সহকারী শিক্ষক
১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:৩০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মহানবী (সা.)-এর জন্মের প্রেক্ষাপটঃমহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে (রসুল সা.) এক বিশেষ সময়ে এই পৃথিবীতে মানব জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার লক্ষ্যে পাঠিয়েছেন। এ জগতে তার আগমনে কুল কায়েনাত পুলকিত ও আনন্দিত; আমরা তার উম্মত হতে পেরে গর্বিত। মহানবী (সা.)-এর জন্মের মাস রবিউল আউয়ালে তার আগমনকে কেন্দ্র করে নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করার উদ্দেশ্যে যে সমুদয় মাহফিল ও ইসলামী অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হয়, যাকে মিলাদুন্নবী বলে; এর দ্বারা গোটা জাহানে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি, ইমানি ও রুহানি শক্তি বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে অন্ততপক্ষে কিছু সময়ের জন্য হলেও তাসবিহ-তাহলিল, হামদ-নাত ও দরুদ পাঠ করার মতো নানা ইবাদত করার সৌভাগ্য নসিব হয়।
বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য বড় নিয়ামত এবং সারা জাহানের জন্য রহমত ও বরকত।
আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সারা জাহানের রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি। ’
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। যেহেতু তিনি তাদের কাছে তাদের মধ্য থেকে একজন রসুল প্রেরণ করেছেন।
’ এ আয়াতদ্বয়ে আল্লাহতায়ালা প্রিয় নবীকে তার উম্মতের জন্য রহমত ও অনুগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ কথা সত্য, অপসংস্কৃতির ঘোর অন্ধকারে যখন তামাম পৃথিবী সয়লাব, মানবসমাজে মনুষ্যত্ব ও মানবতা যখন ধুলায় মিশ্রিত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা করুণ, ব্যক্তিপূজা, অগ্নিপূজাসহ বহুঈশ্বরে বিশ্বাসী আরব সমাজ যখন অত্যন্ত কলুষিত, নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি যখন একেবারেই অনুপস্থিত এবং অস্থিরতা, অরাজকতা ও অশান্তি যখন সর্বত্র বিরাজমান ঠিক তখনই বিশ্বের সব মানুষের শান্তি ও কল্যাণের শাশ্বত বার্তা নিয়ে এ পৃথিবীতে শুভাগমন করেন মহামানব হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার এ পৃথিবীতে মক্কায় মা আমিনার উদরে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রিয় নবী (সা.)-এর জন্মের সময় ছিল সুবহে সাদিকের পর এবং সূর্যোদয়ের পূর্বক্ষণ।
যখন নবী (সা.) মাতৃগর্ভে ছিলেন তখন মা আমিনা স্বপ্নে দেখেন যে এক উজ্জ্বলতর আলো সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ পর্যন্ত আলোকিত করছে। এ আলোক মা আমিনা নবীজির তাশরিফলগ্নে সচক্ষে পুনরায় দেখতে পান। পুণ্যময় আলোয় তার ঘর আলোকিত হয়। এ আলোর কারণে রোমের প্রাসাদসমূহ পর্যন্ত দৃষ্টিগোচর হয়। তার শুভাগমনলগ্নে পারস্যের রাজপ্রাসাদের ১৪টি চূড়া ভূমিতে ধসে পড়ে।
রাজধানীতে আদিকাল থেকে জ্বালিয়ে রাখা অগ্নিকুণ্ড নির্বাপিত হয় এবং সিলওয়া উপসাগর শুষ্ক হয়ে যায়।
হজরত রসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভাগমনের সংবাদ পেয়ে তার প্রিয় দাদা আবদুল মুত্তালিব আনন্দিত হন এবং তাকে কোলে তুলে নিয়ে কাবা শরিফে গমন করেন এবং আল্লাহর মহান দরবারে কৃতজ্ঞতা জানিযে খায়ের ও বরকতের জন্য দোয়া করেন।
তার চাচা আবু লাহাবকে যখন সুয়াইবা নামীয় এক দাসী পেয়ারা নবীর আগমনের খবর জানান তখন আবু লাহাব ভাতিজার জন্মের কথা শুনে খুশি হয়ে আপন দাসী সুয়াইবাকে আজাদ করে দেন।
খাসায়েসে কোবরাও তারিখুল খামিদ গ্রন্থে আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) উল্লেখ করেন, মা আমিনা বলেন, যখন আমার প্রিয় পুত্র ভূমিষ্ঠ হলো তখন আমি দেখতে পেলাম সে সিজদায় পড়ে আছে।
##তিনি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি। মানবকুলের সর্দার। আশ্চর্য চরিত্রের অধিকারী। অতুল সৌন্দর্যমণ্ডিত রহমাতুল্লিল আলামীন। তাঁর জন্মের প্রাক্কালে ও জন্মের পর এই ধরনীতে সংঘঠিত হয়েছে অনেক আশ্চর্যজনক আলৌকিক ঘটনা। এই অলৌকিক ঘটনাগুলো থেকে কিছু তুলে ধরছি-
১. সততা, আমানতদারীতা, বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদীতার জন্য সাদিক উপাধী পাওয়া নবীদের বংশে জন্ম নেয়া হযরত ইমাম সাদিক বলেছেন, শয়তান বা ইবলিস অতীতে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত যেতে পারতো, অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য সে সপ্তম আকাশে যেত। কিন্তু হযরত ঈসা আ.এর জন্মের পর থেকে চতুর্থ আকাশের উপরে ওঠা শয়তানের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এরপর যখন আমাদের নবী, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মগ্রহণ করলেন তখন তার জন্য সব আকাশই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। শয়তানকে আকাশের দরজাগুলো থেকে ধূমকেতু দিয়ে বিতাড়ন করা হয়।
২. পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভোর, যেই ভোর বেলায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন করলেন এই ধরনীতে, সেদিন বিশ্বের সবগুলো মূর্তি মাটির দিকে নত হয়ে পড়েছিল।
৩. সেদিনই ইরানের রাজার বিশাল প্রাসাদের বারান্দা কেঁপে ওঠেছিল এবং ছাদের ১৪টি প্রাচীর ধসে পড়েছিল।
৪. সেদিনই ইরানের সভে অঞ্চলের হ্রদটি তলিয়ে শুকিয়ে যায়। বহু বছর ধরে এই হ্রদের পূজা করা হত। (হ্রদ হল ভূ-বেষ্টিত লবণাক্ত বা মিষ্টি স্থির পানির বা জলের বড় আকারের জলাশয়। হ্রদ উপসাগর বা ছোট সাগরের মতো কোন মহাসমুদ্রের সাথে সংযুক্ত নয়, তাই এতে জোয়ার ভাটা হয় না।)
৫. সামাভে অঞ্চলে (কুফা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী) পানির প্রবাহ সৃষ্টি হওয়া। অথচ বহু বছর ধরে সেখানে কেউ পানি দেখেনি।
৬. ইরানের ফার্স অঞ্চলের (বর্তমান যুগের শিরাজ শহর সংলগ্ন) অগ্নি উপাসনালয়ের আগুন সেই রাতে নিভে যায়। অথচ ওই আগুন এক হাজার বছর পর্যন্ত প্রজ্বলিত ছিল।
৭. ইরানি সম্রাটের প্রাসাদের খিলান আকৃতির তোরণ ভেঙে যায় মাঝখান দিয়ে। ফলে তা দুই টুকরো হয়ে গিয়ছিল।
৮. রাসূলের জন্মদিনের রাতে বেলায় হিজাজ বা বর্তমান সৌদি আরব থেকে একটি আলো দৃশ্যমান হয় এবং তা পূর্বাঞ্চলসহ সারা বিশ্বের ছড়িয়ে পড়েছিল।
৯. সেই ভোরে বিশ্বের সব সম্রাটের সিংহাসন উল্টে পড়েছিল।
১০. সেই দিন বিশ্বের সব রাজা বোবা হয়ে পড়েছিলেন। অর্থাৎ তারা কথা বলতে পারছিলেন না।
১১. সেই দিন গণকদের সব জ্ঞান লুপ্ত হয় এবং জাদুকরদের জাদুগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।
"যার আগমনে পৃথিবী আলোকিত
যিনি এলেন এ ধরায় রহমত রূপে
যার আগমনে ফুটিল ফুল
ভেঙ্গে গেল মানুষের শতভুল।"
৭০
১৪৪ মন্তব্য