সহকারী শিক্ষক
৩০ অক্টোবর, ২০২১ ০১:০৮ অপরাহ্ণ
বিড়ালের আদিখ্যেতা, বাঘ হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা
বিড়াল সম্পর্কে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা একেবারেই কম। আমি নিজে যেমন বিড়াল পছন্দ করি না তেমনি বিড়ালরাও সম্ভবত আমাকে তেমন একটা পছন্দ করে না। বিড়ালরা আমাকে কেন পছন্দ করে না সেটি আমি বলতে পারব না বটে; তবে আমি কেন এদের পছন্দ করি না সেটি বলতে পারি। এই প্রাণীটি সম্পর্কে সর্বপ্রথম আমার বিরক্তির উদ্বেগ হয় শৈশবকালে। আমাদের বাড়িতে একটি বেহায়া বিড়াল ছিল, যাকে ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হতো ছোঁচা বিলাই। প্রমিত বাংলায় ছোঁচা শব্দের অর্থ লোভী। তবে সাধারণ লোভ এবং আঞ্চলিক শব্দ ছোঁচার প্রতিশব্দ লোভ এক জিনিস নয়। সাধারণ লোভের বৈশিষ্ট্য হলো- লোভ বেশির ভাগই মনের মধ্যে থাকে। কিছু লোভের কারণে জিহ্বায় লালা চলে আসে এবং শরীরে উত্তেজনা দেখা দেয়। অন্য দিকে কিছু লোভের কারণে জিহ্বা বের হয়ে আসে এবং লোভনীয় বস্তু লেহন না করা পর্যন্ত জিহ্বা মুখের মধ্যে ঢোকে না। আপনি যতই লাথি-গুঁতো, কিল-ঘুষি মারুন অথবা অপমান করুন তাতে লোভের জিহ্বায় কিছুই হবে না- ওটি তার লেহনকর্ম করেই ছাড়বে এবং বিড়ালের লোভ যখন এই পর্যায়ে পৌঁছে তখনই কেবল সেটিকে ছোঁচা বিলাই বলা হয়ে থাকে।
আমাদের বাড়ির ছোঁচা বিলাইয়ের যন্ত্রণায় আমরা যারপরনাই অস্থির হয়ে পড়েছিলাম। রান্না করা খাবারে মুখ দেয়ার সব অপকৌশল সে জানত। ফলে আমাদের খাবার যে বিড়াল এঁটো করে দিত সেই সন্দেহ নিয়েই আমরা খাবার খেতাম। অন্য দিকে তার দুর্বৃত্তপনাও ক্রমেই বেড়ে চলেছিল। খাবারের প্লেট থেকে মাছ-গোশত ছিনতাই করা, শিশুদের ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে ভয় দেখানো এবং তাদের খাবার কেড়ে নেয়া ছাড়াও নির্বিচারে সবাইকে আঁচড় দিয়ে আহত করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। কোনো শাসন, লাঠিপেটা অথবা অন্য কোনো আঘাতে তাকে কাবু করা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় তাকে মারাত্মক আহত করা বা মেরে ফেলা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু এটা করা অসম্ভব ছিল। কারণ প্রাণী হত্যা করে মহাপাপী হয়ে দোজখে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়ার মতো কোনো লোক আমাদের বাড়িতে ছিল না।
উল্লিখিত অবস্থায় বিড়ালটিকে বস্তায় ভরের সাত-আট মাইল দূরের কোথাও ফেলে দিয়ে আসার জন্য আমার ছোট কাকাকে দায়িত্ব দেয়া হলো। তিনি নির্দিষ্ট দিনে কাজটি করলেন এবং অত্যন্ত খুশি মনে বাড়ি ফিরে এলেন। পরের দিন দুপুর বেলায় আমরা সবাই খোশ মেজাজে মধ্যাহ্ন ভোজনে যখন ব্যস্ত ছিলাম তখন লক্ষ্য করলাম যে ছোঁচা বিলাইটি ফিরে এসেছে। আমার শৈশবের এই স্মৃতির কারণে আমি বিড়াল থেকে নিজেকে তেত্রিশ গজ দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ১৯৯৪ সালের পর আমি আর সেটি পারিনি। কারণ আমার বড় সন্তানটি প্রচণ্ড বিড়ালভক্ত হয়ে জন্ম নিলো এবং শিশুকাল থেকেই বিড়াল সান্নিধ্য তার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ল। ফলে পুত্রের আবদারে আমি বিড়াল কিনে আনতে বাধ্য হলাম। আমার স্ত্রীর আমার মতোই বিড়ালের বিষয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু পুত্রসন্তানের আগ্রহের কারণে তিনি বিড়ালের যত্নআত্তি করতেন এবং বিড়ালের বিষ্ঠা পরিষ্কার করতেন। এভাবেই ২০০৫ সাল অবধি চলল। ইতোমধ্যে আমার বড় পুত্র বয়সে বালকে উন্নীত হলো এবং কন্যাটি শিশু থেকে নাবালিকাতে পরিণত হলো। তারা লেখাপড়া বাদ দিয়ে বিড়াল নিয়ে বেশি সময় কাটাতে ভালোবাসত। ফলে আমার স্ত্রী একদিন রাগ করে আমাকে একখানা কড়া নোটিশ দিলেন। তিনি বললেন- তোমার আদারের ছেলে-মেয়েদের বলে দাও- আমি আর বিড়ালের গু পরিষ্কার করতে পারব না। স্ত্রী মহোদয়ার রেড অ্যালার্টটি আমি পুত্র-কন্যাকে জানালাম। তারা তখন মহাচিন্তায় পড়ে গেল। কিভাবে নিরাপদে বিড়ালের বর্জ্য পরিষ্কার করা যায় তা নিয়ে বালক পুত্র এবং নাবালিকা কন্যা বহু চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করে এক উপায় বের করল।
১৬
২৬ মন্তব্য