Loading..

ব্লগ

রিসেট

২২ অক্টোবর, ২০২১ ১০:০৪ অপরাহ্ণ

সালোকসংশ্লেষণ বা Photosynthesis

# সালোকসংশ্লেষণ বা Photosynthesis: 

সালোকসংশ্লেষণ বা Photosynthesis শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ photos (অর্থ: আলোক; এখানে সূর্যালোক) ও synthesis (অর্থ: সংশ্লেষণ, বা তৈরি করা) এর সমন্বয়ে গঠিত। 

আবার সালোকসংশ্লেষণ কথাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,সালোক শব্দটির অর্থ হলো--সূর্যালোকের উপস্থিতি এবং সংশ্লেষণ শব্দটির অর্থ—কোনো কিছু উৎপাদিত হওয়া। এক কথায় সালোকসংশ্লেষণ এর অর্থ দাঁড়ায় সূর্যালোকের উপস্থিতিতে রাসায়নিক সংশ্লেষ।

অর্থাৎ, যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2) ও মূল দ্বারা শোষিত পানির বিক্রিয়ায়, সূর্যালোকের উপস্থিতিতে, ক্লোরোফিলের সহায়তায় শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন করে এবং গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইডের সমপরিমাণ অক্সিজেন প্রকৃতিতে নির্গত হয়, তাকে সালোকসংশ্লেষণ বলে।


# সালোকসংশ্লেষণ এর বিক্রিয়া: 



সালোকসংশ্লেষের স্থান (Site of Photosynthesis):

ক্লোরোফিল সমন্বিত সকল সজীব কোষে সালোকসংশ্লেষ সংঘটিত হয় । তবে ক্লোরোফিলযুক্ত সবুজ পাতাই উদ্ভিদের প্রধান সালোকসংশ্লেষকারী অঙ্গ । পাতায় অবস্থিত মেসোফিল কলার কোষগুলিতে ক্লোরোফিলের আধিক্য থাকায় সালোকসংশ্লেষর মাত্রা সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয় । তবে পাতা ছাড়াও যে কোনো সবুজ সজীব কোষে অর্থাৎ সবুজ কান্ডে (ফণীমনসা, লাউ, কুমড়ো, পুঁই ইত্যাদি), ফুলের সবুজ বৃতিতে, অর্কিড মূলের সবুজ অংশে, গুলঞ্চের আত্মীকরণ মূলে, সবুজ শৈবাল (নস্টক, ভলভক্স, ইডোগোনিয়াম, কারা ইত্যাদি) এমনকি এককোশী প্রাণী ইউগ্লিনা (Euglena) ক্রাইস্যামিবা (Chrysamoeba) প্রভৃতির দেহেও সালোকসংশ্লেষ ঘটে । রোডোস্পাইরিলাম (Rhodospirillum) , রোডোসিউডোমোনাস (Rhodopseudomonas) নামক সবুজ ব্যাকটেরিয়াও সালোকসংশ্লেষ ঘটাতে সক্ষম ।

উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষের স্থান:

১. মূল - গুলঞ্চ, অর্কিড 

২. কান্ড - লাউ ফনীমনসা 

৩. পাতা - সবুজ পাতা

৪. বৃতি - ফুলের সবুজ বৃতি

৫. দল - আতা, কাঁঠালিচাঁপার সবুজ দল  

৬. ত্বক - কাঁচা ফলের ত্বক ।


* সালোকসংশ্লেষের প্রধান অঙ্গ - পাতা

* সালোকসংশ্লেষের প্রধান স্থান - মেসোফিল কলা

* সালোকসংশ্লেষকারী অঙ্গাণু - ক্লোরোপ্লাস্ট

* সালোকসংশ্লেষের আলোক বিক্রিয়ার ঘটনাস্থল - ক্লোরোপ্লাস্টের গ্রানা ।

* সালোকসংশ্লেষের অন্ধকার বিক্রিয়ার ঘটনাস্থল - ক্লোরোপ্লাস্টের স্ট্রোমা ।

* সালোকসংশ্লেষকারী রঞ্জক - ক্লোরোফিল ।

* সালোকসংশ্লেষে সক্ষম প্রাণী - ইউগ্লিনা, ক্রাইস্যামিবা ।

* সালোকসংশ্লেষে অক্ষম উদ্ভিদ  - ছত্রাক, স্বর্ণলতা ।


সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া:

১৯০৫ সালে ইংরেজ বিজ্ঞানী ব্ল্যাকম্যান (Blakman) সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করেন। যথা-    

১। আলোক পর্যায়/ আলোক নির্ভর পর্যায় (Light dependent phase)

২। অন্ধকার পর্যায়/আলোক নিরপেক্ষ পর্যায় (Light independent phase)


  * আলোক নির্ভর পর্যায় : দিনের বেলায় সূর্যের আলোর উপস্থিতিতে এ পর্যায় সম্পন্ন হয়। এ পর্যায়ে আলো অপরিহার্য। 

১। এ পর্যায়ে উদ্ভিদের পাতার ক্লোরোফিল সৌরশক্তিকে শোষন করে রাসায়নিক শক্তিতে পরিনত করে।

২। এ সময় পাতার ভেতরে পানি ভেঙে অক্সিজেন, ইলেকট্রন ও হইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন করে। পানির এ ভাঙ্গন প্রক্রিয়াকে    ফটোলাইসিস বলে।

৩। অতঃপর ফটোফসফরাইলেশন প্রক্রিয়ায় ATP উত্পন্ন হয় এবং NADP কে বিজারিত করে NADPH+H+ উৎপন্ন করে।

ফটোফসফরাইলেশন: সৌরশক্তি ব্যবহার করে ADP এর সাথে অজৈব ফসফেট যুক্ত হয়ে ATP তৈরি করার প্রক্রিয়াকে ফটোফসফরাইলেশন বলে।




আলোক নিরপেক্ষ পর্যায়: এ পর্যায়ে আলোর প্রয়োজন হয় না তবে আলোর উপস্থিতিতেও এ প্রক্রিয়া চলতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই অক্সাইড বিজারনের মাধ্যমে শর্করা জাতীয় খাদ্য উত্পন্ন হয়। উদ্ভিদ দেহে কার্বন ডাই অক্সাইড বিজারনের তিনটি গতিপথ সনাক্ত করা হয়েছে। যথা-

১। C3 গতিপথ বা ক্যালভিন চক্র

২। C4 গতিপথ বা হ্যাচ ও স্ল্যক চক্র

৩। CAM প্রক্রিযা / ক্রেসুলেসিয়ান এসিড বিপাক

C3 গতিপথ: বায়ুমণ্ডলের CO2পত্ররন্ধ্রের মধ্য দিয়ে কোষে প্রবেশ করে রাইবিউলোজ -১,৫ ডাইফসফেটের সাথে যুক্ত হয়ে অস্থায়ী যৌগ কিটোএসিড তৈরি করে।


i. পরবর্তীতে এ কিটোএসিড সাথে সাথে ভেঙে ৩- ফসফোগ্লিসারিক এসিড উৎপন্ন করে। এটি এ চক্রের প্রথম স্থায়ী যৌগ এবং তিন কার্বন বিশিষ্ট ।

ii. অত:পর ৩-ফসফোগ্লিসারিক এসিড আলোক পর্যায় থেকে প্রাপ্ত ATP  ও NADPH2  কে ব্যবহার করে ৩-ফসফোগ্লিসারালডিহাইড ও ডাইহাইড্রক্সি এসিটোন ফসফেটে পরিণত হয়।

iv. ৩-ফসফোগ্লিসারালডিহাইড ও ডাইহাইড্রক্সি এসিটোন ফসফেট থেকে ক্রমাগত বিভিন্ন বিক্রিয়ার মাধ্যমে একদিকে শর্করা এবং অপরদিকে রাইবিউলোজ ১,৫- ডাইফসফেট তৈরি হতে থাকে।


সালোকসংশ্লেষণের গুরুত্ব:

সালোকসংশ্লেষণ হলো উদ্ভিদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ খাদ্য উত্পাদন করে। জীবজগতে সালোকসংশ্লেষণের গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে সংক্ষেপে এর গুরুত্ব সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

১। সকল শক্তির উত্স সূর্য, উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সৌর শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত করে।

২। খাদ্যশৃংখলের মাধ্যমে উক্ত শক্তি সকল জীবে সঞ্চারিত হয়।

৩। পৃথিবীর সকল উদ্ভিদ ও প্রাণির খাদ্য প্রস্তুত হয় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায়।

৪। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় CO2  ও O2 অনুপাত ঠিক রাখতে সালোকসংশ্লেষণ বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

৫। উদ্ভিদ ও প্রাণির স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য বায়ুতে এ দুটি গ্যাসের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে উক্ত প্রক্রিয়ার ভূমিকা রয়েছে।

৬। শ্বসন প্রক্রিয়ায় নির্গত গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বায়ুমণ্ডল জীবজগতের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠবে। সালোকসংশ্লেষণ উক্ত গ্যাস গ্রহণ করে বায়ুকে নির্মল রাখে।

৭। মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান যেমন- কয়লা, পেট্রোল, রেয়ন, কাগজ, রাবার, ঔষধ ইত্যাদি সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার ফল।



সম্পাদনায়

তুষার কান্তি বৈদ্য

এম,এস,সি(উদ্ভিদবিজ্ঞান)

সহকারী শিক্ষক

বাবুগঞ্জ সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়

মন্তব্য করুন