিস্তৃত এবং শীর্ষভাগ ক্রমশঃ হয়।
৪)এই ধরনের খাদ্য পিরামিড দ্বারা বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বায়োমাস বা জীবভরের পরিমান জানা যায়।
৫)জীবভর পিরামিডের একক হলো কিলোগ্রাম/বর্গমিটার/বছর।
উদাহরণ-একটি তৃণভূমির বাস্তুতন্ত্রে উৎপাদক তৃণ প্রজাতির জীবভর সর্বাপেক্ষা বেশি।এরপর ক্রমপর্যায়ে প্রথম শ্রেণীর খাদক (হরিণ) থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর খাদক (শৃগাল) এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর খাদক থেকে তৃতীয় শ্রেণীর খাদক (বাঘ) স্তরে জীবভর ক্রমশ কমতে থাকে। সর্বোচ্চ খাদক স্তরে জীবভর সর্বাপেক্ষা কম হয়।
শুভেচ্ছান্তে
মোঃ মামুনুর রহমান
সহকারী শিক্ষক(আইসিটি),
আইসিটি (ICT4E) জেলা অ্যাম্বাসেডর, রাজশাহী , a2i, Bangladesh
ও
ব্রিটিশ কাউন্সিল কো-অর্ডিনেটর,রাজশাহী
গুল-গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়
গোদাগাড়ী, রাজশাহী
Mobile & WhatsApp : +8801768927380
Email: [email protected]
বাতায়ন আইডি : mamunggghsc10 ,
Profile Link : https://www.teachers.gov.bd/profile/mamunggghsc10
৫৩
৯১ মন্তব্য